ভূগোল বইতে পড়া 'Nippon' শব্দটা ছোট্ট মনে একটা দোলা দিয়েছিল নিশ্চয়ই! কি সুন্দর নাম জাপানের! কিন্তু অমন নাম কেন? বাবা বলেছিলেন, নিপ্পন মানে 'উদীয়মান সূর্যের দেশ'। ওখানেই সবার আগে সূর্যোদয় হয় কিনা!
বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথের 'জাপান যাত্রী' বা বহু লেখা পড়ে দেশটা সম্পর্কে একটা কৌতূহল তৈরি হয়েছিল বৈকি। তাই, এবার যখন কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই জাপান যাত্রার সুযোগ এল, মনের মধ্যে ছোট্টবেলায় পড়া সেই ভালোলাগার স্মৃতিই ফিরে ফিরে এল। আর আমাদের প্লেন যখন নারিটা এয়ারপোর্টের মাটি ছুঁল, মনে মনে বললাম, এই তো এসেছি তোমাদের দেশে, প্রথম সূর্যোদয় দেখতে! আর তো মাত্র কিছু সময়ের অপেক্ষা!
পরদিন আমাদের সফর শুরু হল টোকিও দিয়ে। এই সময় মূলত চেরি ব্লসমের সময়। তাই প্রচুর ট্যুরিস্টের ভীড়। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের কপাল একটু মন্দ। দুটো পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এই ফুলের সমাহার দেখাতে। কিন্তু একটু নিরাশ হলাম। কিছু গাছে ফুল ফুটলেও, অনেক গাছই পুষ্পশূণ্য। গাইড বলল, এবার বৃষ্টির জন্য একটু দেরি হচ্ছে। এমনিতেই এই ফুল খুব স্পর্শকাতর। একটু ঝোড়ো হাওয়াতেই ঝরে যায়। আর এদের সময়সীমাও দু'সপ্তাহের মতো।
পূর্ণ প্রস্ফুটিত চেরি ফুলের গাছ।
তবে যে কয়েকটি গাছে ফুল ফুটেছে, সেই সাদা, লাল আর গোলাপীর বিভিন্ন রঙের শোভায় মুগ্ধ হলাম। সব গাছে একসাথে ফুল ফুটলে, পার্ক যে কি অপরূপ হয়ে উঠবে, সেই ছবিই মনে মনে এঁকে নিলাম। গাইড ছেলেটি বেশ মজার। বলল, "এটা ডগ পার্কও বটে। প্রচুর ধরনের কুকুর দেখতে পাবেন।" সত্যিই তাই। এদেশে কুকুর নিয়ে রাস্তায় ঘোরা নিষিদ্ধ। কুকুর মালিকদের জন্য নির্দিষ্ট পার্ক আছে। একটু পরেই বিভিন্ন রঙের ও সাইজের কুকুরে জায়গাটা ডগ শো-এর চেহারা নিল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদের কেরামতি দেখলাম। গাইড বলল, এদেশে মোটামুটি সবাই কুকুর পোষে।
এমনিতে টোকিও শহরটাতে শুধুই হাইরাইজ। ভূ-কম্প প্রধান দেশ জাপান। সেখানে এত উঁচু উঁচু বিল্ডিং! গাইড বলল, এখন বিল্ডিংগুলো খুবই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে বানানো। তাই ছোটখাটো ভূ-কম্পনে কোনো ক্ষতি হয় না। হবেই তো! জাপান তো প্রযুক্তিরও দেশ! আর কি চমৎকার রাস্তা ঘাট! কোথাও এতটুকু ধুলোময়লা, এমনকি গাছের পাতা পর্যন্ত পড়ে নেই। রাস্তার দু'পাশে সুন্দর গাছের সারি রাস্তাগুলোকে আরও মোহময় করে তুলেছে। আর একটু পরে পরে কিছু জায়গাজুড়ে ফুলের উদ্যান। তাতে হরেক রঙের ফুল, একেবারে লাল, নীল, সবুজের মেলা! সত্যি বলতে কি, এই সুন্দর রাস্তা ধরে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, এই পথ যদি না শেষ হয়! আমরাও যদি কলকাতার পথ ঘাটকে এভাবে ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিতে পারতাম!
