শীতকাল। বাইরে বরফ পড়ছে। রাস্তায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে। বেশ একটা আলো-আঁধারি পরিবেশ। তারই একপাশে চিমনিসমেত একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। সেখানে একটা কুকুর। নিদেনপক্ষে একটা বেড়াল। সেখানে বাস করে বাপ-হারানো একটি ছোট ছেলে, তার বোন আর মায়ের সাথে। ঘরে দরিদ্রতার ছাপ স্পষ্ট। অভাব। তবু তারা স্বপ্ন দেখে। এবছর তাদের বড়দিন পালন করতেই হবে। ওদিকে ক্রিসমাস পালনে প্রতিবেশীদের অসহযোগিতা। তা সত্ত্বেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের দৃঢ়তা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদির সমাহারে ঠাসবুনোট বুক মোচড় দিয়ে ওঠা কথোপকথন।
এভাবেই শুরু হতো আমাদের ছোটবেলায় পড়া সোভিয়েত দেশের অধিকাংশ ছোটদের গল্পগুলো। গল্প পড়ার সময় অন্য কোনোকিছু আমাদের খেয়াল থাকত না। আমরা সম্পূর্ণ একটা অন্য জগতে প্রবেশ করতাম। আর গল্পের শেষে মন উদাস হয়ে যেত। বইয়ের শেষ পাতা খোলা থাকতো অনেকক্ষন ধরে। আর এখান থেকেই আমরা পেতাম মানবিকতা, মূল্যবোধের পাঠ। ছোটবেলায় আমাদের কেউ ঘাড় ধরে সেই পাঠ কেউ শিখিয়ে দেয়নি। অবশ্য এই বইগুলো সারাবছর আমরা পেতাম না। ঠিক পুজোর সময় কাস্তে-হাতুড়ির ছবি দেওয়া লাল কাপড়ে মোড়া স্টল থেকে বাবা কিছু বই কিনে দিতেন। ওখানে বসে থাকা কাকুরা আমার পছন্দমতো বই বেছে নিতে বলতেন। মাঝে মধ্যে নিজেরাই বেছে দিতেন। নতুন ঝকঝকে বই হাতে পেয়ে আমার সে কি আনন্দ। বইগুলোর মূল আকর্ষণ ছিল অসাধারণ সব ইলাস্ট্রেশন। বাবা কোনওদিন আমাকে কোনও কমিকস-এর বই কিনে এনে দেননি। ওগুলো অনেক পরে আমাদের আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহারস্বরূপ পেয়েছি।
●
তারপর ধীরে ধীরে ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় স্কুল থেকে ফিরে যখন সময় পেতাম তখন, আমাদের বাড়িতে বহু পুরোনো একটা আলমারি ছিল সেখানে পুরোনো সব বই থাকতো, সেখান থেকে বই বের করে পড়তাম। ওখানে ছিল 'দেব সাহিত্য কুটির'-এর সব বই। সাথে নারায়ণ দেবনাথ-এর করা দারুন সব ইলাস্ট্রেশন। সেই সময় কিছু স্বপনকুমারের লেখা বইও পড়েছি। ছিল 'চাঁদমামা', 'অমর চিত্র কথা', 'শুকতারা', 'সন্দেশ' এইসব ম্যাগাজিন।
পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য বেশি সময় ব্যয় হওয়ায় পাঠ্য বইয়ের চাপে পাঠ্যাতিরিক্ত বই বেশি পড়া হতো না। সেই সময় মূলত কমিকস পড়েছি - অরণ্যদেব, ম্যানড্রেক এইসব।
