কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষ তথা সমস্ত বিশ্বে পরিচিত চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের একক প্রদর্শনী হয়ে গেল কলকাতার এক নামী গ্যালারী কে. সি. সি (কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভিটি)-তে গত ২০ থেকে ২৪ নভেম্বর, ২০২৩। একক প্রদর্শনীর বিষয় ছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন মহাকাব্য 'রামায়ণ'। এই প্রদর্শনীটি ভারতবর্ষের অনেকগুলি প্রদেশের বেশ কয়েকটি গ্যালারীতে ইতিমধ্যেই প্রদর্শিত হয়েছে, যেমন গ্যালারি নায়া (নিউ দিল্লী - ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩), কর্ণাটক চারুকলা পরিষদ (১৯ জানুয়ারি, ২০২৪), আর্ট ওয়ার্ল্ড/সারদা'স আর্ট ইন্টারন্যাশনাল (চেন্নাই - ২ মার্চ, ২০২৪)।
চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্নের ভাষায়, রামায়ণের সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল নৈতিক প্রভাব, সদগুণের গুরুত্ব, যা নাগরিক জীবন এবং রাষ্ট্র গঠন বা একটি কার্যকরী সমাজ গঠনের জন্য উপযোগী। রামায়ণ হল গার্হস্থ্য ও সামাজিক জীবন, পিতা ও পুত্র, স্বামী স্ত্রী, বন্ধু ও ভাই এবং শাসক ও শাসিতের গল্প। তিনি তাঁর ছবির মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলিকে খুব সুন্দর করে বিশ্লেষণ করেছেন।
হিন্দুধর্মের কাহিনী হলেও রামায়ণ ধর্মকে ছাপিয়ে ধর্মনিরেক্ষতার দৃষ্টিকোণ থেকেও যদি বিচার করা যায় তাহলেও এটি আজও সমসায়িক। সত্য-অসত্য, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, নীতি, আদর্শ, রাজা ও প্রজার নিবিড় সম্পর্ক, সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রতিটি মানুষের সম্পর্ক সব মিলে আজও প্রাসঙ্গিক। তাই শুধুমাত্র ভারতবর্ষেরই নয়, সমস্ত বিশ্বের মানুষের জন্যই উপযোগী।
শিল্পী শুভাপ্রসন্ন মোট ৩০টি ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক রঙে রামায়ণের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলিকে চিত্রিত করেছেন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা ও তীক্ষ্ণ শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গী ও দক্ষতাকে ঢেলে দিয়ে। সম্পূর্ণ প্রদর্শনীটিকে বর্ণনার মধ্যে দিয়ে রূপকল্প তৈরি করতে করতে তিনি একটি মহাকাব্য এঁকেছেন। মজার বিষয় হল সম্পূর্ন গল্পের মতো হলেও তাঁর প্রতিটি ছবিই যেন আলাদা আলাদাভাবে পূর্ণমাত্রায় স্বতন্ত্র। ছবিগুলি খুবই সহজ সরল বিন্যাসে তিনি শুধুমাত্র অভিব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করেছেন বিস্তৃত চরিত্রচিত্রণ, যেগুলোর রহস্যময়তা বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন কাজ। তাঁর ছবিতে কম্পোজিশনের তাগিদে কোনও কোনও ছবিতে উঠে এসেছে খুব সামান্য বস্তু বা প্রধান চরিত্রের সাথে দুটি বা তিনটি ফিগার। তিনি কম্পোজিশনে ফিগারগুলিকে নিজের মতো করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অংশটুকুই রেখেছেন।এত সরল বিন্যাস অনেক অভিজ্ঞতার ফসল। তাঁর ছবিতে দেখতে পেলাম মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং-এর পাণ্ডুলিপির মতো বাংলা ভাষায় ডিজাইনের ঢঙে চরিত্রগুলির বা ঘটনার সারসংক্ষেপ, যেন কম্পোজিশনগুলিকে আরও সমসাময়িক করে তুলেছে।ছবিগুলিতে অভিব্যক্তি প্রকাশে উজ্জ্বল রঙের ব্যাবহারের সাথে একটা রহস্যময়তা রয়েছে। রঙের ব্যবহারেই রয়েছে চরিত্রগুলির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলির বিশ্লেষণের আভাস, যা তাঁর অভিজ্ঞতার প্রকাশকে আরও ত্বরান্বিত করে। অনেক বড় বড় ছবির মাঝেও ছোট দুটি ছবি 'মন্থরা' ও 'অঙ্গদ'-এর প্রতিকৃতিধর্মী ছবির মধ্যেই শিল্পীর গভীর জীবনবোধ ও তীক্ষ্ণ শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ পাওয়া যায়।