সত্যজিৎ রায়-এর 'সোনার কেল্লা' বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালে 'আনন্দ পাবলিশার্স' থেকে। আর সেই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে সিনেমা তৈরি হয় ১৯৭৪ সালে। আজ সেই ছবির অর্ধশতক পূর্ণ হয়েছে। অর্ধশতক পূর্তি উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে সবার মতো আমরাও স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছি। ফেলুদার প্রথম গল্প 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি' (১৯৬৬) প্রথম প্রকাশিত হয় 'সন্দেশ'-এ। তারপর 'বাদশাহী আংটি' (১৯৬৯) ও 'গ্যাংটকে গন্ডগোল' (১৯৭১) পেরিয়ে দেখতে গেলে 'সোনার কেল্লা' ফেলুদার চার নম্বর গল্প। আপনারা হয়ত জানেন যে কোনো গল্প বা উপন্যাস-নির্ভর ছবি তৈরি হলে, সে ছবি পরিচালকের হাতে পড়ে কিছুটা হলেও কার্যক্ষেত্রে গিয়ে পরিবর্তিত হয়। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেই কাহিনীতে সামান্য হলেও অদলবদল ঘটে। এটা শুটিংয়ের একটা অংশ। এখানে একটা কথা বলে রাখি, ফেলুদার গল্প, উপন্যাস পত্রিকায় যা বেরোত, তাই ছাপা হতো বইয়ে। সত্যজিতবাবু কখনও তাতে হয়তো সামান্য কিছু বদলাতেন। কিন্তু বড়সড় পরিবর্তন কোনওদিন করেননি।
এক জায়গায় পড়েছিলাম, একবার গৌরকিশোর ঘোষ সত্যজিতবাবুকে অনুরোধ করেন 'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক আকারে ফেলুদার একটা রহস্য গল্প লিখতে। সেই সূত্রেই একটি ছোট ছেলের হঠাৎ জাতিস্মর হয়ে যাবার গল্পের প্লট ওঁনার মাথায় আসে। পরে সেটি 'সন্দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক আকারে বেরোয়।
সত্যজিতবাবুর লেখার মতো তাঁর আঁকা, বিশেষ করে মলাট আঁকা নিয়ে কতজনের কত কৌতূহল। সত্যিই তো অমন অসামান্য মলাট আর কতজনই বা আঁকতে পেরেছেন! 'সোনার কেল্লা'র মলাটের কথাই ধরা যাক। প্রথমে তো তিনি প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন। বইয়ে তাই ছিল। এরপর ছবি মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সেটা পালটে 'সোনার কেল্লা' ছবির একটি স্টিল দিয়ে প্রচ্ছদ করলেন। তখনকার দিনে, মানে, সাতের দশকে ব্যাপারটা খুব অভিনব ছিল। এখন তো আবার আগের প্রচ্ছদই ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
আমাদের ধারণা, এতটা শিশুসুলভ কৌতূহল এবং আগ্রহ শেষ বয়েস অবধি ওঁনার মধ্যে ছিল বলেই ওঁর সৃষ্টির সম্ভার এত বিচিত্র। আর ছিল একটা ভীষণ খোলা মন, অটুট ধৈর্য, লেগে থাকার ক্ষমতা এবং খুঁটিনাটি কাজেও অসম্ভব যত্ন। সন্দীপ রায় এক জায়গায় লিখেছেন, প্রত্যেকটা গল্প বা উপন্যাসের খসড়া থেকে ফেয়ার করার কাজটা সত্যজিতবাবু নিজেই করতেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একটা কাহিনির একাধিক খসড়া তৈরি করতেন। শেষের দিকে ওঁর শরীর যখন বেশ খারাপ, সন্দীপ রায় বহুবার বলেছেন, খসড়া থেকে ফেয়ার কপি না হয় তিনিই করে দেবেন। সত্যজিতবাবু রাজি হননি। কারণ ফেয়ার করার সময়েও বহু খুঁটিনাটি পরিবর্তন উনি করতেন। সেটা অন্যের হাতে দিলে সম্ভব হবে কী করে? এত যত্ন যাঁর, তাঁর রচনা তো অন্যদের থেকে আলাদা হবেই।
