পঙ্কজ উধাস (১৭ মে, ১৯৫১ - ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪)
সালটা ১৯৮৮। তখন আমার লিন্ডসে স্ট্রিট-এর ম্যাজ লেন (Madge Lane) স্থিত এক শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মার্কেটে পার্টনারশিপ-এ একটা ইলেকট্রনিক্স ও মিউজিক-এর দোকান ছিল। সাইড বিজনেস আর কি!
স্পষ্ট মনে আছে তখন বিদেশী ক্যাসেট যেমন Stevie Wonder, George Benson, Rod Stewart, Michael Jackson-এর পাশাপাশি বোম্বের আলিশা চিনয়, বাবা সেহগল এঁদের অ্যালবাম-এর মিউজিক মার্কেটে খুব ডিমান্ড ছিল। তেমনই আমার ওস্তাদজী গুলাম আলী (পাকিস্তান), জগজিৎ সিং-এর 'Beyond Time', 'Haseen Lamhe', 'Passions', 'Echoes' ইত্যাদি ক্যাসেট অ্যালবাম-এরও কদর ছিল আকাশছোঁয়া। এরই মধ্যে পঙ্কজ উধাস (মূলত গীত গায়ক)-এর Double Cassette Album 'Shagufta'-র Polydor থেকে 'highest selling' ছিল। সাদামাটা সুর, ততোধিক সাদা গায়কী। ওঁনার মূল শ্রোতামন্ডলী (listeners base) মূলতঃ মারোয়ারি সম্প্রদায় ছিল। যারা সাধারণ চলতি কথার বাইরে বুঝত না, হালকা গান যাদের পছন্দ ছিল, পঙ্কজজী সেখানে সম্রাট ছিলেন। নামেই গজল। কিনতু গজল নয়, গীত-এর চাইতেও মামুলি সাধারণ চলন। কিন্তু যশ, সে তো শুধু উৎকর্ষতা হলেই আসেনা। পঙ্কজজীর ভাগ্য চমকালো। প্রতিটি অ্যালবাম হট এবং হিট।
যদিও জগজিৎ সিং, মেহেদী হাসান সাহেব বা ওস্তাদ গুলাম আলী সাহেবের গজলের ধারেকাছেও এমনকি হাজার মাইলের মধ্যেও পঙ্কজজীর গানের মান কোনদিনই ছিল না। তবুও জনপ্রিয় ছিলেন। আমি শুনতাম না বিশেষ, কারণ আমি নিজে পাতিয়ালা ঘরানার শিল্পী, ওস্তাদ গুলাম আলী, মেহেদী হাসান সাহেব ও আমাদের অজয় চক্রবর্তীই আমার চিরকালের প্রিয় ছিলেন আছেন থাকবেনও।
১৯৯২ সাল। ততদিনে ওস্তাদজির শাকরেদ হয়ে গেছি। ১৯৯০ থেকেই দেশ-বিদেশ ঘুরছি। ওঁনার সঙ্গে বাজাচ্ছি, রোজ শিখছি, তালিম নিচ্ছি এবং নিজের জীবন ও দু'কানকে ধন্য করছি।
১৯৯২-এর আগস্ট-এ Four Square cigarette-এর স্পন্সরশিপ-এ Godrey Philips দ্বারা চারটি গজল শো-এর বায়না হলো। বরোদা, আহমেদাবাদ, হায়দ্রাবাদ এবং পুনেতে। হরিহরণজী গাইবেন। গাইবেন পঙ্কজ উধাসজীও। ওস্তাদ গুলাম আলীজী তো মুখ্য আকর্ষণ!
সেই প্রথম আলাপ পঙ্কজজীর সঙ্গে। খুব ভদ্র অমায়িক মিষ্টি মানুষটা। ওঁনার গানের চেয়েও মিষ্টি। ওঁনার মতো ঘন সিংহের কেশর-এর মতো ফুলে থাকা চুলের বাহার আজ অবধি কারও দেখলাম না। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করাতে বলেছিলেন, শ্যাম্পু নয়, আমি রিঠা ভেজানো জলে চুল ধুই।
একদিন পুনেতে রেওয়াজ করছেন, বসে গেলাম গীটার নিয়ে। পর পর ১০/১২টা শো-এ ওঁনার সাথে বাজালাম, মিশলাম। ঘুরলাম রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র। খুব ভালো লেগে গেলো মানুষটাকে।
প্রোগ্রাম থাক আর না থাক, গান নিয়ে প্রতিদিন ঘণ্টা তিনেক নিয়ম করে বসতেন। আর নতুন নতুন শের ও শায়েরির খোঁজে থাকতেন।
ওঁনার শুরুর দিকের কথা একটু বলে নিই। পঙ্কজ উধাস ১৯৮০ সালে 'Aahat' নামের একটি গজল অ্যালবাম, Music India Polydor থেকে প্রকাশের মাধ্যমে সংগীতজগতে তাঁর সফর শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালে 'Mukarrar', ১৯৮২ সালে 'Tarannum', ১৯৮৩ সালে 'Mehfil', ১৯৮৪ সালে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে পঙ্কজ উধাস লাইভ, ঐ বছরেই 'Nayaab' এবং ১৯৮৮ সালে 'Shagufta'-র মতো অনেক হিট অ্যালবাম রেকর্ডও প্রকাশ করেন।
একজন গজল গায়ক হিসেবে সাফল্য লাভের পর, তিনি হিন্দি সিনেমায় তাঁর কাজের জন্য পরিচিত হন। তিনি মহেশ ভাটের 'Naam' চলচ্চিত্রে উপস্থিত হওয়ার এবং গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হন, যেখানে তাঁর "চিঠি আয়ি হ্যায়" তাৎক্ষণিকভাবে হিট হয়ে ওঠে। এরপর বহু হিন্দি ছবিতে তিনি প্লেব্যাক গান করেন।
পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে অ্যালবাম এবং লাইভ কনসার্ট তাঁকে গায়ক হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়।
২০০৬ সালে, পঙ্কজ উধাস ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ পুরস্কার 'পদ্মশ্রী'তে ভূষিত হন। তাঁর ভাই নির্মল উধাস এবং মনোহর উধাসও গায়ক। বিশেষ করে মনোহর ভাইয়ের মুকেশ-এর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে দারুণ মিল ছিল।
২০২৪-এর এই ২৬ ফেব্রুয়ারি চলে গেলেন সব বন্ধন কাটিয়ে। খুব কষ্ট পেয়েছি। ভালো মানুষগুলো পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
পঙ্কজজী যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। পদ্মের বিভা থেকে বঞ্চিত হবে ভারতীয় সংগীতজগৎ।
[লেখক বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক, সংগীত গবেষক ও মিউজিসিয়ান।]