নিজ বাসভবনে 'সুজন'-এর প্রাণপুরুষ ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল।
[দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ-এ রায়পাড়া সাহেবখালি অঞ্চলে 'সুজন' নামে একটি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র চালাচ্ছেন। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে 'সুজন' আজ একটি সেবা প্রতিষ্ঠান (Charitable Trust)-এ পরিণত হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ, আর্ত ও অসহায় মানুষদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা সামাজিক প্রতিকূলতাকে নিজের অদম্য জেদ, সততা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে একজন চিকিৎসকের জয়ী হওয়ার কাহিনীই নিজের কলমে লিখেছেন ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল। মানুষের পাশে থাকার, অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সেবাপ্রদান করার তাঁর নিরলস মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত করেন। বকলমে এই জয় সাধারণ মানুষেরই জয়। এই লেখায় মূলত 'সুজন' গড়ে ওঠার প্রাক-কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে আজকের কিছু কথাও এসেছে। লেখাটি ধারাবাহিক আকারে প্রকাশ করতে পেরে 'ডটপেন ডট ইন' ই-পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী ডাক্তারবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ।]
'সুজন' সূচনালগ্নে যেমন ছিল...
সালটা সম্ভবতঃ ১৯৮৪। বিরাটী মহাজাতি নগরের বিধান মার্কেটের সন্নিকটে হরিতোষ দাসের বাড়ীতে চেম্বার। চেম্বার ফি রোগী পিছু ২ টাকা। সকাল-বিকেল মিলিয়ে ভালোই রোজগার হয়। মাঝে মাঝে বিভিন্ন এনজিও-র ডাকে মেডিকেল ক্যাম্প করতে যাওয়া। এভাবে বিভিন্ন মেডিকেল ক্যাম্প করতে করতে বোধোদয় হল যে এভাবে সাধারণ মানুষের সত্যিকারের কোনো উপকার হয় না। কারণ একবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১০ দিন বা ১৫ দিনের কিছু ঔষধ দেওয়া হল। তারপর ১৫ দিন বাদে ঐ রোগী কোথায় ডাক্তার দেখাতে যাবে বা কিভাবে ঔষধপত্র খাবে এ ব্যাপারে কেউ খোঁজ-খবর রাখে না। যদি সত্যি সত্যিই মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দিতে হয় তাহলে কোনো একটি স্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে ধারাবাহিকভাবে সঠিক গুণমানের ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। সেই চিন্তাভাবনা থেকে FOSET-এর উদ্যোগে ছেঁদাপাথর (বেলপাহাড়ির সন্নিকটে অবস্থিত)-এ একটি চিকিৎসাকেন্দ্র করার পরিকল্পনা করা হয়, কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তার কারণে এ পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। এরপর ডুয়ার্সের চা-বাগান শ্রমিকদের জন্য পরিষেবা কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রেও নানাবিধ কারণে সেটা ফলপ্রসু হয়নি। এমনই এক সময়ে সুন্দরবনের নদীবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়। ঔষধপত্র সহ মেডিকেল টিম নিয়ে পৌঁছে যাই সুন্দরবনের বন্যাপীড়িত অঞ্চলে। দীর্ঘ ১৫ দিন বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে মেডিকেল ক্যাম্প করতে গিয়ে উপলব্ধি করি যে, সরকারী স্বাস্থ্য পরিষেবা সেভাবে এই সুন্দরবনের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। হাসপাতাল আছে তো ডাক্তার নেই, ডাক্তার আছে তো ঔষধ নেই, আর ঔষধ থাকলেও তা যথাযথ গুণমানের নয়। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র হিসেবে তখনই সিদ্ধান্ত নিই যে, যদি কিছু করতে হয় তো সুন্দরবনের মাটিতেই করব, সুন্দরবনের মাটিতেই আমার জন্ম - বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোর কেটেছে সুন্দরবনের বিরুপ প্রাকৃতিক পরিবেশে। স্কুলের পঠনপাঠন শেষ করে টাকি সরকারী কলেজ ছুঁয়ে কলকাতায় আসা ডাক্তারী পড়তে। তাই কোথাও যেন একটা মাটির টান, জন্মভূমির সোঁদা গন্ধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার তাগিদে আবার ফিরে যাওয়া সুন্দরবনের মাটিতে, চিকিৎসক হিসেবে, প্রান্তিক হতদরিদ্র মানুষের স্বার্থে প্রতি শনি-রবিবার নিজের পৈতৃক বাড়ীতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যত্ন সহযোগে রোগী দেখে প্রেসক্রিপশন করে দেওয়া। বেশ কিছুদিন বাদে লক্ষ্য করলাম - একই রোগী বারে বারে আমার কাছে আসছে কিন্তু রোগের কোনো উপশম হচ্ছে না। কারণটি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখলাম - আর্থিক অসঙ্গতির কারণে তারা ঔষধ কিনে খেতে পারছে না। আর যারা কিনে খাচ্ছে সেগুলো অধিকাংশই ভেজাল ঔষধ। তাহলে উপায়? ভাবলাম, প্রেসক্রিপশনের সাথে সাথে যদি সঠিক গুণমানের ঔষধ দেওয়া যায় তবে এত পরিশ্রম করে কলকাতা থেকে আসা কিছুটা হলেও সার্থক হবে। শুরু হলো কলকাতায় ডাক্তার বন্ধুদের চেম্বার থেকে ফিজিশিয়ান স্যাম্পেল সংগ্রহ করা। তারপর সেই সব স্যাম্পেল ঝাড়াই-বাছাই করে ব্যাগভর্তি করে গ্রামে নিয়ে গিয়ে রোগীদের দেওয়া। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর হয়নি। কিছু কিছু ডাক্তারবাবুদের উন্নাসিকতা, expiry date পেরিয়ে যাওয়া ঔষধগুলো বস্তাবন্দি করে দিয়ে নিজেদের চেম্বার পরিষ্কার রাখা, খুব কম পরিমাণে প্রয়োজনীয় ঔষধ পাওয়া ও সর্বোপরি ঘন্টার পর ঘন্টা বাইরে বসিয়ে রেখে অপদস্থ করা ইত্যাদি। তা সত্ত্বেও যাও বা ঔষধ পাওয়া যাচ্ছিল তা দিয়ে, পুরো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
'সুজন'-এ অসহায় রোগীরা অপেক্ষারত।
তখন ঠিক করলাম - সঠিকভাবে চিকিৎসা করতে গেলে বাজার থেকে সঠিক গুণমানের ঔষধ পয়সা দিয়ে কিনে দিতে হবে। কিন্তু পয়সা পাবো কোথায়? কলকাতার চেম্বার থেকে যা রোজগার করি নিজের সংসার চালিয়ে ও একটু-একটু করে ঔষধপত্র কিনে কোনওরকমে চালাতে থাকলাম, এমন সময় কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী এগিয়ে এলেন। তারা অকৃপণ হস্তে আর্থিক সাহায্য করতে থাকলেন আর আমি বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে চললাম চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে। সে সময় গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল। বিদ্যুৎ ছিলই না, আর পানীয় জল বলতে পুকুরের জল বা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে আনা আর্সেনিকযুক্ত টিউবওয়েলের জল। আমার পৈতৃকবাড়িটি গ্রামের এক প্রান্তে হওয়ায় সবার পক্ষে আসা-যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না, বিশেষ করে বয়স্ক ও কঠিন রোগাক্রান্ত মানুষরা এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তখন ঠিক করলাম - বেশী সংখ্যক মানুষের কাছে এই পরিষেবা পৌঁছে দিতে গেলে PWD-র রাস্তার পাশে কেন্দ্রটি গড়তে হবে। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে একখন্ড জমি কিনলাম PWD-র রাস্তার পাশে। সেখানেও ঠকলাম। ১৫ কাঠার টাকা নিয়ে দিল ১১ কাঠা জমি। ধ্রুবলক্ষ্য মানুষকে পরিষেবা দেওয়া। তাই সমস্ত প্রতিকূলতাকে সাথী করে এগিয়ে যাওয়া। শুরু হলো স্বাস্থ্যপরিষেবা কেন্দ্রের কাজ। অনেক অনুরোধে হাসনাবাদের 'পাল ব্রাদার্স' একসপ্তাহ বাকীতে মালপত্র দিতে রাজী হলেন। সারা সপ্তাহ কলকাতায় প্রাকটিস করে যা রোজগার করতাম পরের সপ্তাহে সুন্দরবনে যাওয়ার পথে পাল ব্রাদার্স-এ গিয়ে টাকা জমা করে আসতাম। এভাবে চললো প্রায় বছরখানেক। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বাড়িটা সম্পূর্ণ করলাম। নাম দিলাম - 'সুজন'।
তখন রাতেও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীরা ভিড় করত।
স্বাস্থ্যপরিষেবা কেন্দ্র 'সুজন' নামের অর্থ 'A good friend of society'. সুজন তৈরীর প্রথম পর্যায় থেকে সঞ্চিতের অবদান অনস্বীকার্য। বাড়ি তৈরির সরঞ্জাম (Building materials) আনা, মিস্ত্রীদের খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি সবকিছু দেখভালের দায়িত্ব ছিলো সঞ্জিতের ওপর। প্রথমদিন থেকে আজ পর্যন্ত সস্ত্রীক সঞ্জিত 'সুজন'-এর দায়িত্বভার টেনে নিয়ে চলেছে। প্রথম পর্যায়ে বিরাটীর 'Elevation Cultural Forum' বলে বামপন্থী একটি সংগঠন আমার সহযোগী ছিল। আমিও দীর্ঘ ১৮ বছর এই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলাম এবং চিকিৎসা বিভাগের দায়িত্বে ছিলাম। প্রথমদিন থেকেই নানান অছিলায় তারা আমার কাজের রাশ টেনে রাখবার চেষ্টা করত। ফলে পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে কাজ করার অন্তরায় হয়ে উঠল। যদিও অর্থ সংগ্রহ, ঔষধ সংগ্রহ, চিকিৎসা করা এমনকি সমস্ত ব্যবস্থাপনা আমাকেই করতে হতো। এভাবেই কোনওরকমে চলছিল। আসলে একজন মানুষের স্বপ্নকে মর্যাদা দেওয়া তাদের সংবিধানে ছিল না। তা সত্ত্বেও আমার স্বপ্নের প্রকল্পের কোনও খামতি হোক আমি চাইতাম না। যাই হোক ২০০৯ সালের ২৫শে মে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় 'আয়লা' সুন্দরবনের উপর আছড়ে পড়ল। এমন এক সংকটময় সময়ে তারা আমার ২.৫ লক্ষাধিক টাকার প্রাপ্তি অস্বীকার করে সরে পড়ল। আমি তখন সম্পূর্ণ একা। হাতে একটাও পয়সা নেই। কিভাবে চালাবো এই কাজ? কবিগুরুর "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে" আর স্বর্গীয় ডঃ ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গান "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?" অবলম্বন করে, স্ত্রী অপর্ণা ও পুত্র অর্ণবের উৎসাহে, কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীর আর্থিক সহায়তায় বলিষ্ঠভাবে অতীতকে ভুলে এগিয়ে চললাম। একটাই লক্ষ্য - মানুষের জন্য কাজ করতে হবে, বিপন্ন ও আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে নিজের অর্জিত চিকিৎসালব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে।
(ক্রমশ)
আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।
'সুজন'-এর ওয়েবসাইট লিঙ্কঃ www.sujan-sundarban.org
লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/