(১)
নকল নদী আর পাহাড়ের গায়ে ঘর বেঁধে আমি শান্তি খুঁজছিলাম। এখানে গাছের পাতার রং ধূসর আর বাতাসের গায়ে নোনাজলের ছোপ ছোপ দাগ। নকল সুখের শরীরে কত কত কান্নার দাগ লেগে থাকে তা শুধু মার্ক জুকেরবার্গ জানে। স্বপ্নগুলো নুড়িপাথরের মতো স্থির হয়ে বসে থাকে খরস্রোতা নদীর বুকে। ভোরের ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে ঘুমন্ত স্ত্রী আর সন্তানের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ঈর্ষার অভিযোগ। এই রোগ থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে নকল পাহাড় আর নদীর পাশে আমার হাসপাতাল, নার্সিংহোম।
একটু দূরে ডোম আমার মৃতদেহ ময়নাতদন্তের পর সেলাই করছে। পচন ধরে যাওয়া নিজের দেহের ঘ্রাণ আমি বেশ স্পষ্ট পাচ্ছি নাকে। দূরে কেউ নকল গাছের বাকলে খোদাই করে লিখে রেখেছে আমার নাম। আমি নিজেকে চেনার চেষ্টা করছি। এইসব নকল পাহাড় আর নদীর মধ্যে কাটিয়ে ফেলা জন্ম আর মৃত্যুর ভাঁজে শুকনো গোলাপের মতো পড়ে আছি আমি। আসল না নকল সে নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো ভালবাসার মানুষ নেই এখানে। অন্ধকার সাজানো পথের দুপাশে। ঠিক যেমন আলোর কথা শুনেছিলাম।
দূরে বেহালার ছড়ে কেউ লিখছে বিরহ কাহিনি। আমি জানি সেও নকল প্রেমের বাঁধনে বাঁধা পড়ে আছে। নকল হাসি আর কান্নার বাজারদর নিয়ে মাথাঘামানোর কোনও প্রয়োজন নেই এ সময়। একটা স্বচ্ছ ভোরের জন্য হাজার রাত্রির যৌনতা বাজি ধরে বসে থাকা জরুরি। সেই ফাঁকে পাহাড়ি নদীতে হড়কা বান আসবে।আসবেই। আর, এইসব নকল পৃথিবীর আমি ভেসে যাব ফাঁকি দেবার কথা না রেখেই। একশো একটা ফাঁকির জীবনে বাকি থেকে যাওয়া স্বপ্নের মৃত্যু নিয়ে একটা সিরিজ কবিতা অন্তত লেখা হবে ভেবে তুমি নদী থেকে জল তুলে, মাথায় ছিটিয়ে ফিরে যাবে ঘরে।
(২)
অন্ধকার থেকে সরিয়ে নিয়েছি আলো, ঠিকানার থেকে আলাদা করেছি পথ আর তারপর হেঁটে গেছি হাঁটার আনন্দে। শরীর থেকে আলো সরিয়ে নিয়ে দেখেছি ছায়ার কোনও দাবিদার নেই। আবার অন্ধকার ঠিকানার মুখোমুখি আলোর পথ এসে দাঁড়ালে বুঝেছি জীবন মহাকাব্যের রচনা করার জন্য তৈরি। প্রস্তুত থাকা আর তৈরি থাকা এক নয় জেনেও অন্ধকারের জন্য সজাগ থাকার আলো খুঁজতে বেরিয়েছি। অথচ ঠিকানা জানা নেই। পথও জানি না। আলোর মুখোশ নিয়ে পসরা সাজানো দেখেছি পথের দু'ধারে। বারেবারে ভুল সওদায় মানিব্যাগ খালি করে ফিরেছি ঠিকানায়। অথচ পথ আমাকে অন্যদিকে নিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। মুখে রা কাড়িনি অথচ এত এত কথোপকথনের সাক্ষী থেকেছি যে, জীবনের নাট্যরূপ লেখা হয়ে গেছে আলো অন্ধকারে। বারেবারে ঠিকানা খুঁজতে বেরিয়ে ভুল পথের