বাড়িতে 'আনন্দমেলা' আসার সুবাদে রোভার্সের রয়, সদাশিব, টারজান, গাবলু এইসব কমিক স্ট্রিপ পড়েছি। পরে জেনেছি সদাশিব-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তরুণ মজুমদার। ইলাস্ট্রেশন করতেন বিমল দাশ। সঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর লেখনি। তখন 'আনন্দমেলা'-র সাইজ ছিল মাঝারি। আর দৈনিক 'আনন্দবাজার পত্রিকা'র ২-এর পাতার নীচে বাঁদিকে নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে বেরোত অরণ্যদেব আর জাদুকর ম্যানড্রেক-এর কমিকস।
এরপর শুষ্ক জমিতে ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। হঠাৎই স্কুলের এক বন্ধুর মারফত হাতে এলো হাঁদা-ভোঁদা আর বাঁটুল। সেই সময় 'হাঁদা-ভোঁদার কাণ্ডকারখানা' আর 'বাঁটুল দি গ্রেট' গুলে খেয়েছি। পরে এলো নন্টে ফন্টে (সাথে কেল্টুদা আর হেডস্যার)। তখন বন্ধুদের সাথে বইয়ের আদান-প্রদান চলত। পাড়ার একটা দোকানে তখন মিনি লাইব্রেরি ছিল। ওখানে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে সদস্য হওয়া যেত। সেই প্রথম লাইব্রেরি কার্ড হাতে এলো। মনে মনে কেন জানি না একটা গর্ব হতো। মনে আছে একদিন স্কুলে গিয়ে সেই কার্ডটাই বন্ধুদের দেখিয়েছিলাম। এখন ভাবলে হাসি পায়। কি বোকাই না ছিলাম তখন।
এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য বইয়ের সাথে পরিচয় ঘটে - সুকুমার রায়-এর আবোল তাবোল, পাগলা দাশু, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জীবজন্তুর কথা, পৌরাণিক কাহিনি, গোপাল ভাঁড় ইত্যাদি ইত্যাদি।
এরপর এলো 'ডায়মন্ড কমিকস' প্রকাশিত প্রাণ-এর (প্রাণ কুমার শর্মা) বিখ্যাত চরিত্র চাচা চৌধুরী আর সাবু। ওটার নেশা আমাকে ধরিয়েছিলেন আমার এক জামাইবাবু। উনি এলেই আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ওগুলো কিনে দিতেন। পরবর্তীকালে আরও বই কিনতে গিয়ে হাতে এলো বিদেশি কার্টুনের বই। বাংলা মিডিয়মে পড়ায় ওগুলোর প্রতি কোনো আকর্ষণ আমি কোনোদিনই অনুভব করিনি। খানিকটা পড়েই হাঁফিয়ে উঠতাম।
●
একটা ঘটনার কথা বলি... একসময় আমার বড়মাসিরা উত্তর কলকাতার বাড়ি ছেড়ে দিয়ে উত্তর চব্বিশ পরগণার এক জায়গায় গিয়ে থিতু হন। তো ওই উত্তর কলকাতার বাড়ি থেকে জিনিসপত্র স্থানান্তর করার সময় আমি একদিন ওই বাড়িতে গিয়েছি। ওই দোতলা বাড়িতেই চিলেকোঠার একটা ঘর ছিল। আমার মাসতুতো দাদা ওই ঘরে একসময় পড়াশোনা করতো। ওই বিশেষ ঘরটা আমার খুব প্রিয় ছিল। আসবাব বলতে ওখানে টেবিল চেয়ার ছাড়াও একটা ছোট খাট আর টুলের ওপর বসানো একটা কুঁজো ছিল। আর ছিল দেড় ফুট বাই দু' ফুটের একটা জানলা। ওই জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখতে আমার কেন জানি না খুব মজা লাগত। ওই ঘর থেকে তখন সব জিনিসপত্র মোটামুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিছু পুরোনো কাগজপত্র, পত্রপত্রিকা বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে রয়েছে। সেই পরিত্যক্ত ম্যাগাজিনগুলোর মধ্যেই আমি হঠাৎ খুঁজে পেলাম কিছু বিদেশি কমিকস-এর বই। সেখানেই ছিল টিনটিন আর অ্যাস্টেরিক্স-এর ইংরেজি বই। আর ছিল 'বিশ্বভারতী' কর্তৃক প্রকাশিত নন্দলাল বসুর আঁকা নিয়ে একটা বই। বইটা ছিল বিচ্ছিরি রকমভাবে পোকায় কাটা। যাই হোক ওই টিনটিন আর অ্যাস্টেরিক্স-এর বইগুলো ধুলোটুলো ঝেড়ে আমি বাড়িতে নিয়ে এলাম। পরবর্তীকালে 'আনন্দ পাবলিশার্স' থেকে প্রকাশিত টিনটিন-এর বাংলায় অনুবাদ করা কিছু বই কিনেছি। পরে জেনেছি ওই অসাধারণ অনুবাদগুলো নাকি করতেন প্রখ্যাত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। অ্যাস্টেরিক্স-এরও বাংলা অনুবাদ পরে বেরিয়েছে। তবে অ্যাস্টেরিক্স-এর বইগুলো আমার কোনোকালেই পছন্দের ছিল না। বরং আনন্দমেলায় টিনটিনের গল্পগুলো কিস্তিতে মাঝেমধ্যেই বেরতো। ওইগুলো সংগ্রহ করতাম। এখনও আমার কাছে বইগুলো আছে।
●
একসময় তখন আমি ক্লাস এইট-এ পড়ি, আমার নিজের দাদার জন্ডিস হয়েছিল। দাদা স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে বিশ্রামে ছিল। তখন মোবাইল তো দূর ঘরে ঘরে টিভিও ছিল না। ওরও সময় কাটতো না। সেই সময় দাদার এক বন্ধু মাঝে মাঝেই আমাদের বাড়িতে দাদার সাথে গল্প করতে আসত। সেই দাদাই একদিন সাথে নিয়ে এলো সত্যজিৎ রায়-এর লেখা দু'একটা গোয়েন্দা গল্পের বই। ফেলুদা নামের ছ' ফুট লম্বা আদ্যন্ত বাঙালি গোয়েন্দার সঙ্গে সেই প্রথম আমার আলাপ। সাথে ছিল তার খুড়তুতো ভাই তোপসে। বইটা ছিল 'বাদশাহী আংটি'। জটায়ুর প্রবেশ তখনও ঘটেনি। পরে যখন দূরদর্শনে 'সোনার কেল্লা' ছবি দেখলাম তখন থেকে পুরোপুরি আমি সত্যজিৎ ভক্ত হয়ে গেলাম। প্রদোষ চন্দ্র মিত্র (ফেলুদা), তপেশ রঞ্জন মিত্র (তোপসে) আর লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু - এদের কান্ডকারখানা সম্বলিত এক একটা বই তখন আমি দিনরাত পড়ছি।
বাংলার বাকি গোয়েন্দা চরিত্রগুলো তখনও আমাকে সেভাবে টানেনি। চরিত্রগুলোর সম্বন্ধে আমি যে ওয়াকিবহাল ছিলাম না ব্যাপারটা সেরকম নয়। এটা হতে পারে, ফেলুদাকে পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে যেটা সবথেকে বেশি দায়ি ছিল সেটা হল সত্যজিৎ রায়ের নিজ হাতে করা অসাধারণ সব ইলাস্ট্রেশন। যেটা সেই সময়ের অন্য বাঙালি লেখকদের সৃষ্ট চরিত্রগুলো নিয়ে খুব বেশি হয়নি। হলেও সেইসব আঁকার মান খুব একটা বাস্তবধর্মী (realistic) ছিল না।
যেমন টেনিদার ছবিগুলো কার্টুনের মতো দেখতে হতো। ঘনাদার চরিত্র আমার যেটা বেঢপ লাগত সেটা হল ওর মাথার পিছনের দিকে আকার। মাথাটা কেমন যেন লম্বাটে গোছের দেখতে হতো। পরে জেনেছি এটারও একটা কারণ আছে।
