পরিবেশ ও বিজ্ঞান

কোথায় গেল শামাপোকা? গভীর উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা



বিশেষ প্রতিবেদন


এখন হলে কি ফেলুদাও পারতেন টিনটোরেটোর যিশুর নকল ছবি চিনতে? কেননা যে গ্রিন লিপহপারের রক্ত-সমাধি আসল-নকলের ফারাক ধরিয়ে দিয়েছিল প্রদোষ মিটারকে, সে-ই তো আজ প্রায় নেই। দুর্গাপুজো সেরে কালীপুজো পেরিয়ে গেলেও এখন আর তাদের দেখা মিলছে না। সন্ধ্যার পর থেকে অতিষ্ট হয়ে যে মানুষটি ঘরের আলো বন্ধ করে বসে থাকতেন তিনিই এখন একপ্রকার মিস করছেন সেই 'কুখ্যাত' শামাপোকাকে। কলকাতায়, এই বাংলায় তাদের দেখা বিশেষ মিলছে না।

এমন গরহাজিরার খবরে ধানচাষীরা ঈষৎ খুশি হলেও পরিবেশবিদ থেকে বিজ্ঞানের লোকজন সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। ভয়ানক আতঙ্কে রয়েছেন তাঁরা। কোথায় গেল শামাপোকা? তবে কি এরাও বিলুপ্তির পথে। ধান উৎপাদনকারী রাজ্যেই মূলত দেখা যায় এই শামাপোকা। যার বৈজ্ঞানিক নাম নেফোটেট্রিক্স ভিরেসেনস। এদের প্রধান খাবার হল ধানগাছের রস। আলোর উৎসের দিকেই এদের ঝোঁক। আলো নিভে গেলে অনেক সময় শামাপোকাকে খসে পড়তে দেখা যায়।

শ্যামাপুজোর সঙ্গে এই পোকার বিশেষ কোনও সংযোগ নেই, কিন্তু এই অক্টোবর-নভেম্বর বা বাংলায় আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণের মধ্যেই তাদের আগমন হতো বলে হালকা সবুজ রঙ। ওই ক্ষুদ্র কীট বাড়ি হোক বা অফিস, দোকান, বাজার - যত্রতত্র, যেখানেই আলো জ্বলতে দেখা যেত, সেখানেই তারা দলবেঁধে হামলা করত। গত কয়েক বছরে তারা হাতে, ঘাড়ে কামড়ও বসাচ্ছে। আগে সেই প্রবণতা তেমন ছিল না বললেই চলে। শামাপোকা আলোর উৎসবের বার্তা বয়ে আনে, এমন উক্তিও শোনা যেত আগে ঘরে-ঘরে। কিন্তু আচমকা তাদের গতিবিধি কমে যাওয়ায় আমজনতা চিন্তিত হয়ে পড়েছে, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রশ্নটিই ঘুরেফিরে আসছে। শুধু শামাপোকাই নয়, বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, কৃমি, ছোট মাছের সংখ্যাও কমেছে। যা চট করে চোখে না পড়লেও, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ে থাকে।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের (দূরশিক্ষা) পরিবেশবিদ্যার অধ্যাপক অম্লান দে-র কথায়, "জলবায়ু পরিবর্তনই মূল কারণ। একসময় কালীপুজোর আগেই শামাপোকা দেখা যেত। তা এখন আর দেখা যায় না। তবে অল্প হলেও কালীপুজোর পরে শামাপোকার দেখা মিলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ওদের ক্রোনোবায়োলজিরও বদল ঘটছে। আবার কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাবে অর্থাৎ বায়ুদূষণ ক্রমশ বাড়তে থাকায় শামাপোকার রঙও বদলে গিয়েছে। আগে যে হালকা সবুজ রঙ ছিল, এখন তা বাদামি-কালো হয়ে গিয়েছে। আর জিনগত পরিবর্তনের কারণে এখন পোকাগুলি কামড়াচ্ছে। অভ্যাস ও আচরণগত পরিবর্তনও হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের উপর যে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে তারই একটি অংশ এই শামাপোকার বিলুপ্তিও"। শহুরে এলাকায় ঘাসজমি কমতে থাকায় সবুজ কমছে। ফলে এরা ডিম পাড়তে পারছে না। যেহেতু শামাপোকা ধান চাষে ক্ষতি করে, তাই গ্রামীণ এলাকায় চাষজমিতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। তার প্রভাবেও প্রজনন হ্রাস পাচ্ছে এবং পোকার সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন তিনি। সেইসঙ্গে 'অনিয়মিত' বর্ষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শামাপোকা কমে যাওয়ায় মানুষ চিন্তিত হলেও পরিবেশবিদ, জীববিদ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর জন্য মানুষের উপর সরাসরি কোনও খারাপ প্রভাব পড়ছে না। বরং ধানচাষে আগে যে ব্যাঘাত ঘটত, তা এখন অনেক কমেছে। কিন্তু, বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ খাদ্যশৃঙ্খলের উপর এর প্রভাব পড়ছে। আর খাদ্যশৃঙ্খলের উপর প্রভাব পড়ায় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেশ কিছু পাখি, এই শামাপোকার মতো ছোট ছোট কীটপতঙ্গ খেয়ে বাঁচত। তাদের খাবার ক্রমশ কমছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান দূষণের কারণে মহাসাগরে অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। যার জেরে বিভিন্ন ছোট ছোট মাছের যেমন মৃত্যু হচ্ছে, তেমনই টুনা, মার্লিনের মতো সামুদ্রিক বহু মাছও মৃত্যুর মুখে চলে যাচ্ছে। বহু ছোট-ছোট পোকামাকড়ের অবলুপ্তি, প্রজনন না হওয়া পরিবেশের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। যা আপাতদৃষ্টিতে তেমন গুরুতর না হলেও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ছোট কীটপতঙ্গগুলিও প্রকৃতিরই সম্পদ। ফলে পতঙ্গবিদ, পরিবেশবিদরা বারবারই দূষণ কমানোর প্রচেষ্টায় জোর দেওয়ার কথাই বলছেন।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।