টোকিও টাওয়ার।
আমাদের আইটিনারি মতো Tokyo Tower, Imperial Palace, Rainbow Bridge সবই দেখা হল। ভালো লাগল, 'Kawasaki Robostage'-এ যন্ত্রমানবের কীর্তি দেখে। আমি আর আমার স্বামী একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ালাম। সামনের মনিটর স্ক্রিনে আমাদের ছবি ফুটে উঠল। একটু পরে ছবি মিলিয়ে গেল। আমরাও ঐ জায়গা থেকে সরে এলাম। এবার রোবট দেখাল তার কেরামতি! এক মিনিটের মধ্যে দু'হাতের ব্যাবহারে হুবহু আমাদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়ে গেল। তাজ্জব ব্যাপার! জানা গেল, মূলত এই Kawasaki থেকেই বিভিন্ন কলকারখানায় রোবট সাপ্লাই হয়। জাপানে লোকসংখ্যা এমনিই কম। তাই ওদেশে রোবটের বিপুল জনপ্রিয়তা। সত্যি বলতে কি, এদেশে রোবটের যে বিশাল কর্মকাণ্ড আজ সারা দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাচ্ছে, তা মন্ত্রমুগ্ধ হবার মতো। কিন্তু আমাদের মতো জনবহুল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো? এখানে মানব শক্তিই তো অফুরান! রোবট সবকিছু করে দিলে, যে বিপুল সংখ্যক মানুষ বে-রোজগেরে হয়ে যাবে, সেই কথা ভাবতে ভাবতেই বাসে উঠলাম।
টোকিওতে বৌদ্ধ মন্দির।
এদের নিয়মানুবর্তিতা যতো দেখছি, অভিভূত হচ্ছি। এক মিনিট সময়ের এদিক ওদিক হয় না। আমাদের বাসের ড্রাইভারকে দেখতাম, রোজ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সীটে বসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাদের কিছু যাত্রী বরং দেরিতে এসেছে, কিন্তু ড্রাইভারের কোনো দিন ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখিনি। শিক্ষণীয় বিষয়! আর কি অসম্ভব ভদ্র এরা! যার সাথেই দেখা হয়, একমুখ হাসি নিয়ে, মাথা নীচু করে অভিবাদন করে। পথচারী রাস্তা পার হবার জন্য অপেক্ষা করলে, গাড়ি তার গতি বন্ধ করে, পথচারীকে রাস্তা পারাপারের সুযোগ দেয়। কি ভালো যে লাগে! আর এই ভালো লাগার রেশ সারাদিন মনকে ছুঁয়ে থাকে। আমরা কেন এরকম পারি না? কম কথায়, সুন্দর ব্যবহারে এবং অসম্ভব নিয়মানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলার সঙ্গে জাপানের মতো ছোট্ট একটা দেশ তো সারা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। সত্যিই কুর্নিশ করার মতো!
২৪ মার্চ, ২০২৪
আজ যাচ্ছি জাপানের সবচেয়ে উঁচু এবং বিখ্যাত পর্বত, মাউন্ট ফুজি দর্শনে। ভূগোলে কত পড়েছি ফুজিয়ামা পর্বতের কথা। এটি একটি সক্রিয় ভলক্যানোও বটে। তবে বিগত তিনশো বছর ধরে ঘুমন্ত। প্রথমে Hakone-তে নেমে লেক আসি-তে জাহাজে করে ঘুরলাম এবং সেখান থেকেই বরফে ঢাকা মাউন্ট ফুজি দেখে একাধারে উল্লসিত এবং রোমাঞ্চিত। সেই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই। লেক আসিও ভারী সুন্দর। টলটলে জলে পাহাড় আর বৃক্ষরাজির ছায়ায় এতই মোহাবিষ্ট ছিলাম, চমক ভাঙল গাইডের ঘোষণায়। নেমে এবার রোপওয়েতে উঠতে হবে ফুজিয়ামা সন্দর্শনে। রোপওয়ে থেকে যখন নামলাম, চতুর্দিকে বরফ আর ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে হাড়ে কাঁপন ধরে গেল। কিন্তু কি ভয়ংকর সুন্দর! সময় এখানে থমকে গেছে।হালকা তুষারপাতের শব্দ ছাড়া চারিদিক কি অসম্ভব শান্ত! তবে নৈঃশব্দ্যেরও বোধহয় একটা ভাষা থাকে। চুপ করে বসে তাই শুনতে ইচ্ছে করে। ফিরতি পথও পুরোপুরি তুষারাবৃত এবং মাঝে মাঝে বরফে ঢাকা ফুজি পর্বত দেখে উচ্ছ্বসিত আমরা তাকে লেন্সবন্দি করতে মরিয়া।
ফুজি পর্বতমালা।
এবার খাওয়াদাওয়া নিয়ে একটু বলতে হয়। যদিও আমাদের লাঞ্চ এবং ডিনারের জন্য ভারতীয় রেস্টুরেন্টেরই নিয়ে যাওয়া হতো, কিন্তু ব্রেকফাস্ট হোটেলগুলোতেই থাকত এবং সেখানে দেখেছি বিবিধ মাছের পদের (সবই প্রায় সামুদ্রিক) সমাহার। সেইসব জাপানী নাম (ইংরেজি হরফে লেখা থাকলেও) উচ্চারণ করা দুঃসাধ্য। জাপানীরা দেখতাম সকালে দিব্যি ভাত (ভীষণ আঠালো, খেয়ে দেখেছি) আর মাছের ঝোল দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারছে। সী ফুডে অ্যালার্জির জন্য আমি অবশ্য কোনওদিন এসব মাছ চেখেও দেখতে পারিনি। এরা কাঁচা মাছও খায়। তবে বিভিন্ন ধরনের পাঁউরুটি, পেস্ট্রি আর কুকিজে দিব্যি পেট ভরে যেত। আর কত ধরনের যে ফল খেয়েছি! অনেকগুলোই অচেনা। এক ধরনের খয়েরি লিচু খেলাম, কি ভীষণ মিষ্টি আর রসালো! পানীয়ের মধ্যে চা, কফি দুটোই চলে। কফি খুবই টেস্টি আর চা-এর মধ্যে মূলত চীন আর সিলোন-এর চা-ই বেশি থাকত।
জাপানে এলাম, আর বুলেট ট্রেন চড়ব না, তা হয় নাকি? টোকিও থেকে হিরোশিমা - এই দীর্ঘ আটশ কিলোমিটার পথ, বুলেট ট্রেনে লাগল মাত্র তিন ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট। আর কি সুন্দর সেই ট্রেন! ভেতরটা একেবারে ঝকঝকে। ট্রেনে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে মোবাইল যেন সাইলেন্ট রাখা হয়। বুঝলাম, এই জাতি খুব শান্তিপ্রিয়। কারোর যাতে ব্যক্তিগত শান্তি বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে সদা সজাগ। এরা কথা বলে খুব আস্তে। রাস্তায় দেখেছি, সারিবদ্ধভাবে সবাই চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছে। শব্দদূষণের মাত্রা এখানে শূন্য। গাড়িতে কোন হর্ণ নেই। কেউ কাউকে ওভারটেক করে না। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশও দেখিনি, তার দরকারও পড়ে না। এরা এতই সুসভ্য আর শৃঙ্খলিত একটা জাতি। এদের থেকে তো প্রতি পদে শিখছি! এইসব ভাবতে ভাবতেই হিরোশিমা পৌঁছে গেলাম।
হিরোশিমা নামের সাথে যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে, সেটা ভাবলেই একরাশ মন খারাপ চেপে ধরে । যদিও বর্তমান শহর খুবই সুন্দর, সাজানো গোছানো। টোকিওর মতোই চারিদিকে হাইরাইজ। কিন্তু কংক্রিটের জঙ্গল নয়, তার মধ্যেই প্রচুর গাছ আর ফুলের বাগান রাস্তাগুলোকে সুশোভিত করেছে। কোথাও কোনও মলিনতা চোখে পড়লনা।
ধাক্কা খেলাম, পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে ঢুকে। এই নিউক্লিয়ার বোমার ভয়াবহতা সবারই জানা। কিন্তু সেই ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করা? বস্তুত সেই সব দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া মানব শরীরের ছবির দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। এত নিষ্ঠুরও কেউ হতে পারে? একশো চল্লিশ হাজার মানুষের মৃত্যু মিছিল। শুধু তাই-ই নয়, পরবর্তী দু' তিন প্রজন্ম সেই একক বোমার অভিঘাত বয়ে বেড়িয়েছে। সেইসব বিকলাঙ্গ শিশুদের ছবির দিকে তাকিয়ে সত্যিই চোখের জল বাধা মানে না। কারোরই কথা বলার শক্তি নেই। সকলেই যেন অন্তর থেকে অনুভব করছে সেদিনের মর্মান্তিক যন্ত্রণা।
আচ্ছা, সেদিনের সেই নারকীয় হত্যালীলা থেকে আমরা সত্যিই কি কিছু শিখতে পেরেছি? তাহলে আজও কেন রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ চলে? গাজায় নিরীহ নাগরিকদের ওপর কেন নির্বিচারে গুলি চালায় ইজরায়েল? কেন শত শত শিশু জন্মেই অনাথ হয়ে যায় বা মা সন্তান হারা? এর কোনো উত্তর হয় না ...and history repeats itself যুগে যুগে ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে অন্ধ করে রেখেছে। হা ঈশ্বর!
পিস মেমোরিয়াল পার্ক, হিরোশিমা।
পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই Children Peace Memorial পার্কের দিকে। যেসব শিশু এই বম্বিং-এ মারা গেছে, তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই পার্ক উৎসর্গীকৃত। ওপরে লেখা "We will Rise" ...হ্যাঁ, তোমরা পেরেছো। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখির মতো যুদ্ধের সব ক্লেদ ঝেড়ে তোমরা উঠে দাঁড়িয়েছো... চেষ্টা করেছ, সব ক্ষত সারিয়ে হিরোশিমাকে তার আগের রূপ ফিরিয়ে দিতে ...ধন্য তুমি! সব শহরবাসীর উদ্দেশ্যে আমার একরাশ শুভেচ্ছা রইল। ভালো থেকো তোমরা।
২৫ মার্চ, ২০২৪
আজ যাচ্ছি জাপানের আর এক শহর ওসাকা। সেই বুলেট ট্রেনে চেপেই, হিরোশিমা থেকে। আগেই বলেছি, এই ট্রেনে চাপা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বাইরের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মন ভেসে যায় কোন সুদূর! কামরাগুলো নিজেদের ঘরের মতোই পরিষ্কার। প্রত্যেকটা সিটের সাথে একটা করে প্লাসটিক কভার, যার যা গারবেজ, ওখানেই ফেলো। মেঝেতে কিছু পড়লে, গার্ড সাথে সাথে এসে তা কুড়িয়ে নিয়ে ঐ জায়গা মুছে দিচ্ছে। বুঝলাম, পরিচ্ছন্নতা এদের মজ্জায় আর প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী না হলে তা সম্ভব নয়।
ওসাকা শহরে।
ওসাকা শহরে।
