শিল্পকলা

বিশেষ সাক্ষাৎকারঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায় (বিষয়ঃ ইউরোপের শিল্পকলা) (প্রথম পর্ব)




[শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায় পেশায় একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। পেশার কারণে ৮০-র দশকের শুরু থেকেই তাঁকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস করতে হয়েছে, সেই সূত্রে সেই সমস্ত দেশের মিউজিয়ম-এ গিয়ে শিল্পকলা নিয়ে তিনি চর্চা চালিয়েছেন সুযোগ সুবিধে মতোন। এমন ভারতীয় খুব কম সংখ্যায় রয়েছেন যাঁরা গৌতমবাবুর মতো বিশ্বজুড়ে শিল্পের ইতিহাস নিয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে চর্চায় রত অথচ শিল্পকলার পেশার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন। তাঁর জাদুঘর পরিদর্শন নিয়ে তিনি একান্তে বিশদ আলোচনা করেছেন শুভাশীষ ঘোষ-এর সঙ্গে। কথোপকথনটি দীর্ঘ হওয়ায় আমরা এটিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব। 'ডটপেন ডট ইন' ই-পত্রিকার সূচনা সংখ্যায় প্রথম পর্ব প্রকাশিত হল।]

শুভাশীষঃ যেহেতু আপনার কোনো আর্ট ব্যাকগ্রাউন্ড আলাদা করে নেই বা আপনি বিশেষভাবে আর্ট প্রফেশনের মধ্যে নেই, সেই কারণে আপনি যখন ভ্রমণ করেছেন, ইউরোপ এবং আমেরিকার মিউজিয়ম থেকে শুরু করে বা গ্যালারিগুলো ঘুরে দেখেছেন সেইখানে আপনার আর্ট নিয়ে উৎসাহটা কবে থেকে কিভাবে বেড়ে উঠেছিল?

গৌতমঃ আমি একটু বলি... আমি basically Chartered Accountant by profession আমার কাজের মধ্যে আর্ট একদম কাছাকাছিও আসে না। আমি Physics নিয়ে পড়েছি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই আমার আগ্রহ ছিল আর্ট-এ। তার একটা কারণ আছে, আমাদের স্কুলে একজন মাস্টারমশাই ছিলেন... যাঁরা আগেকার দিনের আর্টের সম্বন্ধে জানেন তাঁরা বলতে পারবেন... অবনী সেন was a very famous name। সেরকম বড় মাপের আর্টিস্ট সাধারণতঃ স্কুলে পড়ান না। কিন্তু অবনী সেন আমাদের স্কুলে আঁকার শিক্ষক ছিলেন। That's very unusual. যেমন আমি দেখেছি বম্বেতে আমার শ্যালকের স্কুলে শিক্ষক ছিলেন ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত। উনিও আঁকা শেখাতেন। অনেকেই এরকম পেশা বেছে নেন আর কি। তাঁরা প্রত্যেকেই তা পছন্দও করেন। আমার আর্ট-এ আগ্রহ বাড়ে during school days, আমি তো আর্ট নিয়ে পরে আর পড়াশুনো করিনি। কিন্তু স্কুলের মধ্যে art was my favourite subject. কারণ অবনী সেন। উনি আমাকে হাতে ধরে আঁকা শিখিয়েছেন। Geometric figure দিয়ে কি করে মানুষ, গরু ইত্যাদি তৈরি করতে হবে সব। Quicksilver temperament... প্রচন্ড চটে যেতেন কিন্তু শিক্ষক হিসেবে খুবই ভালো। সেই অবনী সেন দিয়েই শুরু। এরপরে উৎসাহ দিলেন মানব মুখার্জী, আমাদের উঁচু ক্লাসের আঁকার শিক্ষক। সুতরাং আমার মাথায় চিরকালই আর্ট নিয়ে একটা interest area ছিল। কিন্তু পড়াশোনার মধ্যে বা কাজের মধ্যে একদমই আঁকাটা ঢোকেনি। সেইজন্য আঁকা নিয়ে চর্চা করার আর তেমন কোনও সুযোগ হয়নি।

