সাল ২০১২। সেবার আবহাওয়া দপ্তরের বিলম্বে বর্ষা নামবার পূর্বাভাসে মনে সাহস সঞ্চয় করে জুনের মাঝামাঝি ট্রেনে চড়ে বসেছিলাম। চলেছি উত্তরাখন্ডের কুমায়ুন হিমালয়ের সুন্দরডুঙ্গা অঞ্চলে। উত্তরাখন্ডের বাগেশ্বর জেলার অন্তর্গত এই সুন্দরডুঙ্গা অঞ্চল। ১২৩১৭ আপ অকালতখত এক্সপ্রেস পরদিন সকাল ৬:১৪-এ পৌঁছাবে বরেলী স্টেশন। তারপর সেখান থেকে জীপে করে হলদুয়ানি হয়ে ঐদিন সন্ধ্যে নাগাদ পৌঁছব বাগেশ্বর। রাতে সেখান হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন সকালে রওনা হব খাতি-র উদ্দেশে। সেসময় পথে সপ্ত অবধি গাড়ি চলত। এরপর খাতি গ্রাম অবধি পায়ে চলা পথ। এই খাতি থেকে একদিকে পিন্ডার নদ পাড় হয়ে একটি পথ গিয়েছে সুন্দরডুঙ্গার দিকে আর অন্য একটি পথ পিন্ডারকে বাঁ দিকে রেখে গিয়েছে পিন্ডারী ও কাফনীর দিকে। সুন্দরডুঙ্গা অঞ্চলটি ভ্রমনের ইচ্ছা বহুদিনের। তার অন্যতম কারণ দেবীকুন্ড দর্শন। সমুদ্রতল থেকে ১৪,৮০০ ফুট উচ্চতায় ভানোটি (১৮,৫২০ ফুট) পর্বতে অবস্থিত মনোরম এই কুন্ডের কথা বইয়ে পড়েছি। পথ আতি দুর্গম। তবে দর্শনে চোখ সার্থক হয়।
প্রচলিত কাহিনীতে শোনা যায় চন্দ্র বংশীয় কুমায়ুন রাজার কন্যা নন্দা ছিলেন শিবভক্ত। অসামান্যা রূপবতী এই রাজকন্যার রূপে মুগ্ধ হয়ে কুমায়ুন রাজারই আশ্রিত কোনো এক রাজপুত্র কুমায়ুন রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করলে নন্দা প্রাসাদ ছেড়ে চলে আসেন হিমালয়ের কৈলাশ পর্বতে। স্বয়ং শিব তখন তাঁর তুষার প্রাচীর বেষ্টিত পার্বত্য প্রাসাদে ভক্ত নন্দাকে আশ্রয় দেন। ক্রমে জনমানসে এই ভক্ত নন্দাই স্থান করে নেন দেবী নন্দা রূপে। একদা একাকী ভ্রমনকালে দেবী নন্দা এই কুন্ডের জলে অবগাহন স্নান করেছিলেন। পরবর্তীকালে এটিই 'দেবীকুন্ড' নামে স্থানীয় মানুষের কাছে খ্যাত হয়। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে এ এক অতি পবিত্র কুন্ড। এবার সঙ্গে এসেছেন আমার প্রতিবেশী বাপ্পাদিত্যবাবু। পেশায় মাষ্টারমশাই, নেশায় পাহাড়। ওনার দাবি একটাই, সুন্দরডুঙ্গা গেলে যে ভাবেই হোক দেবীকুন্ড যাওয়া চাই-ই চাই। মনে মনে ভাবি বর্ষার সময়, এসময় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে দেবীকুন্ড পৌঁছনো নাও হতে পারে। তবুও চেষ্টা করতে হবে।
বাগেশ্বরে হোটেল সিদ্ধার্থ-এ থাকাকালীন সেখান থেকে একজন গাইডকে আমরা নিয়েছি। নিয়েছি না বলে জুটেছে বলাই সঙ্গত হবে। সাতসকালে হোটেলে ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে এক বৃদ্ধ উপস্থিত হলেন। মোহন সিং কাপকোটি। বয়স পঁয়ষট্টি। সুন্দরডুঙ্গা দেবীকুন্ডের পথের জন্য গাইডের কাজ করবেন। সঙ্গে মালও বইবেন। আমরা ওর বিস্তারিত ইন্টারভিউ নিয়ে যা বুঝলাম তাতে দেবীকুন্ডের রাস্তা উনি চেনেন। সেখানে অনেকবার গিয়েছেন। তবে এই বৃদ্ধ গাইডের ওপর নির্ভর করে এই দুর্গম পথে পা বাড়াতে সাহস হয় না। কারণ দেবীকুন্ড যেতে পথের প্রতিকুলতা অতিক্রম করে এগোতে গেলে সেখানে গাইডের সাপোর্টের প্রয়োজন হতেই পারে। বাপ্পাদিত্যবাবুর স্পন্ডেলাইটিসের সমস্যা রয়েছে। ওঁনার পক্ষে ভারী মাল নিয়ে চলা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে পথের প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে প্রয়োজন একটি শক্তপোক্ত গাইড। এদিকে সাতসকালে কাজের আশায় বেরিয়েছে এই বয়স্ক মানুষ। রেফারেন্স দিয়েছে হোটেল সিদ্ধার্থ। পড়লাম বিপদে। অগত্যা একে নিয়েই পথে নামতে হল। স্থির হল আপাতত পিন্ডারী যাব। তাতে মোহন সিং-এর সক্ষমতার একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। পথে সেরকম বুঝলে একটা পোর্টার নিয়ে নেব নয়।