কাছে বাড়িয়েছি বন্ধুত্বের হাত আর অন্ধকারের স্বর্গ ভ্রমণ করে লিখেছি অবচেতনের বিমূর্ত পৃথিবী। ঋণ মেটাতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে ছায়া। আলোর পৃথিবী থেকে দূরে গিয়ে আলোর অভিনয় করেছে বহুবার। আমি দর্শক। হাততালি দিতে গিয়ে দাঁত, নখ বের করার সুযোগ আমার নেই। অভিভূত হয়ে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা অথবা বিরক্ত হয়ে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া আমার আর কোনও পথ নেই। অথচ ঠিকানাবিহীন এই পথ আমার নয়। অব্যবহৃত সঞ্চয় নিয়ে আর কতদিন বেঁচে থাকতে হবে সে খবর কারোর কাছেই নেই।
এখন শব্দ নিয়ে খেলা করি আর যতিচিহ্ন নিয়ে রসিকতা করার সুযোগ খুঁজি।
(৩)
শুকনো পাতার দেহ অশ্লীলতার দায় মাথায় নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ায়। আমার ঘুম ভাঙে না। মাঝেমধ্যে জাগি আর ঘুমের ভিতর চিৎকার করি। ঘুমের ভিতরে গাছের ছায়ার থেকে দূরে গিয়ে আলোর উত্তাপ নিই। কখনও নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়। ছায়ার সাথে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ, উত্তাপের স্বাদ নিতে ব্যর্থ। ঘুমাতে ব্যর্থ, জেগে থাকতেও ব্যর্থ। ব্যর্থতায় ঢাকা পড়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যায় শুকনো পাতার দেহ। শরীরে রক্তচাপের ছাপ ক্রমশ মনের গভীরে চারিয়ে দেয় তার শিকড়। অবসাদের তাড়নায় নিজেকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ানোর অভিনয়ে ক্রমশ পটু হয়ে যায় স্বপ্ন। পূর্ণিমার চাঁদের শরীরের সামনে শুকনো পাতার দেহ নিয়ে নিজস্বী তোলার ধূম লেগে যায়।
এসবই নিজেকে খুঁজে নেবার তাগিদ। সবার এই তাগিদ থাকে এমন নয়। তবু কারও কারও থাকে। আর এই খোঁজ বা সন্ধানে সর্বদা ব্যস্ত থাকায় এবং যা খুঁজে চলেছি তা খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতায় মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে। কথায় কথায় চিৎকারে কাছের মানুষ আহত হয় এবং উঠে চলে যায় দূরে। এর মধ্যে ভুল, ঠিক খোঁজা ঠিক নয়। তবু পরিচয় হয়ে যায়। ভুলের সাথে ঠিক হাত মেলায়। পরিচয় পর্বের শেষে এক নতুন অধ্যায় শুরু করার কথা থাকে বটে কিন্তু কথা রাখা হয় না। দাঁড়ের ময়না খাঁচায় ঢুকে পড়ে। নাম ধরে ডাকে কিন্তু খাঁচার বাইরে আসে না। ছোলা খেতে খেতে সে নাম ধরে ডাকে। হয়তো ভুলে যাওয়া কোনও নাম।অনেক চিঠির খাম এখনও যত্নে রাখা আছে। অথচ চিঠিগুলো নেই। কথাগুলো দিব্যি মনে আছে অথচ অঙ্গীকারগুলো ভুলে গিয়ে আমরা শুকনো পাতা উড়িয়ে বেড়াচ্ছি রাস্তায়। অবৈধতার মোড়কে মোড়া বৈধ জীবনের ছায়ার খোঁজে প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে অবিশ্বাসের হাত ধরে। বিশ্বাস অনেকদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে আর তারপর নিজের প্রতিবিম্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি হেসেছে। এখন সব হাস্যকর এমনকি অবসাদও। প্রাত্যহিক দিনলিপি লেখার অভ্যাস হারিয়ে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দেহে আঁচড় কাটছি। নখের দাগ বসে যাচ্ছে আর এক অদ্ভুত আনন্দ পাচ্ছি সবাই। পাই-পয়সার ধারদেনা মিটে যাবার কথা ছিল বটে কিন্তু মিটল না এখনও। ক্রমশ ঘন অরণ্যের দিকে আমরা হেঁটে যাচ্ছি। ঢুকে পড়ছি গভীর জঙ্গলের সংসারে। শিকারপর্ব শেষ হলেই প্রত্যেকে নিজেকে জাগিয়ে তুলব উল্লাসধ্বনি দিয়ে। আর এখন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুকনো পাতার দেহে হাত বোলাচ্ছি আর স্বপ্নের ভিতরে শীৎকার ধ্বনিতে নিজেকে শান্ত করছি প্রতিনিয়ত।
(৪)
যে কোনও ডাকে আমাকে সাড়া দিতে হবে এমন কোনও নিয়ম নেই। তবে অন্তরের ডাক এলে আমি চুপ করে বসে থাকতে পারি না। অথচ এ কথাও ঠিক যে অন্তরের ডাক বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না সবসময়। সে ডাকে আর ডেকে ফিরে যায় সাড়া না পেয়ে। মাঝেমাঝে সেই সাড়া না দেওয়াই হয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল আবার সাড়া দিয়ে দ্রুত ছুটে গিয়েও যে ভুল হয় না এমন নয়। অনেকসময় ভয় সঞ্চয় করার পর নিজেকে ফিরিয়ে এনেছি এই পুরনো পরিচয়ে। তারপর অনেক অঙ্ক কষে দেখেছি মুদ্রাদোষে কিছু ভুল হয়ে যায় সবারই। এই অভিজ্ঞতা যত ভারী হয়, ততই ভালো। অসংখ্য আলো জ্বালার পর যে সামান্য অন্ধকার জমা হয় সেখানেই মূল নাটক মঞ্চস্থ হয় জীবনের।
অথচ মনের কাছে দায় বাড়তে থাকে প্রতিদিন। সে ভাবে আর ভাবায় আর আমি ভাবতেই থাকি। ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজের কলার ধরে শাসন করার আগে আমি ভাবি এবং ভাবতে ভাবতে পেরিয়ে যাই অসংখ্য জীবনের পথ। যারা বলে জীবন একটাই আমি সে দলে পড়ি না। একটা জীবনের ভিতর এত অসংখ্য ছোট ছোট জীবন থাকে বাঁচার যা সাজানো গোছানো জীবনের চাহিদায় হারিয়ে যায়। ভাগ্যবান তারাই যারা সেইসব ছোট ছোট জীবনের স্বাদে বেঁচে থাকার বিভিন্ন পদ সাজিয়ে বসে খাবার টেবিলে এবং অগোছালো, অনিয়ন্ত্রিত করে বাঁচে অমূল্য জীবন।
সুখের পাশাপাশি শোকের সঙ্গে সহবাসে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয় তার মূল্য নির্ধারণ করবে কোন দ্রুতগামী মন? কোন জীবন তাকে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে যাবে রুটিনমাফিক বাঁচা আর মরার দিনক্ষণ উদযাপনে?
