নতুন এই ই-ম্যাগাজিনের শুভারম্ভে, বড়দিন-এর শুরুতে লিখতে বসে মনে হচ্ছে, যে বছরটা চলে যাচ্ছে, তাকে কিভাবে আমরা বিদায় জানাবো, আর ক'দিন বাদেই যে নতুন বছরটা শুরু হবে, তার কাছেই বা কি প্রার্থনা করবো!
রবি ঠাকুর অবশ্য বলছেন, নতুন বছর আর পুরোনো বছর, আমাদের হিসাব, পৃথিবী চলে নিজের মতন, তার ক্রমাগত চলায় কোনো ছেদ নেই, আমরা শুধু ভাগ করে করে দেখি নিজের সুবিধার জন্য।
এই ভাগ করতে হয় আমাদের ভালো-মন্দ দিনগুলোকে একটু ফিরে দেখতে, আগামী দিনগুলোর কাছে কিছু আশা করতে, কিছু প্রার্থনা করতে।
যে বছরটা চলে যাচ্ছে, তাকে কিভাবে দেখবো? বিশ্ব দিয়ে শুরু করবো, না, আমাদের ভারতবর্ষ নিয়ে শুরু করবো, নাকি পশ্চিমবঙ্গ, আমরা যেখানে বাস করছি তা নিয়ে ভাবনা আরম্ভ করা ঠিক হবে!
বিশ্ব দর্শন
বিশ্বের দিকে চাইলে, ২০২৩ সাল, এক করুণ সময়, অন্তত, সুখ-শান্তির বিচারে। রাশিয়া-ইউক্রেনের ক্রমাগত যুদ্ধ, ইজরায়েল-গাজায় হত্যার মিছিল, মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তি। এদিকে রোহিঙ্গা, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, দেশে দেশে অগনিত শরণার্থীর ভীড়। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার সর্বত্র মানবাধিকার, মানবতার চরম লাঞ্ছনা। ক্ষুধার রাজ্য, যুদ্ধর রাজ্য অব্যাহত।
এছাড়া পরিবেশ দূষণ, গাছপালা ধ্বংস, আবহাওয়া পরিবর্তন (ক্লাইমেট চেঞ্জ) জনিত বিপদ। অথবা বলা যায়, পৃথিবীর প্রাকৃতিক বিপর্যয় অব্যাহত। কোভিড-১৯-এর ভয়ংকর সর্বনাশা আতংক কোনো দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা দিল না।
আশার কথা চিকিৎসা জগতে ভাইরাস মোকাবিলার অনেক প্রতিষেধক, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হল, বিজ্ঞানের অনেক সদর্থক আবিষ্কার হল, মানব কল্যাণে লাগল। কিন্তু মানুষ মারার কল, মানুষ বাঁচানো হতে অনেক এগিয়েই রইল। সাল ২০২৩-এ যা ঘটলো না, ২০২৪-এ তার ব্যতিক্রম ঘটবে - এমন মনে হবার কোনো কারণ অন্তত নেই। আমরা যেভাবে পশু-পাখি-গাছ-জলাভূমি ধ্বংস করে চলেছি, তাতে মঙ্গল-দিকে যাত্রার ভরসার বিন্দুমাত্র ইঙ্গিত নেই, আগামী ২০২৪ সালের জন্য। ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তী বা অন্য দার্শনিকদের কোনো সাবধানবাণী কি কানে আসবে না আমাদের!
ভারতবর্ষ
ভারতবর্ষের দিকে তাকালে, ২০২৩ সাল আমাদের কাছে ভালো-মন্দে মেশানো এক বছর। ভারতে অনেক জয়যাত্রা, চন্দ্রায়ন-৩-এর আগষ্ট মাসে চাঁদে সফল অভিযান, সেপ্টেম্বর-এ সৌর মিশন (আদিত্য এল-১-এর শ্রীহরিকোটা হতে উৎক্ষেপণ), খাদ্য উৎপাদনে অপেক্ষাকৃত সুফল, খেলার জগতে প্রভূত সাফল্য - এগুলো নিশ্চয় ভাল খবর। অনেক রোগ প্রতিষেধক আবিষ্কার, ইলেকট্রনিক জগতে জয় জয় ডাক, অন্যদিকে বেকারত্ব, বে-রোজগার, নিরন্ন ভুখা দিনযাপন, মুদ্রাস্ফীতি, পরিবেশন দূষণ, পাহাড়-জঙ্গল সাফ, নারী নির্যাতন অব্যাহত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নকারী হিংসার পরিবেশ।
মনিপুর, কাশ্মীর সহ অনেক অনেক রাজ্যে এক ধ্বংসলীলা।
নতুন বছরের কাছে কি আশা করতে পারি কোনো কল্যানবার্তা?
পশ্চিমবঙ্গ
আমরা যে রাজ্যে বাস করি, সেখানে, আশা আছে, আবার নিরাশাও অনেক। প্রশাসনিক দূর্নীতির এক উৎকট প্রকাশ, শিক্ষা ক্ষেত্রে, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে, চাকরি ক্ষেত্রে এক বিপুল নৈরাজ্য। নতুন বছরে ভালো কিছু ঘটবে এমন ভাবা অলীক স্বপ্ন। অসম্ভব কল্পনা।
আগামী বছর কেন্দ্রে লোকসভা নির্বাচন, সেখানে কিছু আশাব্যঞ্জক ঘটনা ঘটবে, এমন ভাবাও শক্ত।
তবু আশার বিরুদ্ধে আশা, হোপ এগেষ্ট হোপ নিয়ে আমাদের বাঁচা।
আমাদের মঙ্গল প্রার্থনা, আমাদের কল্যান প্রার্থনা, আমাদের আলোর দিকে ফেরার চেষ্টা তো চালিয়ে যেতে হবেই। যে শারীরিক অক্ষম মানুষজন এখনও নিত্যনতুন ক্ষমতা দেখিয়ে প্রতিদিন লড়াই করে চলেছে, বাঁচাতে এগিয়ে চলেছে, তাঁদের দিকে ভরসা রেখে এগোতে তো হবেই। রসায়নবিদ প্রফুল্ল রায়ের কথা স্মরণ করে বলা যায়, একটাও মঙ্গল প্রদীপ যদি জ্বালিয়ে রাখা যায়, তবে সেই আলোতে উৎসাহী মানুষ পথ খুঁজে পাবে। আরও আরও প্রদীপ জ্বলে উঠবে। আর সেই হবে, আজকের কুরুক্ষেত্রের, আজকের নৈরাজ্যে একান্ত আশা ভরসা।
আগামী বছর, সেই আলোই হয়তো, আগামী শতবর্ষকে উজ্জ্বল উদ্ধারের পথে নিয়ে যাবে।
পরিশেষে, রবিঠাকুরের, 'সভ্যতার সংকট' (১৯৪১ সালে লেখা) দিয়ে শেষ করি,
"...ভদ্রাণি পশ্যতি।..."
"উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব
নবজীবনের আশ্বাসে।
'জয় জয় জয় রে মানব - অভ্যুদয়'
মন্দ্রি উঠিল মহাকাশে।"
(১ বৈশাখ, ১৩৪৮)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।