২৩ জুন, ২০১২
পিন্ডারি জিরো পয়েন্ট দর্শন করে আজ বেলা এগারোটা নাগাদ খাতি পৌঁছেছি। খাতি গ্রামের এক দোকানে দুপুরের খাওয়া সেরে ধরলাম জাতোলির পথ। এখান থেকে জাতোলি প্রায় সাত কিলোমিটার। খাতি পেরিয়ে একটি উতরাই পথ খাতির নির্মীয়মান হাসপাতালটির পাশ দিয়ে জাতোলির দিকে চলে গেছে। হাসপাতালটিকে বাঁহাতে রেখে পাথুরে পথ ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। কিছু পথ চলার পর একটি সাঁকো মিলল। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে পিন্ডার। সাঁকো পেরিয়ে আরও কিছুদূর যাওয়ার পর সুন্দরডুঙ্গা নদীর দেখা মিলল। ব্রীজ দিয়ে নদী পার হলাম। কিছুদূরেই দেখা যায় সুন্দরডুঙ্গা আর পিন্ডারীর সঙ্গম। ব্রীজ পাড় হয়েই একটা ছোট্ট গ্রাম - রিটং। পাথর দিয়ে তৈরী বেশ সুন্দর কিছু ছোট ছোট বাড়ি চোখে পড়ল। একটা বাড়ির উঠোনে মালপত্র নামিয়ে রেখে একটু বিশ্রাম নিতে বসলাম। এখানে আশেপাশের ছোট ছোট জমিতে আলুর চাষ হচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পিঠে মালপত্র উঠিয়ে পথে নামলাম। আকাশ আজ সারাদিনই পরিষ্কার। তবে যেকোনো মুহূর্তেই এর পরিবর্তন ঘটতে পারে। গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলি। রিটং পার হওয়ার পর আবার একটা ঝোরা পেরোতে হল। তবে ঝোরার ওপর কাঠের ব্রীজ ছিল। এরপর সুন্দরডুঙ্গা নদীকে ডানহাতে রেখে পাহাড়ি পাকদন্ডী বেয়ে উঠতে লাগলাম। প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ডিগ্রীর চড়াই বেয়ে আমরা উঠতে লাগলাম। পথ বিপজ্জনক না হলেও ক্লান্তিকর আর একঘেয়ে। কেবল চড়াই আর চড়াই। আর শোনা যায় অলক্ষ্যে বয়ে চলা সুন্দরডুঙ্গা নদীর অবিরাম জলস্রোতের আওয়াজ। পথের ধারে ঝোপের আড়ালে নদী অদৃশ্য। পথের পাশে বাঁশ, আখরোট প্রভৃতি গাছের জঙ্গল। কিছুদুর চলা, বিশ্রাম, আবার চলা। এভাবে ধৈর্য্য যখন শেষ পর্যায়ে তখন দূরে দেখা মিলল ছবির মতো এক গ্রামের। জাতোলি। সবুজে মোড়া একখন্ড জমির স্থানে স্থানে ছোট ছোট ঘরবাড়ি। আমাদের আজকের গন্তব্য। রাস্তা ধরে খানিক এগিয়ে যেতেই একটি ছোটো নদীর পাড়ে এসে পৌঁছলাম। জায়গার নাম খন্ডবাগার। নদীর ওপর কাঠের ব্রীজ পেরিয়ে তারপর চড়াই পথে থানিক উঠে আসতেই পৌঁছলাম জাতোলি গ্রামে। তখন ঘড়িতে বিকেল চারটে। গ্রামের পাথর বাঁধানো পরিষ্কার রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে একটা বাড়ির উঠোনে এসে উঠলাম। এটা এ অঞ্চলের বিখ্যাত গাইড পুষ্কর সিং-এর বাড়ি। বাপ্পাদিত্যবাবু উঠোনের একপাশের চায়ের দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়ে সামনের বেঞ্চে গা এলিয়ে দিলেন।
