।। ১ ।।
বলতে গেলে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালের অক্টোবরের এক সকালে, কারণ সেদিন আমার দাদু আমাদের আপার সার্কুলার রোডের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যেটি দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত ছিল। পথে আমরা একটা সমবেত গর্জন শুনতে পেলাম এবং এক বাস-বোঝাই জওয়ান চোখে পড়ল, হঠাৎ করেই সামরিক বাহিনীর দেওয়া জাতীয়তাবাদী স্লোগানের আওয়াজে ভোরের সাময়িক ক্লান্তি এবং কলকাতার শান্ত সকালের স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমার দাদু রাস্তার ধারে তাঁর গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে গেলেন, এবং উত্তেজিতভাবে তাদের উৎসাহিত করতে লাগলেন - একজন একাকী ব্যক্তিকে ওরকম আচরণ করতে দেখে অন্যান্য পথচারীরা অবাক হয়ে বোকার মতো এই দৃশ্যটি দেখতে লাগলেন। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতেই বাড়িতে, আমার মা আর আমার কাকিমার কথা মনে পড়ল, তাঁরা সরকার কর্তৃক দেওয়া গাঢ়-সবুজ উল থেকে সোয়েটার, গ্লাভস, টুপি (মাঙ্কি ক্যাপ) ইত্যাদি বুনতেন।
আমরা যে জওয়ানদের দেখছিলাম তারা বিমানবন্দরের পথে যাচ্ছিল, দেশের পূর্ব সীমান্তের বরফময় যুদ্ধক্ষেত্রে উড়ে যাওয়ার জন্য। আমাদের বাড়িতে পশমের জিনিসগুলো ফৌজিদের ব্যবহারের জন্য বোনা হচ্ছিল, এদেশের দিকে দিকে তখন ঘরে ঘরে বোনা পশমের পরিচ্ছদ দ্বারা সজ্জিত সৈন্যরা চীনা আক্রমণের ঢেউ মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
আমার কাছে এই ঘটনাটি, এবং 'পিপলস লিবারেশন আর্মি'র অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের সংবাদপত্রের রোমহর্ষক প্রতিবেদনগুলি ছিল '৬২-এর চীন-ভারত যুদ্ধের স্মৃতি। এমন একটি যুদ্ধ যা আমি এখনও পরোক্ষভাবে অনুভব করি, আপার সার্কুলার রোডের সেই জওয়ানদের কথা কল্পনা করে, যারা দূরের পাহাড়ে, এক জনহীন ভূখণ্ডে আমাদের জীবনরক্ষার জন্য লড়াই করেছে।
* * * *
ঠিক পঞ্চাশ বছর পরে, মলি, ভাস্বর এবং আমি তাওয়াং, সেলা, বোমডিলা এবং অন্যান্য অঞ্চলের সেইসব যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছি। অরুণাচলের ওপর চীনা আক্রমণের ফলে যে যুদ্ধ অনেক আগেই তা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও তার কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে। এখানে যুদ্ধের স্মারক সম্বলিত স্মৃতিসৌধগুলি সেনাবাহিনীর তরফে বিশেষ নৈপুণ্যের সাথে স্থাপন করা হয়েছে - যুদ্ধ-বীরদের সেপিয়া রঙের ফটোগ্রাফ সহ স্মারক, দৈত্যাকার মডেলের মাধ্যমে যুদ্ধে ব্যবহৃত চেম্বারগুলি সামরিক পরিভাষার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। একথা আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে আমি এখন পঞ্চাশ বছর আগের সেই ঘটনার সাথে নিজেকে ভীষণভাবে একাত্ম করতে পারছি এবং প্রচন্ড প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের সেনাবাহিনী জাতির জন্য যা করেছিল তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। সেই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২,৪২০ জন জওয়ান প্রাণ হারিয়েছিল, পাশাপাশি যেমন অনেক চীনা সৈন্যও মারা গিয়েছিল। পঞ্চাশ বছর আগে সংঘটিত সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পটভূমিতে সম্প্রতি আদিম অরুণাচল প্রদেশে এক সপ্তাহ অতিবাহিত করতে পেরে আমাদের নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছে।
