সংস্কৃতি ও বিনোদন

  • কথা রইল (তৃতীয় ও অন্তিম পর্ব)

মানবেন্দ্র মজুমদার

['কথা রইল' শ্রী মানবেন্দ্র মজুমদার রচিত একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ তারিখে নাটকটি লেখা সম্পূর্ণ হয়েছিল। এই সংখ্যায় সেটির তৃতীয় ও অন্তিম পর্ব প্রকাশিত হল।]

যাদের নিয়ে - অবিনাশ, অনির্বাণ, অংশু, অদিতি এবং অটবি/অনুসূয়া।


[অখিল চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ঢোকে।]

অখিল ।। এটাও কিন্তু সত্যিসত্যি সাদা গরুর দুধের চা। তোমরা ভেবোনা আমি বাজে কথা বলছি। প্রতিদিন সকালে আমি খাটালে যাই আমার বাড়ির জন্য দুধ আনতে। আজ ওরা একটা সাদা গরু দুইয়ে আমায় দুধ দিল। সেই দুধটা আজ আমি এখানে নিয়ে এসেছি তোমাদের স্পেশাল চা খাওয়াব বলে। নাও - এবার আমিও দেখব যে এই দুধ খেয়ে তোমাদের শিকড়ের টান বাড়ে না কমে।

অনির্বাণ ।। বাড়বে তো নিশ্চয়ই অখিলদা। দুধের জন্য না হলেও - তোমাদের সবার সঙ্গলাভের জন্য তো বাড়বেই।

অখিল ।। আচ্ছা অনি, তোমার এখনও বই পড়ার নেশা আছে?

অনির্বাণ ।। আছে অখিলদা, কিন্তু ইদানিং একটু কমিয়ে দিয়েছি নেশাটা।

অদিতি ।। কেন? কমিয়ে দিলি কেন?

অনির্বাণ ।। সম্প্রতি আমার ধর্মগ্রন্থ পড়ার নেশা হয়েছিল আর তাতেই বিপত্তিটা বাঁধল। পড়ার নেশায় বিঘ্ন ঘটল।

অংশু ।। বুঝলাম না। ধর্মগ্রন্থ পড়লে বই পড়ার নেশায় বিঘ্ন বিপত্তি ঘটার কি কারণ থাকতে পারে।

অনির্বাণ ।। আসলে নানান ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে দেখলাম যে স্বর্গে লাইব্রেরী আছে এমন কথা কোনও ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই, বা আমি পাইনি। সুন্দরী অপ্সরাদের কথা আছে, খাদ্য পানীয়ের কথা আছে, নাচ-গান-জলসার কথা আছে, বাট নো লাইব্রেরী। তাই একটু চিন্তায় পড়ে বই পড়ার নেশাটা কমিয়ে দিয়েছি। কারণ ওখানে শুধু নেশাটা নিয়ে গিয়ে লাভ কি? যখন নেশা পূরণের বস্তুটা পাব না - তখন খুব কষ্ট হবে। আর জেনেশুনে কে কষ্ট করতে চায় বল?

অংশু ।। সত্যি, এটা তুই ঠিক বলেছিস। আচ্ছা - একবার নরকে খবর নিয়েছিস - সেখানে আছে কি না? আমাদের তো সেখানে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।

অদিতি ।। না না, নরকে থাকবে না। সেখানে তো খালি গরম তেল - আগুন, এসব। আর আমরা কেউ নরকে যাব না সেটা নিশ্চিত।

অংশু ।। কি করে নিশ্চিত হলি?

অদিতি ।। বা রে! একই অপরাধের জন্য বা ভুলের জন্য কেউ দু'বার শাস্তি পায় নাকি? আমরা ভুল করে মানুষ হয়ে জন্মে কি যথেষ্ট শাস্তি পাইনি ইতিমধ্যে? তাহলে আবার নতুন করে কেন শাস্তি ভোগ করব নরকে গিয়ে? আমরা সবাই স্বগ্যেই যাব - [হাসতে থাকে]

অখিল ।। ঠিক বলেছ একদম। মাঝেমাঝে মনে হয় মানুষ হয়ে জন্মানটাই হল নরকবাস।

অনির্বাণ ।। অখিলদা - তুমিও -

অখিল ।। তোমাদের একটা কথা বলা হয়নি -

অংশু ।। বল -

অখিল ।। একটা মেয়ে খুব জেদ ধরেছে আমার রেস্তোরাঁতে বসবে। তার রেস্তোরাঁর নামটা খুব পছন্দ হয়েছে তাই। কাল সকালেই সে নাকি এই শহর ছেড়ে চলে যাবে। আমি বারবার বলেছি যে আজ আমি এখানে বসতে দিতে পারব না, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। বলল যে সে ওয়েটিং হলে বসবে। এখানে বসবে না। মেয়েটি অনেক দূর থেকে এসেছে। তা তোমরা যদি অনুমতি দাও তাহলে আমি তাকে ওয়েটিং হলে বসতে দিতে পারি।

অনির্বাণ ।। অবশ্যই দাও অখিলদা। আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটা শর্ত। মেয়েটিকে বলবে যে সে যদি ভুল করেও আমাদের কোনো কথোপকথন শুনে ফেলে তাহলে সাথেসাথে যেন সেটা তার মস্তিষ্ক থেকে ডিলিট করে দেয়। ঠিক আছে?

অখিল ।। [হেসে] ঠিক আছে। আমি সে' কথাই বলব তাকে। [অখিল চলে যায়।]

অদিতি ।। চা-টা কিন্তু অখিলদা এখনও সেই আগের মতই সুন্দর বানায়।

অংশু ।। সাদা গরুর দুধের চা বলে কথা। [সবাই হেসে ওঠে।]

অনির্বাণ ।। অবিনাশ তাহলে সত্যি এলো না! এতক্ষণ আমার মনে একটু আশা ছিল যে ও হয়তো ঠিক এসে উপস্থিত হবে। কিন্তু এখন যেন কেমন দুশ্চিন্তা হচ্ছে।

[বাইরে একটা হট্টগোল শোনা যায়। অখিলের গলা - "না-না, তুমি ভিতরে যাবে না, এখানে বসার কথা হয়েছে তোমার সাথে, তুমি এখানেই বসে থাকবে"।

একটা মেয়ের কণ্ঠ শোনা যায় - "আমি এক্ষুনি চলে আসব। প্লিজ আমায় একবার অন্তত যেতে দিন"।

অখিলের কন্ঠস্বর শোনা যায় - "না, তুমি ভিতরে যাবে না"।

মেয়েটি বলে - "আমি একটু ভিতরটা দেখেই বেরিয়ে আসব"।]

অদিতি ।। [উঠে দরজার কাছে গিয়ে] অখিলদা, ওকে আসতে দাও -

[বলার সাথে সাথে একটা মেয়ে ঢোকে। ৩০/৩৫ বছর বয়স হবে। জিন্স ও গেঞ্জি পরা। পিঠে একটা রুকস্যাক জাতীয় ব্যাগ। ঢুকে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওরাও দেখতে থাকে মেয়েটিকে। বোঝা যায় মেয়েটি পরিশ্রান্ত।

অদিতি মেয়েটিকে বলে - বোসো তুমি।

মেয়েটি ।। [একটু ইতস্তত করে একটা চেয়ারে বসে] - ধন্যবাদ - [মেয়েটির বো করে সবাইকে ধন্যবাদ জানানো দেখে মনে হয় যে মেয়েটি এই শহরে বেড়ে ওঠে নি। বাইরে কোথাও বড় হয়েছে।]

অদিতি ।। তোমার নাম কি?

মেয়েটি ।। অনুসূয়া।

অদিতি ।। কোথায় থাকো তুমি?

অনুসূয়া ।। ব্রিসবেন।

অংশু ।। সেকি! সবাই কি আজকাল বিদেশে থাকে না কি?

অনুসূয়া ।। না আঙ্কেল, যাদের দেশে থাকার সুযোগ কমে আসে তারা ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়ে - আর এদেশ ওদেশ ঘুরতে ঘুরতে কোথাও গিয়ে নোঙর ফেলে।

অনির্বাণ ।। কেন - তোমার বাবা-মা কি এদেশে থাকেন না?

অনুসূয়া ।। না আঙ্কেল। আমার বাবাও তাঁর ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ব্রিসবেনে গিয়ে থিতু হয়েছিলেন, আমার জন্ম সেখানেই।

অদিতি ।। বাঃ, দেখেছিস অনি - অংশু? তবুও ও কি সুন্দর বাংলা বলতে পারে।

অনুসূয়া ।। সব কৃতিত্ব আমার বাবার আন্টি। আমার মধ্যে বাংলা শেখার, বাংলা ভাষাটাকে ভালোবাসার ইচ্ছেটাকে প্রবলভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন তিনি। আমার মাও আমায় যথেষ্ট উৎসাহ জুগিয়েছেন সুন্দর বাংলা শেখবার জন্য, যদিও তিনি একজন আইরিশ মহিলা।

অংশু ।। তুমি কি ঘুরতে এসেছ এখানে? মানে এই দেশে?

অনুসূয়া ।। প্রতি বছর একবার করে আসি আঙ্কেল। তবে এ'বছর ঘোরার সাথে একটা কমিটমেন্ট ফুলফিল করার আছে।

অদিতি ।। তুমি কিছু খাবে?

অনুসূয়া ।। হুঁ - সাদা গরুর দুধের চা।

অনির্বাণ ।। [হেসে] - মানে -

অনুসূয়া ।। আমি শুনেছি আপনারা সাদা গরুর দুধের চা নিয়ে কিছু বলছিলেন।

অংশু ।। তুমি তো সাংঘাতিক - আড়ি পেতে সব শুনেছ।

অনুসূয়া ।। অবশ্য আপনাদের সম্বন্ধে কিছু তথ্য আমার এমনিতেই জানা আছে।

অদিতি ।। এ নিশ্চয়ই অখিলদার কাজ।

অনুসূয়া ।। না, অখিল আঙ্কেল কিছু বলেননি।

অনির্বাণ ।। তাহলে তুমি জানলে কি করে?

অনুসূয়া ।। [অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে] আপনি তো খুব ভালো গান গাইতে পারেন, লিখতে পারেন - তাই না?

অংশু ।। তোমায় এসব তথ্য নির্ঘাৎ অখিলদা দিয়েছেন। এছাড়া আর কিছু হতেই পারে না।

অনুসূয়া ।। [অংশুকে] আপনার তো বরাবরই গ্রাম ভালো লাগে। আপনি তো সারাদিন আপনার গ্রামের জন্য খেটে যান। আপনার গ্রামের সবাই আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে - ভালোবাসে।

অদিতি ।। আশ্চর্য! তুমি এত সব কথা জানলে কি করে?

অনুসূয়া ।। [অদিতিকে] আপনার অসীম ধৈর্য আর মনোবল আপনাকে নমস্য করে তুলেছে। আজ আপনি বিদেশ বিভূঁইতে বিপদগ্রস্ত অসহায় মহিলাদের ভরসার কেন্দ্র। প্রতিনিয়ত অগনিত মানুষ আপনাকে শ্রদ্ধা জানায়।

অনির্বাণ ।। তুমি এতসব জানলে কি করে? সত্যি করে বলতো তুমি কে? তুমি কেন এসেছ এখানে?

অংশু ।। নাকি অখিলদা তোমার কাছে সবকিছু গল্প করেছে। সত্যি করে বলোতো অনুসূয়া।

অনুসূয়া ।। না আঙ্কেল, বিশ্বাস করুন অখিল আঙ্কেল আমায় কিছু বলেননি। সত্যি কথা বলতে কি অখিল আঙ্কেল আমাকে এই 'Transit Lounge' রেস্তরাঁতে ঢুকতেই দিতে চাইছিলেন না প্রথমে। অনেক কষ্টে আমি অখিল আঙ্কেলকে রাজি করিয়েছি। [ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বার করে] - আপনাদের সম্বন্ধে বেশিরভাগ তথ্য আমি এই ডায়েরিতে পেয়েছি। এখানে লেখা আছে অদিতি আন্টির সাথে মিঃ শৈবালের প্রবঞ্চনার কথা, আন্টির মেরুদন্ড শক্ত করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার কথা। এখানে লেখা আছে অনির্বাণ আঙ্কেলের ছবি আঁকা শেখানোর কথা, জামুরিয়া-কালাপাহাড়ি-অন্ডাল-সালানপুরের কুলি কামিনদের সন্তানদের পড়াশুনোর সাথেসাথে ছবি আঁকা-গান বাঁধা- গান গাওয়ার জন্য নিজের যাবতীয় উপার্জন, সঞ্চয় বিলিয়ে দেবার কথা। এখানে লেখা আছে অংশু আঙ্কেল এখনও তার গ্রামে কারো বাড়িতে সন্তান হলে তাদের সাদা গাভী উপহার দেন, যাতে সেই গাভীর দুধ খেয়ে সেই সন্তান মেধাবী হয় - সেই কথা। এখানে লেখা আছে কোটিপতি ব্যবসায়ীর পত্নী অটবির কথা - যে নাকি ন্যাষ্টি মিডলক্লাসদের সাথে তার কোনো পরিচয় আছে সে কথা ভাবতেই লজ্জা পায় - ন্যাস্টি বাংলাতে এত ভিড় যে এখানে পা রাখলেই তার সংক্রমনে মৃত্যু ঘটবে - তার কথা।

অদিতি ।। কে? কে লিখেছে এইসব?

