কাট ওয়ান - জানুয়ারি, ১৯৭৪, হাওড়া স্টেশন, কলকাতা
১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসের এক ভোরে 'সোনার কেল্লা'র শুটিং ইউনিট ট্রেনে হাওড়া স্টেশন থেকে রওনা দেয় রাজস্থানের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার আগে ভোরবেলায় হাওড়া স্টেশনে একটা ছোট দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। দৃশ্যটা ছিল - ফেলু আর তোপসে রওনা হচ্ছে রাজস্থানের উদ্দেশে। তোপসের বাবা (হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়) এবং মা (রেখা চট্টোপাধ্যায়) তাদের ছাড়তে এসেছেন, কথা বলছেন। অত সকালেও উৎসাহী দর্শকদের ভিড়ে ঠাসা হাওড়া স্টেশনে একটা ট্রলিতে ক্যামেরা নিয়ে সত্যজিৎ রায় দৃশ্যটা শুট করেছিলেন। সেদিন হাওড়া স্টেশনে অত ভিড় সামলে রেখেছিলেন ছবির প্রোডাকশন ম্যানেজার ভানু ঘোষ। শুটিং-এ ব্যবহৃত ট্রলি সামনেও টানা যায়, আবার পিছনেও। এক্ষেত্রে পিছনদিকে টানা হয়েছিল, যাতে মনে হয়, দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেন সামনের দিকে চলতে শুরু করেছে। অতঃপর চলন্ত ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ফেলু-তোপসে বাবা-মায়ের দিকে আস্তে-আস্তে হাত নাড়ে। প্রত্যুত্তরে তোপসের বাবা-মা-ও ওদের দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানান। ক্যামেরা স্টেশনের সিলিং-এ প্যান করলে দেখা যায় স্টেশনের ঘড়িতে ৯:৩৫ বাজে।
হাওড়া স্টেশনে তোলা 'সোনার কেল্লা' ছবির দুটি দৃশ্য।
হাওড়া স্টেশনে শুটিং-এর নানা মুহূর্তে পরিচালক সত্যজিৎ রায়।
কাট টু - জয়পুর, রাজস্থান
জয়পুরের রাস্তায় এখন লক্ষ্য করলে দেখা যায় গোলাপি পাথরের বাড়ির সঙ্গে-সঙ্গে নতুন ধরণের বাড়িও তৈরি হয়েছে। তবে নতুন বাড়িগুলির বিশেষ কোনও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই - যা জয়পুর ঘরানার স্থাপত্যের সঙ্গে মেলে। এখন ভারতের যেকোনও শহরে এরকম বাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। তখন জয়পুরের রাস্তায় অনেক অটোরিক্সা, টাঙ্গা দেখতে পাওয়া যেত। টাঙ্গা এখন আর নেই, অটো একটু-আধটু আছে। জয়পুরে সেই সময় 'সোনার কেল্লা'র শুটিং ইউনিট-এর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল 'খাসা কুঠি'তে। জয়পুর সার্কিট হাউসের পাশেই অবস্থিত এই 'খাসা কুঠি'। এটি একটি হাভেলি যেটির চারদিকে বেশ প্রশস্ত বাগান রয়েছে। গত ৫০ বছরে এটির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। বর্তমানে এটি বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাড়া দেওয়া হয়। ১৯০০ সালের আশেপাশে রাজা রাম সিং এই কুঠি তৈরি করান, অতিথিশালা হিসেবে। এখন 'খাসা কোঠি' (Hotel Khasa Kothi) জয়পুরের একটি অন্যতম 'বাজেট হোটেল'।
হোটেল খাসা কোঠি (Hotel Khasa Kothi), জয়পুর।
