[দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ-এ রায়পাড়া সাহেবখালি অঞ্চলে 'সুজন' নামে একটি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র চালাচ্ছেন। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে 'সুজন' আজ একটি সেবা প্রতিষ্ঠান (Charitable Trust)-এ পরিণত হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ, আর্ত ও অসহায় মানুষদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা সামাজিক প্রতিকূলতাকে নিজের অদম্য জেদ, সততা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে একজন চিকিৎসকের জয়ী হওয়ার কাহিনীই নিজের কলমে লিখেছেন ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল। মানুষের পাশে থাকার, অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সেবাপ্রদান করার তাঁর নিরলস মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত করেন। বকলমে এই জয় সাধারণ মানুষেরই জয়। এই লেখায় মূলত 'সুজন' গড়ে ওঠার প্রাক-কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে আজকের কিছু কথাও এসেছে। লেখাটি ধারাবাহিক আকারে প্রকাশ করতে পেরে 'ডটপেন ডট ইন' ই-পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী ডাক্তারবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ।]
'সুজন' এখন।
'সুজন'-এ অপেক্ষারত রোগীরা। এখনও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
রোগীরা কাউন্টারে নাম লিখিয়ে টোকেন সংগ্রহ করছেন।
২০০০ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আমি কাজ শুরু করি। প্রথমে নিজের পৈতৃক বাড়ীতে। যাতে বেশী সংখ্যক মানুষ আমার এই পরিষেবার সুযোগ নিতে পারে সেজন্য নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে PWD রাস্তার কাছাকাছি রায়পাড়াতে একখন্ড জমি কিনি। এই জমি কেনার ব্যাপার সঞ্চিত আমাকে ভীষনভাবে সাহায্য করে। তারই ছোটকাকার জমি - যদিও জমি কিনতে গিয়ে চতুর ও ধূর্ত মতিশ রায় বেশ ভালোভাবেই প্রবঞ্চিত করেন, তারপর নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পর্যায়ক্রমে দোতলা বিল্ডিং তৈরী করি। টাকা-পয়সা সংগ্রহ করা, ঔষধপত্র জোগাড় করা এমনকি ন্যায্যমূল্যে বাজার থেকে ক্রয় করা, রোগী দেখা, ঔষধপত্র দেওয়া সবটাই একক প্রচেষ্ঠায় করতে থাকি। প্রথম পর্যায়ে একটি বামপন্থী সংগঠন বিরাটীর 'Elevation Cultural Forum' আমার সহযোগিতায় ছিল। আমি নিজেও দীর্ঘদিন এই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য এমনকি 'Integrated Health Project'-এর দায়িত্বে ছিলাম। সেই সংগঠনও কোনওরকম কারণ না দর্শিয়ে আয়লার সময় এক সংকটময় মূহূর্তে সরে গেল। বিরাট অংকের আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে নিয়ে বলিষ্ট পদক্ষেপে এককভাবে পথ চলা - "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।" কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীর আর্থিক সহায়তায় ও সহযোগিতায় পথ চলা। বন্ধুর সে পথ, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বর্তমানে টিঁকে থাকা। ভেবেছিলাম স্থানীয় প্রশাসন কিছু সাহায্য করবে। কিন্তু কেন জানি না - প্রথমে বামপন্থী সরকার ও পরে TMC-র মা-মাটি-মানুষের সরকার কেউই কোনোপ্রকার সাহায্য তো করেইনি, উপরন্তু বর্তমান শাসকদল ক্ষেত্রবিশেষে অসহযোগিতাই করেছে।
দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের দরবার হল-এ মাননীয় রাষ্ট্রপতি শ্রী রামনাথ কোবিন্দ-এর হাত থেকে 'পদ্ম সম্মান' গ্রহণ করছি।
রাষ্ট্রপতি ভবনের দরবার হল-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী-র সাথে একান্ত আলাপচারিতা।
'পদ্মশ্রী' সম্মানে সম্মানিত হবার পর ভেবেছিলাম কেন্দ্রীয় সরকার হয়ত সাহায্য করবে, কিন্তু সেখানেও হতাশা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেইমতো 'Integrated Health Poject in Sundarbans' নামে একটি ২ কোটি টাকার Poject জমা দিই। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে ২ মাস বাদে তা নাকচ হয়ে যায়।
মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বিশ্রামকক্ষ।
দোতলার বিশ্রামকক্ষ।
ভেবেছিলাম আমি যে সংগঠনের আজীবন সদস্য অর্থাৎ Indian Medical Association (I.M.A.) তারা হয়ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু হায়! সামান্য শুভেচ্ছা জানানো দূরে থাক, আবার আর্থিক সাহায্য। অথচ কতজন ডাক্তার এমন অমূল্য সম্মানের অধিকারী হয়? এমনকি আমার ডাক্তার বন্ধুরাও সেভাবে কেউ এগিয়ে আসেনি। সবাই ভূয়সী প্রশংসা করেছে, বাহবা দিয়েছে, কিন্তু আর্থিক সাহায্য নৈব নৈব চ। অথচ পাঁচটি Centre চালাতে আমাকে প্রতিমাসে লক্ষাধিক টাকার ঔষধ কিনতে হয়। তাই মনে হয় বাস্তবটা বড় রুঢ়। শুধু বাহবা পেলেই হবে, যে গ্রীষ্মে সকলে যখন এসি চালিয়ে শনি-রবিবার আয়েশ করে, আমি তখন সুন্দরবনের রাস্তায় রাস্তায় ৪৫-৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পুড়তে থাকি। আর এখন যে এ কাজ থেকে সরে আসব তারও উপায় নেই। কারন যেভাবে অসংখ্য মানুষ নির্ভরশীল হয়ে গেছেন, সেখানে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের তাগিদে পিছিয়ে আসব - সে উপায়ও নেই। একমাত্র নিজের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা আমাকে চালিত করছে যেন তেন প্রকারেন এ কাজটাকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। যদিও এই প্রৌঢ় বয়সে মানুষ একটু আরাম চায়, একটু স্বস্তি চায়। অদ্ভুত স্থানীয় পঞ্চায়েতের কোনো পদাধিকারী, এমনকি যে রাজ্যে আমি কাজ করি সেই রাজ্যের শাসকদলের কোন মন্ত্রী, এমএলএ বা এমপি পর্যন্ত সৌজন্য শুভেচ্ছাও জানাননি - যেহেতু পদ্ম পুরস্কার কেন্দ্রীর সরকার দেয়। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ করতে হয়। তাই মাঝে মাঝে উৎসাহহীনতায় ভুগতে হয়। চারিদিকে নীতিহীনতা, আদর্শহীনতা, মূল্যবোধহীনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার আস্ফালন। আমরা প্রায়শই যুবসম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি - বর্তমানে তাদের সামনে না আছে কোনো আদর্শ, না আছে কোনো অনুকরণযোগ্য চরিত্র। সুতরাং, কি দেখে বা কাকে দেখে তারা অনুপ্রাণিত হবে? মূল্যবোধহীন শিক্ষা একটি জাতিকে কিভাবে পঙ্গু করে বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সেটা অত্যন্ত প্রকট। কিন্তু উপায় কোথায়? তবে কি এভাবেই চলবে সুজন-এর স্বাস্থ্য প্রকল্প?
সুন্দরবনের গোধূলি আকাশে রঙের খেলা। (ক্ষণিকের অবসরে 'সুজন'-এর ছাদ থেকে তোলা)।
(ক্রমশ)
আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।
'সুজন'-এর ওয়েবসাইট লিঙ্কঃ www.sujan-sundarban.org
লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/