প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড রূপে ফাঁসিই কি শেষ কথা বলে?



আনন্দ মুখোপাধ্যায়


আর জি কর কাণ্ডে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই পুলিশের তরফে ও হাসপাতালের পক্ষ থেকে নির্যাতিতার 'আত্মহত্যা'র তত্ত্ব তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের সাংসদ তথা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দোষীকে গুলি করে মারার দাবিতে সরব হয়েছেন। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সওয়াল করেছেন। এমনকি কলকাতার মেয়র সহ ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা, মন্ত্রী, বিধায়কও অপরাধীকে ধনঞ্জয়ের মত শাস্তি দেওয়া থেকে শুরু করে এনকাউন্টার পর্যন্ত করার দাবিতে সরব হয়েছেন।

কিন্তু, হঠাৎ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর সাংসদ-বিধায়কদের মুখে 'মৃত্যুদণ্ড' বা 'গুলি করে হত্যা করার' দাবির নেপথ্যে কি কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে? ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীরা কি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিবাদী কন্ঠস্বরের অনুরণনের ফলে গদি হারাবার ভয় পাচ্ছেন? যে সরকারের পুলিশ বাহিনীর ওপর থেকে কার্যত রাজ্যের অগণিত মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস উঠে যেতে বসেছে, খোদ কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা পুলিশের প্রতি আস্থা রাখতে না পেরে ঘটনার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে ন্যস্ত করেছেন, সেই সরকারের প্রধান কুশীলবরা 'রাম-বাম' তত্ত্ব খাড়া করার পাশাপাশি অপরাধীর ফাঁসির দাবিতেও সরব হয়ে আদতে কি গণবিক্ষোভকে প্রশমিত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন? যে সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি গোপনীয়তা অবলম্বনের তথা তথ্য প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে সেমিনার রুম সংলগ্ন ঘর তড়িঘড়ি ভেঙে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, এমনকি আর জি করের অধ্যক্ষ ইস্তফা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আবার অন্য একটি সরকারি হাসপাতালের অধ্যক্ষ পদে বসানোর ব্যবস্থা করা হয়, তা যে নির্যাতিতার বাবা-মা সহ সমগ্র রাজ্যবাসীর কাছে নেতিবাচক বার্তা বহন করে এনেছে, সে কথা অনুধাবন করেই সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রী সহ একাধিক নেতা নেত্রীরা নিজেদের তৎপরতা জাহির করতেই মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে গলা ফাটাচ্ছেন তথা মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে আইন আনতে তৎপর। যেমনটি আমরা বাম আমলে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ফাঁসির ক্ষেত্রে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী-জায়া মীরা ভট্টাচার্যের আচরণে প্রত্যক্ষ করেছি।

এখন প্রশ্ন হল, মৃত্যুদণ্ড কেন? রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও অন্যান্য নেতা-নেত্রীরা নিশ্চয়ই আর জি করের ঘটনায় প্রকৃত দোষীর চরম শাস্তির দাবিতে সরব হবেন, সেটার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু সাত দিনের মধ্যে বিচার করে ফাঁসি দেওয়ার দাবির মধ্যে কি কোথাও যেন তেন প্রকারেন কোন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাকে ফাঁসির দড়িতে লটকানোর মধ্যে দিয়ে অশান্ত রাজ্যবাসীর ক্ষোভকে প্রশমনের ভাবনা রাজনৈতিক নেতাদের মনে কাজ করছে? নাকি, কোনও ব্যক্তিকে তাড়াহুড়ো করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে পর্দার অন্তরালে থাকা ক্ষমতাবান ব্যক্তিটিকে সুকৌশলে আড়াল করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে?