'খাসা কুঠি' থেকেই শুটিং ইউনিট নাহারগড় কেল্লায় শুটিং করতে গিয়েছিল। সেখানেই শুট করা হয়েছিল দূরে উট দেখানোর অছিলায় আসল ডক্টর হাজরা (শৈলেন মুখোপাধ্যায়)কে কিভাবে মন্দার বোস (কামু মুখোপাধ্যায়) 'ভ্যানিশ' করে দেবে সেই দৃশ্য।
নাহারগড় কেল্লার সামনে মুকুল (কুশল চক্রবর্তী)।
নাহারগড় কেল্লা, জয়পুর।
কাট থ্রি - বিকানের, রাজস্থান
ছবির পরবর্তী খুব সামান্য কিছু অংশের শুটিং হয়েছিল জয়পুর থেকে ৩৩৪ কিমি দূরে বিকানের-এ অবস্থিত বিকানের দুর্গে। বিকানের-এ অবশ্য ইউনিটের থাকার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। খুব সকালে সেখানে পৌঁছে দুর্গের কিছু স্থিরচিত্র নেওয়া হয়েছিল আর ভিতরে একটা করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে ফেলুদের সাথে মন্দার বোসের একটা সংলাপ-দৃশ্য তোলা হয়েছিল।
বিকানের দুর্গের ভিতরে তোলা ছবির কিছু দৃশ্য।
কাট ফোর - যোধপুর, রাজস্থান
গল্পের পরবর্তী বেশ অনেকখানি অংশের ছবি তোলা হয় যোধপুর-এর সার্কিট হাউস-এ। সার্কিট হাউসেই শুটিং ইউনিট-এর অনেকে ছিলেন। ছবিতে এখানেই ফেলুদার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় মন্দার বোস, নকল ডক্টর হাজরা এবং মুকুলের। এখানেই তোলা হয় বিখ্যাত সেই কাঁকড়াবিছের দৃশ্য।
একতলার সার্কিট হাউস এখন দোতলা হয়েছে। এ ছাড়া, আদতে সেই চার দশক আগেকার সার্কিট হাউস। সেই গেট, সেই গোল বাগান। সার্কিট হাউসের করিডর, রিসেপশন, ডাইনিং রুম সব এক। শুধু আসবাবপত্রে আধুনিকতার ছাপ লেগেছে। ঘরগুলো বাইরে থেকে সব একই আছে। কলকাতার ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতে ঘরের ভিতরটা হুবহু তৈরি করা হয়েছিল। সেখানেই ঘরের ভিতরের সব দৃশ্য শুট হয় রাজস্থান থেকে ফেরার পর।
সার্কিট হাউস, যোধপুর।
যোধপুর সার্কিট হাউস-এ শুটিং-এর নানা মুহূর্ত।
ছবির একটি দৃশ্যে যোধপুর সার্কিট হাউস-এর করিডোর।
যোধপুর সার্কিট হাউস-এর সেই করিডোর এখন।
কাট ফাইভ - শ্রী ভদ্রিয়া লাঠি রেলওয়ে স্টেশন, জয়সলমীর, রাজস্থান
'সোনার কেল্লা'র মাঝের খানিকটা অংশের শুটিং হয় 'লাঠি' নামক একটি স্টেশনে। যোধপুর থেকে এবার গাড়ি করে জয়সলমীরের দিকে। পথে পড়বে সেই 'লাঠি' স্টেশন। এই পথেই অনেক দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল চলন্ত গাড়িতে। তখন ছিল অ্যাম্বাসেডর গাড়ি যেটা সিংজি চালিয়েছিলেন। এই পথেই তোলা এক দৃশ্যে জটায়ু উট উদ্দেশ্য করে ফেলুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কাঁটা কি ওরা বেছে খায়?” যে সংলাপ এখনও অনেক বাঙালিই মাছের কাঁটা বাছতে গিয়ে অজান্তে বলে ফেলেন।
ছবির একটি দৃশ্যে 'লাঠি' রেলওয়ে স্টেশনে মন্দার বোস (কামু মুখোপাধ্যায়) অমিয়নাথ বর্মণ ওরফে নকল ডক্টর হাজরা (অজয় ব্যানার্জি)-র কাছ থেকে পাওয়া নোট নকল কিনা তা যাচাই করছে।
রেল স্টেশনটির সম্পূর্ণ নাম - শ্রী ভদ্রিয়া লাঠি রেলওয়ে স্টেশন (Shri Bhadriya Lathi Railway Station)। এটি রাজস্থানের জয়সলমের জেলার অন্তর্গত একটি রেলওয়ে স্টেশন। এর কোড হল SBLT। আমাদের ড্রাইভারকে বলা ছিল, জয়সলমের ঢোকার আগে 'লাঠি' স্টেশনে যেন দাঁড়ায়। এখানে অনেকেই এই স্টেশনের নাম শোনেনি। আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোক তো শোনেনইনি। তখন দুপুর। বড় রাস্তার পাশে একটা বসতি চোখে পড়ল। গাড়ির স্পিড কমিয়ে ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়ে লাঠি স্টেশন কহাঁ হ্যায়?" দিকনির্দেশ পাওয়া গেল, গাড়িটা সামনের বাঁকে বাঁদিকে নেমে গেল। আমরা চারদিকে চোখ রাখছি।
শ্রী ভদ্রিয়া লাঠি রেলওয়ে স্টেশন, জয়সলমীর।
মরুভূমির মধ্যে নির্জন একটি এলাকায় স্টেশনটি এখনও একটি সিঙ্গল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনে প্রবেশ করার সিঁড়ি থেকে আরম্ভ করে টিকিটঘর - এখনও সব এক। তখনকার মতো এখনও এক্কেবারে শুনশান ট্রেনলাইন। কয়েকটা মিলিটারি ট্রেন আসা-যাওয়া করে। শুধু রাতের দিকে একটা জয়সলমীর যাওয়ার ট্রেন আসে।
থর মরুভূমিতে সূর্যাস্তের দৃশ্য।
এই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই ফেলু, তোপসে আর জটায়ু অপেক্ষা করেছিল জয়সলমীরগামী রাতের ট্রেন ধরার জন্য। এখানেই অস্তমিত সূর্যকে নেপথ্যে রেখে সিল্যুটে কোমর দুলিয়ে ব্যায়াম করেছিলেন জটায়ু। অসাধারণ সেই দৃশ্য। এই প্ল্যাটফর্মেই জটায়ু আক্ষেপ করেছিলেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভোজালি নিয়ে। খানিক দূরেই অবশ্য ছদ্মবেশধারী মন্দার বোস ঘাপটি মেরে বসে সব শুনছিল। এখানেই ফেলু জটায়ুকে তার কোল্ট .৩২ রিভলভারের মেকানিজম বুঝিয়েছিল। আবারও এক বিখ্যাত সংলাপের জন্ম হয়েছিল -"ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই... ঠাঁই..."! সাথে জটায়ুকে ফেলুদার উপদেশ - "...তা এগুলো তো জানতে হবে... না জেনে লিখলে সবই যে উটের পাকস্থলী হয়ে যাবে মিস্টার জটায়ু"। এই ছোট কিন্তু সিরিয়াস সংলাপের মাধ্যমে সত্যজিৎ আপামর বাঙালি লেখক ও পাঠককে একটা সতর্কবার্তাও দেন। সববয়সী পাঠকদের মধ্যে বাড়িয়ে তোলেন অজানাকে জানার ক্ষিদে।
'সোনার কেল্লা' ছবিতে 'লাঠি' স্টেশনে রাতে গানের দৃশ্য আপনারা দেখেছেন। স্টেশনের বাইরে আগুন জ্বেলে সেই গানের দৃশ্য শুট করা হয়। সেই দৃশ্যের মাধ্যমেই প্রথমবার বাঙালি শ্রোতাদের কানে খরতালের শব্দ পৌঁছে দেন সত্যজিৎ। দু'জোড়া কাঠের টুকরো হাতের তালুতে রেখে বাজাতে হয়। এখানেই ফেলুদা ছদ্মবেশ নেওয়া মন্দার বোসকে চিনে ফেলে তার হাতের আংটি দেখে। গায়করা বেশিরভাগই ছিলেন এককালের ডাকাত। পেশা ছেড়ে সবাই জীবিকার জন্য সঙ্গীত বেছে নেন। তাদের আবিষ্কার করেন সত্যজিৎ। তখন অবশ্য এখানে বিদ্যুৎ আসেনি। কেরোসিনের ল্যাম্প দেখানো হয়েছিল ছবিতে। এত বছর পর আবার মনে হল, সত্যিই লোকেশন বাছার ব্যাপারে সত্যজিৎ রায়ের কোনও জুড়ি নেই।
ফেলুরা ট্রেনে উঠে পড়ার পর মন্দার বোস তার হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে ট্রেনের বন্ধ দরজার বাইরে ঝুলন্ত অবস্থায় বসে থাকবে - এই পুরো দৃশ্য ও ট্রেনের ভিতরের দৃশ্য পরে কলকাতার 'ইন্দ্রপুরী স্টুডিও'তে তোলা হয়েছিল।