প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত জাতোলি বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। গ্রামে রয়েছে প্রচুর চাষযোগ্য জমি। বোঝা যায় চাষাবাদই এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা। গম, রাজমা, আলু, ভুট্টা প্রভৃতি এই গ্রামের প্রধান ফসল। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সংলগ্ন বাগানেই ফলে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানান সব্জি, ফুল। বাড়ির উঠোনে বাঁধা রয়েছে ভেড়া, গরু। এসে জুটল গ্রামের কচিকাঁচা ছেলে বুড়োর দল। জমে উঠল আড্ডা। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পথে ও ঘরে ঘরে জ্বলে উঠল সৌরলণ্ঠনের টিমটিমে আলো। বৈদ্যুতিক আলো এখানে এখনও অবধি এসে পৌঁছয়নি। তাই সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘরে ও পথের ধারে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামের এক প্রান্তে তৈরী হয়েছে KMVN-এর গেষ্ট হাউস। সেখানকার নির্মানকার্য সম্পন্ন হলেও তখনও অবধি সেটা ট্যুরিষ্টদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। তাই আমাদের আশ্রয় জুটেছে পুষ্কর সিং-এর বাড়ির দোতলার একটি ঘরে। চায়ের গ্লাস হাতে বাড়ির বারান্দায় চেয়ার টেনে এনে বসি। দূরে আলো-আঁধারি ভেদ করে গ্রামের প্রান্তে দেখা যায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যাকৃতি পাহাড়ের প্রহরা। আর এরই মধ্যে অন্ধকারের বুক চিড়ে কোনো এক মায়াবী পুরীর মত দাঁড়িয়ে থাকে জেনারেটরের আলোয় ভাসা KMVN-এর বাংলোটি। মোবাইলের সংযোগ এখানে অনুপস্থিত। তবে নিচে চা খাওয়ার সময় পুষ্কর সিং-এর বাড়িতে লক্ষ্য করেছি একটি WLL ফোনের সংযোগ রয়েছে। গোটা গ্রামের বর্হিজগতের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের আপাতত এটিই একমাত্র ব্যবস্থা।
আজ সন্ধ্যায় আমাদের আসন্ন দেবীকুন্ড যাত্রাপথের পথপ্রদর্শক হিসেবে দলে একটি গাইড পাওয়া গেছে। চামু সিং সুরাগী। স্থানীয় সুরাগ গ্রামের বাসিন্দা। উত্তরকাশীর 'মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সস্টিটিউট' থেকে 'এ্যাডভান্সড মাউন্টেনিয়ারিং' কোর্স শেষ করেছে। এভারেষ্ট জয়ী প্রখ্যাত মহিলা পর্বতারোহী বাচেন্দ্রী পালের দলে কাজের অভিজ্ঞতাও ওর রয়েছে। সর্বোপরি দিনচারেক আগেই দিল্লীর একটি ট্যুরিষ্টকে নিয়ে দেবীকুন্ড ঘুরে এসেছে। এরকম একজন গাইডকে পেয়ে অনেকটাই ভরসা পাওয়া গেল।
রাতে আমাদের কথামতো রুটি আর রাজমার তরকারির ব্যবস্থা হল। রান্নার স্বাদে মনেই হল না সুদুর বাংলা থেকে এতদূর চলে এসেছি। বাঙালী ঘরোয়া রান্নার সঙ্গে কোনওই পার্থক্য নেই। আহারাদি পর্ব রাত নটার মধ্যেই শেষ হল। এরপর মোমবাতির আলোয় আগামী ট্যুরের time table-এ চোখ বুলিয়ে নিয়ে লেপের নীচে আশ্রয় নিলাম।
খিরকিয়া থেকে খাতির পথে দূরে হিমালয় পর্বতমালা।
খাতির পথে দূরে পাহাড়ী রাস্তা।
খাতি প্রবেশের কিছু আগে নীচে বয়ে চলা পিন্ডারের ওপর সাঁকো।
খাতি গ্রাম।
জাতোলি গ্রাম।
২৪ জুন, ২০১২
