বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। একসময় বৈশাখ দুয়ারে কড়া নাড়তে শুরু করলেই ছোট-বড় সকল ব্যবসায়ীরা 'হালখাতা' নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে দিতেন। ঘটা করে আয়োজন করা হতো 'হালখাতা' অনুষ্ঠানের। দেনাদার ক্রেতারা এ'দিন নিজেদের দেনা কিছুটা হলেও পরিশোধ করতেন। দিনশেষে দেনার টাকা পেয়ে হাসি ফুটত ব্যবসায়ীর মুখে।
আগে হালখাতা উৎসবের কার্ড ছাপা হতো। কার্ডে হিন্দু ব্যবসায়ীরা মাটির ঘটে কলাগাছের পাতা, ডাব এবং উপরে লক্ষ্মী-গণেশের ছবি দিতেন। অনুরূপভাবে মুসলিম ব্যবসায়ীদের কার্ডে থাকত মসজিদের মিনার। এই উভয় রীতির মধ্যে ছিল হালখাতার আমন্ত্রণ। কিন্তু এখন আর হালখাতার কার্ড সেইভাবে ব্যাপক হারে ছাপা হয়না। এখন আপ্যায়ন করা হয় কার্ডের বদলে মোবাইলে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে।
এই হালখাতার খাতাটি ছিল একটি বিশেষ ধরনের খাতা। এটি আবার বিভিন্ন আকারের হতো। এক-দুই দিস্তা ধবধবে দুধসাদা কাগজ মোটা কাগজের কভারে লাল শালু-কাপড়ে মুড়ে মোটা সাদা দড়ি দিয়ে ফোল্ড করে বাঁধাই করা থাকত। আর তার থেকে দপ্তরী-পাড়ার লেই আঠার একটা মিষ্টি গন্ধ বের হতো। অনেকে সেই আঠার মধ্যে সুগন্ধী মেশাতেন। এদিন ব্যবসায়ীরা খুব ভোরে উঠে স্নান করে নতুন জামাকাপড় পড়ে দোকান বা অফিসঘর খুলতেন। তারপর একটি বেতের ঝুড়ির মধ্যে লাল শালু-কাপড় বিছিয়ে সদ্য কেনা লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি, ফুল-মালা সহ পূজার অন্যান্য সামগ্রী, একটি গিনির ১ টাকা ও নতুন হালখাতাটি নিয়ে মন্দিরে যেতেন পুজো করাতে। পুরোহিতমশাই হালখাতার প্রথম পাতায় সিঁদুর দিয়ে একটি স্বস্তিক চিহ্ন এঁকে গিনির পয়সায় সিঁদুর মাখিয়ে সেই স্বস্তিক চিহ্নের নীচে পাশাপাশি তিনবার লেপে দিতেন। ফলে পাতায় সেই টাকার ছাপ পড়ে যেত। যবের শিষ খোদাই করা এই এক টাকার ছাপ দেবার পুরো প্রক্রিয়াটিকে বলা হতো 'মোহর করা'। তারপর সিদ্ধি সহ ফুল-মালা দিয়ে পুজো করে সেই খাতাটি মন্দিরে ঠাকুরের পায়ে ছুঁইয়ে ব্যবসার যাতে শ্রীবৃদ্ধি ঘটে তার জন্য কামনা করতেন।
বাংলা বছরের প্রথম দিনে এই উৎসবও আর সেই জাঁকজমকে খুব একটা পালিত হয়না। অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলা নববর্ষের উৎসব। তবে নিছক ঐতিহ্য হিসেবে কিছু ব্যবসায়ী পয়লা বৈশাখে নতুন হিসাবের খাতা খোলেন। আগে এ সময় ক্রেতাদের লুচি, রসগোল্লা ও অন্যান্য মিষ্টি বা নোনতা দিয়ে আপ্যায়ন করা হত। নিদেনপক্ষে ঠান্ডা পানীয় দিয়ে। আমরা ছোটবেলায় সেই পানীয়ের লোভে দাদু বা বাবার হাত ধরে বিভিন্ন দোকানে যেতাম। নব্বইয়ের দশকে ঠান্ডা পানীয়ের মধ্যে ক্যাম্পা-কোলা আর লিমকা খুব জনপ্রিয় ছিল। আর ছিল চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়-এর দরাজ গলায় গাওয়া "এসো হে বৈশাখ..."। যা এখনও সমান জনপ্রিয়। নববর্ষে বাংলা হরফে ছাপা হতো বাংলা নতুন বছরের ক্যালেন্ডার। এখন আর সেই দিন নেই। এখন পুরোটাই অনলাইন-নির্ভর। সরকারী তরফে জিএসটি চালু হবার পর থেকে এখন অধিকাংশ ব্যবসাতে কম্পিউটারে ব্যবসার হিসেব রাখা হয়। তবে নিয়ম রক্ষার্থে অনেক ব্যবসায়ীই কম্পিউটারের পাশাপাশি হালখাতা ব্যবহার করেন।
বাংলা ১৪৩১ সাল (সন) এলো। শেষ হয়ে যাওয়া বছরের হতাশা আর দুঃখগুলোকে পিছনে ফেলে আরেকবার আশায় বুক বাঁধার সময় এখন, তাই সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে পয়লা বৈশাখের চিরনূতন গান - রবি ঠাকুরের 'এসো হে বৈশাখ' তুলে দিলাম।
এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি)