রশীদ খান (১ জুলাই, ১৯৬৮ - ৯ জানুয়ারি, ২০২৪)
কয়েকদিন পূর্বেই ভারতীয় মার্গ সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চিরবিদায় হল। ভারত তথা সারা বিশ্বের সংগীতাকাশ ক্ষনিকের জন্য অন্ধকারাছন্ন হল। কলকাতা, হিন্দুস্তানি মার্গ সঙ্গীতে যাঁকে নিয়ে গর্ব করত, সেই উস্তাদ রশীদ খান, অকস্মাৎ আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। যাঁকে "A Bolt from the Blue" বলা হতো। আরবীতে 'রশিদ' কথার অর্থ 'যিনি সঠিক পথ অনুসরণ করেন' (Person who follows the right path)। আর ইসলামে 'সঠিকভাবে নির্দেশিত ব্যক্তি' (Rightly guided person).
থেমে গেল তাঁর সেই অনন্য কন্ঠস্বর। আমি অনেকগুলি অনুষ্ঠানে ওঁনার সাক্ষাৎ পেয়েছি, কখনও ঘরোয়াভাবে, কখনও শ্রোতা ও শিল্পীর মাধুর্যে স্বাভাবিক দূরত্বে।
প্রতিবারই একটা বিষয়ে খুব হতচকিত হয়েছি। হতচকিত হতাম রশীদ ভাই-এর 'অনায়াস গায়ন' পদ্ধতি শুনে ও দেখে। আনন্দিতও হয়েছি, নিজে শিল্পী ও সংগীত পরিচালক হিসেবে, কারণ গান ডেলিভারির রসায়নটা আমরা জানি, শিখেছি। বাচস্পতি, আমির খানি টোড়ী অথবা মধুবন্তির মতো রাগ-এর আলাপ, পকড়, তান, সরগম যেভাবে উনি ডেলিভারি করতেন, মনে হতো পাহাড় থেকে ঝরনা পড়ছে। এতই সাবলীল ও তরঙ্গময় তাঁর গতি।
রশীদ ভাই খেতে ও খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। নিজে অসামান্য রান্নাও করতেন। আর সবসময়ের সঙ্গী ছিল পান। বলা যায় তাঁর প্রতিক্ষণের সাথী। আমেরিকাতে শো করতে গিয়েও পানের পাতা তাঁর আবশ্যিক সঙ্গী। খাস সাহেবদের অনেকেরই মাথায় ঢোকেনি, এই অদ্ভুত সুগন্ধি মাখানো পাতা চিবানোর রহস্য।
তবে রশীদ ভাইয়ের কণ্ঠে আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া, বঙ্গোপসাগর থেকে অতলান্তিক সাগর আলোড়িত হয়েছিল। স্বকণ্ঠে এমন লয়কারী খুব কম শিল্পীই দেখাতে পেরেছেন।
ওঁনার বিষয়ে একটু বিশদে বলে নিই। রশীদ ভাই হিন্দুস্তানি ঐতিহ্যের একজন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তিনি রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার অন্তর্গত ছিলেন এবং ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ইনায়েত হোসেন খানের প্রপৌত্র ছিলেন। বিয়ে করেছিলেন সোমা খানকে।
তিনি ভারত সরকার কর্তৃক 'পদ্মশ্রী' ও 'পদ্মভূষণ' সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন। ২০০৬-এ 'সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার'ও পেয়েছিলেন।
প্রাথমিকভাবে বাদায়ুনে তাঁর বাড়িতে তিনি ভারতীয় মার্গ সংগীতে তাঁর প্রধান প্রশিক্ষণ ওস্তাদ নিসার হুসেন খানের কাছ থেকে গ্রহণ করেন।
কঠোর নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলা, ওস্তাদ নিসার হুসেন খান ভোর চারটে অর্থাৎ ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে স্বর সাধনা (ভয়েস ট্রেনিং)-এর উপর জোর দিতেন এবং রশীদকে ঘন্টার পর ঘন্টা স্কেলের একটি নোট অনুশীলন করাতেন।
একটিমাত্র নোট অনুশীলন করতে একটি পুরো দিন ব্যয় হতো। যদিও রশিদ শৈশবে এই পাঠগুলিকে অপছন্দ করতেন। তবে পরবর্তীকালে সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণের পরে তাঁর তান এবং লায়কারিতে তিনি স্বাভাবিক দক্ষতার পরিচয় দেন।
উস্তাদ রশীদ খান এগারো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কনসার্টৈ অংশ নেন এবং পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৮-এ তিনি দিল্লিতে আইটিসি আয়োজিত একটি কনসার্টে পারফর্ম করেন। ১৯৮০ সালের এপ্রিলে, যখন ওস্তাদজি নিসার হুসেন খান কলকাতার আইটিসি-র 'সঙ্গীত গবেষণা একাডেমি' (এসআরএ)-তে চলে আসেন, রশিদ খানও ১৪ বছর বয়সে কলকাতাতেই সেই একাডেমিতে যোগ দেন।
১৮ বছর বয়সে রশিদ সত্যিকার অর্থে তার সঙ্গীত প্রশিক্ষণ উপভোগ করতে শুরু করেন।
১৯৯৪ সাল নাগাদ, তিনি একাডেমীতে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন দক্ষ ও পূর্ণ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে স্বীকৃত হন।
ওঁনার সংগীতের গায়কী কিছুটা হলেও আমির খান এবং ভীমসেন জোশীর গায়কীর দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
তিনি তাঁর গুরুর মতো তারানাতেও ওস্তাদ ছিলেন। কিন্তু সেগুলিকে নিজের ঢঙে গাইতেন, যন্ত্রের স্ট্রোক-ভিত্তিক শৈলীর চেয়ে খেয়াল শৈলী পছন্দ করতেন যার জন্য ওস্তাদ নিসার হুসেন বিখ্যাত ছিলেন।
তাঁর ডেলিভারি ও তাঁর সুরের বিশদ বর্ণনায় বলা যায় তা আবেগের আভাসের ওপর দাঁড়িয়েছিল। তিনি বলেছেন, "আলাপে আবেগের বিষয়বস্তু থাকতে পারে, কখনও কখনও বন্দিশ গাওয়ার সময়, বা গানের অর্থ প্রকাশ করার সময়।" তিনি চিত্তাকর্ষক কৌশল এবং কঠিন প্যাসেজগুলির দক্ষতাপূর্ণ সম্পাদনের উপর বেশি জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছিলেন।
এমন শিল্পী আর জন্মাবে কি না সন্দেহ আছে। বিশেষত বর্তমানে এমন একটা সময়ে, যখন সিরিয়াস গানবাজনা শোনার মানুষ ক্রমশ কমে আসছে। এখন না সেটা শেখা, না সময় দেওয়া বা প্রশংসা করার মানসিকতা রাখে কেউ। ইন্দ্রপতনের এই অভিঘাত আমি এখনও সামলে উঠতে পারিনি। আলবিদা রশিদ ভাই।
[লেখক বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক, গবেষক ও মিউজিসিয়ান।]