যদিও, যে পরিবারের সদস্যাটি এমন পাশবিক নৃশংসতার বলি হয়েছেন, সেই পরিবারের সদস্যদের মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেকোনো সহানুভূতিশীল মানুষই তার আন্দাজ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে উক্ত ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষেই সেই তরুণীর পরিবারের দাবি জানানো স্বাভাবিক। কিন্তু এ প্রশ্নটিও চেতনাবান জনগণের মনে উদয় হওয়া প্রয়োজন যে, এই মৃত্যুদণ্ড দানের ফলে কি সেই পরিবারটি তাদের মেয়েকে ফিরে পাবেন? মনে পড়ে, ১৯৯৯ সালের ২৩শে জানুয়ারি ওড়িশার প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলে সামাজিক কাজে যুক্ত থাকা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিশ্চান মিশনারি গ্রাহাম স্টেইনস ও তার ছোট ছোট সন্তানদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা। স্টেইনস পত্নী কোনক্রমে প্রাণে রক্ষা পান। পরবর্তী সময়ে তার স্বামী ও দুই পুত্রকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় দোষী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড মকুবের পক্ষে তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে সওয়াল করেছিলেন শুধুমাত্র মানবতার দৃষ্টিভঙ্গিতে। এক্ষেত্রে 'হত্যার বদলে হত্যা'র মানসিকতা পরিত্যাগ করে একজন স্বামী সন্তানহারা বিদেশিনী ভারতবর্ষে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা-ও একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়ার মতো নয়।

পাশাপাশি, এ কথা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় থেকে দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ডের অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও দেশজুড়ে মহিলাদের ওপর হওয়া এই ধরনের পাশবিক অত্যাচারের উপর কাবু পাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, তেলেঙ্গানার পশু-চিকিৎসক তরুণীকে ধর্ষণ ও খুন করার অপরাধে অভিযুক্ত চার ব্যক্তিকে তো আবার হেফাজতে থাকাকালীনই সে রাজ্যের পুলিশ এনকাউন্টার করে হত্যা করে, যার ফলে সাধারণ মানুষ প্রবল উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। কিন্তু পুলিশের এই ধরনের আচরণ একদিকে যেমন বিচার ব্যবস্থার সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলার স্পর্ধা দেখানোর নামান্তর, অপরদিকে তা প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রকট করে তুলবে। প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ঢাকতে পুলিশ অনেক সময় রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে 'অতি সক্রিয়' ভূমিকা অবলম্বন করে থাকে। সাধারণ মানুষ আবেগের বশে পুলিশের 'এক্সটা জুডিশিয়াল কিলিং'-এর ঘটনাকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করলে তা ভবিষ্যতে নিরীহ আমজনতারই মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণ হয়ে উঠতে পারে, সেই বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার।

বস্তুত, আর জি কর-এ ঘটা নারকীয় ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, সেটাই হওয়া উচিত সমগ্র রাজ্যবাসীর একমাত্র দাবি। এ প্রসঙ্গে লক্ষ্য রাখা দরকার, দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে গিয়ে যেন আবার তদন্তের মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত না হয়ে পড়ে। স্মরণে রাখা দরকার, সিবিআই-এর মত সংস্থাও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আজও সনাক্ত করতে অপারগ। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে সিবিআই-এর ওপর অতি দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও চাপ সৃষ্টি করা অসম্ভব কিছু নয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত তদন্তের কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে যদি ক্ষমতাশালী রাঘব বোয়ালরা জাল থেকে বেরিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে তা হবে নির্যাতিতার ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়।

আসলে, কোনও অভিযুক্তের অপরাধ আদালতে প্রমাণ করার জন্য দীর্ঘ আইনি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। সমাজমাধ্যম সহ সর্বত্র আমরা যে মিডিয়া ট্রায়ালের রমরমা প্রত্যক্ষ করছি, বিচার প্রক্রিয়ায় এই বিষয়গুলি কোনোভাবেই আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। তদন্তকারী অফিসারদের মামলা সাজানোর মুন্সিয়ানা, নিশ্চিদ্র তদন্ত প্রক্রিয়া, পোস্টমর্টেম, ফরেন্সিক সহ নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি রিপোর্ট সহ ঘটনার সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে আদালতের সামনে সমগ্র বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়েই অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করা যায়। সেক্ষেত্রে তদন্তে ফাঁকফোকর থাকলে অভিযুক্তের দোষ প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে শুধু আবেগ নয়, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশেষ আদালতে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কঠিন শাস্তি যাতে নিশ্চিত করা যায়, সচেতন নাগরিক রূপে আমাদের সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত। পরিশেষে, প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ফলি এস নরিম্যানের একটি বিখ্যাত উক্তিটিকে একটু ভেবে দেখার অনুরোধ রইল - "ইজ ইট রিয়েলি নেসেসারি টু হ্যাং পিপল ইন অর্ডার টু কনভিন্স পিপল দ্যাট কিলিং পিপল ইজ রং?"

[লিখিত বক্তব্যের দায় সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব।]

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।