আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইন্দো-চীন যুদ্ধে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাদের সম্মানে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে, স্মৃতিস্তম্ভটি একটি 'চর্তেন' (Chorten) (চর্তেন হল একটি ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ যেখানে শ্রদ্ধেয় লামাদের ছাই রাখা হয়) আকারে ডিজাইন করা হয়েছে। তবে এটির ঘেরের চারপাশে মেশিনগানের সাহায্যে একটি বিন্যাস (array) তৈরি করা হয়েছে, আর প্রথাগত বৌদ্ধ পতাকার পরিবর্তে বিভিন্ন সেনা রেজিমেন্টের পতাকা রয়েছে। একটি কালো গ্রানাইট পাথরের উপর কারুকার্যমন্ডিত ফ্রেমের মধ্যে সমস্ত 'শহিদ'-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা আছে যা স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করার সময় যে কোনো মানুষের হৃদয়ে এক গভীর কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভব করাবে।
ওয়ার মেমোরিয়াল-এর সামনে।
ওয়ার মেমোরিয়াল, তাওয়াং।
আমাদের মধ্যাহ্নভোজ ছিল প্রধান রাস্তার পাশে একটি আবছা আলোকিত হোটেলে। চীনা পদ্ধতিতে তৈরি চিকেন, মোমো এবং স্থানীয় লাল চালের সাথে রান্না করা পনির আমরা তৃপ্তি সহকারে খেলাম। অরুণাচলে 'তাওয়াং উৎসব' (Tawang Festival) হল সম্প্রতি প্রবর্তিত একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান - যেখানে হস্তশিল্পের স্টল, ফুড কোর্ট এবং স্টেজ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হয় - যা পাহাড়ের সমতল অংশে স্থাপন করা একটি অস্থায়ী কাঠামোর উপর অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবে নানা ধরণের বর্ণাঢ্য পারফরম্যান্স চলছিল - জনপ্রিয় হিন্দি ছায়াছবির গানের তালে স্কুলছাত্রীদের নাচ, স্থানীয় লোকসঙ্গীতের সাথে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং ঢোল ও করতাল সহযোগে আবৃত্তি ইত্যাদি। শুধুমাত্র এই উৎসবের সময় স্থানীয়রা সমস্ত বিধিনিষেধ পরিত্যাগ করে হৃদয়ে বন্য হয়ে মদ্যপান সহযোগে হুল্লোড় করে এবং জওয়ানরা সামরিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বহন করেই আবেগপ্রবণ জনতার মধ্যে মিশে গিয়ে তাদের সাথেই উল্লাসে মাতে।
উৎসবে 'ইয়াক নৃত্য' পরিবেশিত হচ্ছে।
তাওয়াং-এ আমাদের শেষ দিনটা কাটলো অনেকগুলো হ্রদ ঘুরে দেখার মধ্যে দিয়ে যেগুলো উপরের দিকে রয়েছে। তাওয়াংয়ের উত্তরের পুরো এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কারণ রাস্তাটি বুম লা সীমান্ত এলাকার দিকে গেছে। সেই অঞ্চলে পাহাড়ের ধারে প্রচুর ছদ্মবেশী বাঙ্কার রয়েছে যেখানে সামরিক কূটকৌশল স্বমহিমায় বিদ্যমান।
Panga Teng Tso (PTSo) লেক।
পাঙ্গা তেং সো (Panga Teng Tso - PTSo) লেক অতিক্রম করার পর, আমরা ১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় একটি সামরিক ফাঁড়িতে পৌঁছলাম যেখানে আমাদের কফি (প্রতি কাপ ৩ টাকা) এবং স্টিম মোমো (প্লেট প্রতি ২৫ টাকা) পরিবেশন করা হল। এগুলো আপনি বিশ্বের কোথাও কি এত সস্তায় পাবেন? আরও একটা ব্যাপার, এখানে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে সেনাবাহিনী পাহাড়ের নানা রুটে বিশেষ করে নারী পর্যটকদের চাহিদার কথা খেয়াল করে বিভিন্ন সুবিধাসহ এমন ক্যান্টিন স্থাপন করেছে। এমন একটা সাধু উদ্যোগের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানালাম।
মঠের জানালা থেকে দেখা দৃশ্য।
প্রবেশদ্বারের সিলিং।
গেটে পদকসজ্জা।
মোনাস্ট্রি থেকে দেখা তাওয়াং শহর।
তাওয়াংয়ের উত্তরে তুষারাচ্ছাদিত চূড়া।
চীনা সীমান্তের কাছের দৃশ্য।
প্রার্থনা পতাকায় রঙের বৈচিত্র্য।
সঙ্গীতসার লেকে ফেস্টুন।
