হেরে যাওয়া ব্যাপারটা জিতে যাওয়ার মতোই সহজ। কিন্তু একটা পার্থক্য তো আছেই। জিতে যাওয়া ব্যাপারটাকে আলাদা করে মেনে নেওয়া বা মানিয়ে নেবার চাপ থাকে না অথচ হেরে যাওয়া ব্যাপারটাকে বিশেষভাবে মেনে বা মানিয়ে নিতে হয়। তারপরও, বার বার হেরে যেতে থাকলে পিছিয়ে পড়তে হয় এবং এক সময় প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয়।
প্রত্যেক মানুষকেই জিততে হয় জীবনের কোনও না কোনও প্রতিযোগিতায়। প্রতিমুহূর্তে জীবন রাশি রাশি প্রতিযোগিতার প্রলোভন আমাদের সামনে হাজির করে। 'দাদাগিরি' থেকে 'দিদি নাম্বার ওয়ান' অথবা 'কৌন বনেগা ক্রোড়পতি' থেকে 'ইন্ডিয়ান আইডল' - সে আপনি যে নামেই ডাকুন না কেন এইসব প্রতিযোগিতায় অংশ না নিয়েও আপনি প্রতিযোগী। অথবা এদের মতোই পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় হয়তো ছোটোখাটো সংস্করণ চলতেই থাকে! সে চলুক বা না চলুক আমরা কিন্তু প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়ে ফেলি নিজের অজান্তেই। পাশের বাড়ির ব্যানার্জিবাবুর ছেলের অঙ্কের নাম্বারের সাথে আমার মেয়ের অঙ্কের নাম্বারের প্রতিযোগিতা অথবা পিছনের বাড়ির মিস্টার মিত্রের ফোর হুইলারের সাথে আমার মারুতি অল্টোর মাইলেজের প্রতিযোগিতা! এমনভাবেই কারোর বাড়ির সঙ্গে আমার ফ্ল্যাটের অথবা কারোর ছাদের বাগানের সাথে আমার ব্যালকনির ক্যাকটাসের। প্রতিযোগিতা চলছেই। অন্য প্রতিযোগী অংশগ্রহণ না করলেও আমি ছাড়ছি না কিছুতেই। নিজেই হিসাব কষে ঠিক করি হারা এবং জেতার। আর, তারপর হেরে যেতে থাকলে মানিয়ে নেবার অনুশীলন চলে একা একাই। এ স্বাদের ভাগ হবে না। আর তাই কাউকে কিছু না জানতে দিয়ে সবটা একা একা হজম করার বৃথা চেষ্টা করি এবং সবশেষে বদহজমে মরার অবস্থায় পৌঁছে যাই।
কিন্তু কার তাতে কী? আমি যদি হেরে যাই এবং হেরে যাওয়া ব্যাপারটা বার বার মেনে নিতে বা মানিয়ে নিতে না পেরে, "আই কুইট" লিখে একদিন মানিয়ে নেবার পরিবর্তে হারিয়ে যাই!
ভাবতে যতই বিস্ময়কর লাগুক না কেন এমন হবার চান্স কিন্তু প্রবল। আমাদের সবার মধ্যেই এই হেরে যাওয়া এবং মানিয়ে নেবার খেলা চলছে দারুণভাবে। জিতলে লোকদেখানো ফেসবুক পোস্ট আর হারলে চুপচাপের ঠোঁটে ছাপ মেরে নিজের ভোট নিজে দিতে পারার আনন্দে আরও একবার প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া চলছে, চলবে।
তবু, মাঝেমধ্যে এই হেরে যাওয়া ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় না, মানিয়ে নেওয়াও যায় না। তখন মাঠ ছেড়ে পালানোর পথ খোঁজার কথা মাথায় আসে। যেমন ভাবা তেমন কাজ, সবাই যে করতে পারেন এমন না হলেও কেউ কেউ অবশ্যই পারেন। এক প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে অন্য প্রতিযোগিতায় তিনি কি নাম লেখান? যেখানে শোকসভা, মিথ্যে প্রশংসা আর রাশি রাশি চাপলুসি বাক্যের মধ্যে দিয়ে আগের খেলার প্রতিযোগী আবার তাকে হারিয়ে দেন বৈকি!
এই ভাবনা মাথায় আসতেই সাইড লাইনের ধারে ওয়ার্ম আপ চালু করে দিই। হারকে মেনে নিলেও মানিয়ে নেবার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে নিজেকে জেতার জন্য প্রস্তুত করতে উঠে পড়ে লাগি। পরিশ্রমের ঘুমকে স্বাগত জানিয়ে বিদায় জানাই স্লিপিং পিলকে। আর, পরাজয়কে জয়ের স্তম্ভ বানিয়ে নতুন এক ইতিহাস লেখার চেষ্টা শুরু হয় ভিতরে ভিতরে।
এমন তো সবারই হয়। জেতার খিদে ঠিক কখন মরে যায়? বার বার জিতে নাকি বার বার হেরে? হেরে গেলে পরের বার জয়ের নতুন স্বাদের জন্য লড়া যায় কিন্তু জিতে গেলে? প্রথমবার জেতার পর কি আদৌ একই খিদে থাকে অপরাজিত থাকার জন্য? এ ব্যাপারে বারবার হেরে যাওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা কম আর তাই চুপ করে অপেক্ষা করা উচিত।
অপেক্ষার ফল সবসময় মিষ্টি হয় এ কথা হয়তো সত্যি নয় তবু সুযোগের অপেক্ষা করা প্রতিযোগী সুযোগ পেলে যে পাশা পাল্টাতে পারে, এ কথা কে না জানে? ক্রিচে টিকে থাকলে রান হবার চান্স বেশি কিন্তু বেশি রান তাড়া করতে গিয়ে ক্রিচে টিকে থাকাটাই হয় না।
হার জিতের এই খেলাকে জীবনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যেতে পারে আবার মিলিয়েও দেখা যেতে পারে। তবে কোনটাতে জিতে যাবেন আর কোনটাতে হেরে তা বোধহয় প্রতিযোগী হয়ে বুঝতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/