[অখিল চা নিয়ে ঢোকে।]

অখিল ।। অবিনাশ। [সবাই ঘুরে তাকায়।] - এটা অবিনাশের ডায়েরি।

অংশু ।। আর তুমি?

অনুসূয়া ।। অবিনাশ আমার বাবা।

অদিতি ।। আশ্চর্য! ওর সাথে তো দীর্ঘদিন আমাদের কারও যোগাযোগ ছিল না। ও এত কথা জানল কি করে?

অনুসূয়া ।। বাবা আপনাদের সব খবর জোগাড় করতেন, লিখে রাখতেন এই ডায়েরিতে।

অনির্বান ।। অবিনাশ এলো না কেন?

অনুসূয়া ।। বাবা গত বছরে মারা গিয়েছেন। আসলে এক রোড এক্সিডেন্টে আহত হয়ে চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলেন বাবা। কিন্তু মনে অসম্ভব জোর ছিলা। খুব ইচ্ছে ছিল আজকের দিনে আপনাদের সাথে দেখা করার। মারা যাবার আগে আমায় বলেছিলেন যে আমি যেন আজকের দিনে এখানে এসে এই মিলনোৎসবের সব ব্যবস্থা করি। গতকাল আমি অখিল আঙ্কেলের সাথে সেইমতো কথা বলি। অখিল আঙ্কেল বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী সব ব্যবস্থা করেছেন। এমনকি সাদা গরুর দুধের চা পর্যন্ত। প্রতিবছর বাবা আমায় একবার করে দেশে পাঠাতেন সবার খবরাখবর নেবার জন্য। কিন্তু নিজের পঙ্গুত্বের খবর কাউকে দিতে চাইতেন না। তাই কোনোদিন আপনাদের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ করেননি। আমায় বলেছিলেন যে আমি যেন আজ সবার শেষে 'Transit Lounge'-এ আসি। কারণ আপনাদের শর্ত অনুযায়ী যে সবার শেষে আসবে - সে সমস্ত বিল মেটাবে। আর কেউ যদি না থাকে তাহলে সে তার উত্তরসুরির কাছে দায়িত্ব দিয়ে যাবে সেদিন উপস্থিত থাকার। তাই আমি সবার শেষে এসে আপনাদের বন্ধুর দিয়ে যাওয়া দায়িত্ব পালন করলাম। আপনাদের এই মিলনোৎসবে আমার বাবার প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে গ্রহণ করুন আপনারা।

[অদিতি অনুসূয়াকে জড়িয়ে ধরে। অখিল গিয়ে যে স্ট্যান্ডে ক্যালেন্ডারটা ঝুলছিল একদম প্রথমে সেই স্ট্যান্ডে একটা লম্বা কাগজ ঝোলায় পোস্টারের মতো। তাতে লেখা -

ভালো থাকিস তোরা - অখিলদা

তুমিও - অবিনাশ

লেখাটার উপরে আলো পড়ে। মঞ্চের অন্যান্য আলোগুলো সব আস্তে আস্তে নিভতে থাকে। নিয়নের আলোতে শুধু 'Transit Lounge' লেখাটা জ্বলতে থাকে। অনির্বাণ গান ধরে -]

"আমিও পথের মতো হারিয়ে যাব

আমিও নদীর মতো আসব না ফিরে

আর আসব না ফিরে কোনোদিন

আমিও দিনের মতো ফুরিয়ে যাব

আসব না ফিরে আর

আসব না ফিরে কোনোদিন।

মন আমার বাঁধল বাসা ব্যাথার আকাশে

পাতা ঝরা দিনের মাঝে মেঘলা বাতাসে

আমিও ছায়ার মতো মিলিয়ে যাব

আসব না ফিরে আর

আসব না ফিরে কোনোদিন।

যাবার পথে পথিক যখন পিছন ফিরে চায়

ফেলে আসা দিনকে দেখে মন যে ভেঙে যায়

চোখের আলো নিভল যখন মনের আলো জ্বেলে

একলা এসেছি আমি একলা যাব চলে

আমিও সুখের মতো ফুরিয়ে যাব

আসব না ফিরে আর আসব না ফিরে কোনোদিন

আসব না ফিরে কোনোদিন।..."

[পর্দা পড়ে]