পরিবেশ ও বিজ্ঞান

শরীরে প্রোটিনের চেহারা বদলে গেলে কী হতে পারে



ডঃ তমোঘ্নী মান্না


ভদ্রলোক সেদিন সকালে বেশ সুস্থ অবস্থাতেই বাজারে গেলেন। বাজার শেষে তাঁর মনে হল তিনি বাড়ি ফেরার রাস্তাটা চিনতে পারছেন না। শেষে পরিচিত লোকজনেরাই তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে গেলেন। কী হলো তাঁর? তিনি কি হারিয়ে গেলেন স্মৃতির ভুলভুলাইয়ায়? হ্যাঁ, সত্যিই তাঁর ধরা পড়লো অ্যালজাইমার রোগ। নানা পরীক্ষার পর জানা গেলো, তাঁর মস্তিষ্কের কিছু প্রোটিন তাদের চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। তার ফলেই এই বিপত্তি।

প্রোটিন আমাদের শরীরের অন্যতম জৈব রাসায়নিক উপাদান। প্রোটিন শরীরের শক্তির যোগান দেয়। নানান হরমোন, উৎসেচক, এমনকি হিমোগ্লোবিনও প্রোটিন দিয়ে তৈরি। প্রোটিন শরীরের সঞ্চিত পদার্থের পরিবহন করে, রোগ প্রতিরোধকারী এন্টিবডি তৈরি করে। এক কথায় নানা ধরনের প্রোটিন আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।

শরীরে প্রতিটা প্রোটিনের এক বিশেষ আকার থাকে অর্থাৎ কে কতগুলো এবং কী ধরনের অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি হবে, সেগুলো কীভাবে সাজানো হবে, তারা আবার কী ধরনের বন্ধনীর মাধ্যমে যুক্ত হবে সবই নির্দিষ্ট থাকে। নির্দিষ্ট থাকে তাদের আণবিক ওজন। এই প্রোটিনেরা সব সময় ভাঁজ হয়ে একটা ত্রিমাত্রিক সুস্থির অবস্থায় আসে। আর এই ভাঁজগুলো একেবারে নির্ভুল হতে হয়।

এখন এই প্রোটিনের গঠন যদি কোনোভাবে অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে তাহলে তার ফল হয় মারাত্মক। এতে বিভিন্ন কোষ কলা ও অঙ্গের কাজকর্মে বাধা পায়; নানারকম অসুস্থতা দেখা দেয়। এই ঘটনাকে এক কথায় বলা হয় 'প্রোটিনোপ্যাথি'। এই প্রোটিনোপ্যাথির ধারণা শুরু হয় ১৮৫৪ সালে বিজ্ঞানী র্যাডলফ ভিরকো এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের কাজের মধ্য দিয়ে।

শৃঙ্খল-এর মতো কাঠামো দিয়ে প্রত্যেক প্রোটিনেরই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঠিকমতো ভাঁজ না হওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। অবশ্যই সুখের কথা, খুব কম সংখ্যক প্রোটিন এই জটিলতার মাধ্যমে রোগ বাধাতে পারে। বার্ধক্যে, মানসিক চাপে কিংবা জীনগত সমস্যার জন্য, বিচ্ছিন্ন মনোমারের মত অস্থির প্রোটিনেরা সহজে ভুল ভাঁজে বিন্যস্ত হতে পারে। এদের এই পরিবর্তিত চেহারা যেমন পাল্টে দেয় তাদের রাসায়নিক চরিত্র, তেমনই তৈরি করে নানান রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা।

এইসব পরিবর্তিত চেহারার প্রোটিনেরা যেসব রোগ সৃষ্টি করে এবার তাদের কথা আসা যাক। যেমন, 'অ্যালজাইমার' রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো, স্মৃতি চলে যাওয়া। এক্ষেত্রে গোলমেলে প্রোটিন হলো, অ্যামি-লয়েড বিটা পেপটাইড এবং মাইক্রোটিউবল অ্যাসোসিয়েট প্রোটিন টাও বা MAPT। এর সঙ্গে আবার ১৭ সংখ্যক ক্রোমোজোমের সম্পর্ক আছে।

দেখা গেছে মস্তিষ্কের কোষের প্রোটিনেরা চেহারা বদলালে কেন্দ্রীয় স্নায়ুকোষেরা এক 'বিপদ সংকেত' পাঠায় যা আমাদের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে। স্নায়ু অবক্ষয়জনিত অসুখে এই বিপদ সংকেত কোষের ভেতর ও বাইরের প্রোটিনদের কাজে লাগিয়ে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সৃষ্টি করে।

এরপরে যে স্নায়বিক রোগটির কথায় আসব তা হল 'পারকিনসনিজম্'। এর প্রধান বিশেষত্ব হল, হাত ও অন্যান্য অংশে কাঁপুনি, কাঠিন্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত চলাফেরায় অসুবিধা। মস্তিষ্কের বেসাল গাংলিয়ায়, যেখানে ডোপামিন ক্ষরণকারী স্নায়ুরা থাকে, সেই অংশের পার্স কাম্পাকা অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগ হয়। যে প্রোটিন এখানে বিপত্তি ঘটায় তা হল, আলফা-সাইনুক্লিন।

এখন আরও কিছু প্রোটিনোপ্যাথির উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন, 'গ্লোকোমা'। এতে রেটিনাল কোষের অপযোজনে যে অন্ধত্বের সৃষ্টি হয় তার জন্য দায়ী বিকৃত হওয়া আমিলয়েড বিটা পেপটাইড। রক্তের হিমোগ্লোবিনের প্রোটিনের চেহারার পরিবর্তন হলে লোহিত কণিকার চেহারা কাস্তের মতো হয়, ফলে হিমোগ্লোবিনের অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমে যায়। যার জন্য দেখা দেয় 'সিকলসেল অ্যানিমিয়া'। আর প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ এতে মারা যায়। টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগ যেখানে শরীরে বাইরে থেকে ইনসুলিন গ্রহণ করতে হয়, রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য সেখানে গোলমাল বাধায় Islet Amyloid Polypeptide বা IAPP এবং Amylin। মাওপ্যাথি বা পেশী দুর্বলতা রোগে আকার বদলানো প্রোটিনটি হলো অ্যামিলয়েড বিটা পেপটাইড। এছাড়া চোখে ছানি পড়ার জন্য ক্রিস্টালিন্; বিশেষ ধরনের হৃদরোগ, অ্যাট্রিয়াল আমিলয়েডোসিস-এ অ্যাট্রিয়াল ন্যাট্রিউরেটিক ফ্যাক্টর, আর বিশেষ ফুসফুসের রোগ, পালমোনারি অ্যালভিওলার প্রোটিনোসিস-এ surfactant protein-C-কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রোটিনের চেহারার ত্রুটিজনিত এমন অজস্র অসুখ আছে। নানান জটিল রোগের মূল কারণ এই গোলমেলে চেহারার প্রোটিনেরা। এদের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। এ লড়াইয়ের সফল হোন বিজ্ঞানীরা - এটাই আমরা চাই।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।