বিবিধ

ঘুমের ভিতর ধ্বংসলীলা ও স্বপ্নিল অমৃতমন্থন



অভিজিৎ রায়


আমি হাসছি। আমরা হাসছি। অথচ আমাদের ভিতরে শুধু কান্নার জলপ্রপাত। শব্দহীন অথচ গভীর শোকের ধারা বহন করে চলেছি আমরা। আমাদের শোক এবং তার প্রতি উদাসীনতায় আমরা যেমন হাসছি তেমনই আমরা স্থবির অথচ হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হবার আগেই যেনতেন প্রকারেণ নিরাপদ আস্তানার খোঁজে গুঁজে দিচ্ছি নিজেদের।

নিজেদের বোকা বানানোর এই খেলা আমরা কবে শিখলাম? কীভাবে শিখলাম? এই নিয়ে কোনও তদন্ত কমিশন কোনওদিন বসবে না। এই বিবর্তনবাদের ইতিহাস নিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে লেখা হবে বই! কিন্তু সে বই পড়ার মতো উত্তরপুরুষের জন্ম এখনও আমরা দিতে পারিনি। পারিনি তাদের জন্য যথাযথ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রণয়ন করতে। অথচ আমরা নাকি নিজেরা শিক্ষিত ও সভ্য হয়েছি! সত্যিই কি তাই? তবে যাইই চাই, তাতে কেন আমরা ক্ষতি করে ফেলি আমাদের। আমাদের বিনাশের বীজ রোপণ করে আমরা কি শুধুমাত্র উপভোগের জীবনের সন্ধানে ফেরি করে বেড়াচ্ছি না আমাদের এই জীবন?

প্রকৃতি, নদী বা অরণ্যের কাছে আমরা কি কোনওদিন কৈফিয়ত দিতে পারব কেন আমরা শিকার হয়ে গেলাম শিকার করতে বেরিয়ে? কেন আমরা আজও বিনামূল্যে প্রাপ্ত সুখ, সৌন্দর্য বা প্রকৃতিকে ভোগ করতে শিখলাম না? কেন আমরা শিক্ষার মূল্যায়ন ডিগ্রি দিয়ে বুঝে নিতে শিখলাম? কেন আমাদের শ্বাস এত দামী হয়ে উঠল আমাদেরই অজান্তে অথবা ভোগবিলাসী হবার সুবাদে?

এতগুলো কেন ছুঁড়ে দেবার আগে বুঝে নিতে হবে আমরা শিক্ষিত হয়েছি কম আর কয়েকজন বুদ্ধিমান, অসৎ, ক্ষমতাবান মানুষের শিকার হয়েছি বেশি। দিন যত যাচ্ছে তত ক্ষমতাবানের হাত ততই রাজনৈতিক ক্ষমতার ঘাড়ে হাত দিয়ে আমাদের নিয়ে যা খুশি তাই করছে। আমাদের রুচি, সংস্কৃতি, পছন্দ বা অপছন্দের মতো ব্যক্তিগত জিনিসই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাঁদেরই দ্বারা। অশিক্ষিত সমাজকে এই সত্য বোঝানো মুস্কিল। কিন্তু সত্য তো সত্যিই! বোঝা বা না বোঝার চাপে পড়ে সত্যি তো আর মিথ্যে হয়ে যাবে না! মানুষ বুঝবে একদিন সব। যখন তার হাতে, পায়ে শিকল এবং চারপাশে শক্ত এক প্রযুক্তির খাঁচা বানিয়ে তাকে ভুলিয়ে রাখা হবে ব্যক্তিগত বা সামাজিক অবনমনের সমস্ত চিহ্নসমূহ।

ছেলেকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করার তাগিদে যে অভিভাবক একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আগে স্কুলের কাছে জানতে চান যে তার সন্তানকে কদিন স্কুলে আসতে হবে তিনিই কিন্তু স্কুল ব্যবস্থাকে তুলে দেবার কাজে প্রথম স্বাক্ষর করেছিলেন। সরকার উচ্চশিক্ষার টোপ দিয়ে যে সমস্ত উচ্চবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্তের সন্তানকে পড়ানোর সুযোগ দেবার নামে পুঁজিবাদীদের হাত শক্ত করলেন শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের লাইসেন্স দিয়ে, সেই সরকার আজ সমস্ত শিক্ষিত বেকারকে কাজের সুযোগ করে দিতে ব্যর্থ। তারই মধ্যে দুর্নীতির থাবা বসল বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যবস্থায়। কিন্তু সেই দুর্নীতির পাঠের শুরুও স্কুল অথবা কলেজ থেকে। কোথাও মিড ডে মিলের টাকা মেরে স্কুলের উন্নতি করে বাহবা অথবা সম্মান কুড়োনোর লোভ আবার কোথাও কলেজে চলে ন্যাকের গ্রেড ও টাকার লোভে কাগজে কলমে জালিয়াতি।

অথচ ছাত্রসমাজের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি প্রচণ্ড অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানিং। উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের বেকার বসে থাকতে দেখে কিশোর কিশোরীরা 'পড়ে কী হবে?' এই জাতীয় প্রশ্ন তুলে এড়িয়ে যাচ্ছে ক্লাস। স্কুলে গেলেও পাশ না গেলেও, উচ্চমাধ্যমিকে প্রাকটিক্যাল ক্লাস না করলেও ফুল মার্কস আবার করলেও, কলেজে ক্লাস করলেও নম্বর না করলেও এবং এই তথ্য ছাত্রছাত্রীদের কাছে জানা। ছাত্রছাত্রীরা জানে যে তাদের শিক্ষকেরা, লোভ, ক্ষমতা অথবা মেরুদন্ডহীনতার কারণে তাদের পূর্ণ নম্বর দিয়ে পাশ করাতে বাধ্য থাকবেন। আর, এই বিচ্যুতি গত এগারো বছরের তৃণমূল শাসনে চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠেছে। মানব সম্পদ উন্নয়নে কিছুই হচ্ছে না সরকারি তরফে। একটা শ্রেণি প্রস্তুত করা হচ্ছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের সস্তায় শ্রমের যোগানের উদ্দেশ্যে।

অনলাইনে পড়াশোনা ব্যবস্থা যদি করোনাকালে বাধ্য হয়ে করতেই হয় তাহলে পরবর্তীকালে সেই ব্যবস্থা বন্ধের কোনও নির্দেশ সরকারি তরফে এলো না কেন? কেন করোনা পরবর্তী সময় উচ্চশিক্ষা মন্ত্রক থেকে প্রতিটি কলেজে অফলাইন ক্লাস নেবার পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসও বাধ্যতামূলক করা হয়? কেন ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক অবস্থা এবং জায়গা বিশেষে নেটওয়ার্কের করুণ অবস্থার কথা চিন্তা করা হল না? কারণ লুকিয়ে অন্য জায়গায়। আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সেই ক্ষমতাশালী প্রভুদের দ্বারা যাদের সেবার উদ্দেশ্যে স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি তৈরি হয়েছিল। আর আমরাও 'ব্রেন ড্রেন'-এর বিস্তারিত খবরে গর্বিত হই যখন দেখি পাশের বাড়ির ছেলেটা অথবা মেয়েটা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রাইভেট কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বিদেশে কোটি টাকার চাকরি পাচ্ছে। আমরা গর্বিত হই এবং পরবর্তী প্রজন্মকে উৎসাহিত করি।

সরকার বহুদিন থেকেই শিক্ষাখাতে টাকা কমিয়ে বাজেট বহির্ভূত খাতে টাকা ব্যয় করে চলেছে। এই বাজেট বহির্ভূত ব্যয়ের মধ্যে পড়ে কর্পোরেট ঋণ মুকুবের জন্য সরকারি ব্যয়। পরের ধনে পোদ্দারি প্রবাদটা এই ক্ষেত্রে খুব ভাল খাটে। এবং এইসব কর্পোরেট প্রভুদের তৈরি করা কলেজেই আমি বা আপনি ছেলে বা মেয়েকে পয়সা দিয়ে পড়তে পাঠাই। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির সময় যেমন অভিভাবক দেখেছিলেন কোন স্কুল অনুপস্থিত থাকার সুযোগ দেবে তেমনই এইসব কলেজের ক্ষেত্রেও নির্বাচনের মানদণ্ড হয় কোন কলেজ কর্পোরেট সেক্টরে কাজের সুযোগ করে দেবে।

শিক্ষা যে শেখার আগ্রহ তৈরি করা এবং মানুষের বোধ ও চিন্তাভাবনা গড়ে তুলবার হাতিয়ার তা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের একমাত্র পথ - এই ধারণা ছেলেমেয়েদের মাথায় গেঁথে দিয়ে আমরাই মানবসম্পদ ধ্বংসের খেলায় মেতেছি। একদিকে প্রকৃতি আর অন্যদিকে মানবসম্পদ এই দুইয়ের ধ্বংসলীলার পর কোন অমৃত মন্থনের প্রতীক্ষায় এই লেখা তা আমি এখনও জানি না বা বুঝে উঠতে পারিনি বলে ক্ষমাপ্রার্থী।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।