সাড়া দেওয়া আর না দেওয়া ব্যক্তিগত ব্যাপার সবসময় থাকে না। অনেকসময় যৌথ বা সমষ্টিগত জীবন নির্ধারিত করে দেয় আমাদের সাড়া দেবার ইচ্ছে ও অনিচ্ছেকেও। স্বীকার করি বা না করি, আমরা প্রত্যেকেই সেই ইচ্ছের শিকার হই বই কী! যদিও জীবন টোপ ফেলে বসে থাকে অদূরে। টোপ গিললেই ঘাড়ে দাঁত ফুটিয়ে সে আমাদের তুলে নিয়ে যাবে কোনও ঝোপের আড়ালে। জীবনকে মাঝেমধ্যে এত হিংস্র মনে হয় যে, বেঁচে থাকার জন্য শুধু পলায়নপর হবার দক্ষতা মাপতে থাকি প্রতিনিয়ত।
অদক্ষ ডাকে আমরা যেমন সাড়া দিই না তেমনই নিজেরাই মাঝেমধ্যে অদক্ষ স্বরে ডাক দিই জীবনকে। আর জীবন সাড়া দেয় না আমাদের ডাকে। মৃত্যুকে আরও দ্রুতগামী করে সে ঘৃণায়, বিরক্তিতে। রহস্য ঘনীভূত হয় সাড়া দিয়ে অথবা না দিয়ে। অথচ সাড়া পাওয়া বা না পাওয়ার উওর ডাক নির্ভরশীল নয়। তার মূল পরিচয় ডাকতে থাকায়। সে ডাকতে থাকে। মাচার উপর থেকে, বিছানায় বসে বসে, মাঠের সাইড লাইন থেকে অথবা স্কুলের লাস্ট বেঞ্চের কোণ থেকে।
(৫)
নেই বলতে নেই। আছে, কিছু তো আছেই। সেদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখে নিলেই নেই শব্দটা মনের গোপন ঘর থেকে ভ্যানিস। আদরের বারান্দা থেকে ভালবাসার শোবার ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা একমাত্র সুখের শব্দ আছে। আর, আছে ভাবতে পারলেই সাত সমুদ্র তেরো নদী, পাহাড়, অরণ্য - সব তোমার ড্রয়িংরুমের শোভা বাড়াতে প্রস্তুতি নেবে তক্ষুনি।
অথচ, আমরা নেই, নেই জপতে জপতে এগিয়ে যাচ্ছি খাদের দিকে। সুন্দর, পরিস্কার, নীলনির্জন সমুদ্রের বিচ খুঁজতে খুঁজতে ভুলে যাচ্ছি নিজের গভীরে ডুবে গোপন ঝরনার জলে ভেজার সরল উপায়গুলো। এবার, আঁজলা ভরা জলে উঠে আসছে বালি, পূর্ণিমার রাতে চোখে পড়ছে অন্ধকার।
এই বালি, এই অন্ধকার অবসাদের সুবাসে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে বেঁচে থাকে জীবন থেকে দূরে সরে গিয়ে। নিজেকে বেঁধে রাখার পথ ও পাথেয় আমাদের টুকরো টুকরো করে দিয়েছে ভিতরে ভিতরে। এক আমি অনেক আমি'র ভিতর তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আলোর মুখোশ খুলে নিজেকে অন্ধকারের পোশাক পরিয়ে আমরা প্রত্যেকেই বাঁচতে চাইছি নেই রাজ্যের নৈরাজ্যের সংসারে।