আজ সকাল আটটা নাগাদ কথালিয়া-র উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। ঠিক হয়েছে সেখানে আমরা থাকব রাম সিং-এর ঘরে। রাম সিং-এর ছেলে আরও ঘন্টাখানেক পরে রেশন ও রান্নার লোক জোগাড় করে রওনা হবে। জাতোলি প্রাইমারি স্কুলের পাশ দিয়ে রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। আজ থেকে আমাদের চার সদস্যের দলে পথপ্রদর্শক চামু সিং সুরাগী। পথে দেখা গেল জাতোলি গ্রামের দেবী নন্দার মন্দির। মন্দিরের কোনো গৃহ নেই। পুরোনো এক গাছের নীচে কিছু পাথর আর ত্রিশূল পোঁতা। সেখানেই গ্রামের মানুষ দেবী নন্দার উদ্দেশে পূজো নিবেদন করে। আজ শুরু থেকেই ক্রমাগত চড়াই পথ। পথে পেরোতে হবে প্রায় ন'হাজার ফিট উচ্চতার ঢুন্ডিয়াদন্ড-এর জঙ্গল। তারপর উৎরাই চড়াই মিলিয়ে অবশেষে পৌঁছবো সাড়ে দশ হাজার ফিট উচ্চতায় অবস্থিত সুন্দরডুঙ্গা উপত্যকার কথালিয়ায়। মন্দিরে ধূপ জ্বেলে আমরা এগিয়ে চললাম। প্রায় নটা নাগাদ কিছুটা ঢালু পথ পেরিয়ে উপস্থিত হলাম এক উত্তাল জলস্রোতের তীরে। চামু জানাল এটাই ভৈরব নালা। বালুনী পর্বতের নাগকুন্ড থেকে এর উৎপত্তি। এপথে এই নালার ভয়ানক রূপের কথা পড়েছি। শুনেছি এই নালা পাড় হতে গিয়ে প্রতি বছরই কিছু প্রাণসংশয় হয়ে থাকে। এর উপরের সাঁকোটি নদীর তান্ডবে প্রায়শই ভগ্নদশাপ্রাপ্ত হয়। তখন নদীর উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তবে দেবী নন্দাকে ধন্যবাদ। আজ নদীর ওপরের সাঁকোটি নতুন বানানো। অতএব বিনা বাধায় পেরিয়ে এলাম ভয়ঙ্কর এই নালা। তবে এপাড়েও পথ সুগম নয়। পথ ওপর দিকে খাড়া চারশো ফুট উঠে গেছে। মাঝে মাঝে রাস্তা ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেখানে কাঠ ফেলে অস্থায়ী যাতায়াতের ব্যবস্থা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা ক্ষণিকের অসাবধানতায় ভারসাম্য হারিয়ে গেলে নীচে ভৈরব নালার স্রোতে ভেসে যেতে হবে। চড়াই ভেঙে কিছুদূর যাওয়ার পর এসে উপস্থিত হলাম ঢুন্ডিয়াঢন্ডের নালার সামনে। নালার ওপর দিয়ে সাঁকো পেরিয়ে এসে আরও কিছুটা পাহাড়ের গা বেয়ে চড়াই অতিক্রম করে উপস্থিত হলাম এক সমতল উপত্যকায়। উপত্যকার চারিদিকে ঘন জঙ্গল। রয়েছে তাঁবু খাটানোর জায়গা। আর একটি পাথর সাজিয়ে বানানো চালহীন ঘরের কাঠামো। স্থানে স্থানে বিশাল বিশাল দৈত্যাকৃতি গাছ। কোনওটার গুঁড়ির আয়তন দেখলে ভয় লাগে। শুনেছিলাম এপথে ভাল্লুকের উপদ্রব আছে। চামু সিং-এর কথায় আমরা এক সঙ্গে পথ চলতে লাগলাম। রাস্তার ধারে ধারে রডোডেনড্রন, রাও, খরসু, গোবরখামিয়া, বাঁশ আর ভুজপত্রের জঙ্গল। খরসু গাছের ফল খাওয়ার জন্যই এপথে ভাল্লুকের আগমন ঘটে। এ জঙ্গলের রাও গাছের কাঠ কেটে নিয়ে গিয়ে তৈরী হয় বাড়িঘর, আসবাবপত্র। তবে জঙ্গল যেমন শুনেছিলাম বা পড়েছিলাম তেমন ঘন মনে হল না। বইয়ে পড়েছিলাম এ অরণ্যে গাছপালার আধিক্যে নাকি দিনেরবেলায় সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। হয়তো কোনো এক সময় তা থাকলেও ক্রমাগত গাছ কাটার ফলে জঙ্গল ফিকে হয়ে এসেছে। জঙ্গল পেরিয়ে আমরা নেমে এলাম সুন্দরডুঙ্গা নদীর পাড়ে। ডান হাতে নদীকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম বোল্ডার বিছানো পথে। উপরের পাহাড় ধসে বিশাল বিশাল বোল্ডার নীচে নদী পাড়ে এসে জমা হয়েছে। এক বোন্ডার থেকে অন্য বোল্ডারে লাফিয়ে লাফিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। পথে দুটো ঝরণা পার হলাম। তারপর মিলল আবার পাথর সাজিয়ে বানানো পথ। এক সময় পথের ধারে বসে সেরে নিলাম মধ্যাহ্নভোজ। মেনু - রুটি আর আলুর তরকারি। আবার এগিয়ে চলা। আজও আকাশ আগের মতোই পরিষ্কার। এভাবে চলতে চলতে এক সময়ে দূরে নদীর অপর পাড়ে দেখা দিল সবুজ কার্পেটে মোড়া একখণ্ড জমি। আমাদের