যদিও আমরা ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় গুয়াহাটিতে পৌঁছেছিলাম, আমাদের অরুণাচল ভ্রমণ শুরু হয়েছিল পরের দিন সকাল সাড়ে ছ'টায়। আমরা একটি জ়াইলো (Xylo) গাড়ি ভাড়া করেছিলাম এবং ভালুকপং (Bhalukpong) হয়ে অরুণাচল ঢোকার আগে আসামের সবুজ ধানক্ষেত, দূরে ধূসর পাহাড়কে পটভূমিতে রেখে তেজপুর (Tezpur)-এ পৌঁছেছিলাম।
ভালুকপং অনেকটাই একটি সীমান্ত শহরের মতো, যেখানে প্রবেশ করতে গেলে অবশ্যই সেনাবাহিনীর আধিকারিকদের পারমিট দেখিয়ে তবেই আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অঞ্চলে প্রবেশ করতে হবে। ভালুকপং, কাঠ আর টিনের তৈরি ঘরের ছোট্ট ঘিঞ্জি শহর, মনে হয় যেন আধুনিক সভ্যতা থেকে অনেক দূরে। ভালুকপং যাবার রাস্তাটা একটা খাড়াই বাঁকে ঘন বনরাজি সম্বলিত জনশূন্য পাহাড়ে উঠে যায় এবং নির্জনতার সাথে সাথে নিস্তব্ধতাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম তার কয়েকশো ফুট নীচে পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকার মধ্যে দিয়ে কামেং নদী বয়ে চলেছে, হঠাৎ দেখলে মনে হবে প্রুশিয়ান নীল রঙের একটি ফিতেয় যেন সাদা বালি দিয়ে বর্ডার দেওয়া হয়েছে। পাহাড় একসময় ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতায় ডুবতে থাকে; ঝিঁঝিঁ পোকার অস্বাভাবিক উচ্চৈস্বর গুঞ্জনে যানবাহনের শব্দ, নদীর শব্দ ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল। এখানকার অ্যাসফল্ট-এর রাস্তাগুলো এবড়ো খেবড়ো, অসংখ্য বাটির মতো ছিদ্রযুক্ত; আরও খারাপভাবে বলতে গেলে এখানে রাস্তার কোনো অস্তিত্বই নেই, ভূমিধস ও মানুষের অবহেলার কারণে তা বিলীন হয়ে গেছে।
সূর্য অবশেষে উঁকি দিচ্ছে।
পাহাড়ের ধারে প্রার্থনা কক্ষ।
রাস্তার সমান্তরালে প্রবাহিত কামেং নদী।
রাস্তাজুড়ে মেঘ।
দুপুর দুটোয় এখানে মেঘ নেমে আসে, রাস্তার উপর দিয়ে তা প্রবাহিত হয়, দৃশ্যমানতা কয়েক মিটার পর্যন্ত নিমজ্জিত হয়। মনে হচ্ছিল আমরা সম্ভবত মৃত্যুকে স্পর্শ করছি, কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমরা এর কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা পেয়েছি। তার জন্য আমাদের দক্ষ ড্রাইভারকে মনে মনে আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম। আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রায় দশ কিলোমিটারের মতো পথ পাড়ি দিলাম। পথে মাঝে মাঝে আমাদের এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার সাথে সাথেই নানা প্রাকৃতিক বাধার জন্য থামতে হচ্ছিল, অবশেষে দশ ঘন্টায় আমরা ২৬০ কিলোমিটার মতো দূরত্ব অতিক্রম করেছিলাম।
বমডিলা (Bomdila), অরুণাচল প্রদেশের পশ্চিম কামেং (Kameng) জেলার সদর দফতর, ৭,২০০ ফুট উচ্চতায় একটি ছোট কিন্তু সুন্দর শহর। এটি পূর্ব হিমালয়ের একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত, এখান থেকে বিখ্যাত জিগজ্যাগ রাস্তা সমেত কামেং উপত্যকার শ্বাসরুদ্ধকর অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। এখানে শহরের সর্বোচ্চ স্থানে একটি বৌদ্ধ মঠ অবস্থিত রয়েছে, যা এখানকার জনগণের উপর এর আধ্যাত্মিক প্রভাবের প্রতীক।
বমডিলা মনাস্ট্রি।
এক ভদ্রমহিলা প্রভাতী আচার-অনুষ্ঠানে রত।
আমাদের হোটেলটি শহরের ঠিক মাঝখানে, প্রধান বাজারের রাস্তায় ছিল, কিন্তু সম্ভবত ঠান্ডার কারণে, সন্ধ্যে ৭টার মধ্যে বাজার সমেত পুরো শহর শুনসান হয়ে যেত। সমস্ত দোকানপাটের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যেত। এখানে স্থানীয় অধিবাসীরা সবাই প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ তাদের ব্যবহার। যথারীতি সন্ধ্যের জনাকীর্ণ রাস্তা রাতের মধ্যে আবার নির্জন হয়ে গেল। হোটেল থেকেই দেখলাম একজন অল্পবয়সী লামা একাকী একটি দোকানে, যা এখনও খোলা আছে, জিনিস কিনতে এসে একটা খেলনা পিস্তল নিয়ে ফাটাতে লাগলো; আরেকজন, জাফরান এবং লাল রঙের পোশাক পরিহিত বয়স্ক লামা, একটি অভিনব বাকলযুক্ত জুতো পায়ে গলানোর ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বমডিলার সরু রাস্তায় মেঘ ভেসে যাচ্ছে, কুয়াশা ভেদ করে জ্বলছে রাস্তার আলো।
শহরের ওপর দিয়ে মেঘ ভেসে যাচ্ছে।
প্রার্থনা-পতাকা উড়ছে।
সকালের সূর্যরশ্মি মুখ্য দরজাকে আলোকিত করছে।
নির্জনতা...।
পাহাড়ি পটভূমির মাঝে চূড়ো।
একটি পরিচিত দৃশ্য - ভুট্টা শুকোনো হচ্ছে।
ভুট্টা থেঁতো করা হচ্ছে।
সর্বকনিষ্ঠ খদ্দের?
হোটেল থেকে বমডিলা শহর।
সবজি বাজার।
পরদিন সকাল ৮টায় রওনা দিলাম ১৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তাওয়াং (Tawang)-এর উদ্দেশ্যে। রাস্তা আবারও খারাপ ছিল - বুঝলাম পাহাড়ের শক্তির কাছে মানব প্রকৌশল তুচ্ছ? অ্যাসফল্টের চাঙরগুলো পাথরের বিশাল বিশাল অংশের পৃষ্ঠে খাঁজের মতো দেখাচ্ছিল, কংক্রিট দিয়ে ধরে রাখা দেওয়ালগুলো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হচ্ছে, কারণ ওগুলো পাহাড়টাকে কোনোক্রমে রাস্তা থেকে ঠেকনা দিয়ে ধরে রেখেছে মাত্র।
সেলা (Sela) (পাস) পৌঁছানোর আগে আমরা দিরাং (Dirang) পার হয়েছি, এটি একটি ছোট পাহাড়ী শহর যেখানে একটি ব্যস্ত বাজার চত্বর এবং ইয়াক-গবেষণার একটি প্রস্তাবিত কেন্দ্র রয়েছে।
তাওয়াং জেলার প্রবেশদ্বার, সেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের ধারে কাছে কিছু নেই। এখানকার পাহাড়গুলি গাছপালা দিয়ে ঢাকা, একমাত্র ছোট, লাল লাইকেন গাছ ছাড়া যা ধূসর-বাদামী ল্যান্ডস্কেপে রঙের ছিটে যোগ করেছে। মেঘ নীচে নেমে এসেছে, তার ছায়া পাহাড়ের নির্জন, তুষারযুক্ত ঢালে খেলা করছে।
তাওয়াং জেলার প্রবেশদ্বার।
আয়তাকার ছোট ছোট বহুবর্ণের পুরু বৌদ্ধ প্রার্থনা-পতাকাগুলি রাস্তার পাশে একটি নীল হ্রদের উপর প্রচন্ড হাওয়ার ধাক্কায় পতপত করে উড়ছে।
সেলা পর্বতমালায় শৈবাল।
প্রার্থনা-পতাকায় রঙের মেলা।
সেলা পাস।
পাহাড়ে ছেঁড়া গাছপালা।
লেক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে।
১৩,৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, ঘূর্ণায়মান মহাসড়কটি বিশাল দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে কেটে গিয়ে 'লা' (দুটি পর্বতের মধ্যে একটি পাস)-এর নিখুঁত সংজ্ঞা প্রদান করেছে৷ এখানকার দুটি পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত বাতাস, যা প্রচণ্ড ঠান্ডা, অত্যন্ত দ্রুত বেগে বয়ে যায়, যা সম্ভবত একজন মানুষকে তার পা মাটি থেকে তুলে তাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। দুই সপ্তাহের মধ্যে, আমাদের জানানো হয়, হ্রদটি খুব দ্রুত বরফে পরিণত হবে এবং সেখানে মাটির এমন একটি অংশও অবশিষ্ট থাকবে না যেটি বরফে ঢাকা থাকবে না। শীত আমাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছিল।
মেঘ হঠাৎ করেই পাস ঢেকে দিয়েছে।
প্রথাগতভাবে ক্যামেরায় প্রাণ ভরে ছবি তোলার পর আমরা যশোবন্তগড় (Jaswantgarh)-এর দিকে এগিয়ে গেলাম। চীন-ভারত যুদ্ধের সময়, চীনারা বুম লা (Bum la)-তে ভারতীয় প্রতিরক্ষা (ঠিক মাখনের মধ্য দিয়ে গরম ছুরি চালানোর মতো) ভেঙ্গে ফেলে এবং সেলা যাওয়ার পথে তারা এই অধুনা যশবন্তগড়ে অকস্মাৎ একটি ভারতীয় সৈন্যদলের মুখোমুখি হয়।
১৯৬২ সালের প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্র।
যশবন্ত সিং রাওয়াত ছিলেন একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাইফেলম্যান, যিনি অগ্রসরমান চীনা সেনাবাহিনীর সাথে এক বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং মারাত্মক আহত হওয়ার আগে প্রায় একা লড়াই করে শত্রুর আর্টিলারি বন্দুকগুলিকে অচল করে দেন। ভারত সরকার কর্তৃক তাঁকে মরণোত্তর 'মহা বীর চক্র' সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল এবং যেখানে এই যুদ্ধ হয়েছিল সেখানেই এখন তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মারক স্থাপন করা হয়েছে।
যুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, যশবন্তগড়।
যুদ্ধ স্মৃতিফলক, যশবন্তগড়।
এই প্রসঙ্গে আমাকে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল বি. এম. ভট্টাচার্য সেই সেক্টরে একদিনে পাঁচটি চীনা আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন, যার জন্য তিনিও Maha Vir Chakra (MVC) সম্মানে সম্মানিত হন এবং তাঁর একটি ফটোও এখন স্মৃতিফলকে শোভা পাচ্ছে। তাঁর এই সম্মানপ্রাপ্তির বহু বছর পরে, আমি এই ভদ্রলোকের সাথে একটি কমিটিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি একবারও আমাদের কাছে তাঁর সেই বীরত্বের গল্প বা তাঁর সেইসব গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলির বর্ণনা করেননি, তাঁর স্বভাব ছিল এমনই বিনয় ও নম্রতাপূর্ণ।
এখানেই চীনা সৈন্যদের প্রতিহত করা হয়েছিল।
তাওয়াং যাওয়ার পথে প্রথম তুষারশৃঙ্গ।
কোজাগরী পূর্ণিমা, বমডিলা।
অবশেষে দশ ঘণ্টার যাত্রার পর, আমরা সন্ধ্যা ৬টায় তাওয়াং পৌঁছলাম এবং গায়াকি হোটেল (Gyaki Hotel)-এ উষ্ণ অভ্যর্থনা লাভ করলাম। হোটেলটি পাহাড়ের ধারে আটকে থাকা একটি বেমানান কংক্রিটের কাঠামো, যা দিনের শেষে সারাদিনের দৈহিক পরিশ্রমের পর অবশেষে আমাদের স্বস্তি প্রদান করল।
