গল্প

শ্যাওলা



অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী


শ্যামশ্রী কো-অপারেটিভ হাউসিং সোসাইটি। শহরতলী কলকাতায় সত্তর দশকের শেষার্ধ আর আশির আরম্ভ জুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য সমবায় আবাসনগুলির মধ্যে একটা। মানুষের চাপ বাড়ছে। ঠাঁই চাই। তাই, কর্মজীবী, মূলতঃ সরকারী অফিসের তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের অফিসার, করনিক-বড়বাবু ও সরকারী কারখানার ওভারসিয়ার স্থানীয় মানুষজন, কিছু সরকারী হাসপাতালের নার্স, ইস্কুলমাস্টার, ব্যঙ্ককর্মীরা, তাঁদের নিউক্লিয়ার পরিবারবর্গ - এক এক করে ছোটোবড়ো ফ্ল্যাটগুলোর মালিক হতে থাকলেন। লটারি প্রথায় অ্যালটমেন্ট। সাধ্য, সাধ ও কর্মসাধন অনুসারে কেউ কেউ পেলেন এল-আই-জি ঘরগুলো, কেউ এম-আই-জি।

লোকেশন হিসেবে নেহাত মন্দ নয়। সোসাইটির গেটের সামনে দিয়ে ছুটে গেছে রাজপথ। সেই পথের উৎস মহানগরীর ডিজেলপোড়া ধোঁয়ায় ধূসর থেকে কালো হতে হতে স্পন্দনরত হৃৎপিণ্ড। আর পথের শেষ সুন্দরবনের বাদাবন আর নোনাজল মোহনার কোথাও একটা। রাস্তার মাঝখান চিরে উঁচু ট্রামরাস্তা চলে গিয়েছিল, যদিও গাঙ্গেয় মোহনা অবধি নয়। সেকালের উঁচু ট্রামলাইনের ফাঁকে দুলতে দেখা যেত বিবর্ণ পার্থেনিয়াম ফুলদের। যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিশেষ কেউ সেইসব দেখত না।

আর সোসাইটির গেটের ঠিক উলটো দিকে বিনোদিনী সিনেমা। সেকালের বিনোদন-উৎস হিসেবে মন্দ নয় তার শো-গুলো। মিঠুনের সিনেমা থাকলে ভুতে ঠেলা মারা দুপুরবেলার আপাত-নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে কিছুক্ষণ বেশ ভালোমতো হল্লাগুল্লা ভেসে আসে হাউসিং-এর মোটামুটি ত্রিশ চল্লিশ শতাংশ ফ্ল্যাটঘরে। শিশুদের ভালোই লাগে। বাড়ির বড়োরা যারা সেই সময় থাকা তাঁরা বিশেষ গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন না জনতার সেই মিঠুন- আহ্লাদ।

তবে অনেকের কাছেই সমস্যার বিষয় যেটা, সেটা হলো, চারিদিকে অজস্র জলা। এককালে যখন হাউসিং, সিনেমা বা এমনকি সেই রাস্তাটাও তৈরী হয়নি, তখন হয়তো সবটা মিলে একটা জলা ছিল। এখন নানা জোড়-বিজোড় টুকরোয় বিভক্ত। বাড়িঘর হয়েছে, দোকানপাট, সিনেমা, এমনকি সেই সমবায় আবাসন বসবার আগে থেকেই সেই অঞ্চলের আদি বাজার এলাকাকে পুরসভার কলকাতা ইম্মপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট চুন সুড়কি সিমেন্ট-এ বাঁধিয়ে দিতেও কসুর করেনি।

