ভারতবর্ষ এমন এক দেশ যেখানে সারা বছর উৎসব হয় নানানভাবে যেমন দোলযাত্রা, দুর্গোৎসব, আবার চলচ্চিত্র উৎসব, নাট্যোৎসব এমন কত কি। আমরা এইসব উৎসব সম্পর্কে অবহিত আছি। এবার পরিচিত হলাম নতুন ধরনের এক উৎসবের সঙ্গে। সেটি হলো 'গ্রন্থাগার উৎসব ২০২৩' (Festival of Libraries 2023) যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে, আগস্ট মাসের পাঁচ ও ছয় তারিখ। এই উৎসব করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক। উৎসবের মুখ্য বিষয় ছিল জনগণের মধ্যে মূলত কিশোর ও যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রন্থপাঠের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা ও জনগণকে গ্রন্থাগারমুখী করা। গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় পাড়ায় গ্রন্থাগারগুলিতে পঠনের পরিবেশ তৈরি করা। এখানে মূলত প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল সাধারণ গ্রন্থাগারগুলিকে। ভারত সরকারের উদ্যোগে 'আজাদী কা অমৃত মহোৎসব'-এর সমাপন ঘটানো হয় এই গ্রন্থাগার উৎসবের মাধ্যমে।
সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন গ্রন্থাগার যেমন জাতীয় গ্রন্থাগার, বিভিন্ন রাজ্য, জেলা, শহর, গ্রামীণ পাঠাগার, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার থেকে গ্রন্থাগারিকগণ এই উৎসবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন জেলার কালেক্টররা আমন্ত্রিত ছিলেন। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
এই উৎসব উপলক্ষে প্রগতি ময়দানের পাঁচ নম্বর হলটিকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। ওখানে বিভিন্ন ধরনের স্টল ছিল। এই স্টল-এর ব্যাপারে পরে বিস্তৃত বলছি। এই বিপুল আয়োজন করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় যে হয়েছে তা উৎসবের আয়োজনেই সুস্পষ্ট।
পাঁচ তারিখ একটি বিরাট সভাঘরে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করলেন মাননীয় রাষ্ট্রপতি শ্রীমতী দ্রৌপদী মুর্মু। এই অনুষ্ঠান দেখার জন্য প্রায় এক হাজারের উপর আমন্ত্রিত ব্যক্তির সমাগম ঘটেছিল। উপস্থিত ছিলেন আরও অনেক বেশি মানুষ। কিন্তু সকলের বসার সুযোগ ঘটেনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রকের আধিকারিক শ্রীমতী মুগ্ধা সিনহা। রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় এই উৎসব একটি আলোচনার মঞ্চে প্রতিপন্নিত হলো। যে মঞ্চে সারা পৃথিবীর সব বিখ্যাত গ্রন্থাগারগুলির আধুনিকীকরণ ও ডিজিটাইজেশন (digitisation)-এর সম্পর্কে আলোচনা হবে আবার প্রাচীন সংগ্রহগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করার বিষয়গুলিও আলোচিত হবে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি 'রামপুর রাজা লাইব্রেরী'-র ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ওই গ্রন্থাগারের নব কলেবরের যে বৈদ্যুতিন রূপ তার উদঘাটন করলেন।
সমগ্র হলটিতে অনেক স্টলের সাথে সংস্কৃতি মন্ত্রকেরও একটি নিজস্ব স্টল ছিল। ছিল 'এশিয়াটিক সোসাইটি'র স্টল। এই স্টলে অনেক প্রাচীন ম্যাপ প্রদর্শনের জন্য সাজানো ছিল। ওখানেই একটি অতি প্রাচীন topographic map ছিলো। ওই স্টলেই পাটনার 'খুদাবাক্স গ্রন্থাগার' (Khuda Bakhsh Oriental Public Library)-এর একটি অংশ ছিল। এই গ্রন্থাগারটির সংগ্রহের অনেক প্রাচীন পুঁথি সেখানে প্রদর্শিত হয়েছিল। ওখানকার আধিকারিক শায়েস্তা বেদার মহাশয় ওই পুঁথিগুলো আমাদের দেখিয়েছিলেন। মুঘল আমলের সব পুঁথি। ছোটদের একটি স্টলও ছিলো। সেখানে তাদের নানান কর্মশালায় যুক্ত করা হয়েছিল যেমন ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি। ছোটদের স্টলে গল্প শোনারও অনুষ্ঠান ছিল। লেখকদের জন্য আলাদা স্টল ছিল সেখানে তাঁরা তাঁদের লেখা সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন, পাঠকদের সাথে মতামত বিনিময়ও করছিলেন। ওই স্টলে বিতর্কসভাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে। স্টলগুলির বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছিল যেমন bibliophili (a lover of books), bibliobibuli (the sort of people who read too much), biblichor (the smell of old books) ইত্যাদি।