অপরূপ সঙ্গীতসার লেক।
আমরা সীমানা থেকে ১৩ কিলোমিটার গিয়ে একটা ছোট বাঁক নিয়ে সঙ্গীতসার লেক (Sangetsar Lake)-এ পৌঁছলাম। ১৯৫০ সালে একটি ভূমিকম্পের ফলে গঠিত এই হ্রদটির মাঝখানে খালি গাছ রয়েছে, অনেকটা কেরালার পেরিয়ার (Periyar)-এর মতো। হ্রদের চারপাশে আমরা হাঁটলাম। সময় লাগল প্রায় ৪৫ মিনিট। তবে হ্রদের নীল জলে সূর্যের আলো পড়ে বিভিন্ন জায়গায় আলো-ছায়া সৃষ্টি করেছে। তার সৌন্দর্য ছিল অপরূপ। যাইহোক, শাহরুখ খান ও মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত 'কয়লা' (Koyla, ১৯৯৭) ছবির শুটিংয়ের পরে, স্থানীয়রা এই লেকের নামকরণ করেছে 'মাধুরী লেক'। রাস্তা খারাপ হওয়ায় আমাদের তাওয়াং-এ ফিরতে দেরি হয়েছিল কিন্তু দুপুরের খাবারে শুয়োরের মাংস এবং মাশরুম সমন্বিত স্থানীয় এক পদ থাকায় খাবার দেরীতে হলেও আমাদের ফিরতি যাত্রার জন্য তা যথেষ্ট সন্তোষজনক ছিল।
প্রাক-ভূমিকম্পের সময়ে হ্রদে গাছের কাণ্ড।
অরুণাচলের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হল ভাষা। স্থানীয় জনগণের তাদের ধর্ম এবং অঞ্চলের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন উপভাষা রয়েছে এবং সেগুলি একটার থেকে আরেকটা এতটাই ভিন্ন যে স্থানীয়রা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য প্রধানত হিন্দি ভাষাই ব্যবহার করে।
পরের দিন আমরা বমডিলা (Bomdila)-তে ফিরে আসি, ফেরার পথে একটু অন্যদিকে অবস্থিত নুরানাগ জলপ্রপাত (Nuranag Falls), যা জাং (Jang) জলপ্রপাত নামেও পরিচিত, দেখে আসি। এই মনোরম জলপ্রপাতটির বৈশিষ্ট্য হল এটি বেশ কয়েকশো ফুট নীচে মাটিতে আঘাত করার আগে মধ্য বাতাসে একটি কুয়াশা তৈরি করেছে, তারপরে নীচে আছড়ে পড়ে ফেনাযুক্ত সাদা স্রোতে পরিণত হয়েছে। অসাধারণ সে দৃশ্য। এখানে একটি মিনি হাইড্রো-ইলেকট্রিক স্টেশনও চালু আছে।
জং জলপ্রপাত-এর রাজকীয় দৃশ্য।
মাঝ-বাতাসে জলকণা দ্বারা সৃষ্ট কুয়াশা।
বমডিলার সেপাল ইয়াং জাম হোটেল (Tsepal Yang Jam Hotel)-এ একটি খুব আরামদায়ক রাত কাটানোর পর, আমরা অরুণাচলকে বিদায় জানালাম কিন্তু শেষ সন্ধ্যায় কাজিরাঙ্গা (Kaziranga) পৌঁছানোর জন্য একই অপরিষ্কার ও এবড়ো খেবরো রাস্তা আমাদের পেরিয়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ওখানে গিয়ে আমরা সম্পূর্ণ হতাশ হলাম যখন আমাদের বলা হল যে পার্কটি ১লা নভেম্বর খুলবে আর ওদিকে আমরা ৩১শে অক্টোবর তারিখে ফিরে যাব। সেই মুহূর্তে আমাদের অবস্থাটা একবার কল্পনা করুন। সৌভাগ্যবশত আমরা সেদিন ওখানে একটি সম্পূর্ণ 'প্রাকৃতিক' পরিবেশ অবলম্বন করে নির্মিত 'ওয়াইল্ড গ্রাস' (Wild Grass) নামের এক রিসর্টে সেটির মালিকের সহৃদয়তায় আতিথ্যলাভ করেছিলাম। কেন জানি না তিনি আমাদের ওপর সদয় হয়ে পার্কের কয়েক মিটার ভিতরে অবস্থিত একটি টাওয়ার থেকে জঙ্গল দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বন্য মহিষ এবং অনেক হরিণ দেখার পরে, হঠাৎ আমরা কাছাকাছি একটি হরিণের পাল থেকে অ্যালার্ম কল শুনতে পেলাম। আমাদের গাইড তার দূরবীনকে একটি খোলা মাঠে ফোকাস করলেন এবং শীঘ্রই আমরা সেখানে ৪টে বাঘ দেখতে পেলাম, যার মধ্যে ৩টে প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১টা শাবক - তারা শান্তভাবে একটি খোলা রাস্তা দিয়ে বনের মধ্যে হাঁটছে। আমরা মাত্র ৪-৫ মিনিটের জন্যই তাদের ভালোভাবে দেখতে পেলাম কিন্তু বিকেল ৫টার বিবর্ণ আলোয় ভালো করে ফটো তোলার সুযোগ পেলাম না।
মাছের মুখের আকৃতির শিলা।
দেখুন তো 'গুরুদ্বার'টি খুঁজে পান কিনা।
"...I chatter over stony ways, in little sharps and trebles,
I bubble into eddying bays, I babble on the pebbles..."
নীল বুনোফুলের অনন্য শোভা।
সেনা ক্যান্টিনে টায়ারে জন্মানো ক্যাকটাস।
আমরা রিসর্টে ফিরে এলাম। রিসর্টটার একটু বর্ণনা দিয়ে দিই। এখানে অসমীয়া শৈলীতে নির্মিত তিনটি বিল্ডিং রয়েছে, যেগুলি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে প্রচুর গাছ এবং লতাপাতা দিয়ে ঘেরা। গাছগুলি আবার চেনার সুবিধার জন্য যথাযথভাবে চিহ্নিত করা রয়েছে। সাধারণ কাঠের মেঝে সহ রিসর্টের ঘরগুলি বিশালাকার ছিল এবং গম্বুজাকৃতির সিলিং সহ ডাইনিং রুম, ভিক্টোরিয়ান আসবাবপত্র এবং কন্টিনেন্টাল ডিনার আমাদের পুরোনো আমলের রাজা-মহারাজাদের সময়কার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। আজকের দিনে জঙ্গলের ভিতর অতি-আধুনিক কাঠামোর সব হোটেল ও রিসর্টের মধ্যে, এই রিসর্টটি সত্যিই একটি ব্যতিক্রম এবং আমি আশা করব এটি সেভাবেই বজায় থাকবে।
কাজিরাঙ্গায় সূর্যোদয়ের আগে দেখা চাঁদ।
'ওয়াইল্ড গ্রাস' লজ।
'ওয়াইল্ড গ্রাস' লজের ডাইনিং রুম।
ভারতীয় বাইসন (Indian Gaur)-এর শিং সমেত মাথার খুলি।
পরের দিন, আমরা প্রথাগতভাবে হাতির পিঠে খানিক জঙ্গল ভ্রমণ করে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম এবং সন্ধ্যা নাগাদ আমরা অরুণাচলের এক সপ্তাহের কঠিন কিন্তু আনন্দদায়ক সফরের পর কলকাতায় ফিরে এলাম।
কোথাও রাস্তার অবস্থা কি এর থেকেও খারাপ হতে পারে?
এই লেখা শেষ করার আগে, আমি অরুণাচলের অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় থাকা রাস্তার কথা তুলে ধরতে চাই, যা সাধারণ পর্যটকদের জন্য চরম প্রতিবন্ধক হতে পারে। এখানে গণপরিবহন নেই, তাই সমস্ত ট্যুর ব্যক্তিগত ট্যাক্সির মাধ্যমে প্ল্যান করা হয়। রাস্তার অবস্থা করুণ হওয়ার দরুন সমস্ত ভারি গাড়ি (এসইউভি)-গুলি থেকে সরকার কর্তৃক মোটা অঙ্কের টোল আদায় করা হয় এবং সরকার তাদের ভর্তুকিযুক্ত ডিজেল গছাতেও বাধ্য করে। আমরা চালকদের সাথে কথা বলে বুঝলাম যে গত বারো বছর ধরে এই রাজ্যে রাস্তাগুলি অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে, যদিও প্রধান রাস্তাটিকে একটি দুই-লেনের হাইওয়ে করার প্রচেষ্টা সরকারি তরফে চলছে। আমি নিশ্চিত, কাজের অগ্রগতি খুবই ধীর গতিতে হচ্ছে এবং এই হারে কাজ চললে তা শেষ হতে আরও এক দশক সময় লেগে যেতে পারে। স্থানীয়রা নিজেদের মধ্যে কৌতুক করে যে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে 'মামাদের' দূরে রাখার জন্য করা হয়েছে। তবে পক্ষান্তরে এতে আমজনতাই আর্থিক ক্ষতি সম্মুখীন হয়। রাস্তার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে আমার কোনো অসুবিধা হল না যখন দেখলাম রাজ্যের রাজনীতিবিদ এবং যুব আইকনরা (যাদের মধ্যে একজন উৎসবে গিয়েছিলেন) তাওয়াং পৌঁছনোর জন্য হেলিকপ্টার-এর পথ বেছে নিয়েছেন।
বিদায় অরুণাচল...
[১৯৬২ সালের পর আজকের দিনে অরুণাচল প্রদেশ কালের নিয়মে স্বাভাবিকভাবেই অনেক বদলে গেছে। ওখানকার প্রকৃতি ও পরিবেশেরও আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু এই লেখার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই যে, লেখার মধ্যে বিশেষ করে সেই সময়কার আঞ্চলিক, প্রাকৃতিক, সংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক যে বর্ণনা আমরা পাই তা আজকের সময়ের সাথে তুলনা করলেই অরুণাচল প্রদেশ এই মুহূর্তে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তার একটা সুস্পষ্ট চিত্র পাবো।]