পারফর্মেন্স-এর ঠিকঠাক বাংলা কী? পরিবেশনা? উপস্থাপনা? আর পারফর্মিং আর্টের বাংলা? পরিবেশনমূলক শিল্প বা উপস্থাপনামূলক শিল্প? শিল্পমাত্রই কি সেটা উপস্থাপনামূলক নয়? পরিবেশনামূলক নয়? একটা আলপনাও তো দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা যায়। তাহলে কি আলপনা দেওয়াকে পারফর্মিং আর্ট মনে করাই সমীচীন? অথবা রান্না করা খাবার তো যুগ যুগ ধরে মানুষ পরিবেশনই করে এসেছে। তাহলে রান্না কি পারফর্মিং আর্ট? এসব বড়ো উটকো চিন্তা। মাথায় একবার ঢুকলে জ্বালাতন করে। সন্তোষজনক নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ জেনেও উত্তর খুঁজে যেতে হয়। আবার উত্তর পেলেও যে জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাওয়া হল, এমন দাবি করা যায় না। তবে কিনা এইসব সময়যাপনের অজুহাতকে প্রশ্রয় দেওয়াটাকেই তো আমরা ছুটি কাটানো বলি, তাই পুজোর ছুটির অবকাশে একটু সাতপাঁচ ভাবছি আর কী।
এক এক করে দেখা যাক। প্রথমত, শিল্প কী? এই প্রশ্নেরই কোনও উত্তর নেই। যা খাওয়ার জিনিস, পরার জিনিস আর থাকার জায়গার মতো প্রাথমিক চাহিদা নয়; দোকান-বাজার, রাস্তা, ব্যাঙ্ক, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজের মতো আবশ্যিক পরিকাঠামোও নয়; যাকে সেই অর্থে কোনও ব্যাকরণে পুরোপুরি বাঁধা যায় না, আর দক্ষতা আর বোধের সমন্বয়েই যার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ, তাকেই মনে হয় শিল্প বলে। শিল্প মানুষের ভোগেরও একটা উপকরণ বটে। তাই শিল্পের বাণিজ্যিকরণ হয়, বিপণন হয়। আর যা ভোগের উপকরণ, তাকে ভোগ করতে হয় ইন্দ্রিয় দিয়ে। আরেকটু পরিশীলিত করে বলতে গেলে, শিল্পের সংবেদন হয় ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির মাধ্যমে। এক এক রকমের শিল্পকে চিনে নিতে এক একটা ইন্দ্রিয় প্রধান ভূমিকা নেয়। ছবি দেখতে চোখ লাগে, গান শুনতে কান। আবার সিনেমা দেখতে চোখ-কান দুটোই লাগে। এইবার ধরা যাক ফুটবল খেলা। মানে, যে কোনও খেলাই, তবে আমার প্রথমে মনে পড়ল ফুটবল। উৎকৃষ্ট মানের ফুটবলকে তো আমরা শিল্প বলেই থাকি। আর সেটার জন্য ব্যবহার করতে হয় চোখ। কিন্তু কানে যে গ্যালারির চিৎকার আসছে, নাকে যে ঘাসের ওপর বৃষ্টি পড়ার গন্ধ, বা লক্ষ মানুষের ভিড়ের গন্ধ আসছে, গায়ে যে উত্তেজনার উত্তাপ লাগছে, সেগুলোকে তো একেবারে হেলাফেলা করা যাচ্ছে না। কারণ সেগুলো তো ফুটবল উপভোগ করবার অভিজ্ঞতাটা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। চোখ যখন নাচ দেখে, কান তো নেপথ্যের সুর-তালের সঙ্গে সেই বিভঙ্গকে মিলিয়ে নেয় বটেই। তাই শিল্পের উপভোগে একাধিক ইন্দ্রিয়ের অনুভূতির সমন্বয় আমরা পেয়েই থাকি।
দ্বিতীয়ত, পারফর্মেন্স কোনটা? পারফর্মিং আর্ট কোনটা? উদাহরণ ধরে ভাবলে বোঝা সহজ। ছবি আঁকা পারফর্মিং আর্ট নয়। কারণ ওটা আড়ালে বসে, নিজের সঙ্গে একা বসে এঁকে আনা যায়। চারটে লোকের সামনে এঁকে দেখাতে হবে এমন কোনও বাধ্যতা নেই। রান্না করা পারফর্মেন্স নয়। কারণ রান্নাঘরে ওটা করে আনা যায়। ভোক্তার সামনে করে দেখানো আবশ্যিক নয়। ভোক্তার কাছে পৌঁছায় ফলাফলটা। সুতরাং ফলাফলটাই মূল্যায়ন করা হয়। আর নাচ, গান, ম্যাজিক দেখানো, নাটকের অভিনয়, এগুলো হল পারফরম্যান্স। কারণ এটা বাড়ি থেকে বানিয়ে আনা হচ্ছে না। তখনই বানিয়ে দেখানো-শোনানো হচ্ছে। গানের কথা-সুরটা আগে তৈরি থাকলেও গায়কের স্বরযন্ত্র থেকে সেটা তৎক্ষণাৎ নিঃসৃত হচ্ছে। খেলাধুলোতে তো এমন কী আগে থেকে লিখে বা সুর করে রাখা গানও নেই। এইসব ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা দেখি যে ফলাফলটাই গৌণ হয়ে যাচ্ছে। পদ্ধতিটা, প্রয়োগটা, কর্তবটাকে মানুষ বেশি করে উপভোগ করছে। ওইটাকেই মূল্যায়ণ করছে। মাঠের বাইশ জনের মধ্যে একটা মেসি বা তেন্ডুলকর থাকলে, তাঁদের দল হেরে গেলেও তাঁরাই মনোযোগের কেন্দ্রে রয়ে যাচ্ছেন।
এই যে কোনটা সবার সামনে করে দেখাতে হবে, আর কোনটা তা হবে না, এই স্পষ্ট বিভাজন শিল্পের বাইরেও সব কাজকেই স্পর্শ করে। এর ওপরেই নির্ভর করে কোন কাজের জন্য কেমন জায়গা লাগবে। কোথায় লাগবে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ, কোথায় লাগবে খোলা ময়দান, কোন কাজ করতে লাগবে একটা আস্ত পুকুর বা নদী, আর কোনটা করতে লাগবে একটা হাসপাতাল বা ক্লিনিক। আর এই কোন কাজটা কোথায় করতে হবে, এটা সুবিধামতো ভুলে যাওয়ার মধ্যে অসামান্য বিভ্রাট আর অতুলনীয় মজা লুকিয়ে আছে। এটাও ভাবলে বড়ো চমৎকার লাগে, যে এই ভুলে যাওয়াটা আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রে হয় না। হয় অন্য লোকেদের ক্ষেত্রে।
আমি একজন গায়ক। বেশ ছোটবেলা থেকেই গান শেখার চেষ্টা করতাম। অত্মীয়-বন্ধুদের পরিসরে দেখা হলেই আমাকে অনেকে গান করতে বলতেন। তখন গান না করলে সেটা হতো আমার মা-বাবার অস্বস্তির কারণ। ছেলে অসামাজিক, মিশুকে নয়, গুরুজনদের আদেশের কদর করতে অপারগ, অপ্রতিভ, মুখচোরা একটি কুসন্তানপ্রায়। আমি মঞ্চে প্রথম গান করেছিলাম যখন আমার সাত বছর বয়স। এখন আমি মধ্য-চল্লিশ। আমার অনেক মামা-মাসি-কাকা-পিসি আছেন, যাঁরা আজও সামনে থেকে আমার গান মঞ্চে শোনেননি কখনও। না শুনতে চাওয়ার স্বাধীনতা তাঁদের আছে অবশ্যই। শুনতে চাইলেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে মঞ্চ অবধি পৌঁছানোর পরিশ্রম না করবার সিদ্ধান্ত নেবারও অধিকার তাঁদেরই, সন্দেহ নেই। কাজেই তাঁরা যে শুনতে আসেননি, বেশ করেছেন। অবাক কাণ্ড হল এই যে গত বছর খানেকের মধ্যেই রিষড়ায় আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটা পারিবারিক জমায়েত, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হল। আমি হতবাক হয়ে দেখলাম সেখানে সকলে আমার গান শুনতে উদগ্রীব! আমার ধারণাই ছিল না আমার গানে তাঁদের কতখানি রুচি। আমি অভিভূত হয়ে বলতেই পারলাম না যে এই গান শোনাতে আমি কিছু পারিশ্রমিক নিয়ে থাকি। যুগে যুগে কোনও গায়ক তাঁর আত্মীয়-পরিসরে এই কথা বলে উঠতে পারেননি। এর নাম দেওয়া হয়েছে সৌজন্য।
আমার পরিচিতবর্গে কয়েকজন ডাক্তার আছেন। তাঁরা যখন অতিথি হয়েও কোথাও গেছেন, সে পিকনিক হোক বা বিয়েবাড়ি, কেউ না কেউ এসে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কথা পেড়ে বসেছেন অনিবার্যভাবে। ডাক্তারবাবুও বলে উঠতে পারেননি যে এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তিনি কিছু সাম্মানিক নিয়ে থাকেন। এরও নাম দেওয়া হয়েছে সৌজন্য। বিয়েবাড়িতে পরিচিত ডাক্তারকে দেখে যিনি "সেই যে তুমি সেবার ওষুধ দিয়ে গেলে, তার মাস তিনেক পর থেকে হাঁটুর সমস্যাটা..." বলে এগিয়ে আসছেন, তিনি যে অসৌজন্য দেখাচ্ছেন, এমনটা সচরাচর বলেননি কেউ।
আমার পরিবারে একজন ফুটবলার ছিলেন। যথেষ্ট জনপ্রিয়, আন্তর্জাতিক স্তরে খেলা ফুটবলার। আত্মীয় বন্ধু পরিসরে কখনও কোনও জমায়েতে তাকে কেউ একটা পেনাল্টি বা ফ্রি কিক মেরে দেখাতে বলেননি কখনও। জনমানসে অবচেতনেই এটা রয়েছে যে খেলতে মাঠ লাগে আর গাইতে গলা। পাত্র আর কাল, এ দু'টো হাতে থাকলে স্থানের পরোয়া অনেক কাজের ক্ষেত্রেই আমরা করি না। এইজন্যই হয়তো টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে রান্নাও হয়ে যায় পারফর্মেন্স। পুরো প্রক্রিয়াটাই সবার সামনে করে দেখানো হয়। সেখানে বরঞ্চ প্রক্রিয়াকরণটুকুই দেখা-শোনা যায়। ফলাফলটা চাখার সুযোগ থাকে না। সেই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হয়ে আসেন প্রবাদপ্রতিম গায়িকা। তাকে সঞ্চালিকা বলেন "আজ আমরা রান্না করব আলুর দম। প্রথমে আলুর খোসা ছাড়িয়ে ফোড়ন দিয়ে তেলে ভাজা-ভাজা করে নিলাম। এবার ঢাকা দিয়ে সেদ্ধ হতে হতে আমরা দিদির সেই কালজয়ী গানটা শুনে নেবো।" এবার দিদি কালজয়ী গানের স্থায়ীটুকু গাইতে গাইতে বিজ্ঞাপনের বিরতি নেওয়ার সময় হয়ে যায়। অভিনেত্রী বা ক্রিকেটারও অসেন একই অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে, অন্য পর্বে। তাঁদের কিন্তু রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পারফর্ম করতে হয় না। এই দায় কেবল কিছু পেশা এবং বৃত্তির জন্যই বরাদ্দ হয়েছে। গায়ক-গায়িকারা ঢুকে পড়েছেন সেই দলে। ভারতের পরম্পরার সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ তার সংগীত। তবে, সংগীতের অমর্যাদাও মনে হয় আমাদের অনেক দিনের লালন করা একটা পরম্পরারই সামিল।