মূল সভাঘরের দেওয়াল গোন্ড (Gond) উপজাতির লেখার যে বিভিন্ন স্ক্রিপ্ট (Gondi Script) তাই দিয়ে সাজানো হয়েছিল। আর একটি দেওয়াল প্রাচীন পোস্টাল স্ট্যাম্প দিয়ে সাজানো হয়েছিল। একটি স্টল হয়েছিল 'গ্রাম পাঠশালা'র। এনারা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে সেখানকার মানুষদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সাহায্যেই গ্রন্থাগার তৈরি করছেন। গ্রামের মানুষরাই তাঁদের গ্রামের কোনো পরিত্যক্ত বাড়িকে সারাতে সাহায্য করে পাঠশালা ও গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা করছেন। এটা সম্পূর্ণ বেসরকারি একটি প্রচেষ্টা।
উৎসবে প্রায় একশো জন কালেক্টরদের নিয়ে আলোচনা সভা বসেছিল। তাঁরা গ্রামে গ্রামে কিভাবে গ্রন্থাগার স্থাপন করা যায় সেই ব্যাপারে সম্ভাব্য পরামর্শ দিয়েছেন। 'লিটারারি রিট্রিট' নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা সম্পর্কে আলোচনা হল। কোনো লেখক তাঁর গৃহের বাইরে গিয়ে কিছুদিন অন্য পরিবেশে থেকে লেখার সুযোগ পান এই ক্ষেত্রে। 'রামপুর রাজা লাইব্রেরি'রও একটি স্টল হয়েছিল। রামপুর-এর রাজার রহস্যজনকভাবে অন্তর্ধানের উপর নানা গল্প ও উপন্যাস আছে, তার উপর সাম্প্রতিকতম গ্রন্থটি উদ্বোধন করেন মাননীয় রাষ্ট্রপতি।
শ্রীমতী মীনাক্ষী লেখি বর্তমানে ভারতের পররাষ্ট্র ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তিনি অনুষ্ঠানের শেষ দিনের বক্তৃতায় উল্লেখ করেন যে একটি শিশুকে যদি বইয়ের নেশায় ছোট থেকে যুক্ত করা যায় তবে সে আর অন্য কোনো বড় নেশায় মজে না। তিনি প্রসঙ্গক্রমে 'দিল্লি পাবলিক লাইব্রেরী'র কথা উল্লেখ করেন। এক সময় অনেক প্রোথিতযশা ব্যক্তি এই গ্রন্থাগার ব্যবহার করেন। তিনিও ছাত্রজীবনে এই গ্রন্থাগার ব্যবহার করেন বলে উল্লেখ করেন। ওই গ্রন্থাগারটিকে বর্তমানে আবার নব কলেবরে সজ্জিত করা হচ্ছে।
উৎসবের শেষ দিনের শেষ পর্বে উপরাষ্ট্রপতি শ্রী জগদীপ ধনখর মহাশয় একটি 'গ্রন্থাগার ডিরেক্টরি'র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।উপরাষ্ট্রপতির বক্তব্যের মধ্যে বই পড়া ও গ্রন্থাগার ব্যবহার করার উপযোগিতা এবং এর মাধ্যমে যুব সমাজ যে এক নতুন স্তরে দেশকে পৌঁছে দিতে পারে এই ভাবনাটিই ফুটে ওঠে।
এই উৎসবে প্রচুর অর্থব্যয় হল ঠিকই কিন্তু বর্তমানে সমগ্র দেশের প্রায় চল্লিশ হাজার গ্রামীণ সাধারণ গ্রন্থাগার যে অর্থাভাবে প্রায় বন্ধের মুখে সেই ব্যাপারে আর্থিক সাহায্য কেন্দ্রীয় সরকার কিভাবে করবেন বা গ্রন্থাগারের প্রশিক্ষিত কর্মী কিভাবে নিয়োগ করবেন সে ব্যাপারে কোনো দিশা পাওয়া গেল না।
আলোকচিত্রঃ ডঃ মধুশ্রী ঘোষ উপাধ্যায়
[ডঃ মধুশ্রী ঘোষ উপাধ্যায় বর্তমানে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপ গ্রন্থাগারিক হিসাবে কর্মরতা]
#FestivalOfLibraries2023 #PragatiMaidan #Delhi #AzadiKaAmritMahotsav #DroupadiMurmu #MeenakshiLekhi #JagdeepDhankhar #MugdhaSinha #RampurRazaLibrary #AsiaticSociety #TheAsiaticSociety #DigitisationOfLibraries #KhudaBakhshOrientalPublicLibrary #ChildrensPavilion #VillagePathshala #LiteraryRetreat #WritersRetreat #DelhiPublicLibrary #DPL #NetajiSubhasOpenUniversity #NSOU #LibraryDirectory #books #bookworm #reading #booklover #read #bibliophile #bookish #bookaholic #bookphotography #reader #booklove #literature #library #bookshelf #author #bookstore #bookmark #DrMadhusriGhoshUpadhyay #DeputyLibrarian