বিবিধ

সুজন - সুন্দরবন (চতুর্থ পর্ব)



ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল


[দীর্ঘ ২৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল উত্তর চব্বিশ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ-এ রায়পাড়া সাহেবখালি অঞ্চলে 'সুজন' নামে একটি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র চালাচ্ছেন। বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে 'সুজন' আজ একটি সেবা প্রতিষ্ঠান (Charitable Trust)-এ পরিণত হয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থ, আর্ত ও অসহায় মানুষদের হয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা সামাজিক প্রতিকূলতাকে নিজের অদম্য জেদ, সততা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে একজন চিকিৎসকের জয়ী হওয়ার কাহিনীই নিজের কলমে লিখেছেন ডাঃ অরুণোদয় মণ্ডল। মানুষের পাশে থাকার, অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সেবাপ্রদান করার তাঁর নিরলস মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালে ভারত সরকার তাঁকে 'পদ্মশ্রী' সম্মানে ভূষিত করেন। বকলমে এই জয় সাধারণ মানুষেরই জয়। এই লেখায় মূলত 'সুজন' গড়ে ওঠার প্রাক-কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে আজকের কিছু কথাও এসেছে। লেখাটি ধারাবাহিক আকারে প্রকাশ করতে পেরে 'ডটপেন ডট ইন' ই-পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলী ডাক্তারবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ।]

না, এভাবে চলতে পারে না। তবে কি আমার স্বপ্নের প্রকল্পের অপমৃত্যু ঘটবে? আমার নিজের সংগঠন 'Elevation Cultural Forum' শেষে কিনা আমারই সংগৃহীত প্রায় ২.৫ লক্ষ টাকা দিতে অস্বীকার করল! ঘটনাটা এরকম, প্রথম পর্যায়ে 'সুজন'-এর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না। ফলে নানা জায়গা থেকে যে সমস্ত অনুদান বা ডোনেশন পেতাম সবটাই 'Elevation Cultural Forum'-এর অ্যাকাউন্টে জমা রাখতাম। ওরাও আমাকে লিখিত আশ্বাস দিয়েছিল যে, যেদিন 'সুজন'-এর নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন হবে ও নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হবে সেদিন 'সুজন'-এর অনুদানের সমস্ত টাকা-পয়সা 'সুজন'-এর অ্যাকাউন্টে ওরা স্থানান্তর (transfer) করে দেবে। কিন্তু 'সুজন' (Sujan)-এর রেজিস্ট্রেশন-এর পর যখন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হল তখন 'Eleviation Cultural Forum'-এর তৎকালীন কর্মকর্তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে টাকা স্থানান্তর করতে অস্বীকার করল। আমার এক বন্ধু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উর্দ্ধতন আধিকারিক - সে সময়ে বারুইপুর Subdivion-এর SDO ছিলেন। এই আকস্মিক বজ্রাঘাতে অসহায় পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে তাকেই সঙ্গে নিয়ে 'Registration of Societies'-এর অফিসে দেখা করে পুরো সমস্যাটা তাঁদের বুঝিয়ে বললাম। তাঁরা আমাকে একটি লিখিত অভিযোগ (Written Complain) দায়ের করতে বলেন। ওদিকে যাঁরা অসহায় রোগীদের প্রতি আমার নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা দেখে আমাকে অনুদান দিয়েছিলেন তাঁরা এই অপ্রীতিকর ঘটনা জানতে পেরে সম্মিলিতভাবে 'Elevation Cultural Forum'-এর সম্পাদকের (Secretary) কাছে অনুরোধ করেন যাতে তাঁদের অনুদান-এর পুরো টাকাটা 'সুজন'-এর অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দেওয়া অনুদান অন্য কোনো খাতে খরচ করা সম্পূর্ণরূপে বেআইনি, তাছাড়া তাঁরা তো বকলমে 'সুজন'কেই অনুদান দিয়েছেন, তার রসিদও আছে। এমন এক পরিস্থিতিতে 'Registrar of Societies'-এর আধিকারিক মিঃ ঘোষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে খুবই ক্রুদ্ধ হয়ে 'Elevation Cultural Forum'-এর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। এ সময় আমিই তাঁকে এত বড় কড়া পদক্ষেপ না নিতে অনুরোধ করি। কারণ দীর্ঘ ১৮ বছর আমি এই সংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলাম। তাই এত বড় পদক্ষেপ আমার পক্ষেও অসহনীয় হতো।