ওসাকা শহরটাও ভারী সুন্দর। প্রচুর হাইরাইজ, কিন্তু তাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়নি এতটুকু। রাস্তাঘাট সেরকমই সুদৃশ্য। এবার জাপান যাত্রায় বেশ বৃষ্টি পাচ্ছি, কিন্তু কোথাও এতটুকু জল জমে নেই! রোজকার জনজীবন যাতে এতটুকু ব্যাহত না হয়, সেদিকে এদের প্রখর দৃষ্টি। গাইড বলল, এদেশে সরকারি কর্মচারীদের কাজের চাপ সাংঘাতিক। সাধারণত সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে ছটা ...সব অফিসে কাজের সময় এটাই। কিন্তু সরকারী কর্মীদের রাত নটা দশটা বেজে যায়। এ যে আমাদের দেশের একেবারে উল্টো! বুঝলাম, কেন এই ছোট্ট দেশটা, এত কম জনসংখ্যা নিয়েও এত সুশৃঙ্খলভাবে চলছে! তবে এদেশে জন্মহার অবিশ্বাস্যভাবে কমে যাচ্ছে। মৃত্যুহার বাড়ছে। নতুন প্রজন্ম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ আর থাকতে চাইছেনা, চাইলেও সন্তানে আগ্রহী নয় এবং এখন এটাই জাপানের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। সরকার থেকে ভালোরকম আর্থিক অনুদান নবদম্পতিকে দেওয়া হচ্ছে সন্তান আনয়নের জন্য, কিন্তু তাতেও সমস্যা মিটছে কই? কত দোকানে, বাজারে, রেল স্টেশনে দেখেছি বৃদ্ধরাও কাজ করছে।
নারা পার্কের টোডাজী বুদ্ধ মন্দির খুব ভালো লাগল। সুবিশাল কাঠের শান্ত, সমাহিত বুদ্ধ মূর্তি দেখে ভক্তিতে মাথা নত হয়ে আসে। এদের প্রণাম পদ্ধতিও বেশ অভিনব। প্রথমে মাথা নত করে দু'বার দু'হাতে তালি বাজায়। তারপর নিজের মনের কথা ঈশ্বরকে নিবেদন করে। পরিশেষে আবার মাথা নত করে অভিবাদন করে ফিরে আসে। আমরাও এই পদ্ধতিই অনুসরণ করলুম। বাইরে দেখি, ছোট ছোট কাঠের ফলক বিক্রি হচ্ছে। তাতে নিজের মনের ইচ্ছে লিখে তা সামনের একটা গাছে অনেকে ঝুলিয়ে রাখছে। এ তো পরিষ্কার আমাদের দেশের গাছে সুতো দিয়ে ঢিল বেঁধে রাখার মতো! মনোষ্কামনা পূর্ণ হলে সেই ব্যক্তি তার নির্দিষ্ট ঢিল খুলে রেখে যায়। এখানে শুনলুম পরদিন পুরোহিত এই কাঠের ফলকগুলোতে লিখিত ব্যক্তিগত অভিলাষ ঈশ্বরের কাছে সরাসরি পেশ করেন। বেশ মজা লাগল শুনে!
নারা পার্ক হরিণের জন্য বিখ্যাত। এমনি রাস্তাতেই এরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রচলিত নাম সিকা বা জাপানীজ ডিয়ার। জাপানে এদের ভগবানের দূত মনে করা হয়। অনেকেই দেখলাম বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। আমিও ফটাফট এদের সাথে কিছু ছবি তুলে ফেললাম।
ঐতিহাসিক ওসাকা প্রাসাদটিও বেশ আকর্ষণীয়। পাহাড় আর লেক দিয়ে ঘেরা সেই প্রাসাদ অনেকটা মিউজিয়ম স্টাইলে তৈরি। ওসাকায় আর এক প্রাপ্তি সুন্দরী চেরি ব্লসমের দর্শন। বিভিন্ন রঙের চেরি ব্লসমের সেই শোভা আজন্ম স্মৃতিতে থেকে যাবে।
ওসাকা জাপানের অন্যতম বাণিজ্য নগরী। তাই এখানে প্রচুর দোকানপাট। এখানের ব্যস্ততম Shinsaibashi বাজারে আমাদের শপিং-এর জন্য কিছু সময় দেওয়া হয়েছিল। বিবিধ ভোগ্যপণ্যের সমারোহে চোখ ধাঁধিয়ে যাবার অবস্থা! কিন্তু জিনিসপত্র খুবই মহার্ঘ্য। জাপানে সাধারণ জিনিসপত্রের দামও খুব বেশি। হাতে সময় কম, এর মধ্যে তাড়াতাড়ি করে ছাতা, কলম, ব্যাগ, ঘর সাজানোর কিছু জিনিস আর বিবিধ চকোলেট কিনে ফেললাম। জাপানী পোষাক কিমোনো কেনার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দাম? সিল্কের কিমোনো বার থেকে চোদ্দ হাজার ইয়েন! দরকার নেই বাবা! তবে জাপানের চকোলেট আর কুকিজ সত্যিই খুব সুস্বাদু। তাই ওদেশে গেলে ঐ দুটো জিনিস অবশ্যই কিনবেন।