প্রথম সুযোগ এলো যখন আমি কাজের সূত্রে বিদেশ গেলাম। আফ্রিকাতে গেলাম। ওখানকার যে Tribal Art... excite me quite a lot. পরে দেখলাম শুধু আমাকেই নয় আরও অনেককেই সেই Tribal Art excited করেছে। পরে জেনেছি যেমন পাবলো পিকাসো has been greatly inspired by tribal art... আমি তখন অতশত বুঝিনি তবে আমাকে ওটা প্রচন্ডভাবে উৎসাহ জুগিয়েছিল। সেইজন্য আমি মাঝে মাঝেই মিউজিয়ম যেতাম। এটা আমি বলছি ১৯৮১ সালের কথা।

আমি Price Waterhouse দিয়ে শুরু করে Indal-এ চাকরি করি। Indal থেকে থেকে চাকরি ছেড়ে ১৯৮১-৮২ দু' বছরের জন্য আমি গেলাম নাইজেরিয়া (Nigeria)। নাইজেরিয়ার একটা রাজ্যের সরকারি চাকরি করতে গিয়েছিলাম। আমি যে শহরটায় ছিলাম সেটা একটা রাজ্যের রাজধানী। রাজ্যটার নাম ছিল প্ল্যাটো (Plateau) আর জায়গাটার নাম ছিল জস (Jos)। আর মিউজিয়ম আমার অফিস বা বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। যেহেতু সরকারি অফিস ছিল, আমি একটা reasonable position-এ ছিলাম, একটা influence ছিল, বেশ কিছু বড় বড় সরকারি অফিসারের আনাগোনা ছিল। তার মধ্যে ওই মিউজিয়মের কিউরেটরও আসতেন। আমি সেটা জানতাম না। ঘটনাচক্রে কথায় কথায় তিনি একদিন আমাকে বললেন যে, তুমি মিউজিয়ম-এ যাও? আমি হ্যাঁ বলাতে তিনি বললেন ওখানে এলে আমার সঙ্গে দেখা কোরো। তো আমি একদিন সময় করে ওঁনার কাছে যেতে উনি খুব উৎসাহিত করলেন। ওঁনার সাথেই ঘুরে ঘুরে মিউজিয়মটা দেখলাম... নানান রকম tribal piece, tribal art, tribal mask ইত্যাদি। আর আমাকে খুব যেটা আশ্চর্য করেছিল সেটা হচ্ছে ওদের ড্রামস। অসম্ভব সুন্দর... কারণ মিউজিকের ইন্টারেস্টটাও আমার চিরকাল ছিল। যেমন পড়াশোনার মধ্যে মিউজিকটাও কোনোকালে আসেনি। কিন্তু ইন্টারেস্ট এরিয়ার মধ্যে যাকে বলে one of the top most priorities মিউজিকও তাই ছিল।

এই সূত্রে ওখানকার একটা মজার অভিজ্ঞতার কথা বলি। দুর্গাপুজোর সময় আমাদের বাঙালিদের পুজো শুরুই হয় ঢাক দিয়ে। কিন্তু ওখানকার বাঙালিদের পুজোয় ঢাক আর কোথায় পাবো? তো ওখানে একজন ডাক্তার ছিলেন। তাঁর একটা তবলা ছিল। উনি বললেন, আপনি আমার তবলাটার ওপর ডান্ডা দিয়ে বাজান। আমি বললাম, আপনার তবলার গাবগুলো সব উঠে যাবে তো! উনি শুনে বললেন, যাক না সে না হয় সারিয়ে নেবো। পুজোটা তো করে দিন। তখন আমি ওটাকে ঢাকের মতো করে বাজিয়েছিলাম। পরের দুটো দিন যাবার পরই যথারীতি ওই তবলাটার দফারফা হল। অগত্যা কি করা... আমি ভাবলাম এবার তো আমাকেই explore করতে হচ্ছে। আমি ওঁদের বললাম আমি প্রচুর ড্রাম দেখেছি মিউজিয়মে ওখান থেকে একটা যদি আনা যেত... ওঁদের অনুরোধেই গেলাম মিউজিয়মের কিউরেটরের কাছে। ওখানে গিয়ে ওঁনাকে অনুরোধ করে বললাম, আপনি কি আমাকে একটা ড্রাম কয়েকদিনের জন্য ধার দিতে পারেন? উনি শুনে বললেন, পাগল!! এগুলো মিউজিয়মের ড্রাম। এগুলো তো ওভাবে দেওয়া যাবে না। আমিও নাছোড়বান্দার মতো ওঁনাকে পুরো ঘটনাটা বলাতে, ওঁনার কি জানি মনে হলো উনি অবশেষে রাজি হলেন। শর্ত একটাই - রিচুয়ালের শেষে ড্রামটা অক্ষত অবস্থায় ফেরত দিয়ে যেতে হবে। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। উনি সেইসময় আমাকে যে ড্রামটা দিয়েছিলেন সেটা হলো ইওরুবা টকিং ড্রাম (Yoruba Talking Drum). ইওরুবা টকিং ড্রাম মানে তুমি যদি কখনও অরণ্যদেব না বেতাল পড়ে থাকো ওখানে আদিবাসীরা হাত দিয়ে ড্রাম বাজিয়ে কথার আদানপ্রদান করে, এটা সেই ড্রাম। এখানে একটা কথা বলে রাখি 'ইওরুবা' হচ্ছে একটা ট্রাইব। তারা যে ড্রামটা বাজায় সেটাকেই বলে 'ইওরুবা টকিং ড্রাম'। এরকম ভিন্ন ভিন্ন ট্রাইবের নামে আলাদা আলাদা ড্রাম আছে। সেগুলোর আকার, আকৃতি, আওয়াজ, তাল সব আলাদা।