অথচ, জীবন সাজিয়ে দিয়েছে সব। স্নেহ, প্রেম, ভালবাসা, যত্ন, আদর নিয়ে লং ড্রাইভে বেড়িয়ে পড়ার অবসর। কিন্তু আমরা ক্রেডিট কার্ডের ছাড় লুটে নিতে গিয়ে আমাজনের গভীর জঙ্গলে হারিয়ে ফেলেছি পথ। স্যোসাল মিডিয়ায় বন্ধু খুঁজে পেতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানের বন্ধুদের। এরই ফাঁকে রোয়াকের টক-ঝাল-মিষ্টি আড্ডা হারিয়ে এখন ঘন্টাখানেক সঙ্গে সুমনের ভদ্রলোকের বস্তির ঝগড়া শুনে আমরা স্থির করে ফেলি গণতন্ত্রের ভবিষ্যত আর সাজানো জীবন অগোছালো হয়ে পড়ে।
জীবন অগোছালো হয়ে পড়লে হাতের কাছের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমরা খুঁজে পাই না সময়ে। আর, আমাদের মনে হয় আমাদের কিছু নেই। আমরা হাতড়ে মরি সুখ আর আমাদের হাতে এসে ঠেকে শোক। ঘুরে ফিরে জীবন এক জায়গায় থমকে দাঁড়ায়। আছে ভাবলেই পূর্ণ আর নেই ভাবলেই শূন্য।
(৬)
উদাসীন থাকব ভাবা আর উদাসীন থাকা এক ব্যাপার নয়। উদাসীনতা নিয়ে একটা পুরো অধ্যায় মহাভারতে লেখা উচিত ছিল। কিন্তু ভুল হয়ে গেছে। আর, আমরা তো জানি যা নেই ভারতে (মহাভারত), তা নেই ভারতে।
জানা ব্যাপারটা ততক্ষণ ভাল যতক্ষণ তুমি মেনে নিতে পারছ মন থেকে। তুমি জানলে অথচ মানলে না, যদি এরকম হয় তাহলে যাবতীয় ব্যাপার গুলিয়ে যায়। সম্পর্কে জট পেকে যায় আর অনুভবে ভুল অভিজ্ঞতা জড়ো হয়। একটা জীবন সম্পর্কে উদাসীন থাকা উচিত কি উচিত না সে নিয়ে অনেক তর্ক চলতে পারে। কিন্তু উদাসীনতাকে এড়িয়ে অথবা থামিয়ে দেবার মতো মনোবল থাকা জরুরি।
জরুরি কাজ অবশ্য সহজ হয় না। বরাবরই কঠিন। তাই আমরা প্রত্যেকেই এড়িয়ে যাই সে সব কঠিন ব্যাপার। আসলে উদাসীন থাকার অভিনয় করি কঠিন দায় আর দায়িত্বগুলো সম্পর্কে। আবার আমরাই উদাসীনতাকে ঘৃণা করি। বিরক্ত হই কেউ যদি আমাদের সম্পর্কে উদাসীন থাকে তাহলে।
আমাদের এই দ্বিচারিতা জীবন নাকি আসল জীবন এইসব উদাসীনতা যা আমাদের সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়? ভালবাসা সত্যি নাকি সত্যি ভালবাসার মানুষের ঘৃণা? এসব প্রশ্নের উত্তর যে নেই এমন নয়, কিন্তু আমরা জটিল প্রশ্ন সম্পর্কে যতটা আগ্রহী, উত্তর সম্পর্কে ততটাই উদাসীন। আমাদের ঋণ এই উদাসীনতার প্রতি। বেঁচে থাকার ঋণ। যদি আমরা উদাসীন থেকে এড়িয়ে যেতে সমর্থ হই যাবতীয় জটিল সম্পর্কের হাতছানি, তবে অন্তত বেঁচে থাকার পথে কোনও বাধা থাকবে না। জীবনের মায়াজালে নিজেকে না বেঁধে রেখে, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমরা খুব সহজেই তাকে জিতে নিতে পারি, যে আমাদের প্রতি সারাজীবন উদাসীন থেকেছে।
এই যে আমাদের পেরে যাওয়ার ক্ষমতা আর সফল হবার ইচ্ছে এক বিন্দুতে মিললে তবেই তো আতস কাচের নিচে রৌদ্রকিরণ আগুন জ্বালাতে পারবে?
ইচ্ছেগুলো সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়। ইচ্ছেগুলো সত্যি করার ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা উদাসীনতা। এইটুকু বুঝে ফেলতে পারলেই নিজেকে হারিয়ে নিজে জিতে যাবার ক্ষমতা আমাদের সবার আছে।
(৭)
লিখিনি কিছুই আমি, শুধু বার বার আঁকি শূন্যতার মুখ। এ অসুখ আমার একার নয়; প্রত্যেকের মনের গভীরে শুধু এটুকুই সঞ্চয়। সীমাহীন সময়ের কাছে হাত পেতে দেখেছি যখনই, স্তব্ধতার কলরব প্রত্যক্ষ করেছি। উজ্জ্বল চন্দ্রিমা দেখে ভুলে আছি অন্ধকার হৃদয়ের রূপকথা। অজস্র হিংসা আর উচ্ছ্বলতার বাদামী রাত্রি পার করে কিনেছি অসুখ। অধিকার বোধে তাকে জড়িয়ে রেখেছি, উদাসীনতায় পথে ফেলে রেখে ফিরিনি বাড়িতে। বহু যত্নে লালন করেছি শূন্যতার অধিকার। নিজেকে মিশিয়েছি যে অন্ধকারে, তার গভীরে গোপন রাখা আলো লিখে রেখে যাওয়া বাকি। জীবনের বাকি হিসাব রাখিনি। বেহিসাবি নগদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হারিয়ে ফেলেছি ঋণের যোগ্যতা।
নীরবতা নিয়ে মুখর হবার পর একা আমি ভিড়ের ভিতর হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে। মুখরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি যখন তখনই আমি একা হয়ে গেছি অনেক অনেক ভিড়ের আড়ালে। ভালবাসার ইস্তেহারের ছায়াসঙ্গী কিছু ঘৃণা। অনেকে এসব দেখেও দেখে না।আমি দেখি আর লিখি। লিখি আর লিখতে লিখতে দেখি অবচেতনের মায়া খেলা। উদাসীনতার হাত ধরাধরি করে অবহেলা শূন্যতার মুখের উপর আলো ফেলে। সে আলোয় অন্ধকার দেখা যায়। আমি সেই অন্ধকার আঁকি। এইসব লেখায় এখনও ফাঁকি মেশাইনি আমি। জানি, তাতে নিজেই ফাঁকি পড়ার সুযোগ থাকে বেশি।
লিখিনি কিছুই আমি। শিখিনি আঁচড় দিতে অচেনা কৌশলে। নোনাজলে স্নান সেরে অপেক্ষা করেছি পূর্ণিমার। অথচ গ্রহণ লেগেছে চাঁদে। নিরপরাধের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে বারবার। আবার জন্ম নিয়েছে, জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ভালবাসা। শূন্যতার মুখ চেয়ে বাঁচার প্রত্যাশা জীবনকে জিতিয়ে দেয় অনেক অনেক পরাজয়ের ভিতরেও। আমাদের ক্লান্তিকর মুখচ্ছবি দেয়ালে টাঙানো থাকে অথবা অভিনীত চরিত্রগুলো। জীবনের বড় মিথ্যেগুলো ফেসবুকের দেওয়ালে খসে পড়ে পুরনো নোনা ধরা বাড়ির পলেস্তারার মতন। সেখানে সময় ছবি আঁকে আর জীবন লিখে রাখে ধারাবিবরণী।
(৮)
নিজেকে সরিয়ে নিতে পারলে ভাল, না পারলে অবসাদ। এই যে ইঁদুর দৌড়, নিজেকেই সেরা বলে প্রচারের দৌড়, এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার সুযোগ বেশি। নিজেকে সেরা বানানো আর সেরা বলে প্রচারের দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া এক নয়। প্রযুক্তি আর অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই বিপথে চালিত করে। জীবিকার ক্ষেত্রে তাও এই দৌড়ে নাম লেখানোর একটা মানে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু যশের লোভে নিজেকে তৈরি না করেই প্রচারমঞ্চে উঠে দাপাদাপি করার যে প্রবণতা বাঙালি সমাজে দেখা যাচ্ছে তা বিরক্তিকর। অনেকাংশে ক্ষতিকরও। নিজেকে তৈরি করার সময় না পেলে প্রচারের কোনও বিশেষ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। এই