২৭ মার্চ, ২০২৪
আজ সফরসূচির শেষ দিনে আমাদের গন্তব্য আরেক শহর কিয়োটো। ওসাকা থেকে দূরত্ব প্রায় এক ঘণ্টা। মন স্বভাবতই কিছুটা বিষণ্ণ। কিন্তু কিয়োটোর সৌন্দর্য মন ভালো করে দেয়। প্রকৃতি এখানে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। এখানে হাইরাইজ চোখে পড়ল না। বাড়িগুলো বেশিরভাগই একতলা, দোতলা। গ্রামের ছোট ছোট বাড়িগুলোও বেশ সুন্দর। মন্দির আর সংস্কৃতির শহর কিয়োটো। তাই এখানে অনেক বুদ্ধ মন্দির। এখানকার বিখ্যাত Bamboo Groove-এ দেখি দেশি-বিদেশি বহু পর্যটকের ভীড়। জায়গাটার অনন্য সৌন্দর্য মন বিভোর করে দেয়। ঘন, সুউচ্চ বাঁশ গাছের সারির ভেতরে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। তাই ভেতরটা বেশ অন্ধকার। এই আলো-আঁধারিতে ভরা গভীর বনরজির মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা... বেরিয়ে এসে খুব সুস্বাদু সাকুরা (চেরি) ড্রিংক খেলাম।
'কিমোনো' পরিহিত জাপানি মহিলারা।
কিয়োটোর সর্বশেষ গন্তব্য ছিল Sagano Romantic ট্রেন ভ্রমণ। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের এই রেলযাত্রা সত্যিই এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। ধীর গতিতে পাহাড়, নদী আর গভীর জঙ্গলকে দু'পাশে রেখে ট্রেন ছুটে চলেছে, কামরার ভেতরে ঢিমে তালে বেজে চলেছে জাপান দেশের সঙ্গীত। আমি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বাইরে চেয়ে থাকি। কামরার ভেতরে অপার নৈঃশব্দ্য। সকলেই এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করছে। এক সময় যাত্রা শেষ হয়। ড্রাইভারকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বাসে উঠি।
কিয়োটোতে সুন্দর লেক।
আজ আমাদের সকলের মনই ভারাক্রান্ত। তাই, বাস থেকে নেমে ধন্যবাদের পালা শেষ হতে চায় না। হোটেলের কর্মী, গাইড, বাসের ড্রাইভার সকলকে বলি 'সায়োনারা' (বিদায়)। তারা হাসিমুখে বলে, "আবার এসো আমাদের দেশে"। প্রত্যুত্তরে তাদের বলি, "নিশ্চয়ই আসব"। মনে মনে ভাবি আর কি আসতে পারব? অনেকটাই তো অদেখা রয়ে গেল! তবু বার বার কি ফিরে আসা যায়?
মেঘের বুক চিরে আমাদের উড়োজাহাজ এগিয়ে চলেছে। ছোট্ট জাপান দেশটা ফেলে এসেছি সেই কখন! বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। সেই মহাশূন্যের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ে রেস্তোঁরার সেই মেয়েটির কথা, যে অনাবিল হাসি নিয়ে আমাদের ফরমাস খাটতে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ক্লান্তিহীন পায়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। পরে আমরা একসাথে ছবি তুলেছিলাম। আমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "সায়োনারা বলব না, আবার এসো আমাদের দেশে"। অজান্তে দু' চোখের পাতা ভিজে যায়। মনে মনে বলি, মুক্ত হোক মানুষের মন, সহিষ্ণুতা বাড়ুক সকলের... ঘোর ভাঙে এয়ার হোস্টেসের সিট বেল্ট পরে নেওয়ার ঘোষণায়... সামনে বড়সড় 'Turbulence' আসছে যে!