পরবর্তীকালে পাণ্ডব গোয়েন্দা, গোগোল, অর্জুন, কাকাবাবুর চরিত্রঅঙ্কনে অনেক বেশি বাস্তবের ছোঁয়া লক্ষ্য করেছিলাম। ফেলুদার প্রতিটা ইলাস্ট্রেশনেই অনেক বেশি ডিটেলিং দেখা যেত। অধিকাংশ ছবিই শ্রী সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায় আঁকতেন। ওঁনার তুলির টানে বেশ একটা স্মার্ট ব্যাপার ছিল। অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে জীবনের শেষের দিকে তাঁর বইয়ের প্রচ্ছদ এবং অলঙ্করণ কি সত্যজিৎবাবু নিজে করতেন? নাকি শুধু পেনসিল দিয়ে আর্টওয়ার্ক দেখিয়ে দিতেন! আর্টওয়ার্ক ও ফিনিশিং অন্য কেউ করতেন। এ প্রসঙ্গে প্রকাশক বাদল বসু এক জায়গায় লিখেছেন, "...দু'-তিনটে বই ছাড়া নিজের সব বইয়ের মলাটের আর্টওয়ার্ক সত্যজিৎবাবুর করা। শারীরিক অসুস্থতার জন্য দু'-একটা বই তাঁর লে-আউট অনুযায়ী করেছেন কৃষ্ণেন্দু চাকী আর প্রবীর সেন। একবারই দেখেছিলাম সমীর সরকারের করা ফেলুদার ইলাস্ট্রেশন দেখে তাঁকে অসন্তুষ্ট হতে।" তাছাড়া পূজাবার্ষিকী 'আনন্দমেলা' ছাড়া বছরের অন্য সময়ে অন্য গোয়েন্দা চরিত্রগুলো নিয়ে লেখা পাঠকরা প্রায় পেতেনই না। কিন্তু 'সন্দেশ' পত্রিকায় সারা বছরই ফেলুদার গল্প বেরতো। হয়ত ফেলুদার বিপুল জনপ্রিয়তার এটাও একটা অন্যতম কারণ। তাছাড়া সত্যজিতের লেখনির মধ্যে একটা টানটান রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার মিশেল তো ছিলই। তখন পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় বাকি গোয়েন্দা চরিত্রদের নিয়ে লেখা গল্প ছাড়াও অন্যান্য গল্পও পড়তাম।
আসলে আমার এত কথা লেখার উদ্দেশ্য এই প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের মধ্যে গল্পের বইয়ের বিষয়ে অনীহা তৈরি হওয়া দেখে। আমাকেও যেমন কেউ ছোট থেকেই বই পড়ার বিষয়ে জোর করেনি। তেমনি এখনকার বাবা-মায়েদের বলছি আপনারাও আপনাদের সন্তানদের গল্পের বই পড়া নিয়ে জোর করবেন না। শুধু তাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করুন। বাকিটা নিজে থেকেই হয়ে যাবে। মাটি যদি উর্বর হয় আর সঠিক সময়ে তাতে জল পড়ে তাহলে চারাগাছ নিজে থেকেই অঙ্কুরিত হবে। অবশ্য পারিপার্শ্বিক আবহাওয়াটাও একটা অন্যতম উপাদান যেটাকে কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
এ তো গেল আমার কৈশোরের কথা। পরে কোনওদিন সময় সুযোগ হলে আরও কোন কোন বই পড়ে আমি একজন পাক্কা বইপোকা হলাম সে গল্প বলবো।
চিত্রঋণঃ লেখায় ব্যবহৃত সমস্ত ইলাস্ট্রেশন ও বইয়ের প্রচ্ছদ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত এবং এগুলি শুধুমাত্র ইলাস্ট্রেশন-এর তফাৎ বোঝানোর উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।