পরদিন ভোরবেলা এই ট্রেনের কামরার মধ্যে থেকেই ফেলুদার ডাকে উঠে পড়ে তোপসে আর জটায়ু প্রথম 'সোনার কেল্লা' দর্শন করবে। সাথে আমরাও।
কাট সিক্স - মরুভূমির মাঝে উট ও ট্রেনের দৃশ্য
'সোনার কেল্লা'-র বিখ্যাত উট এবং ট্রেনের দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল জয়সলমিরের প্রায় সত্তর মাইল পূবে, যোধপুরের দিকে একটা জায়গায়। সত্যজিৎ রায় তাঁর নানা ছবিতে শুটিং-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বই 'একেই বলে শুটিং'-এ 'উট বনাম ট্রেন' নিবন্ধে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন - "...যে জায়গাটা শুটিং-এর জন্য বাছা হয়েছিল, তার ত্রিসীমানায় কোনও লোকালয় নেই। চারিদিকে ধূ ধূ করছে বালি, মাঝে মাঝে শুকনো ঘাস আর ছোট ছোট কাঁটা ঝোপ। এরই মধ্যে দিয়ে চলে গেছে মিটার গেজের লাইন; দেখলে মনে হয় যার শুরুও নেই শেষও নেই। এই রেললাইনের পাশ দিয়েই আবার চলে গেছে জয়সলমির যাবার মোটরের রাস্তা। লাইন যদি রাস্তা থেকে বেশি দূর হত তা হলে শুটিং সম্ভব হত না, কারণ জয়সলমিরে আমাদের ডেরা-সেখান থেকে মালপত্তর লোকজন নিয়ে আসতে হবে শুটিং-এর জায়গায়। উট যখন ট্রেনের দিকে ছুটে যাবে, তখন ক্যামেরাকেও ছুটতে হবে তার সঙ্গে সঙ্গে। তার মানে ক্যামেরাকে চাপতে হবে হুড খোলা জিপের উপর, আর তার মানেই রেললাইনের কাছাকাছি পিচ বাঁধানো রাস্তা চাই।"
ছবির একটি দৃশ্যে পোখরান রেলওয়ে স্টেশন।।
যোধপুর থেকে একটা সকালের ট্রেন সত্তর মাইল দূরে পোকরান অবধি যেত। সত্যজিতের শুটিং ইউনিট সেই ট্রেনটাকেই ব্যবহার করবে বলে ঠিক হয়েছিল। পোকরান হল যোধপুর আর জয়সলমিরের মাঝামাঝি। ইউনিটের বাছাই করা জায়গাটা অবশ্য পোকরান ছাড়িয়ে আরও ২০ মাইল পশ্চিমে। ঠিক হয়েছিল যে রেলের কর্তাদের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেই ট্রেনটাকেই ইউনিট তাদের কাজের জায়গা অবধি এগিয়ে নিয়ে যাবে।
শুটিং স্পটে উটের দল এসেছিল সেখান থেকে আরও সাত মাইল পূবে 'খাচি' নামে একটা গ্রাম থেকে।
কাট সেভেন - জয়সলমীর, রাজস্থান
গল্পের বাকি ও অন্তিম দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল জয়সলমির-এ অবস্থিত জয়সলমির দুর্গে। জয়সলমীরে শুটিংয়ের সময় ইউনিট সঙ্গে করে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, নুন আর ডিম নিয়ে গিয়েছিল। তখন ওখানে খাওয়া-দাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। কেল্লাও ছিল পরিত্যক্ত। জয়সলমিরে 'সোনার কেল্লা'-র শুটিং ইউনিটের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জনের থাকার ও খাওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছিল জয়সলমির ফোর্ট থেকে আধ মাইল দূরে একটি ছোটখাটো প্রাসাদের মতো গেস্টহাউস - 'জহর নিবাস'-এ।
জহর নিবাস - হেরিটেজ প্যালেস হোটেল (Jawahar Niwas - A Heritage Palace Hotel), জয়সলমীর।