ইওরুবা টকিং ড্রাম (Yoruba Talking Drum)

শুভাশীষঃ এই ড্রামটা ওরা কিভাবে বাজায়? What is the action of that particular drum? How it can talk? মানে এটার কি particular কোনো রিদম আছে?

গৌতমঃ ওটা ওদের নিজেদের signal. ড্রামেতে ওদের নিজেদের vocabulary আছে। ওরা গ্রুপে যখন ড্রাম বাজায় তখন আমি দেখেছি দুটো গ্রুপ ড্রামের মাধ্যমে কথা বলছে আর উপস্থিত সমস্ত দর্শক হাসছে। মানে তারা বুঝতে পারে অন্যরা কি বলছে। এটা পুরোটাই ফোনেটিক্ (phonetic). ফোনেটিক্ দিয়ে বাজনা বাজিয়ে ওরা একে অন্যের সঙ্গে communicate করে। এই বিষয়টা আমার খুব ইন্টারেস্টিং লেগেছিল। ওদের এরকমই ট্রাইবাল আর্ট আছে, ট্রাইবাল মূর্তি আছে, ট্রাইবাল পুতুল আছে সেগুলো খুব exciting.

তো সেইখানে আমার ট্রাইবাল আর্টের সাথে হাতেখড়ি। তারপর নাইজেরিয়ায় দু'বছরের মধ্যেই আমি সেই চাকরিতে ইতি দিলাম। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম রাজনৈতিকভাবে কিছু একটা গন্ডগোল শুরু হতে যাচ্ছে। আমি চাকরি ছেড়ে চলে আসার পরেই মিলিটারি ক্যু (Military coup) হয়েছিল। আমি গভর্নমেন্টের মধ্যেই ছিলাম তাই বুঝতেই পারতাম ওদের দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে কিছু একটা হতে চলেছে। তাই সময়মতো আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। এটা বলছি ১৯৮৩-র কথা।

শুভাশীষঃ সেখানে কোনো ট্রাইবাল আর্ট বা কিছু দেখেছিলেন?

গৌতমঃ ওদের কালচার বা আর্ট সম্বন্ধে জানার খুব একটা সুযোগ আমার ঘটেনি।

শুভাশীষঃ সেসময় কোনো মুখোশ বা কিছু সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন?

গৌতমঃ আমার বাড়িতে দু'একটা মুখোশ আছে। আমার ফেয়ারওয়েল-এর সময় আমাকে ওরা একটা মাস্ক উপহারস্বরূপ দিয়েছিল। এছাড়াও দু'তিনটে আমার কাছে আগে থেকেই ছিল। এছাড়াও আমার এসব বিষয়ে আগ্রহ দেখে ওরা আমাকে কিছু পুতুল, মূর্তি, হার এইসব উপহার দিয়েছিল। একটা কাঠের প্যানেল-এর ওপর খোদাই করা পুরোহিতরা পুজো করছে, শোভাযাত্রা হচ্ছে ওটা দিয়েছিল। আরেকটা দিয়েছিল তারাবা (Taraba) বলে একটা ট্রাইব একটা বড় মূর্তিকে উৎসর্গ করছে... এটাও কাঠের ছিল। 

শুভাশীষঃ সেইসময়ে মিউজিয়মগুলো যখন ঘুরে দেখেছিলেন, সেগুলো তো শুধুই আফ্রিকা সংক্রান্ত। সেখানে কোনও ইউরোপিয়ান টাচ দেখেছিলেন?

গৌতমঃ না ওই মিউজিয়মগুলোতে ছিল না। হয়ত মূল রাজধানী লাগোস (Lagos)-এর মিউজিয়মগুলোতে গেলে নিশ্চয়ই ছিল। ওখানে অনেক আর্টিস্টও ছিলেন। কিন্তু আমি তো ওখানে ছিলাম না। আমি জস-এ ছিলাম। এটা একটা wealthy কিন্তু ছোট স্টেট গভর্মেন্ট। পাহাড়ের ওপরে very unlike Africa মানে আমরা আফ্রিকা বলতে যেটা বুঝি সেরকম নয়। ওখানকার মিউজিয়মগুলো পুরোপুরি আঞ্চলিক জাদুঘর। ওখানে আর কোনো মিউজিয়ম আমি দেখতে যাইনি। '৮৩-র জানুয়ারিতে আমি ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ি। আসার সময় আমি গভর্মেন্টকে বললাম আমি দেশে ফিরে যাব কিন্তু তার আগে আমি ইউরোপটা ঘুরে বেড়াতে চাই। ওরা বললো টিকিট তো আমরা সরাসরি তোমার দেশের দেবো। আমি তখন ওদের বললাম, তোমরা একটা কাজ করো তোমরা আমাকে ইউরোপ ঘুরে টিকিট করে দাও বাকি টাকাটা আমি দিয়ে দেবো। ওখানকার যিনি অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল ছিলেন তিনি খুব ভালো ছিলেন। একটা ব্যতিক্রম হিসাবে উনি স্পেশাল পারমিশন দিলেন যেন আমাকে আলাদা করে টিকিট কাটতে দেওয়া হয়। সাধারণত কি হয় সরকার নিজেই টিকিট কেটে দেয়। আমাকে ওরা বললো তুমি কোন কোন জায়গায় যাবে তার পুরো ভ্রমণসূচী (itinerary) আমাদের দিয়ে দাও আমরা টিকিট কেটে দেবো।

তখন আমি প্রথমে গেলাম ইংল্যান্ড। সেখান থেকে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইৎজারল্যান্ড আর ইটালি। এতগুলো দেশ ঘুরে আমি ভারতে ফিরলাম। ১৯৮৩-র জানুয়ারিতে বেরিয়েছিলাম মার্চ নাগাদ কলকাতায় এসে পৌঁছলাম। তখন চাকরি করেছি, পাউন্ডে রোজগার করেছি ফলে আমার টাকার কোনো টানাটানি ছিল না। ইউরোপ ঘুরতে গিয়ে মনের কোণে আর্টের ব্যাপারটা আবার চাগাড় দিয়ে উঠলো। আমি খুব ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক (National Geographic Magazine) পড়তাম। ওখানে মাঝে মাঝে আর্টের বিষয়ে আর্টিকল বেরোত। সেগুলোও চোখে পড়ত। আর্টের ওপর লেখা প্রবন্ধ, রেস্টোরেশন অফ আর্টওয়ার্ক ইত্যাদি। তার মধ্যে একটা জিনিস আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল তখন রেস্টোরেশন অফ 'সিস্টিন চ্যাপেল' (Sistine Chapel) চলছিল রোমেতে। সেটা নিয়ে আমি খুব উৎসুক ছিলাম যে রোমে যখন যাবো 'সিস্টিন চ্যাপেল' দেখবো। তার আগে 'সিস্টিন চ্যাপেল' নিয়ে আমি যে দারুন কিছু জানতাম তা নয়। মাইকেলেঞ্জেলো (Michelangelo)-র নাম শুনেছিলাম। কিন্তু তিনি যে ওইভাবে বড় স্কেলে কাজ করেছেন সেটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এ পড়েছিলাম। তখন রোম নিয়েও কিছুটা পড়াশোনা করে নিয়েছিলাম। আমার স্মৃতিশক্তিও অনেক ভালো ছিল। কোনো বিষয়ে আগে যা যা পড়েছিলাম সব মনে থাকতো। এখনকার মতো নয়!


