সম্পাদকীয়

..."এই রাজা আসে    ওই রাজা যায়
জামা কাপড়ের         রং বদলায়...
    দিন বদলায় না !"...

– বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আমাদের পত্রিকার এবারের সংখ্যা প্রকাশের মুহূর্তে আমাদের কানে ভেসে আসছে আসছে শিকড় থেকে উচ্ছেদ হওয়া অগণিত বিপন্ন শ্রমজীবী মানুষদের আর্তনাদ-হাহাকার। তাঁদের জীবন-জীবিকা, উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ছোটো ছোটো দোকানপাট, অনেকের মাথাগোঁজার ঠাইকে নির্মমভাবে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবার ধ্বংসাত্মক ছবি আমাদের হৃদয়কে আহত করছে। কোনোরকম বিকল্প ব্যবস্থা, পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নিয়ে রেল স্টেশন ও সংলগ্ন অঞ্চলের সৌন্দর্যায়নের নামে হকার ও গরিব শ্রমজীবী মানুষদের সহায়-সম্বলকে শাসনক্ষমতার দম্ভে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মর্মান্তিক দৃশ্য আমাদের মানবিকসত্তাকে আঘাত হানছে। সরকার ও শাসকদল ঘনিষ্ট কিছু বৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থার স্বার্থরক্ষায় এই বীভৎসতা-চূড়ান্ত অমানবিকতাকে পাশকাটিয়ে আমরা কী করে সাহিত্য-সৃজন করব বা সংস্কৃতি চর্চায় মগ্ন হব? আমরা মনে করি এই নির্মমতাকে ধিক্কার জানানো এবং রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের এই বিপন্ন-অসহায় মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকারের লড়াইয়ের প্রতি সংহতি জানানো আমাদের দায়। এই সবহারানো,নিঃস্ব মানুষেরা জাগ্রত জনতার প্রতিবাদ-লড়াইয়ের উত্তাল প্রবাহের মধ্য দিয়ে দ্রুত তাঁদের জীবিকার পথ খুঁজে পাবেন এবং তাঁদের জীবনের স্বভাবিক ছন্দে পরিবারে জমাটবাঁধা গভীর বিষণ্ণতার মেঘ কেটে যাবে – এই মুহূর্তে এটাই আমাদের প্রগাঢ় আকাঙ্ক্ষা।

পত্রিকার এবারের সংখ্যা প্রকাশের মাসে জন্ম বাংলার নবজাগরণের অগ্রপথিক রাজা রামমোহন রায় এবং বিদ্রোহ-বিপ্লবের কবি কাজী নজরুল ইসলামের। এছাড়া এমাসেই অসমের প্রগতি সংস্কৃতি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, শিল্পী সেনানী বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার প্রয়াণ দিবস। তাই এবারের সংখ্যায় এই তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়েছে।

এই সংখ্যা থেকেই সূচনা হচ্ছে 'স্মৃতির সঞ্চয়', 'স্মরণে-শ্রদ্ধায়' এবং 'উত্তরের চিঠি' শিরোনামে তিনটি নতুন বিভাগ। 'স্মৃতির সঞ্চয়' বিভাগে সময়বিশেষে তুলে ধরা হবে প্রয়াত বিশিষ্ট লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীদের কালোত্তীর্ণ বিখ্যাত কিছু রচনা। সমসাময়িককালে দেশ-সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষকরে সৃষ্টিশীল জগতের প্রয়াত বিশিষ্টদের অবদানকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করে নিবন্ধ প্রকাশিত হবে 'স্মরণে-শ্রদ্ধায়' শিরোনামে। এছাড়া 'উত্তরের চিঠি' শিরোনামে ধারাবাহিকভাবে একজন সমাজকর্মী-গবেষিকার অভিজ্ঞতাসঞ্জাত উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা ও সংলগ্ন বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ, তাঁদের সমাজজীবন, ন্যায়-অন্যায়, বিভেদ-বৈষম্যের ছবি সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা হবে। দেশের একটি নির্দিষ্ট প্রান্তে সমাজ কোন অবস্থানে, কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে তা পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরাই এর অন্যতম উদ্দেশ্যে।

এই সংখ্যায় আমরা স্মরণ করছি সদ্য প্রয়াত স্বর্ণযুগের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী সুমন কল্যাণপুর এবং এই সময়ের একজন বলিষ্ঠ সমাজসচেতন চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্তকে।

এছাড়াও থাকছে গল্প,কবিতা ইত্যাদি নিয়মিত বিভাগ। এই সম্ভার সাজিয়েই আমরা এবারের সংখ্যা প্রকাশ করতে চলেছি। এই অবকাশে লেখক-কবি, যাঁরা তাঁদের রচনা দিয়ে আমাদের পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেছেন, তাঁদের জানাই অসীম কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা। সেইসঙ্গে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে আমাদের বিনম্র প্রত্যাশা, তাঁদের অভিমত, পরামর্শ ও সহযোগিতায় আমাদের আগামীর চলার পথ মসৃণ হবে। সবাইকে আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।


১ আষাঢ়, ১৪৩৩