চলচ্চিত্রের পর্দায় সৃষ্ট সত্যজিৎ রায়ের গুপি আর বাঘা। বাঙালীর মনের কথা। সংকীর্ণতা দূরে সরিয়ে বলা যায় শুধু বাঙালী নয় আপামর মানুষের অন্তরেরই কথা। এটাও বলা যায় সমগ্র একটা জাতির বাস্তব গল্পগাথা। সমাজিক বৈষম্যের কাহিনি। সারা পৃথিবীর তথাকথিত একনায়কদের চরিত্র বিশ্লেষণে সত্যজিতের মুন্সিয়ানার বাস্তব পরিচয় - গুপি আর বাঘার কাহিনি।
"দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান্ খান্" অথবা "আজ থেকে পাঠশালা বন্ধ। তোমরা সব বাড়ী যাও”। একনায়কের বিরুদ্ধে সোচ্চারের ভাষা। রূপকের মাধ্যমে তার প্রকাশ। বিশ্ববিখ্যাত চিত্র পরিচালক। মরনোত্তর অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের মানসিক গঠনকেই উন্মোচিত করে। খুলে দেয় চোখ সমগ্র প্রগতিবাদী মুক্তচিন্তার ধারক আর বাহকদের কাছে।
খোলা মুক্ত মানসিকতাকে চিরদিনই শাসকশ্রেণী সন্দেহ আর ভয়ের চোখে দেখতেই অভ্যস্ত। উদার মন আর কলুষ-মুক্ত আলো অথবা প্রকৃত শিক্ষার আলোকে আলোকিত হতে কোনো শাসকই কিন্তু রাজী হয় না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসকের তাঁবেদার শ্রেণীর সাহায্যে বা মাধ্যমে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে যায়।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষের চেতনা আর মননকে পরিশুদ্ধ পরিমার্জিত করে। চিন্তাধারাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসতে পথ দেখায়। তৈরী হয় তার মুক্ত চিন্তাধারা।
ইতিহাস বলে উচ্চ মানসিকতা আর স্বার্থহীন মানবতাবোধ সর্বকালেই অত্যাচারিত আর লাঞ্ছিত।
তবুও শিক্ষার পদসঞ্চার আর তার অগ্রগতি রোধ করা বড়ই কঠিন। এ যেন ভরা শ্রাবণের প্লাবনে বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম আর জনপদ প্লাবিত হওয়ার সাথে তুলনীয়।
গুপি আর বাঘার মনের কথা বা উদয়ন পণ্ডিতের দুর্দশা সাথে তার অনমনীয় মনোভাব শুধু বাঙালী জাতির মানসিকতার প্রতিফলন নয়। সারা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই মুক্তিকামী মানুষের কাছে একই অঙ্কের অবতারনা হতে দেখা যায়।
ইতিহাস বড়ই নির্মম। ইতিহাস বড়ই নির্দয়। নিষ্ঠুরও। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করতে শেখায় না। তাই ইতিহাসের পাতা বা প্রকৃত শিক্ষার আলো কুশাসকের চোখের নির্মম চাহনিকে কোনোদিন পরোয়া করেনি আর আগামী দিনেও করবে না।
হিটলারের নারকীয় হত্যাকান্ডকে সমর্থন করার কোনো ভাষা হয়তো বা বিশ্বের শব্দকোষে খুঁজে পাওয়া যাবেনা বা বাংলা সাহিত্যের অভিধানে এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায়। আবার ব্রিটিশ ভারতবর্ষে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের নারকীয়তা একই হিংস্রতার কালো রঙে রঙীন।
আইনের পরিভাষায় বা লাতিন ভাষায় যাকে বলে 'মোডাস্ অপারেন্ডি' (Modus operandi)। সেই মোডাস্ অপারেন্ডিতেই হয়তো কিছু পার্থক্য ছিল। কিন্তু শাসকের মানসিকতার প্রতিফলন উভয়ক্ষেত্রেই এক আর অভিন্ন।
হিটলার গ্যাস চেম্বারের বদ্ধ ঘরে নারকীয়তার ভয়ালরূপে ঝলসে দিয়েছিল সমগ্র ইহুদি জাতির সত্ত্বাকে। ইহুদি জাতিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার তাগিদে। জাতি বিদ্বেষের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং জ্বলন্ত নিদর্শন। আর তৎকালীন বৃটিশ সরকার পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে যে হিংস্র হত্যালীলায় মেতেছিল এবং মানবতাবোধকে রক্তাক্ত আর কলুষিত করেছিল। সেটাকেও যেমন প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রজন্ম ঘৃণার চোখে দেখে এবং দেখবে ঠিক তেমনিভাবেই হিটলারের ইহুদি নিধনের হত্যালীলাকে মানবতার ওপর হিংস্র আক্রমনের শ্রেষ্ঠ নজিরও বলা যেতে পারে।
ইতিহাস বলে শাসকের হিংসা কালে কালে দেশে দেশে তার রূপ, রস আর গন্ধ নিজেদের সুবিধার্থে পরিবর্তন, পরিমার্জন আর পরিশোধন করে মাত্র।
এটাই স্বীকৃত সত্য দূর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার কালের বাঁধা অতিক্রম করে আজও তার জয়ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর পরাজয়ের পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তিতে সমগ্র জার্মান জাতির অগ্রগতিকে রোধ করা হয়েছিল। জার্মান জাতিসত্ত্বাকে পৃথিবীর ইতিহাসের পাতা থেকে চিরদিনের মতো মুছে ফেলার জন্য।
ইতিহাসে হিটলারের আবির্ভাব না হলে জার্মান জাতি তার আপন সত্বাকে হয়তো বা চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলত। ঠিক একইভাবে জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত না হলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপরেখা অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। তাই লেখকের অভিমত বিশ্বের রঙ্গমঞ্চে হিটলারের আবির্ভাবেরও প্রয়োজন ছিল। ইতিহাসের পাতা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিক্ষা দেয়। সেই কারণে ইতিহাসের কখনও ইতি হয় না। ইতিহাস চিরকালই বহমান স্রোতের মতো। জীবন্ত। ইতিহাস সময়ের দর্পণ। সামাজিক দর্পণ।
বস্তুর বাস্তবতা তার রূপ, রস আর গন্ধে। শাসকের বাস্তবতা শুধুই তার রস আর গন্ধে, রূপের কার্য্যকারিতা আর চাকচিক্য পরিবর্তনে শোষিতকে নিজের বৃত্তে নিয়ে আসার তাগিদে তার স্পৃহা সর্বকালেই পরিলক্ষিত হয়। তাই যুগে যুগে শাসকের রূপান্তর ঘটে। পাঠশালা বন্ধ করার শাসানী আর রক্তচক্ষু দেখাতে হয় না। উদয়ন পন্ডিতদের কারান্ধকারে দিন গুজরান করতে হয় না। ইতিহাস পরিবর্তন হয়ে যায় গ্রহণযোগ্যতার আঙ্গিকে। বাঁধা পড়ে শাসকের মেকী আর কৃত্তিম লোভনীয় অঙ্গীকার।
রচনা হয় নতুন ইতিহাস। পুনরাবৃত্তি হয় সেই শাসকের রূপান্তরিত চরিত্র। শুধু বিশ্লেষণের অপেক্ষায় জেগে থাকে ইতিহাসের গবেষক। সম্মাননীয় গবেষকরা শাসকের ভুলভ্রান্তির দিকে শুধু অঙ্গুলিনির্দেশ করে। শাসকশ্রেণী ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই ভুল পথ থেকে দূরে সরে থাকে। দেশ আর দেশবাসীর মানসিক স্তর হয় উন্নত, তা সক্ষম হয় এক নতুন দিশা দেখাতে।