সিস্টিন চ্যাপেল (Sistine Chapel)-এর ভিতরের দৃশ্য।

ইংল্যান্ড নেমেই আমি লন্ডন শহরে গেলাম সেখানে আমি ভালো হোমওয়ার্ক করেছিলাম। মূলত ওখান থেকে কিছু কাগজপত্র, বই জোগাড় করেছিলাম। ওখানে এছাড়াও প্যামফ্লেট, লিফলেট, পুস্তিকা এইসব পাওয়া যায় কোনো শহরের সম্বন্ধে জানতে গেলে। ইংল্যান্ডে বসে প্রচুর লেখাপড়া করি। তখন ভাবলাম যে ন্যাশনাল গ্যালারি (National Gallery, London) যাওয়া যেতেই পারে। এতো ভালো লাগলো দেখে... ওখানে গিয়ে এতদিন আমি যেসব ছবি কাগজে বা বইয়ের পাতায় দেখেছিলাম সেগুলোর আসল ছবি চর্মচক্ষে সামনে থেকে দেখলাম - এই ব্যাপারটা আমাকে খুব রোমাঞ্চিত করেছিল। আরেকটা জিনিস বলি, আজকের দিনে পৃথিবীর সব মিউজিয়মে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। সাধারণত ১৫-২০ ডলার বা ইউরো... একটা ছোট মিউজিয়মে যদি এক ঘন্টা দেখার জন্যও যেতে হয় তাহলেও কম করে ১০-২৫ ইউরো খরচ হবে। সেই জায়গা থেকে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারি সম্পূর্ণ ফ্রি। ওখানে যা কিছু দেখলাম dream-like, দেখে মাথা ঘুরে গেল। আরেকটা জিনিস দেখলাম এসব গ্যালারি দেখা কম সময়ের মধ্যে হয় না। খুব কম করে হলেও এক থেকে তিনদিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। আমাদের দেশেও কোনো মিউজিয়মে সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে এসেছি। কিন্তু ওখানে একদিন ঘুরে দিনের শেষে দেখলাম তার এক তৃতীয়াংশও শেষ করে উঠতে পারিনি। পরে বুঝেছিলাম এক তৃতীয়াংশ শেষ করা নয় একটা মিউজিয়ম ভালো করে দেখতে গেলে নিদেনপক্ষে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লাগা উচিৎ। তারপরে কতকগুলো টেকনিক গ্রো করলাম। তারপরেও আমি প্রচুর জায়গায় মিউজিয়ম দেখতে গিয়েছি। এখন আগে থেকে হোমওয়ার্ক করে যাই। আজকাল ইন্টারনেটে হোমওয়ার্ক করারও কোনো অসুবিধা নেই। এখন আইডেন্টিফাই করে যাই কোন হলঘরে কত নম্বর এগজিবিট-এ ছবিগুলো আছে। ধরা যাক একটা মিউজিয়মে গিয়ে আমি পঞ্চাশটা ছবি দেখবো। একটা পুরো দিন আমি তার জন্য দিলাম। সেটা দেখার জন্য আমি আগে থেকে নোট করে নিয়ে যাই। ছবিগুলো সম্বন্ধেও জেনে যাই। সেগুলো ছাড়াও আমি অন্য ছবি নিশ্চই দেখবো। কিন্তু প্রথমবারে সেই স্ট্রাটেজিটা না থাকায় আমাকে বারংবার কয়েকদিন ধরে যেতে হয়েছিল।


ন্যাশনাল গ্যালারি, লন্ডন, ইউকে।


ন্যাশনাল গ্যালারি-র বিখ্যাত স্টেয়ারকেস হল।


ট্রাফালগার স্কোয়্যার (Trafalgar Square), লন্ডন, ইউকে। [আলোকচিত্রঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।]


লন্ডনে Westminster Bridge-এর পাশে Boadicea-র ভাস্কর্য। [আলোকচিত্রঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।]


Royal Observatory Greenwich-এ Prime Meridian (0° Longitude)-এর সামনে গৌতম মুখোপাধ্যায়। [আলোকচিত্রঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।]

শুভাশীষঃ ওখানে সবই কি সমসাময়িক কাজ ছিল নাকি...