সত্যের সঙ্গে পরিচয় কারোর নেই অথবা কেউ কেউ সত্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বাঁচায় মোক্ষ লাভ করা যায় ভেবে নিয়েছেন। ভাবলেই আপনি কবি, শিল্পী, গায়ক অথবা ম্যাজিসিয়ান। আপনার মাত্রাবৃত্ত যদি স্বরবৃত্তের পোঁ ধরে, অথবা আপনার সা যদি পা ছুঁয়ে গর্ব বোধ করে তাহলেও কি আপনি নিজেকে প্রচারের আলোয় রাখতে চান? যদি চান তাহলে আপনি নিঃস্ব হবার পথে পা বাড়িয়ে রেখেছেন। বাকিটা সম্পূর্ণ হবার জন্য শুধু অপেক্ষা ছাড়া আর কিছুরই দরকার নেই। নয় একসময় আপনি হাঁপিয়ে ছেড়ে দেবেন এই পথ অথবা প্রতারক হবার রাস্তা খুঁজে পাবেন সম্পাদক-প্রকাশক অথবা অনুষ্ঠান-আয়োজকের ভূমিকায়। মানুষ সময়ে বোঝে না কিছুই। শুধু অসময় তাকে চালনা করে। অস্থিরতা তাকে শেখার আগ্রহ নষ্ট করে ফেলতে সাহায্য করে আর যশের লোভ তাকে মিথ্যে বলতে শেখায়।লেখায় এবং রেখায় সেইসব অস্থিরতা, লোভ ধরা পড়ে। ধরা পড়ে চাতুরি, ছল ও কৌশল। শিল্প গৌণ হয়ে পড়ে। শিল্পী নিজেই তার সৃষ্টিকে ঢেকে দিতে চায়। চায় পুজো হোক শিল্পীর, শিল্পের নয়। আমাদের এই পরিচয় সমগ্র জাতির ধ্বংসের পরিচয়। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শিক্ষার পরিচয়, মোহগ্রস্ত, মোহাচ্ছন্ন রুচির পরিচয়। পরিবর্তন দরকার। বিপ্লব দরকার। কিন্তু বদল বা বিপ্লব তো নিজে নিজেই হেঁটে আসবে না! নিজেকে আস্তাকুঁড়ের জঞ্জাল থেকে সরিয়ে আনার চর্চা করতে হবে শিল্পচর্চার পাশাপাশি। শিল্পের প্রতি নিজেকে উজাড় করে দেওয়া, সৃষ্টির প্রতি নিজের ত্যাগস্বীকার করার সঙ্গে প্রচারের কোনও সম্পর্ক নেই, এই সত্য বুঝে ওঠার সময় এসেছে। সময় এসেছে পথের আলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নিজের গভীরে বহমান ঝরনায় স্নান করার। অবচেতনের সঙ্গে সাঁকো রচনা করার জন্য যে সময়, যে নিষ্ঠার প্রয়োজন তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের বানানোর মধ্যেই নিজেকে আগে প্রচারের উপযুক্ত করার প্রয়োজন। নিজেকে পণ্য বানানোর আগে জেনে নিন আপনার মধ্যে সেই পণ্য হবার সমস্ত গুণ বজায় আছে কী না! বাজারে বিজ্ঞাপন দিয়ে পচা মাল একবারই বিক্রি করা সম্ভব। আর নিজের লেবেল বদলে বদলে আপনি নিশ্চয় নিজেকে বিক্রি করতে উদ্যত হবেন না সব সত্য বুঝে নেবার পর।
নিজেকে সরিয়ে নিতে অবসরের সাধনা প্রয়োজন, দরকার অবচেতনের সাধনার। আপনার যদি সত্যিই দরকার হয়, তবে তো আপনাকেই তা তৈরি করে নিতে হবে! শিল্পের প্রাথমিক শর্ত নিজের আর শিল্পের অস্তিত্বকে আলাদা করে মানুষের কাছে তুলে ধরা। নিজের প্রতি মোহ বজায় রেখে নিজের শিল্পের প্রতি কি নির্মোহ থাকা যায়? অথচ শিল্পী, কবি বা সৃষ্টিশীল মানুষ হতে গেলে এই নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রয়োজন। যদিও আমরা মঞ্চ, আলো, সম্মাননা, পদক, শংসাপত্র আর স্মারক প্রাপ্তিকেই স্রষ্টার স্বীকৃতি বলে ধরে নেওয়ায় আমাদের সৃষ্টিগুলো পদক, শংসাপত্র আর স্মারকের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে কাঁদছে, শুধু কাঁদছে।
নিজেকে সরিয়ে নিতে পারলে ভাল নইলে নিজের সৃষ্টিগুলো হারিয়ে যাবার পথ মসৃণ করে আমরা অন্তত ক্ষণিকের অভিনয়ে ব্যস্ত থেকেই আনন্দ খুঁজতে পারি নিশ্চিন্তে।