পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাসুদেব সার্বভৌম নবদ্বীপ শহরের এক বটবৃক্ষতলে দক্ষিনাকালীর ঘট স্থাপন করেন। কোনো এক সময়ে বটগাছটি ভয়ানক বজ্রপাতে অগ্নীদগ্ধ হলে এই কালী পোড়ামা নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিক ভোলানাথ চন্দ গাছটির বয়স ১৮৪৫-এ একশত বর্ষ বলে নির্দিষ্ট করেছিলেন। সেই হিসাব অনুযায়ী আজকে গাছটির বয়স ২৭৮ বছর।
শাক্ত, বৈষ্ণব ও শৈব সংস্কৃতির ঐকান্তিক সংমিশ্রণে নবদ্বীপ ঐতিহাসিক পীঠস্থানে পরিনত হয়েছে।
গ্ৰাম্যদেবী পোড়ামা সারাবছর দক্ষিণাকালী ধ্যানে পূজিত হন। পাশে ভবতারিণী মন্দির ও শিবমন্দির রয়েছে। শুধুমাত্র সরস্বতী পূজার দিন শ্রীপঞ্চমী তিথিতে 'নীলসরস্বতী' হিসেবে পূজিতা হন। সেদিন ছাত্রছাত্রীদের কলরবে ভরে ওঠে সমগ্ৰ এলাকাটি।
সেই বটবক্ষ এখন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ছবিগুলি তার সাক্ষ্যবহন করে চলেছে।
২০১৯ সালে 'পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন' পোড়ামাতলাকে 'হেরিটেজ স্থান' হিসেবে ঘোষণা করেছে। সারা ভারতবর্ষে এরকম একটি দর্শনীয় স্থান দ্বিতীয় নেই। মায়ের মহিমা দেখার জন্য দলে দলে মানুষ আসেন। নেমে আসা গাছের ঝুরির মধ্যে মায়ের পূজা চলছে। মনে হয় তিনি নিজেই জায়গাটি বেছে নিয়েছেন।
অন্য মতে বাসুদেব সার্বভৌম-র বহু পূর্বে রামভদ্র সিদ্ধান্তবাগীশ এক শাস্ত্রীয় পন্ডিতের সাথে তর্কে পরাজিত হয়ে তাঁর ইষ্টমন্ত্র ত্যাগ করতে উদ্যত হলে ভয়ানক অগ্নিকাণ্ডে মন্দিরের মধ্যে দেবীর কোলে গোপালসহ করাল ভয়ানক রূপ দেখতে পান। আগুন নিভে গেলে ভস্মীভূত স্থান থেকে মাত্র দুটি ইঁট উদ্ধার হয়। সেই ইঁট দুটিই পোড়ামার আধার। তার উপরে ঘট স্থাপন করে আজও পূজা চলছে।
নবদ্বীপধামের এক টুকরো ইতিহাস যেন এখানে থমকে আছে। বটগাছের নীচে প্রায় একশোরও বেশী দোকান। ফুল মালা মিষ্টি শাঁখা সিঁদুর বিক্রি চলছে রমরমিয়ে। বটবৃক্ষতলে তার ছায়ায় ও মায়ায় চলছে এ সংসার। কথিত আছে মহাপ্রভুর মুখেভাত অর্থাৎ অন্নপ্রাশন এখানে হয়েছিল। নবদ্বীপকে আগে 'বাংলার অক্সফোর্ড' (Oxford of Bengal) বলা হতো। কত যে পন্ডিত জন্মেছিলেন এখানে তার শেষ নেই। "হরি বোল হরি বোল" ধ্বনী যখন নবদ্বীপের আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয় তখন মায়ের মন্দিরে শঙ্খ ঘন্টাধ্বনীতে আরাধনা চলতে থাকে। সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মনে হয় সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।
আলোকচিত্রঃ লেখক।