বাজার এলাকার পাশেই বাশুলীর মাঠ। সেখানে বিশালাক্ষীর মন্দির ঘিরে সম্বৎসর মেলা বসে। মন্দির ও মেলা যদিও সেই হিন্দু দেবীর নামেই চিহ্নিত, কিন্তু তার লোকায়ত অথবা বৌদ্ধ নামেই লোকের মুখে ও স্মৃতিতে থেকে গিয়েছে মাঠের নাম। আবার হাউসিং ছাড়িয়ে, বাজার ছাড়িয়ে, রাজপথ ধরে মূল কলকাতার দিকে হনহন করে হেঁটে গেলে একটা পুকুর ঘিরে তৈরী দেওয়াল দেখা যায় যা মুঘল আমলে তৈরি, সম্ভবতঃ সেই অঞ্চলেরই আরেক অন্তঃ-মধ্যযুগীয় ভূস্বামী প্রতাপাদিত্যের পতনের কিছু পরে পরে তৈরী, যেমন তারও আন্দাজমাফিক একশো বছরের মধ্যেই, বর্গী হামলার আগ-আগ দিয়ে নির্মিত চব্বিশ-দেউল শিবমন্দির, বা সেই অঞ্চলে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত দ্বাদশ-দেউল, ছ'মন্দির, জোড়ামন্দিরেরা।

সব মিলিয়ে, সেই জলা এলাকা বাস্তুতন্ত্র ঘিরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে মানুষের আবাস-নিবাস ছিল বহু যুগ ধরেই। অথবা বলা যেতে পারে, সেইখানের মানুষজনের বাস্তুভিটা ঘিরেই বিস্তার হয়েছিল জলাভূমি। এখন তা উঁকি মারতে থাকল আশির দশকের কলকাতা শহরতলীর সমবায় আবাসনের জানলা দিয়ে। কোথাও কোথাও আবার জলাশয় একটু একটু করে ভরাট হচ্ছিল। আবার কোথাও কাদায় কাদায় মজে জলাশয় থেকে মাটি মাথা তুলেছিল। আর মাটিতে মাথা তুলছিল বাঁশঝাড়, নারকেল-সারি। কিছু দূরে দূরে 'লোন রেঞ্জার'-এর মতো দাঁড়িয়ে আকাশে উঁকি মারতো সেই কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা তালগাছ।

এসবের সাথে সাথে, সেই নরম কাদামাটিতে ল্যাণ্ডফিল ফেলে গড়ে তোলা শ্যামশ্রী হাউসিং সোসাইটির পাঁচিলে দেওয়ালে ভিতরে বাইরে জমতে থাকত শ্যাওলা, মোল্ড-ছত্রাক। এত শ্যাওলা, এত ছত্রাক যে তার ইয়ত্তা করা যায় না। বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়ির গৃহবধূগণ যখন বিকেলবেলায় তাদের শিশুদের হাউসিং-এর মাঠ, স্লিপ, দোলনা বা মেরি-গো-রাউণ্ডে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে একে অপরের সাথে আলাপচারিতায় রত হতেন, অথবা অফিস থেকে ফিরে অথবা অফিসরত মানুষদের রিটায়ার্ড পিতৃপুরুষগণ যখন সন্ধ্যা নাগাদ হাউসিং চত্ত্বরের একাধিক সিমেন্ট-বাঁধানো বেঞ্চিতে আড্ডা দিতে বসতেন, তখন সেইসব আলাপ-আলোচনার মধ্যে একটা প্রাত্যহিক টপিক থাকত দেওয়াল বা ছাদে নোনা ধরা বা 'ড্যাম্প লেগে যাওয়া' এবং এর ফলস্বরূপ বিভিন্ন ফ্ল্যাটবাড়ির অস্থানে কুস্থানে পলেস্তরা খসে পড়া; তদসঙ্গে থাকত কি কি উপায়ে তাঁরা সেই সমস্যার সমাধান করতে পারেন বা করছেন সেই প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ। কেউ চিন্তান্বিত গম্ভীর স্বরে, কেউ অসহায়, দীর্ঘশ্বাস-নিসৃত স্বরে, কেউ বা তিক্ত তিতিবিরক্ত স্বরগ্রাম নিক্ষেপ করে করে চালাতেন সেই আলোচনা।

তবে, সেই শ্যাওলাধরা জীবনযাপনের মধ্যেও যে কিছু চাঞ্চল্য একেবারে আসে না, তা নয়। তারই মধ্যে একটি, বিশেষতঃ শিশু ও পুরুষদের মধ্যে, হল ফুটবল বিশ্বকাপ। তখন কিছু কিছু ফ্ল্যাটের বসার ঘরে অ্যান্টেনা সহ সাদাকালো টিভি লেগেছে। দূরদর্শনে সমর্থ হয়েছেন মধ্যবিত্তের অনেকেই। তাই, ফুটবল বিশ্বকাপের সময়ে হাউসিং কমপ্লেক্সের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসা পুরুষদের আলোচনায় শ্যাওলা ও নোনা ফিচার করে না।