।। ২ ।।
অরুণাচল দেশের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বলে এখানে সূর্য তাড়াতাড়ি ওঠে। সকাল ৬টার মধ্যে পাহাড়ের পূর্ব ঢালগুলো সূর্যের আলোয় অবগাহন করল।
তাওয়াং মনাস্ট্রি।
তাওয়াং মঠ (Tawang Monastery)-র প্যাস্টেল-সাদা দেয়াল, উদীয়মান সূর্যের মুখোমুখি হয়ে অন্ধকার ধূসর পাহাড়ের বিপরীতে সোচ্চারে দাঁড়িয়ে আছে। তাওয়াং মঠটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। যেখানে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের নীচের ঢালে চোখ রাখলে তাওয়াং শহর দেখা যাবে। যেখানে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সাগরের মতো ছড়িয়ে আছে কাঠ এবং টিনের ছাদযুক্ত অসংখ্য বাড়িঘর।
৩৩১ বছরের পুরোনো মনাস্ট্রির প্রবেশদ্বার।
আমরা বেশ কয়েক ঘন্টা পরে বিখ্যাত তাওয়াং মঠে পৌঁছেছি এবং এই মঠটি দর্শন করাও আমাদের জীবনে একটা অভিজ্ঞতাস্বরূপ। এই মঠটি ১৬৮১ সালে লামা গিয়ামৎসো (Lama Gyamtso) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিংবদন্তি আছে, জায়গাটি তাঁর ঘোড়ার দ্বারা নির্বাচিত হয়েছিল। তাই নাম - তাওয়াং - যার অর্থ 'ঘোড়া দ্বারা নির্বাচিত'। মঠটি কাঠের তৈরি কতকগুলি বাড়ির সমষ্টি - একটি লাইব্রেরি, একটি স্কুল, একটি যাদুঘর এবং অনেকগুলি প্রার্থনা হল - ঘরগুলি একটি গোলকধাঁধার আকারে তৈরি রাস্তার সাথে সংযুক্ত। নতুন নির্মাণ পুরোনো থেকে আলাদা করা যায় না - অরুণাচলের লোকেরা এখনও কাঠ এবং পাথর দিয়ে তাদের বাড়িঘর নির্মাণ করে যেমন তারা শত শত বছর ধরে করে এসেছে। বর্তমানে মঠের নতুন কংক্রিট কাঠামো কিছু অংশে, প্রাচীন বেশ কয়েক মিটার পুরু সিমেন্টের দেয়াল দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পুরু দেওয়ালগুলি ভাঙা সম্ভব হয়নি।
কাঠের বিম এবং কোণ।
থাঙ্কা (Tangkha)-গুলি হলের শোভাবর্ধন করছে।
প্রার্থনা হলটি বেশ অন্ধকারাছন্ন, শুধুমাত্র স্কাইলাইট দ্বারা আলোকিত - বোধিসত্ত্বদের ম্যুরালে জ্বলজ্বল করা ঘের বরাবর লাল বাল্ব জ্বলছে, মেঝেতে ছড়িয়ে পাতা রয়েছে লম্বা কুশন এবং কাঠের প্ল্যাটফর্মে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে বয়স্ক লামাদের পোশাক। পিতলের ঘন্টা, শঙ্খ, ভারী কারুকার্যযুক্ত শঙ্কু আকৃতির শিঙা এখন নিঃশব্দে বসানো আছে। বিরাটাকার বুদ্ধমূর্তির পাদদেশে দালাই লামার একটি ফ্রেমযুক্ত ছবি সিংহাসনে স্থাপন করা রয়েছে।
প্রার্থনা কক্ষে অধিষ্ঠিত বুদ্ধমূর্তি।
মূর্তির চারপাশে কাঠের সূক্ষ্ম কারুকার্য।
ক্লাস শুরুর আগে ছাত্ররা সমবেত হয়েছে।
মন অন্য জায়গায়।
বর্তমানে, মঠে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ৭০০ জন লামা রয়েছে যাদের বাল্য বয়স থেকে শিক্ষা দেওয়া হয়। আমরা তরুণ লামাদের স্কুলের প্রার্থনা প্রত্যক্ষ করলাম, যারা তাদের গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিহিত হওয়া সত্ত্বেও, তাদের আচরণ শিশুদের মতোই কৌতুকপূর্ণ ছিল।
(ক্রমশ)
আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত। লেখকের নিজের তোলা।
লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/