অন্যদিকে আয়লার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া অসহায় রোগীদের জন্য ইতিমধ্যেই আমি কলকাতা থেকে ১,৮৬,০০০ টাকার ঔষধ ধারে নিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলে গেছি। একলপ্তে এত টাকার ঔষধ কেনার অন্যতম কারণ ছিল আয়লার কারণে বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিশেষ কিছু ঔষধের অপ্রতুলতা। যাদের থেকে ঔষধ কিনেছিলাম একসময় তারাও টাকার জন্য তাগাদা দিতে শুরু করল। এক্ষেত্রে আমার একমাত্র ভরসা ছিল E.P.F. কিন্তু E.P.F.-ও তাদের অক্ষমতা জানিয়ে সরে দাঁড়াল। তখন উপায়? সেই আকস্মিক তৈরি হওয়া পরিস্থিতির অভিঘাতে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়লাম। সেই সময় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে আমার এক বন্ধু সুশীল মালপাণি আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। এদিকে আমার পুত্র অর্ণব ও তার মা দুজনে ৫০,০০০ করে ১,০০,০০০ টাকা দিল। তাতেই আমি ১,৮৬,০০০ টাকার দেনা শোধ করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। আমার কাজের নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা ও দৃঢ়তা দেখে অনেকেই সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন - মাননীয় জয় রায়চৌধুরী, বাঙুরের রথীন চৌধুরী, সমরেন্দ্র বসাক, ডাঃ এস. এম. রায়, বিরাটীর গোবিন্দ কর্মকার, শম্ভু সরকার ও আরও অনেক সহৃদয় ব্যক্তি। তাঁরা অকৃপণভাবে আমাকে আর্থিক সাহায্য করতে ও মানসিকভাবে পাশে দাঁড়াতে শুরু করলেন। আর আমিও ভরসা পেয়ে বলিষ্ঠভাবে 'সুজন'কে এগিয়ে নিয়ে চললাম। আমার একাজে আমাকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার জন্য বিরাটীর রাতুল রায় ও শম্ভু চক্রবর্তীর অবদান অনস্বীকার্য। পরবর্তী সময়ে মাননীয় অশোক ভট্টাচার্য (যিনি একসময় বহুজাতিক কর্পোরেট ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলিতে বরিষ্ঠ ফার্মাসিস্ট হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন) ও ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (Bank of India)-র প্রাক্তন আধিকারিক অশোক সাহা যুক্ত হলেন। যদিও 'সুজন'-এর প্রতিটি সেন্টারে বেতনভুক কর্মচারী থাকে, নইলে নিয়মিতভাবে কাজ করা আমার একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ত।

ইত্যবসরে সুন্দরবনের চারটি কেন্দ্র (সাহেবখালি, কুমীরমারি, বারুইপুর ও পাথরপ্রতিমা) ছাড়াও মন্দারমণি, পাউসি ও বোলপুরে 'সুজন'-এর স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই ২০২০ সালে করোনা অতিমারীর কারণে এবং তার পরবর্তী সময় থেকে মেদিনীপুরের মন্দারমণি ও পাউসি এবং বোলপুরের সেন্টারগুলির কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে অর্থাভাব, অন্যদিকে বয়সজনিত কারণে এবং কাজ করার যোগ্য সহযোগী বা স্বেচ্ছাসেবকের অভাবে ঐ তিনটি কেন্দ্রের কাজ ব্যক্তিগত অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।

(ক্রমশ)

আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।

'সুজন'-এর ওয়েবসাইট লিঙ্কঃ www.sujan-sundarban.org

লেখাটি পড়ে কেমন লাগলো? আপনার মতামত জানান এই লিঙ্কে ক্লিক করে -
https://dotpen.in/feedback/