প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

বাংলায় কাউন্টারকালচার (প্রথম পর্ব)



সুরজিৎ সেন


।। মুখবন্ধ ।।

'পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা'

আমরা কাউকেই 'প্রান্তিক' হিসাবে চিহ্নিত করতে রাজি নই। গোলাকার ভূমার কোনটি কেন্দ্র, আর কোনটা প্রান্ত তা নির্ধারণ করা হয়েছে ক্ষমতার বলয়ের অঙ্গুলিহেলনে। আমরা সে ক্ষমতায়নের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত থাকতে চাইনা। বাংলার যে চাষী, হকার, কারিগরের পরম্পরাগত জ্ঞানভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতির কথা আমরা সজোরে বলে আসছি, সেই ধারায় নবতম-সংযোজন সুরজিৎ সেনের এই পুস্তিকাটি। এ বঙ্গে শ্রমের-প্রধান দাতারা ঐতিহাসিকভাবেই দুর্বল নন, তাদের দুর্বলতার আখ্যান একটি ঔপনিবেশিক নির্মাণ। আর, এই নির্মাণের কোলাবোরেটর-ভদ্রবিত্তরাই লিখেছেন আমাদের ইতিহাস। যা ইওরোপমন্য, মুসলমান-বিদ্বেষী, মহিলাদের হাত থেকে ক্ষমতা কাড়ার নির্লজ্জ দালালিমাত্র। সুরজিৎ এই পুস্তিকাটিতে বারংবার সেই বয়ানের শূন্যতাটিকে ধরতে চেয়েছেন, যেখানে বাবু আকাডেমিয়ার তর্জনী কম যায়, গেলেও তা কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের দাসানুদাস। সুরজিৎ এখানে যখন নিত্যানন্দের কথা বলেন, বলেন তারকেশ্বর সত্যাগ্রহের অংশগ্রহণকারী মহিলাদের কথা আমরা দেখি ইওরোপ-নির্ধারিত 'পলিটিক্স'-এর সংজ্ঞাবৃত্ত থেকে বেরিয়ে গিয়ে, জন্ম হচ্ছে এক অন্য 'লোকনীতি'র বয়ানের, যেখানে ভজনসাধনের পথেই নেমে আসছে সমাজবিপ্লবের প্লাবন, ভদ্রবিত্তীয় রাজনীতির বিপরীতে এক অন্য - অর্ধেক আকাশ। যখন, সুরজিৎ দেখান সিদ্ধাচার্যদের ও দাঁড়াকবিদের পদবীগুলির প্রত্যেকটির গায়ে সাঁটা - গায়ে গতরের শ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জীবিকার ছাপ - বোঝা যায়, কাহ্নপা অথবা গোঁজলা গুঁই আসলে ইতিহাসের কেন্দ্রেই ছিলেন, তারাই বিশ্বকর্মা, ইতিহাসের নির্মাতা, তাদের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে। এককালের ফ্রেঞ্চ-উপনিবেশ, ফরাসডাঙ্গা অথবা অধুনা চন্দননগর থেকে সুরজিৎ সেনের এই 'সদর দপ্তরে কামান দাগো' প্রচেষ্টাকে আমরা অজস্র সালাম জানাই। সাবেক উপনিবেশ থেকে তিনি যেন ঘোষণা করেছেন - 'আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব।' কাজেই, ক্রমে আলো আসিবে, আমাদের জগৎময় ডিজিটাল কারাগারের ফাঁক গলে এই অন্তর্ঘাতও চলিতে থাকিবে।

অত্রি ভট্টাচার্য

 

।। ১ ।।

'কাউন্টারকালচার' বা 'পাল্টাসংস্কৃতি' শব্দটির জন্ম ১৯৬০-এর দশকে, আমেরিকায়। এর অর্থ এটি এমন একটি দর্শন যা সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা, ক্ষমতা-নকশা, জীবনযাপন ও শিল্পশর্তর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছে। আমেরিকায় জন্ম হলেও পরবর্তীকালে এই দর্শনটি এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এই দর্শনটির দ্বারা অনুপ্রাণিত এক নগণ্য বাঙালি হিসেবে আমার মনে হয়েছে, আমাদের বাংলাতেও এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে তাঁদের অঙ্গুঠাছাপ রেখে গেছেন বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে। যাঁরা এই কাজ করেছিলেন তাঁরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই এই কাজ করেছিলেন।