তখনকার রাজাদের গেস্টহাউস, এখন হোটেলে পরিণত হয়েছে। হোটেলের আকার-আকৃতি একই আছে। তবে সময়ের সাথে তার চাকচিক্য বেড়েছে। এখন এটিকে বিলাসবহুল হোটেলই বলা যায়।
কাট এইট - উট ও ট্রেনের বাকি দৃশ্যের শুটিং
প্রথম দিন উটের দৃশ্যের শুটিং পুরোপুরি শেষ করা যায়নি বলে, দ্বিতীয় দিন ভোরে প্রথমেই কেল্লার ভিতরে ঘণ্টা তিনেক ধরে ছবির শেষ দৃশ্যের কিছু শট্ নেওয়া হয়। তারপর তাড়াতাড়ি দুপুরের খাওয়া সেরে পুরো ইউনিট আড়াইটার মধ্যে ট্রেন ও উটের শুটিং-এর জায়গায় গিয়ে হাজির হয়। সত্যজিতের লেখা থেকে জানা যায় - "ঠিক হল পোকরান স্টেশনে এসে ট্রেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আমরা জয়সলমির থেকে একশো মাইল রাস্তা মোটরে গিয়ে ট্রেনে চাপব। ট্রেন রওনা হবে আমাদের উটের দৃশ্যের জন্য বাছাই করা জায়গার দিকে। ফেলু তোপসে জটায়ু অপেক্ষা করবে সেখানে। যাবার পথে আমরা ট্রেনের কামরায় শুটিং করব মুকুল আর বর্মনকে নিয়ে। বর্মন মুকুলকে নিয়ে জয়সলমির যাবার পথে ঝিমিয়ে পড়েছে, আর মুকুল তন্ময় হয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে।"
কাট নাইন - জয়সলমীর রেল স্টেশনের রিটায়ারিং রুম
জয়সলমীর রেল স্টেশনের রিটায়ারিং রুম এখন আর তখন।
কাট টেন - জয়সলমীরের কেল্লা এখন...
জয়সলমীর দূর্গ ('সোনার কেল্লা')-র বর্হিদৃশ্য।
দূর্গের ভিতরের দৃশ্য।
জয়সলমীর এখন বেশ জমজমাট। ওখানে এখন সবকিছু পাওয়া যায়। 'সোনার কেল্লা'র জনপ্রিয়তায় এখন এত পর্যটক যে, সত্যজিৎ রায়কে ওখানে প্রায় ভগবানের আসন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য দারুণ চলছে। কেল্লার মধ্যে বা বাইরে অনেক দোকানের ভিতর দেখা গেল সত্যজিৎ রায়ের ছবি টাঙানো আছে। দেখতে দেখতে ভাবছিলাম একজন ভদ্রলোক তাঁরই একটা গল্পে জয়সলমীরকে স্থান দিয়ে এবং 'সোনার কেল্লা' নাম দিয়ে কী না সৃষ্টি করে গিয়েছেন। যে সিনেমা শুধু কালজয়ী নয়, বদলে দিয়েছে একটা অঞ্চলের অর্থনীতি! মানুষের জীবনযাত্রাকে উন্নততর করে তুলেছে। মুকুল নামটি ওখানে 'হিরো ওয়ারশিপ' পায়। সবাই মুকুলের নাম জানে। কেল্লার মধ্যে গাইড আমাদেরকে 'সোনার কেল্লা'র গল্প বলা শুরু করল। তার কথায় একটু-আধটু ভুল ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তার চোখে আমরা দেখছিলাম বাঙালি সত্যজিতের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।
'সোনার কেল্লা' বইয়ের প্রচ্ছদ (বামদিকে)। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত কেল্লার একটি অংশে অবস্থিত সেই বাড়ি (ডানদিকে)।
মুকুলের সেই বাড়ি।
'সোনার পাথরবাটি'! হলুদ বেলেপাথরে তৈরি নানা আকৃতির বাটি।