আজকের গন্তব্য। কথালিয়া। সুন্দরডুঙ্গার এই অঞ্চলটির নাম কথালিয়া হওয়ার নেপথ্যে একটি স্থানীয় কাহিনী প্রচলিত আছে। বহুদিন আগে এই স্থানে একটি ভেড়ার মালিকানাকে কেন্দ্র করে দুই মেষপালকের মধ্যে বচসা বাধে। অবশেষে ভেড়াটি কেটে দ্বিখন্ডিত করে দুই পক্ষ ভাগাভাগি করে নেয়। এই কেটে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই এই জায়গার নাম হয় কাটালিয়া বা কথালিয়া। অবশেষে দুপুর দুটো নাগাদ এসে পা রাখলাম কথালিয়ায়। নীচ দিয়ে দুরন্ত গতিতে বয়ে চলেছে সুন্দরডুঙ্গার জলস্রোত। তার দুপাশে সবুজ বুগিয়াল। সামনে কিছুদূরে সুখরাম নালা আর মাইকতোলি নদীর সঙ্গমে জন্ম নিয়েছে সুন্দরডুঙ্গা নদী। নদীর দুপাশে দুটি পাথরের কুটির। এই কুটিরগুলি প্রধানত রাখালদের আস্তানা। এ পাশেরটা জাতোলির বিখ্যাত গাইড রূপ সিং-এর আর অপর পাড়েরটা জাতোলির আর এক গাইড রাম সিং-এর। আমাদের ব্যবস্থা হয়েছে রাম সিং-এর কুটিরে। অতএব নদী পার হতে হবে। এখানে নদীর সেতুটা বড়ই বিচিত্র। প্রায় তিন তলা বাড়ির সমান উঁচু প্রকান্ড এক প্রস্তরখণ্ড নদীবক্ষে পড়ে দুই পাড়ের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করছে।
সুন্দরডুঙ্গার পথে বোন্ডার জোন। বামে বয়ে চলা সুন্দরডুঙ্গা নদী।
কথালিয়ায় মাইকতোলি নদী (বামে) ও সুখরাম নালা (ডাইনে) মিলে সুন্দরডুঙ্গা নদীর উৎপত্তি। সুন্দরডুঙ্গা নদীপথে পাথরের প্রাকৃতিক ব্রীজ। বামে রাম সিং-এর কুটির।
সুন্দরডুঙ্গা নদীর ওপরে পাথরের ব্রীজ। নীচে মোহন সিং।
এই অঞ্চলে পাথরের বৈচিত্র্য সত্যিই মন ভরিয়ে দেয়। বহু রঙিন পাথর বা স্থানীয় ভাষায় 'ডুঙ্গা'র দর্শন মেলে এই উপত্যকা অঞ্চলে। তাদের কোনোটি লাল, কোনোটি বা ধবধপে সাদা। এই সুন্দর 'ডুঙ্গা'র জন্যই এই উপত্যকা অঞ্চলের নাম সুন্দরডুঙ্গা। একদা বিখ্যাত পর্বতারোহী শিপটন এবং টিলম্যানের পর্দাপণই এই অতি সুন্দর ও দুর্গম উপত্যকাটির দরজা বাইরের জগতের কাছে উন্মুক্ত করে। নদী পেরিয়ে এসে পৌঁছলাম রাম সিং-এর কুটিরে। রাম সিং-এর লোকেরা রেশন নিয়ে তখনও অবধি পৌঁছয়নি। মালপত্র নামিয়ে রেখে ক্যারিম্যাট বিছিয়ে বসে গেলাম কুটিরের সামনের জমিতে। যেদিকে তাকাই সেদিকেই উঁচু উঁচু পাহাড়। সবুজ উপত্যকাটি তিনদিক থেকে উঁচু উঁচু পাহাড়ের ঘেরাটোপে সুরক্ষিত। পূর্বে সদাজাগ্রত প্রহরীর মতো প্রহরারত পানওয়ালিদোয়ার (২১,৬৮০ ফুট)। যেন এক জোড়া সাপের ফণা আগলে রেখেছে মূল্যবান মনির মত দেবভূমির এই অঞ্চলটিকে। উত্তরে রয়েছে মাইকতোলি পর্বতমালা। পশ্চিমে রয়েছে বালুনী পর্বত। আর দক্ষিণে উন্মুক্ত প্রান্তর দিয়ে সবেগে মর্ত্যলোকের দিকে ধাবমান সুন্দরডুঙ্গার জলস্রোত, যা নীচে রিটং-এর কাছে গিয়ে মিশেছে পিন্ডারের জলধারায়। নদীর অপর পাড়ে পশ্চিমদিকে সবুজ বুগিয়াল সোজা ওপরে উঠে গেছে বালুনীর পথে। আগামীকাল আমরা ঐ পথেই রওনা হবো বালুনী বুগিয়াল হয়ে দেবীকুন্ডের পথে। বসে বসে গল্প করছি এমন সময় উদয় হল কিছু পাহাড়ি মানুষের দল। 'প্রণাম দাদা' বলে বসে পড়ল আমাদের সামনে। হাতে ছোট ছোট লাঠি। কোমরে বাঁধা পাউচ ব্যাগ। জানাল মাইকতোলি বেস ক্যাম্প থেকে ফিরছে। গিয়েছিল এক বিশেষ ধরণের শিকড়ের সন্ধানে। আমাদের কৌতুহল মেটাতে বের করে দেখাল সংগ্রহের একটি নমুনা। একটি ইঞ্চি দুয়েকের সাধারণ শিকড়। স্থানীয় নাম ইয়াশাগম্বু। এর জন্ম হয় দশ হাজার ফিটের উপরে মাটির নীচে। হাতের ছোটো লাঠিটা দিয়ে সারাদিন পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চলে এর অন্বেষণ। দিনশেষে মিলতে পারে দু' তিনটে বা একটিও নয়। জানা গেল ভারতের কোনো এক প্রতিবেশি রাষ্ট্রে এগুলি বিক্রয় হয় মোটা অর্থের বিনিময়ে। আর এর থেকে প্রস্তুত হয় নানান শক্তিবর্ধক ঔষধ। এ অঞ্চলের অধিক উচ্চতায় মেলে নানান প্রজাতির গুল্ম। যেগুলি তাদের ঔষধিগুনের কারনে বৈজ্ঞানিক মহলে গবেষণার বিষয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি জার্নালে দেবীকুন্ডের মতো এত অধিক উচ্চতার লেকের আশেপাশের অঞ্চলটিতে প্রায় ৬২টি ওষধিগুণবিশিষ্ট উদ্ভিদের উল্লেখ করা হয়েছে। [১] ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাম সিং-এর লোকেরা রেশন নিয়ে হাজির হল। রাত আটটা বাজবার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা উপত্যকাজুড়ে শুরু হয়ে গেল তুমুল বৃষ্টি। এরই মধ্যে এসে গেল রাতের খাবার - রুটি আর আলুর তরকারি। তারপর এক রাউন্ড কফি খেয়ে চলে গেলাম স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণ আশ্রয়ে।
২৫ জুন, ২০১২
ভোর চারটে নাগাদ মোহনজীর ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। রাতের বৃষ্টির তান্ডব কেটে গেছে। বাইরে এসে দাঁড়াতেই চামু চায়ের গ্লাস নিয়ে এসে হাজির। জানাল লাঞ্চ-প্যাক আর কিছুক্ষণের মধ্যেই রেডি হয়ে যাবে। আজ যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের বেড়িয়ে পড়তে হবে। কারণ ওপরে বরফ আছে। রোদ ওঠবার আগেই ওগুলো পেরিয়ে যেতে হবে। বাপ্পাদিত্যবাবু এখনও অবধি শয্যাত্যাগ করেননি। চা নিয়ে ডাকাডাকি করতেই বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর চায়ে এক দীর্ঘ চুমুক দিয়েই ব্যস্ত হয়ে গেলেন আজকের প্রস্তুতিপর্বে। অবশেষে ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা দেবীকুন্ডের পথে পা বাড়ালাম। এই উপত্যকার সুখরাম অঞ্চলকে পিছনে রেখে ভানোটি (১৮,৫২৫ ফুট) তুষারশৃঙ্গের প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় এই কুন্ডের অবস্থান। দুর্গম পর্বতগাত্র বেয়ে খাড়া উর্দ্ধমুখী এর পথ যেমন ভয়ানক তেমনই বিপজ্জনক। প্রতি মুহূর্তেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হয়ে চলেছে পথের বিলুপ্তি। ক্ষণিকের অসাবধানতা ঘটাতে পারে যেকোনো বড় দুর্ঘটনা। আজ সব শেষে আমি। আমার সামনে বাপ্পাদিত্যবাবু। ওর সঙ্গে চুম্বকের মত লেগে রয়েছে মোহনজী। সবার আগে চলেছে আমাদের দেবীকুন্ডের পথপ্রদর্শক চামু সিং সুরাগী। পাথরের সেতু পার হয়ে বুগিয়ালের চড়াই পথে এগিয়ে চললাম বালুনি বুগিয়ালের পথে। পথের মাঝেমাঝেই আড়াআড়িভাবে বড় বড় ভুজ গাছের ডাল পথ আগলে পড়ে। কখনও সেগুলো টপকে কখনও বা তার নীচ দিয়ে মাথা নীচু করে এগিয়ে চললাম। কিছুদূরে যাওয়ার পর প্রথমেই আমাদের ডানদিকে মাথা তুলতেই দেখা গেল মাইকতোলি শৈলশ্রেনী। রাতে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আকাশ আবার পরিষ্কার। আরও কিছুদূর যাওয়ার পর একে একে দৃশ্যমান হতে থাকল বালজৌরি কল, পানওয়ালিদোয়ার। ধীরে ধীরে দূরের পাহাড়গুলোয় রোদের আলো পড়তে লাগল। ক্রমে ক্রমে চোখের আড়ালে চলে যেতে লাগল আমাদের কথালিয়ার রাম সিং-এর ঘর, মাইকতোলি নদী, সুখরাম নালা। একসময় কিছুটা সমতল মতো জায়গায় এসে পৌঁছনো গেল। এখানে তাঁবু ফেলা যায়। চারিদিকে রডোডেনড্রন গাছে ঘেরা। সেপ্টেম্বর মাসে গাছগুলো সাদা রডোডেনড্রন ফুলে ভরে ওঠে। আর ঘাড় ঘোরালেই রয়েছে তুষারমন্ডিত পানওয়ালিদোয়ারের সজাগ প্রহরা। এ যেন এক স্বর্গীয় পরিবেশ।
অবশেষে এক দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ঘাসে মোড়া ঘাস জমিতে এসে পৌছলাম। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। যেদিকে তাকাই কোথাও সবুজ ঢেউ খেলানো জমি উঠে গেছে উপরে দিগন্তে। কোথাও বা ধীরে ধীরে নেমে গেছে নীচে সুখরাম নালার নদীগর্ভে। গোটা জমিই ছোট ছোট ঘাসে মোড়া। বালুনী বুগিয়াল। দূরে দেখা যায় মাইকতোলি গ্লেসিয়ার। প্রায় তেরো হাজার ফিট উপরে এ যেন কোনো দেবভূমিরই পথ। দূরে দূরে দেখা যায় তুষারশৃঙ্গগুলি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে।
ভানোটি, দূর্গাকোট, মুগধুনি, মাইকতোলি, পানওয়ালিদোয়ার, বালজোরি ঘিরে রেখেছে এই বুগিয়ালটিকে। দেখা মিলল একদল ট্রেকারের। ওরা গত তিনদিন ধরে এখানে তাঁবু ফেলে বসে রয়েছে দেবীকুন্ড যাবে বলে। কিন্তু গত তিনদিন রোজই সকালে বৃষ্টি হওয়ায় যেতে পারেনি। আজ আবহাওয়া ঠিক থাকলেও ওদের ফিরতে হবে। কারণ ফেরার ট্রেন ধরতে হবে। এর আগেও পথে দুটি দলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ওরাও খারাপ আবহাওয়ার জন্য যেতে পারেনি। এটা বর্ষাকাল। আবহাওয়া যখন তখন বিগড়োতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদেরও ফেরার পথ ধরতে হতে পারে। তাই আমরা এগিয়ে চললাম। বুগিয়ালের গা দিয়ে সরু এক রাস্তা চলে গেছে সুখরাম কেভ অভিমুখে। এই পথে কিছুটা এগোতেই বাঁ দিকে একটি পথ সোজা ওপরে উঠে গেছে বালুনী টপের দিকে। চড়াই পথ ধরে আমরা সোজা ওপরে উঠতে লাগলাম। সারাটা পথে কেবল ছোট ছোট ঘাস। পথ নীচে সোজা নেমে গেছে সুখরাম নালার নদীগর্ভে। ফলে কোনো কারণে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে কিছু ধরার না থাকায় নীচে নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে হবে। কিছুটা ওপরে উঠে আসবার পরেই একটু সমতল জমি মিলল। আমরা আর বালুনী টপের দিকে অগ্রসর না হয়ে ডানদিকের পথে এগোতে লাগলাম। সামনে দূরে দেখা যেতে লাগল সুখরাম কেভ। গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় আকাশ পরিষ্কার হলেও রাস্তা পিচ্ছিল। তার ওপর আমার পুরোনো হান্টারের নীচটা ক্রমাগত পথ চলায় মসৃণ হয়ে যাওয়ায় বার বার পা পিছলে যেতে লাগল। ঢালু বুগিয়াল গাত্র বেয়ে কখনও ওপরে কখনও বা নীচে নেমে পথ এগিয়ে গিয়েছে। পথ না বলে একে পথরেখা বলাই ভাল। অবশেষে এই পথেরও শেষ হয়। শুরু হয় বোল্ডার আর গ্লেসিয়ারের রাজত্ব। বরফের বিশাল বিশাল প্যাচ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। বরফ কোথাও শক্ত, কোথাও বা ঝুরঝুরে নরম। পা ফসকালেই নীচে অপেক্ষা করে আছে প্রবল বেগে ধাবমান সুখরাম নালার জলস্রোত। মাঝে একে একে পার হতে হল হাড়হিম করা পাথরের ধস। পাহাড়ের ঢালু গাত্রে পড়ে থাকা আলগা পাথরের জঞ্জাল। যে পাথরেই পা রাখি সেটাই নীচে গড়িয়ে চলে যায়। ভুল পাথরে পা রাখলে সুখরাম নদীখাতে পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত। আমরা চলেছি প্রায় চোদ্দ হাজার ফিটের ওপরে। মাঝে মাঝেই দম শেষ হয়ে যেতে থাকে। কিছু পথ চলি আবার থামি। দম নিয়ে আবার এগোই। চারিদিকে মেঘ আর কুয়াশায় আশেপাশে ছয় সাত ফুটের বেশি দৃষ্টি যায় না। অবশেষে এক পাথরের পাশ দিয়ে দেখা গেল একটি পথ উপর দিকে উঠে গেছে। পাথরের উপর দিয়ে ওপরে উঠে আসতেই এসে পৌঁছলাম ছোট একখন্ড সমতল জমিতে। চারিদিকে কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা। কিছুই ভালভাবে দেখা যায় না। এমন সময় হঠাৎ চোখের সামনে কে যেন পর্দা সরাবার মতো মেঘটা সরিয়ে দিল। সামনে ফুটে উঠল একটা জলের কুন্ড। একদিকের পাড়টা সাদা বরফে মোড়া। তারপর মেঘ আরও সরে যেতে পশ্চাদপটে দেখা গেল আমাদের বাঁদিকে কুন্ডের একদিক থেকে নেমে এসেছে শ্বেতশুভ্র বরফের আস্তরণ। নয়ন স্বার্থক হল। আমাদের সামনে কুন্ডের অপর পাড়ে এক উঁচু পাহাড়। ডানদিকে সুখরাম অঞ্চলের দিকটা খোলা। ওখান দিয়ে কুন্ডের জলধারা ঝরণা হয়ে নীচে নেমে গেছে সুখরাম নালায়। শ্বেতশুভ্র বরফে মোড়া পাহাড়ের কোলে এ কুন্ড যেন কোনও স্বর্গভুমিরই অংশ বলে মনে হতে লাগল। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে দৃশ্যমান হয় পানওয়ালিদোয়ার, বালজৌরি কল-এর মতো উঁচু শৃঙ্গগুলি। দূরে মাঝে মাঝেই শোনা যাচ্ছিল এক পাখির ডাক। চামু জানাল এটি মুনিয়াল পাখি। ওপরে আসবার সময় পাখিটি আমাদের নজরে পড়েছিল। এত উচ্চতায় এরা যে কিভাবে বেঁচে থাকে ভেবে বড়ই আশ্চর্য লাগল। কুন্ডের একপ্রান্তে দেখলাম কিছু পাথরের স্ল্যাব রেখে তার আশেপাশে কিছু ত্রিশূল পোঁতা রয়েছে। এটাই দেবী নন্দার পূজার বেদী।
বালুনী বুগিয়ালের পথে পথের ধারে ডোয়ার্ফ রডোডেনড্রন বৃক্ষ।
কথালিয়া থেকে বালুনী বুগিয়ালের পথে মাইকতোলি।
কথালিয়া থেকে বালুনী বুগিয়ালের পথে পানোয়ালিদার।
দেবীকুন্ডের পথে ঢালু পর্বতগাত্রে বরফের প্যাচ আর ওপরের পাহাড় ধসে গড়িয়ে আসা বিপজ্জনক পাথরের জঞ্জাল।
দেবীকুন্ডের পথে ফেন কমলের চারা।
অবশেষে দেবীকুন্ড।
ধূপ জ্বেলে আর নারকেল ফাটিয়ে চামু পূজা পদ্ধতি সম্পন্ন করল। প্রায় এক ঘণ্টা কাটাবার পর কানে এল চামুর সতর্কবানী আবহাওয়া যেকোনো মুহূর্তেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করলে বিপদ ঘটতে পারে। অর্থাৎ এখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব প্রস্থান করতে হবে। এত তাড়াতাড়ি ফিরতে মন চায় না। তবুও এযাত্রায় ফিরতে হবে। নাগকুন্ড যাওয়ার রাস্তা এই দেবীকুন্ড হয়েই। জানি না আবার কোনওদিন এখানে আসা হবে কি না। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে মনে মনে প্রনাম জানিয়ে ফিরে চলি কথালিয়ার পথে। ঘন্টাখানেকের এই স্মৃতিটুকু রয়ে যাবে বাকী জীবনের সঞ্চয় হয়ে। কখনও পথ চলতে চলতে ক্লান্ত মনে কোনও চায়ের দোকানে বসে হয়ত বা মনে উকি দেবে এ মুহূর্তটুকু।
আলোকচিত্রঃ লেখক
Reference:
[১] Gajendra Singh, Naveen Chandra, Vineet Pal, Lalit Mohan Tewari and Mehendra Pratap Singh Bisht, "Observation on the Phytodiversity of Sundardunga Valley, Uttarakhand, Western Himalaya", Indian Forester, 145 (12): 1166-1175, 2019. ISSN No. 2321-094X (Online).