এখানে একটু বলে নেওয়া ভালো আজও 'সোনার কেল্লা'র এই তুমুল জনপ্রিয়তার নেপথ্যে ফেলুদা, তোপসে, মুকুল এদের থেকেও যার অবদান কোনো অংশে কম নয় তিনি হলেন লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে 'জটায়ু'। লালমোহন গাঙ্গুলির প্রথম আবির্ভাব 'সোনার কেল্লা'য়। তবে লালমোহন বলতেই আমাদের চোখে সন্তোষ দত্ত প্রভাবিত সত্যজিতের যে ইলাস্ট্রেশনের ছবি মনে ভাসে, প্রথমদিকের লালমোহন মোটেই সেরকম ছিলেন না। 'সোনার কেল্লা'য় আমরা জটায়ুর যে ছবি দেখতে পাই, তাতে তিনি রীতিমতো রোগা এবং গোঁফবিহীন এক ভদ্রলোেক। পরে 'কৈলাসে কেলেঙ্কারি'তে দেখতে পাই 'খোলতাই' চেহারার আর-এক জটায়ুকে। আর 'জয় বাবা ফেলুনাথ'-এ গিয়ে জটায়ু হয়ে ওঠেন এক্কেবারে অভিনেতা সন্তোষ দত্তের প্রতিচ্ছবি।
'সোনার কেল্লা' ছবি তৈরির নেপথ্যের কারিগরদের মধ্যে আর প্রায় কেউই জীবিত নেই। মূল অভিনেতাদের মধ্যে রয়েছেন কুশল চক্রবর্তী (ছবির মুকুল), সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় (ছবির তোপসে) আর নকল মুকুলের ভূমিকায় একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করা শান্তনু বাগচী (৫৮)। এখন তিনি মুম্বাই নিবাসী। 'সোনার কেল্লা' ছবি নিয়ে উৎসাহীরা এঁদের দেওয়া অজস্র সাক্ষাৎকার নানা পত্র-পত্রিকায় পড়ে নিতে পারেন। এঁদের লেখা অনেক বইও ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।
আজ আমরা একটু জানতে চেষ্টা করবো ছবি তৈরির নেপথ্যের শুটিং লোকেশন নিয়ে। এখন কেমন আছে সেই জায়গাগুলো? চলুন দেখে আসি। কলকাতায় 'সোনার কেল্লা' ছবির মূল শুটিং হয়েছিল দুটি জায়গায় - একটি ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আরেকটি ভবানীপুরে। আর সামান্য কিছু অংশের শুটিং হয়েছিল হাওড়া স্টেশন-এ। বাকি ছবির পুরোটাই তোলা হয়েছিল রাজস্থানে।
ভবানীপুরে পদ্মপুকুর রোডের একটি গলিকে (মাধব চ্যাটার্জি লেন) মুকুলের বাড়ির সামনের রাস্তা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। মুকুলের পাড়ায় মন্দার বোস আর নকল ডক্টর হাজরা মুকুলকে অপহরণ করার উদ্দেশ্যে আসবে। সেখানে তারা দূর থেকে গাড়ির ভিতরে বসে নকল মুকুলকে আসল মুকুল ভেবে তার সাথে নানা কথা বলার ফাঁকে সুযোগ বুঝে তাকে অপহরণ করবে - এই ছিল দৃশ্য।
মজার ব্যাপার এখানে পুরো দৃশ্যে কিন্তু তাদের মুখ একবারের জন্যও দেখানো হয়নি। শুধুমাত্র তাদের সংলাপ আর পা দেখানো হয়েছে! তখন এটা সত্যিই এক অভিনব ব্যাপার ছিল। এ থেকেই বোঝা যায় পরিচালক দর্শকদের সাসপেন্সকে এক চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে দিয়ে চেয়েছিলেন। আজকের দিনে সেই শুটিং লোকেশন চাক্ষুষ করার অভিজ্ঞতাই আপনাদের সাথে ভাগ করে নেবো।
২০২৩-এর ডিসেম্বরের শীতের এক সকালে মিঠেকড়া রোদ গায়ে মেখে আমরা 'ডটপেন'-এর তিন প্রতিনিধি বেরিয়ে পড়লাম ভবানীপুরের উদ্দেশ্যে।
পদ্মপুকুর রোডে গিয়ে দেখলাম মুকুলের পাড়া এখনও মোটামুটি একই রকম রয়েছে। কালের নিয়মে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হয়েছে। পদ্মপুকুর রোডে মূল যে বাড়িটির সামনে শুটিং হয়েছিল সেই ১৭৫ বছরের পুরনো কড়ি-বর্গা বিশিষ্ট বাড়িটি, এলাকায় 'মিত্র জমিদার বাড়ি' নামে পরিচিত। তার একটি অংশ এখনও মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। সেই খিলান করা দরজা জানালা, সেই লাল রঙের রোয়াক, সেই দোতলা বাড়িটির টানা ঝোলা বারান্দার কারুকার্য করা রেলিং ইত্যাদি। সেই বাড়ির বাসিন্দা নবতিপর শান্তি কুমার মিত্র জানান, কলকাতায় ছবির বেশিরভাগ অংশের শুটিং হয়েছে ভবানীপুরেই।