।। ২ ।।

যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন 'কাউন্টারকালচার' বা 'পাল্টাসংস্কৃতি' শব্দটির জন্মই হয়নি, আমেরিকা দেশটিই আবিস্কৃত হয়নি। কিন্তু শব্দটি এই লেখায় ব্যবহার করছি বিষয়টিকে সংজ্ঞায়িত করবার জন্য। একদম নিখুঁত ঐতিহাসিক যে কালক্রম মেনে ঘটনাগুলিকে চিহ্নিত করছি না। একটা মোটামুটি কালক্রম মেনে চলার চেষ্টা করছি। শুরু করতে চাই চর্যাপদের কবিদের নিয়ে। চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম পদ সংকলন তথা সাহিত্য নিদর্শন। খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি-না সে বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল পরবর্তীকালে যার অবসান হয়েছে। এটি সৃজ্যমান বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মনে রাখতে হবে, চর্যাপদের রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংস্কৃতে পারদর্শী হলেও তাঁরা তৎকালীন অপরিণত বাংলাতেই পদগুলি রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার অদ্যাবধি আবিষ্কৃত আদিতম রূপ। চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্ব ভারত ও নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উড়িষ্যা, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউ বা রাঢ়ের অধিবাসী ছিলেন। চর্যাপদের কবিরা ছিলেন মূলত শ্রমজীবী সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ। এঁরা পেশায় ছিলেন তাঁতি, কুমোর, চামার, ধোপা, দর্জি, কামার। তবে অনেকে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয়, বণিক শ্রেণী থেকেও এসেছিলেন। কেউ কেউ রাজবংশজাতও ছিলেন। এঁরা জাতপাতের বিরোধী বলে পূর্বাশ্রমের পিতৃপ্রদত্ত নাম ত্যাগ করেছিলেন যাতে নাম দেখে এঁদের জাতি স্থির করা না যায়। এঁরা হিন্দুধর্মের সনাতন শাস্ত্রবিধান মানতেন না বলে এঁদের বেদবিরোধী ও নাস্তিক আখ্যা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত মোট ২৪ জন চর্যাকবির নাম পাওয়া গেছে। এঁরা লুই, কুকুরী, বিরুআ, গুণ্ডরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কাম্বলাম্বর, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, শবর, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তান্তী, লাড়ীডোম্বী। এই নামগুলির অধিকাংশই তাদের ছদ্মনাম এবং ভনিতার শেষে তারা নামের সঙ্গে 'পা' (পদ) পাদ বা চরণ অভিধাটি সম্ভ্রমবাচক অর্থে ব্যবহার করতেন। অনেকে কুকুরীপাকে চর্যাপদের একজন মহিলা কবি হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। “নৌবাহী নৌকা টান অ গুণে” - সরহপাদের এই পদটি সহ বিভিন্ন পদে তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূপ্রকৃতি, জলপথে যাতায়াত বা যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই সমাজে মানুষ ভাত, মাছ, হরিণের মাংস, দুধ, ফলমূল ইত্যাদি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। এছাড়া মানুষের মাদকাসক্তি ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির উন্মত্ত আচরণের ও স্পষ্ট ছবি চর্যাপদে বর্ণনা করা আছে। তবে এসবই সান্ধ্যভাষায় লেখা, এদের অর্থ দ্ব্যর্থবোধক, অর্থাৎ প্রতিটি লাইনের একটি সাধারণ অর্থ ও একটি গুঢ় অর্থ আছে, গুঢ় অর্থটি জানা যায় গুরুর কাছে দীক্ষা নিলেই। চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজিয়া সাধনসঙ্গীত, যদিও এঁরা কেউ রাজ অনুগৃহীত বৌদ্ধপন্থে যাননি। বাস্তব জীবনের জরা, মরণ ও পুনর্জন্মের বিষচক্র পার হয়ে নির্বাণ লাভই বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র। তবে এঁদের পথটি কিঞ্চিত ভিন্ন, সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে গিয়ে পদকর্তা নানারকম গুঢ় তান্ত্রিক আচার আচরণের উল্লেখ করেছে, যা অবলম্বন করলেই গুরুর পথনির্দেশে সাধক অতি সহজেই নির্বাণে পৌঁছে যেতে পারেন। বৌদ্ধ সাধক বা সিদ্ধাচার্যগণ 'কায়াসাধনা' বা সহজিয়া সাধন পদ্ধতির সেই সমস্ত গভীর গূঢ় তত্ত্বকথা ও সাধন প্রণালী সাংকেতিক ভাষার সাহায্যে কবিতায় প্রকাশ করতেন। সেই সমস্ত পদই বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদ নামে পরিচিত। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্ম তত্ত্ব দর্শন ও সহজিয়া সাধন প্রণালীই চর্যাপদ এর মুখ্য বিষয়। তবে তত্ত্ব কথাই প্রধান বিষয় হলেও কবিগণ অল্পবিস্তর প্রতিভার ও পরিচয় দিয়েছেন। ভাষা, ছন্দ, রূপ নির্মিতিতে অসাধারণ এই পদগুলিতে নানা বিচিত্র রূপক, প্রতীক ও চিত্রকল্পের সাহায্যে বৌদ্ধধর্ম, দর্শন তত্ত্ব ও সাধন প্রণালী আভাসিত হয়েছে। সর্বোপরি চর্যাপদে তৎকালীন সাধারণ বাঙালির প্রতিদিনের ধূলিমলিন জীবনচিত্র, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার টুকরো টুকরো রেখাচিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দূর্লভ 'চর্যাপদ'-এর অংশবিশেষ।


'চর্যাপদ'-এর প্রথম কাব্যের রচয়িতা লুইপা (Luipa)।


কানহাপা (Kanhapa), 'চর্যাপদ'-এর সর্বাধিক সংখ্যক কাব্যের রচয়িতা।


শান্তিদেব ওরফে ভুসুকু পা (Shantideva aka Bhusuku pa), 'চর্যাপদ'-এর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক কবিতার লেখক।

এঁরা অনেকেই দীক্ষা নিয়েছেন ডাকিনী বা যোগিনীদের থেকে। তখন গুরু হতেন মহিলারাও। কম্বলপাকে দীক্ষা দিয়েছিলেন কে? ডাকিনী - কম্বলপায়ের নিজের মা রাজরানী নামেই খ্যাত কিন্তু সেটি তাঁর আবরণ। প্রাসাদের বাইরে ডাকিনীচর্যাই ছিল সাধনা। পুত্রকে রাজকাজে বিমুখ করে নিয়ে যান সাধনার পথে। তন্তিপা ও কাহ্নপার গুরু জলন্ধরিপা। তাঁর দীক্ষাও ডাকিনীর কাছে। কুকুরীপা দীক্ষাও ডাকিনীর সঙ্গে। মণিভদ্রা ছিলেন কুক্কুরীপার শিষ্যা। দিংকপা ও দারিকপার গুরু লুইপা - তার দীক্ষাও ডাকিনীর কাছে। ভিক্ষপা, ধর্মপা কন্তলিপাএর শিক্ষা ডাকিনীর কাছে। চুরাশি জনের মধ্যে অন্তত কুড়িজনের দীক্ষাদাত্রী ডাকিনী। এই ডাকিনীদের দীক্ষা দেওয়ার প্রধান শর্ত হল জাতপাতের ধারণা ভোলা, শ্মশানে-মশানে থাকা, ভালমন্দ খাবারের অভ্যেস ছেড়ে পচা ও বাসি খাবার খাওয়া এবং বিভিন্ন ধরণের নেশাও ছিল জীবনযাপনের অঙ্গ। সমাজ এই সিদ্ধাদের অপর এবং পরিতাজ্য করে দিয়েছিল। গুরু মা এবং শিষ্যরা শ্মশানে, শুঁড়িখানায়, পথের ধারে বসে বা নিজেদের জীবিকার স্থানে বসে দর্শনচর্চা করতেন।

পাঠক, এবার মনে করুন, বিখ্যাত বামপন্থী ও বলিউডখ্যাত সলিল চৌধুরির লেখা ও সুর দেওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই সুপার হিট 'গাঁয়ের বধূ' গানটির কথা। সেই গানের মাঝে বলা হচ্ছে -
"ডাকিনী যোগিনী এলো শত নাগিনি
এলো পিশাচেরা এলো রে
শত পাকে বাঁধিয়া
নাচে তা তা তাধিয়া
নাচে তা তা তাধিয়া নাচে রে
কুটিলের মন্ত্রে
শোষণের যন্ত্রে
গেল প্রাণ শত প্রাণ গেল রে...
"

সলিল চৌধুরি বৌদ্ধ সহজিয়া চর্যাপদের সাধকদের ব্যাপারে জানতেনই না বা নাকউঁচু বামপন্থীদের মতো জানতেই চাননি, সমাজের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চালু ধারণাটিকেই গ্রহণ করেছেন। 'ডাকিনী যোগিনী' বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কালীপ্রতিমার দুই পাশে দন্ডায়মান দুই ভয়ঙ্কর নরখাদক নারী। সমাজের মূলস্রোতের ব্রাহ্মণ্যধর্ম ঘৃণায় নিম্নবর্গের সাধিকাকে কোথায় নামিয়েছে, বামপন্থী সলিলও সেই ব্রাহ্মণ্যবাদের জুতোয় পা গলিয়েছেন।


সিদ্ধাচার্য কবি কানহাপাদ (Kanhapada)-এর একটি স্কেচ।


সারাহাপা (Sarahapa)-র একটি সমসাময়িক ব্রোঞ্জের ছবি যা একটি তীর ধরে আছে, সম্ভবত নেপালে তৈরি।

এই চর্যাপদের সাধকদের বৈশিষ্ট্য ছিল -
১. এঁরা সামাজিক বৈষম্য ও জাতিভেদের বিরোধিতা করতেন।
২. ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করতেন না।
৩. নানা ধরণের মাদক ব্যবহারের সংস্কৃতি ছিল এঁদের।
৪. এঁরা মনে করতেন ঈশ্বর এই শরীরের ভেতরই আছেন, সেই দেহ ঈশ্বরেরই চর্চা করতেন তাঁরা।

চর্যাপদের কবিরা যে ভাষায় লিখতেন তাকে বলে 'সান্ধ্যভাষা'। এই সান্ধ্যভাষাকে আমি মনে করি কাউন্টারকালচারের ভাষা।

।। ৩ ।।

চতুর্দশ শতকের কবি চণ্ডীদাস, যিনি জাতের বেড়া ভেঙে ধোপার মেয়ে রামীকে সাধনসঙ্গীনী নির্বাচন করে সাধনা করেছেন, লিখেছেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্য ও আরও অনেক পদ। যিনি লিখেছিলেন, "সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই"। চণ্ডীদাসের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল বলে শোনা যায়। বীরভূমের নানুরে বাশুলীদেবীর মন্দিরের কাছে চণ্ডীদাসের কীর্তন দলের একটি নাট্যশালা ছিল। যেহেতু ব্রাহ্মণ চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী ছিলেন শূদ্রকন্যা রামী, সেই কারণে উচ্চবর্ণের চক্রান্তে স্থানীয় লোকজন তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে তাকে হত্যা করে। সেই ব্রাহ্মণশাসিত সমাজে কাউন্টারকালচারের এক উজ্জ্বল মুখ কবি চণ্ডীদাস।

।। ৪ ।।


শ্রীনিত্যানন্দ।

আরেকজন মানুষ শ্রীনিত্যানন্দ, যিনি শ্রীচৈতন্যর সহযোগী ছিলেন। পঞ্চদশ ষোড়শ শতক জুড়ে এই মানুষটি বাংলার হাজার হাজার নিম্নবর্গের মানুষদের ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে ভক্তি আন্দোলনে সামিল করেছিলেন। নিত্যানন্দকে আমি বাংলার ভক্তি আন্দোলনের এক কাউন্টারকালচার চরিত্র বলে মনে করি। অবধূত সন্ন্যাসী হয়েও নবদ্বীপে এসে শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে পরিচয় হবার পর নিত্যানন্দ নিজের দণ্ড-কমণ্ডলু ভেঙে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিলেন। কোনো ভারতীয় সন্ন্যাসী যা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারে না, এ আচরণ পাপাচার। শুধু তাই নয়, শ্রীচৈতন্য সদ্য সন্ন্যাস নিয়ে পায়ে হেঁটে চলেছেন পুরীতে, সঙ্গে কয়েকজন সহচর, আছেন সর্বক্ষণের সঙ্গী নিত্যানন্দ। কয়েকদিন চলার পর একদিন চৈতন্য দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছেন, পাশে রাখা দণ্ড-কমণ্ডলু, সেই অবসরে নিত্যানন্দ হঠাৎ দণ্ড-কমণ্ডলু নিয়ে ভেঙে নদীর জলে ফেলে দিলেন। শ্রীচৈতন্য মেনে নিয়েছিলেন এই ঘটনা। এও সন্ন্যাসধর্মের প্রতি এক বিদ্রোহ। আবার শ্রীচৈতন্যর অনুরোধে তিনি সন্ন্যাস ত্যাগ করে বিয়ে করে গার্হস্থ্য গ্রহণ করেন, এমনকী দুটি বিবাহ করেন। বৈষ্ণব হয়েও তিনি বৈষ্ণবোচিত আচরণ করতেন না। তিনিই প্রথম সংকীর্তনে মেয়েদের অংশ গ্রহণ করতে বলেন, এব্যাপারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। এমনকী নারী যে গুরু মা হতে পারে, দীক্ষা দিতে পারে এই সবই নিত্যানন্দ শুরু করেন।

।। ৫ ।।

এর অনেক কাল পরে যদি আমরা আঠারো শতকের বাংলার কবিদের দেখি, তাহলে গোঁজলা গুঁই, নিত্যানন্দ বৈরাগী, নৃসিংহ রায়, ভবানী বণিক, কৃষ্ণাকান্ত চামার বা কেষ্টা চামার, ভোলা ময়রা, রঘুনাথ দাস, রাম বসু, এইসব কবিয়ালরা যে ভাষায় কবিতা লিখতেন বা ততক্ষণাৎ এ শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে যেভাবে কবিতা রচনা করতেন তা এক কথায় বৈপ্লবিক সাহিত্য প্রচেষ্টা। দাঁড়িয়ে কবিতা পড়বার রেওয়াজ এই কবিরা শুরু করেন বলে এঁদের দাঁড়াকবি বলা হতো।


ভোলা ময়রার জীবন অবলম্বনে পীযুষ গাঙ্গুলির পরিচালনায় 'ভোলা ময়রা' নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ১৯৭৭ সালে। এই ছবিটিতে অভিনয় করেন উত্তমকুমার, সুপ্রিয়া দেবী, বিকাশ রায় প্রমুখ।

গোঁজলা গুঁই ছিলেন একজন বাঙালি লোকগায়ক। তিনি বাংলা কবি গানের আদি পুরুষদের অন্যতম। তাকে কবি গানের স্রষ্টাও বলা হয়। গোঁজলা গুঁই আনুমানিক ১৭০৪ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত বিশদ জানা যায় না। তিনি টপ্পা রীতি ও টিকারা সঙ্গতে কবিগান করতেন। তাকে কবিগানের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে তাঁর সমসাময়িক কবিয়ালরা ছিলেন রাসু, নৃসিংহ, লালু, কেষ্টা মুচি, নন্দলাল। অনেকে মনে করেন, এঁরা ছিলেন গোঁজলা গুঁইয়ের শিষ্য।

