"শরতে আজ কোন্ অতিথি এল প্রাণের দ্বারে।
আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে।"
রবীন্দ্রনাথ শরতের আবাহনে আনন্দ উদ্যাপনের বার্তা শুনিয়েছেন এই গানের মাধ্যমে। শিউলি ফোটা এই শরতেই এসেছে আমাদের অন্যতম প্রাণের শারদোৎসব। কিন্তু এই উৎসবে কি আমরা কবির আহ্বান অনুযায়ী প্রাণের আবেগে উচ্ছ্বাসে খোলা মন নিয়ে আনন্দগানে মেতে উঠতে পারছি? আজকের জটিল-দ্বন্দ্ব, সমস্যা-আকীর্ণ সময় আমাদের এই প্রশ্ন ও সংশয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কবি জীবনানন্দের ভাষায় – "পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন।" হিংসা, অশান্তি, মৃত্যুর বিভীষিকা, অস্থিরতা, বিপন্নতা যেন গ্রাস করতে উদ্যত গোটা পৃথিবীকে। শুধুমাত্র প্যালেস্তাইনে ধ্বংসের বীভৎসতা ও ফুলের কুঁড়ির মতো শত শত নিস্পন্দ রক্তাক্ত মুখগুলিই আজকের পৃথিবীর এই রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরছে। সেখানে আর উল্লেখের প্রয়োজন হয় না রাশিয়া-ইউক্রেনের প্রলম্বিত যুদ্ধ কিংবা প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের রাজনৈতিক পালাবদল ও প্রাণহানির মতো আরও সব ঘটনা। পৃথিবীর নানা কোণে আজ অশান্তি-অস্থিরতা, বিশেষ করে উন্নত ও সভ্য বলে দাবি করা আমেরিকার সাম্রাজ্যলোলুপ কুৎসিত আগ্রাসী ভূমিকা এই অস্থিরতাকে যেমন বাড়িয়ে তুলছে, তেমনি নতুন করে ফ্যাসিবাদী উন্মত্ততাকেই যেন প্রকট করে তুলছে।
এই আবহে অশান্তি ও যন্ত্রণার দহন থেকে মুক্ত নয় আমাদের দেশও। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সংকটের সঙ্গে নানা বিভেদ-বিসংবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ সহ সংখ্যালঘু নিধন, নিজভূমে পরবাসী করার চক্রান্ত, গণতন্ত্র ও অধিকার হনন, সংবিধানকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টার পাশাপাশি শিক্ষাকে কলুষিত করা এবং বিজ্ঞান-যুক্তিবাদ-মুক্তচিন্তাকে নস্যাৎ করে সার্বিকভাবে দুর্ভর অন্ধকারের আবহ তৈরির উদ্যোগ চলছে রাষ্ট্রীয় মদতে।
আর আমাদের রাজ্যতো চরম নৈরাজ্য, অপশাসন, অন্যায়-অনৈতিকতা, আর আকাশছোঁয়া দুর্নীতির পাঁকে ডুবে আছে পালাবদলের পর থেকেই। সমাজের অন্যান্য অংশের মতো চিকিৎসক, মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরাও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আজ রাস্তায়। তাই তাঁরা নিগৃহীত। একের পর এক নারীলাঞ্ছনা, অত্যাচার ও মৃত্যুর ঘটনায় কলঙ্কিত রাজ্য। বর্তমান শাসনে বেকারত্ব সীমাহীন। নতুন প্রজন্মের সামনে নেই কোনো দিশা। বিপর্যস্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সমস্ত ক্ষেত্র। চারপাশ ছেয়ে আছে ধূসর হতাশার ছবি।
এর মধ্যেই অতি সম্প্রতি প্রবল বৃষ্টিতে জলমগ্ন হলো কলকাতা মহানগরী ও সংলগ্ন অঞ্চল। সরকার ও প্রশাসনের চূড়ান্ত উদাসীনতা ও অপদার্থতায় শারদোৎসবের প্রাক্লগ্নে নিদারুণ জল-যন্ত্রণা ভোগ করতে হতে হলো কলকাতাবাসীকে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অকালে ঝরে গেল বেশ কয়েকটি প্রাণ! চারদিকের প্রবল ক্ষয়ক্ষতির মাঝে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ার ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়লেন। জমা জলের প্রকোপে বিনষ্ট ও ধ্বংস হয়ে গেল কতশত দামি, দুষ্প্রাপ্য, প্রয়োজনীয়, অমূল্য গ্রন্থ! সেইসঙ্গে ছাপার কাগজ, আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ইত্যাদিরও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলো! কিন্তু কী নিষ্ঠুর পরিহাস! জলপ্লাবিত দুর্গত কলকাতাবাসী যখন বিপন্নতায় কাতর, তখন মুখ্যমন্ত্রীকে দেখা গেল নিজেদের অকর্মণ্যতা ও অপদার্থতাকে আড়াল করতে অন্যকে দোষারোপ করে গলা চড়াতে। আরও বিস্ময়ের যে, এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি কেটে ওঠার আগেই তিনি ও তাঁর পারিষদেরা মগ্ন হলেন পুজো উদ্বোধনে! মুখ্যমন্ত্রী নিজের মৌরুসিপাট্টা অটুট রাখার বাসনায় রাজ্য কোষাগার উন্মুক্ত করে দেদার অর্থ বিলোলেন পুজো-আয়োজক ক্লাবগুলোকে। অথচ দাবি ওঠা সত্ত্বেও দুর্গত-বিপন্ন মানুষদের সাহায্য তো দূরের কথা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো ও বিন্দুমাত্র সহানুভূতির বার্তাও শোনা গেল না মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে! এর মধ্য দিয়ে আর. জি. কর সহ আগের অসংখ্য ঘটনার মতো এবারেও মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সরকার চরম অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার নজির গড়লেন! আমরা কি এদের এই চরম অমানবিক মনোভাবকে নীরবে সম্মতি জানাতে পারি? আমরা নিশ্চিত, প্রিয় রাজ্যবাসী তাঁদের জীবনের অভিজ্ঞতায় এই সমস্ত অপহ্নবের স্মৃতি মনের গহনে সঞ্চিত রাখবেন। সব মিলিয়ে আজ এটা বলাই যায় যে, এই জমানায় বাংলার চিরন্তন ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, মানবিক আদর্শ, মূল্যবোধ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি সব কিছুই বিপর্যস্ত।
এই সমস্ত কিছুর অভিঘাতকে পাশ কাটিয়ে উৎসবে মেতে ওঠা কঠিন, কিন্তু বাংলার মানুষের দুর্মর প্রাণশক্তি রয়েছে অসম্ভবকে জয় করার।
আমরা জানি রাতের গাঢ় অন্ধকার শেষে ভোরের সূর্য আভা ছড়ায়, তেমনি নিদারুণ দুঃখ-যন্ত্রণার আগল ভেঙে এক সময় উৎসব-আনন্দের জোয়ার আসার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় । সংকট কখনোই শেষ কথা হতে পারেনা। আর এই শারদোৎসব তো অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার অঙ্গীকারের উৎসব। এই লক্ষ্যেই আমাদের উৎসব সংখ্যা প্রকাশের আন্তরিক প্রয়াস। এই অবকাশে আমাদের সমস্ত কবি, লেখক এবং পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই।
আসুন আমরা সমস্ত অশুভের বিরুদ্ধে সুন্দর ও শুভ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই উৎসবে শামিল হই। আমাদের এই আলোর অভিযাত্রায় ধ্বনিত হোক বিশ্বকবির সেই অমোঘ আহ্বান –
"হবে জয়, হবে জয়, হবে জয় রে,
ওহে বীর, হে নির্ভয়।
জয়ী প্রাণ, চির প্রাণ, জয়ী রে আনন্দ গান,
জয়ী প্রেম, জয়ী ক্ষেম, জয়ী জ্যোতির্ময় রে।
এ আঁধার হবে ক্ষয়, হবে ক্ষয় রে,
ওহে বীর, হে নির্ভয়।
ছাড়ো ঘুম, মেলো চোখ, অবসাদ দূর হোক,
আশার অরুণালোক হোক অভ্যুদয় রে।"
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