৭৬ বছর বয়সী রাতুল কৃষ্ণ ব্যানার্জি, একমাত্র বিদ্যমান 'রোয়াক বাড়ি'-র গর্বিত মালিক যেটি শুটিং জোনের অংশ ছিল। তিনি বলেন, “এটা ছিল ১৯৭৩ সালের শরৎ, দুর্গাপুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে। আমার মনে আছে সত্যজিৎ রায় শুটিংয়ের আগে বেশ কয়েকবার রেকি (recce) করতে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে পদ্মপুকুর রোড দিয়ে হেঁটেছিলেন।” 'সোনার কেল্লা'র দৃশ্যের অংশ ছিল এই ব্যানার্জি বাড়ি সংলগ্ন চৌধুরী, রায় এবং সিংহী পরিবারের মালিকানাধীন অনুরূপ বাড়িগুলি। যে বিল্ডিংগুলি সবই বর্তমানে ভেঙে ফেলা হয়েছে। আশেপাশের এই পুরোনো বাড়িগুলির বেশিরভাগই ছিল বাঙালি এবং ইউরোপীয় স্থাপত্যের এক অনন্য মিশ্রণ যা এখনও ভবানীপুর অঞ্চলে দৃশ্যমান।
পদ্মপুকুর রোডের মাধব চ্যাটার্জি লেন-এর বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী সৌমিত্র দাস স্মৃতিচারণ করেন, "আমার নিচতলার ঘর সংলগ্ন গলিটি গভীর রাত পর্যন্ত উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে ছিল কারণ সেখানে শুটিং চলছিল"।
কিন্তু মুকুলের বাড়ি হিসেবে যেটি দেখানো হয়েছিল ২২০ বছরের পুরোনো সিংহ বাড়ি সেটির এক অংশ কালের ভার সইতে না পেরে সম্প্রতি (৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, শনিবার, ভোর ৪:৪৫-এ) ভেঙে পড়েছে। মহাদেব সিংহ জাগুলিয়ার জমিদার ছিলেন। আঠারোশো শতকে এখানে আসেন। বাড়িটির মালিক শ্রীপর্ণা মিত্র ষষ্ঠ প্রজন্ম। অলোক রায়চৌধুরী আগে ওই বাড়িতে থাকতেন।
এলাকার মানুষজন যে এই বাড়িটির গুরুত্ব বা অতীত নিয়ে খুব একটা ওয়াকিবহাল তা নয়। অনেককেই জিজ্ঞেস করাতে তারা বিশেষ কিছুই বলতে পারলেন না। বয়স্ক কয়েকজন বললেন তারাও শুটিং-এর ব্যাপারে শুনেছেন কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী কেউই প্রায় আর জীবিত নেই। মজার কথা আমাদের দেখে পাড়ার কয়েকজন উঠতি বয়সের ছেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল আমরা আবার শুটিং লোকেশন দেখতে এসেছি কিনা? আবার এখানে কোনো ছবির শুটিং হবে কিনা ইত্যাদি। আমরা না বলাতে তারা খানিকটা হতাশ হল। আর আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য বলাতে দেখলাম 'সোনার কেল্লা' ছবির নাম তারা শুনলেও অবাক হলাম এটা জেনে যে এই পাড়ায় শুটিং-এর ব্যাপারে তারা কিছুই শোনেনি বা জানেনা!
"যতবার আমি এই রাস্তা দিয়ে যাই, আমার একটি অদ্ভুত অনুভূতি হয়...", বলেছিলেন সন্দীপ রায়, যিনি তখন ১৯ বছর বয়সী ছিলেন এবং শুটিংয়ের সময় তাঁর বাবাকে সহায়তা করতেন এবং স্থিরচিত্র নিতেন।
আমরা বেরিয়ে পড়লাম ওখান থেকে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ইন্দ্রপুরী স্টুডিও।
টালিগঞ্জে ইন্দ্রপুরী স্টুডিও পৌঁছে আমরা বাইরে থেকে কয়েকটা স্টিল নিলাম। স্টুডিওতে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কোথায় কোন ফ্লোরে শুটিং হয়েছিল তা কারোরই স্পষ্ট করে জানা নেই।
(ক্রমশ)
[প্রতিবেদনটির জন্য সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে। পরবর্তীকালে ভবানীপুর অঞ্চলের পদ্মপুকুর রোডের কোনও ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়ে থাকলে, সে বিষয়ে আমরা স্বভাবতই অবগত নই। এলাকার সাম্প্রতিক কোনো তথ্য কারোর জানা থাকলে আমাদের ই-মেইলে জানালে আমরা তথ্যদাতাকে যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তথ্যটি লেখায় সংযোজন করব। আশা রাখি এতে লেখাটি আরও সমৃদ্ধ হবে।]
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।