।। ৬ ।।

গোঁজলা গুঁইয়ের শিষ্যদের মধ্যে নিত্যানন্দ ও নৃসিংহ ছিলেন হুগলি জেলার চন্দননগরের বাসিন্দা। আঠারো শতকের বাংলার কবিয়াল বা দাঁড়াকবিদের মধ্যে চন্দননগরের নিত্যানন্দ বা নিতে বৈরাগী, রাসু আর নৃসিংহ দুই ভাই এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ছিলেন বিখ্যাত। এঁরা ছাড়া নীলমণি, বলরাম, ভবানী কবিয়ালরাও জনপ্রিয় ছিলেন - এঁরা মূলত নিম্নবর্গের মানুষ ছিলেন। এইসব কবিয়ালরা যে ভাষায় কবিতা লিখতেন বা তৎক্ষণাৎ শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে যে ভাবে কবিতা রচনা করতেন তা এককথায় বৈপ্লবিক সাহিত্য। দাঁড়িয়ে কবিতা বলতেন বলে এঁদের দাঁড়াকবি বলা হতো। আজকে যারা বাংলায় র্যাপ (Rap) করে তাদের দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়ে এই দাঁড়াকবিদের কথা, আজকের বাংলা rapper-রা হল সেই সময়ের দাঁড়াকবিদের প্রকৃত উত্তরাধিকার। এরপরে বলতে হয় চন্দননগরের পাঁচালিকারদের কথা। গান, বাজনা, ছড়া কাটা, গানের লড়াই ও নাচ এই পঞ্চাঙ্গের সমাবেশ ঘটে বলে একে 'পাঁচালি' বলা হয়। এই পাঁচালি আঠারো শতকের বাংলায় খুবই জনপ্রিয় মনোরঞ্জনের একটি মাধ্যম ছিল। চন্দননগরের পাঁচালিকারদের মধ্যে চিন্তামণি বা চিন্তেমালা, রামভাট, ঢ্যামনা গোপাল এঁরা ছিলেন বিখ্যাত। মেয়ে পাঁচালি সম্ভবত চন্দননগরেই প্রথম চালু করেন আনন্দমোহিনী বা আন্দি, এরপর এই মেয়েপাঁচালি বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।

।। ৭ ।।


বঙ্গনটী বিনোদিনী দাসী।

উনিশ শতকে পাঁচালি নতুন ফর্ম নেয়। পাঁচালির কনটেন্টে যুক্ত হল সংলাপ, আরও চরিত্র, আরও ঘটনা, জন্ম হল একটি নতুন শিল্পের, যার নাম 'যাত্রা'। চন্দননগরে সে আমলে বিখ্যাত যাত্রাপালাকাররা হলেন গুরুপ্রসাদ বল্লভ, এঁর চণ্ডীযাত্রা বিখ্যাত ছিল, এছাড়া মদন মাস্টার, নবীন মাস্টার এঁরা খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তবে মদন মাস্টারের পুত্রবধূ বউ মাস্টারও পালাকার হিসেবে এতটাই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, যে তাঁর নামে 'বউ মাস্টার লেন' নামে একটি রাস্তা আছে, উত্তর চন্দননগরে।

।। ৮ ।।


'চণ্ডীদাস' (অক্টোবর, ১৯৩২) ছায়াছবির প্রচার পুস্তিকা।

এঁরা শুধু নয়, কবিয়ালের সাবঅল্টার্ন ডিসকোর্সটি যাঁদের আয়ত্তে ছিল এ সেই নীলমণি পাটনি, জগন্নাথ বেনে, মতি পসারি, ভীমদাস মালাকার, জগা কৈবর্ত - এঁদের সবাইয়ের নাম আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছে ঔপনিবেশিক শিক্ষা। এর জন্য দায়ী লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি আর লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আমরা ভুলে গেছি আমাদের সাহিত্যের অন্য স্বরগুলো, আমরা হারিয়ে ফেলেছি বাংলার কাউন্টারকালচার সাহিত্যের টেক্সট। আমাদের স্মৃতি বিপর্যয় ঘটে গেছে, ঔপনিবেশিক শাসক তাঁর নিজের সাহিত্যের টেক্সট আমাদের স্মৃতিতে গেঁথে দিয়েছে। তাই ইংলন্ডের ছুতোর কবি উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা পড়া আমাদের কাছে গর্বের বিষয়, কিন্তু গোঁজলা গুঁই বা কেষ্টা চামারের কবিতা পড়ার কথা আমরা ভাবতে পারি না, বিষয়টিকে 'অশিক্ষিতের ব্যাপার' বলেই মনে করি। ঔপনিবেশিক শিক্ষার উন্নাসিকতার কারণে আমরা এঁদের টেক্সটগুলো সংরক্ষণযোগ্য মনে করিনি। সেই সব টেক্সট অধিকাংশই আজ লুপ্ত।

(ক্রমশ)