গৌতমঃ Modern আর Contemporary Art-এর Exhibition হয় প্রায়ই - তবে ওদের নিজের বলতে সবই Medieval আর Late Renaissance Masters, Impressionist যুগের প্রচুর Masterpieces. মিউজিয়মে প্রবেশ করেই my first encounter was with Van Gogh's 'Sunflowers'.

শুভাশীষঃ শুরুতেই সান ফ্লাওয়ার!


সানফ্লাওয়ারস্ (১৮৮৮); শিল্পীঃ ভিনসেন্ট ভ্যান গগ; তৈলচিত্র; ন্যাশনাল গ্যালারি, লন্ডন।

গৌতমঃ তখন মিউজিয়মের প্রবেশদ্বার সেইদিক থেকে ছিল। এখন এন্ট্রিটা ঘুরে গেছে। তাই আমি যখন দেখেছিলাম তখন ভ্যান গগ (Vincent van Gogh)-এর সানফ্লাওয়ারস (Sunflowers) ছিল।


Buckingham Palace-এর সামনে পরী। [আলোকচিত্রঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।]


Change of Guards-এর সময় এই roundabout-টা খুবই বর্ণময় হয়ে ওঠে। [আলোকচিত্রঃ শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।]

শুভাশীষঃ ওটা কি ন্যাশনাল মিউজিয়মের নিজস্ব সম্পত্তি নাকি অন্য কোনো মিউজিয়ম থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল?

গৌতমঃ না সবকটা মিউজিয়মেরই। These are all owned by National Gallery. যখন মিউজিয়মে বিশেষ কোনো প্রদর্শনী হয় তখন ওরা সারা পৃথিবীর অন্য গ্যালারি থেকে ছবি নিয়ে আসে। কিন্তু these Museums have the pride of possession of the one of the best artworks আর তার মধ্যে লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারি has one of the largest collection of Masters. পৃথিবীর অন্য গালারিগুলোর মধ্যে ল্যুভর (Louvre Museum, Paris, France) সবচেয়ে বিখ্যাত ল্যুভর বিশাল বড় গ্যালারি... কিন্তু ল্যুভর-এর আবার একটা পিরিয়ড আছে। ওখানে 6th Century B.C. থেকে 19th Century A.D. পর্যন্ত আছে তারপরের সময়ের ছবিগুলো ওখানে পাবে না। Impressionists-ও নেই। তার জন্য তোমায় যেতে হবে মিউজি দ্যা ওরসে (Musée d'Orsay, Paris, France)-এ। তারপর মর্ডান-এর জন্য লন্ডনের টেট্ গ্যালারি (Tate Modern, London, UK) যেতে হবে। আমেরিকাতে গেলে গুগেনহেইম (Solomon R. Guggenheim Museum, New York, USA), MOMA (Museum of Modern Art, New York, USA) ইত্যাদি জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু প্রত্যেকটা জায়গাতে তাদের নিজেদের পজেশন (Possession) আছে। তাদের পজেশনের মধ্যে মাস্টার্স-এর সংখ্যা খুব বেশি আর ওরা যখন ছবি কিনেছে মিলিয়নস দিয়ে কেনেনি। ওরা যখন কিনেছে তখন কিন্তু সস্তায় কিনেছে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই ছবিগুলো আজকের কেনা নয়। এখনও মিউজিয়মগুলো ছবি কেনে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় মিউজিয়মের হাতে যে ছবিগুলো আছে সেগুলো কিন্তু বিক্রি হয় না সেগুলো অমূল্য... Priceless. তখন আমি গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম এইসব ছবিগুলো এদের কাছে আছে। তাছাড়া প্রাইভেট মিউজিয়মে তো ছবি থাকেই। কিন্তু সেখানে তো যাবার উপায় নেই। সেগুলো সাধারণের জন্য নয়।

(ক্রমশ)


চিত্রঋণঃ
● ইওরুবা টকিং ড্রাম, সিস্টিন চ্যাপেল, ন্যাশনাল গ্যালারি ও 'সানফ্লাওয়ার'-এর ছবি অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
● অন্যান্য আলোকচিত্র শ্রী গৌতম মুখোপাধ্যায়-এর ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত।