সম্পাদকীয়

'একুশ'-'উনিশ' মানে মাথানত না করা

'একুশ'-'উনিশ' মানে মাথানত না করা – লড়াইয়ের অঙ্গীকারে উদ্দীপ্ত হওয়া। এই দু'টি দিন শুধু বিক্ষোভ-বিদ্রোহ-আন্দোলনের প্রতীক নয়, রক্তে রাঙানো পথে সাফল্যেরও প্রতীক। মাতৃভাষার মর্যাদা ও স্বাধিকার রক্ষায় এই দু'টি দিনের ঐতিহাসিক আন্দোলনের রক্তরঞ্জিত স্মৃতি আমাদের গর্ব – যা আমাদের হৃদয়ের গভীরে, মননে, সত্তায় প্রথিত উজ্জ্বল এক অহংকার, মহান উত্তরাধিকার এবং প্রগতির অভিযাত্রায় অফুরন্ত পাথেয়।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় – এটি জাতীয় সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের আধার। মাতৃভাষার মধ্যে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনবোধ সঞ্চিত থাকে। মাতৃভাষা দুর্বল হলে, অথবা বিস্মৃত হলে দুর্বল হয় জাতির আত্মপরিচয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা পেলে জ্ঞান অর্জন সহজ, স্বাভাবিক ও আনন্দময় হয়।

'একুশে ফেব্রুয়ারি' দিনটি শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিরোপা অর্জনের পর সমগ্র বিশ্ব মানবের সম্পদ। বিগত শতাব্দীর উনিশ শ বাহান্নর এই দিনটিতে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দেশপ্রেমিক ভাষাব্রতীরা ঢাকার রাজপথ রুধিরাক্ত করে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছিলেন, কালের প্রবাহে সেই লড়াইয়ের পথ বেয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা।

আবার উনিশ শ একষট্টির উনিশে মে তৎকালীন আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে একইভাবে এগারোজন শহিদের আত্মত্যাগ ও অগণন মানুষের লড়াইয়ের বিনিময়ে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

তারপরেও মাতৃভাষার উপরে আঘাত এসেছে বারবার, গড়ে উঠেছে দৃপ্ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। সেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ রূপান্তরিত হয়েছে দুর্বার লড়াইয়ে। যে লড়াই আজও চলছে বাংলাদেশে - অসমে, নানা জায়গায়।

যারা মানুষের কাছে যেতে চায়, তাদের কাছে ভাষার কোনো জাত নেই, শ্রেণি নেই । আর যারা মানুষের কাছে যেতে চায় না, তারাই মানুষকে ঠেলে দেয় ভাষার লড়াইয়ের দিকে। মানুষকে পদানত, বিভাজিত করার লক্ষ্যে আঘাত হানে ভাষার উপর। বর্তমান সময় তারই কিছু কদর্য সাক্ষ্য বহন করছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- প্রতিরোধের লড়াইও চলছে অবিরত।

রবীন্দ্রনাথ ১৯২৩ সালের ৩ মার্চ কাশীতে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতার এক জায়গায় উচ্চারণ করেছিলেন:
"আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা যেমন মাতৃক্রোড়ে জন্মেছি তেমনি মাতৃভাষার ক্রোড়ে আমাদের জন্ম, এই উভয় জননীই আমাদের পক্ষে সজীব ও অপরিহার্য। ...মাতৃভাষায় আমাদের আপন ব্যবহারের অতীত আর-একটি বড়ো সার্থকতা আছে। আমার ভাষা যখন আমার নিজের মনোভাবের প্রকৃষ্ট বাহন হয় তখনই অন্য ভাষার মর্মগত ভাবের সঙ্গে আমার সহজ ও সত্য সম্বন্ধ স্থাপিত হতে পারে।"

বিশ্বকবির এই অমোঘ উক্তিকে স্মরণ করে চলার দায় আমাদের – সবার।

এই অনুষঙ্গেই এবারের সংখ্যার আয়োজন। এই সংখ্যা প্রকাশের মুহূর্তে আমরা প্রত্যক্ষ করছি অস্থির পৃথিবী, চারপাশে যুদ্ধের বিভীষিকা, ধ্বংস ও মৃত্যুর ভয়াবহতা। এই বেপথু আবহে এবারের সংখ্যাটি পাঠকদের হৃদয়কে যদি কিঞ্চিৎ স্পর্শ করতে পারে, তবেই আমাদের প্রচেষ্টা সার্থক হবে – এই আমাদের বিনম্র অনুভব।


২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