দুর্গের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম কোথায়-কোথায় শুট হয়েছিল। গুলিয়ে যাচ্ছিল। ভিতরে এখন প্রচুর দোকানপাট, লোকবসতিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। চারদিক একেবারে গমগম করছে। কেল্লার মধ্যে পাকানো রাস্তায় এখন বাইক এবং অটোর ভিড়। অবশেষে কেল্লার মধ্যে খুঁজে পেলাম মুকুলের সেই চেনা বাড়ি। এখনও আগের মতোই রয়েছে। শুটিংয়ের সময়ে জয়সলমীর দুর্গ ছিল একটা প্রায় জনবসতিবিহীন ফাঁকা কেল্লা। সেইখানে মুকুল দৌড়োদৌড়ি করছে তার বাড়ির খোঁজে আর গুপ্তধনের খোঁজ করছে নকল ডক্টর হাজরা। মুকুলকে বাঁচাতে হাজির হয়েছে ফেলুদা, তোপসে, জটায়ু। দূর থেকে সোনার কেল্লা এখনও একই আছে। কিন্তু কেল্লার ভেতরে এবং আশেপাশে এত লোকবসতি, খাটাল, এত দোকানপাট, পর্যটক... মনে আশঙ্কা জাগে আগামীদিনে কেল্লা এর ভার সইতে পারবে তো? প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কেল্লার মধ্যে ও বাইরে এইভাবে যত্রতত্র বাড়িঘর ও দোকানপাট গজিয়ে উঠলে অদূর ভবিষ্যতে কেল্লার পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হবে।
অবশেষে মুকুল (কুশল চক্রবর্তী) তার বাড়ি যাবার রাস্তা নকল ডক্টর হাজরা (অজয় ব্যানার্জি)-কে দেখিয়ে দিচ্ছে।
আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে জয়সলমীর দুর্গ ওরফে সোনার কেল্লাকে তাই আমাদের রক্ষা করতেই হবে।
প্যাকআপ
জয়সলমীরে তিনদিন কাটানোর পর পুরো শুটিং ইউনিট তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতায় ফিরে আসে। কলকাতায় এসে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর ইনডোরে ছবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের শুটিং সম্পূর্ণ করা হয়।
* * * *
এই হল 'সোনার কেল্লা'র শুটিং লোকেশনগুলোর কাহিনী। পুরোনো আলোচনায় একধরনের গন্ধ থাকে। নতুন সুগন্ধির চেয়েও তারা অনেক দামি। এই লেখায় আমরা সেই অনুভূতিগুলোই ধরতে চেয়েছি। এই লেখা লিখতে গিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত আমাদের 'ডটপেন ডট ইন'-এর প্রতিবেদকদের বিস্তর কাগজপত্র, পত্রপত্রিকা খুঁজে গবেষণা করা, শুটিংয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত বহু মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া ও আলোকচিত্র তোলার জন্য এই সময়ে শুটিং স্পটগুলিতে যেতে হয়েছে।
ভবিষ্যতে আমাদের ইচ্ছা আছে সত্যজিৎ রায়ের আরও নানা ছবির শুটিং লোকেশন এখন কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে একটি গবেষণামূলক কাজ করার। আপনারা এই বিষয়ে আপনাদের মতামত জানান। আপনাদের সহযোগিতা লাভ করলে আমরা আরও এই ধরণের কাজ করতে উৎসাহিত হবো। যাঁরা এ কাজে তথ্য ও নথি দিয়ে আমাদের পাশে থাকতে চান তাঁদেরকেও স্বাগত।
(সমাপ্ত)
চিত্রঋণঃ
● জয়সলমীর দুর্গ-র ভিতরের আলোকচিত্রঃ শ্রীমতী শ্বেতা সরকার ঘোষ ও তাঁর পরিবারের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
● ছবি কম্পোজঃ 'ডটপেন ডট ইন'।
● কিছু ছবি অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
● 'সোনার কেল্লা' ছবির কিছু স্থিরচিত্র ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে।
লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/