এইরকমই এক বিশ্বকাপ আসন্ন। সেই সময়ে, আবাসনের এক কমিটি মিটিং-এ নবনির্বাচিত সমবায়-সভাপতি শ্রী শ্যামল দত্ত উৎসাহের বশে ঘোষণা করে বসলেন যে, যেহেতু ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালীন হাউসিং-এর শিশু ও কিশোর বালকদের মধ্যে হাউসিং-এর মাঠে ফুটবল খেলার হিড়িক বেড়ে যায়, এবং যেহেতু সেই মাঠে একজোড়া সাদা পেইন্ট-মাখা লোহার গোলপোস্ট বসানো হলেও মাঠ উঁচুনিচু ঢিপিময়, সেহেতু বিশ্বকাপের আগেই সেই মাঠের সমতলীকরণ করে ফেলা হবে। উদ্দীপনার আঁচ ছুঁল উপস্থিত আবাসন সমিতির সদস্যবৃন্দের মনে ও সিদ্ধান্তে। উপস্থিত সভ্যবৃন্দের মধ্যে যাঁরা ভাবিকালে সমিতি-সভাপতি হওয়ার সদিচ্ছা পোষণ করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকের মনে পড়ল বিগত শীতকালীন অধিবেশনে আবাসনের শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রেস, কমলালেবু-রেস, হাঁড়ি-ভাঙা সহ নানান ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিষয়ে আলোচনা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়নি সেই মাঠের অসমতার জন্য। তাই তাঁরা শ্রী দত্ত ওরফে শ্যামলবাবুর প্রপোজালে তাঁর থেকেও দ্বিগুন বেশী উৎসাহে সায় দিলেন।

এদিকে, সেবছর, অসময়ে বৃষ্টি হল, এবং শহরতলী ছেড়ে, কল্লোলিনী তিলোত্তমাকে পিছনে ফেলে, মাইল পাঁচেক দূর থেকে আরম্ভ করে বহু বহু দূর অবধি কৃষকদের বুক ফাটিয়ে, সেই বৃষ্টি চলল একটানা বেশ কিছুদিন। ফলতঃ, শ্যামশ্রী আবাসনের প্রাপ্তবয়স্ক বাসিন্দাদের চিন্তিত আলোচনার মধ্যে মূল বিষয় শ্যাওলা, নোনা, ড্যাম্প বা বিশ্বকাপ না হয়ে হল মূল্যবৃদ্ধি ও অসময়ে শীত। কিন্তু শিশু ও কিশোরদের মনে অন্য আরেক মেঘ দেখা দিল। পুরো মাঠ বৃষ্টি আসার আগে খুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। ভরাট করার আগেই কাপ শুরু হতে চলল। মাঠ ঘিরে উঁচু হয়ে থাকা মাটির নবনির্মিত ঢিপিগুলোর থেকে কাদা ধুয়ে মাঠের খুঁড়ে রাখা গর্তের বৃষ্টির জলের সাথে মিলেমিশে মাঠের যা দশা হয়েছে, তাতে ওতে ফুটবল খেলা অসম্ভব। একই চিন্তার মেঘ শ্যামলবাবুর মনকেও ছুঁয়ে গেল বটে, তবে তাঁর মনকে যে সব কারণে সেই দুশ্চিন্তার মেঘে ছেয়ে যেতে থাকল, সেই সব কারণ জানা আবাসনের শিশু ও কিশোরদের পক্ষে সম্ভব না। ফলতঃ, হাউসিং-এর 'ব্লক' হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট-বাড়ির ঘরে ঘরে ধিক ধিক করে জ্বলে উঠল শিশু-কিশোর বিদ্রোহের শিখা।

বিদ্রোহীগণ সাম্যবাদী সরকার শাসিত অসম মাঠ দেখে বড়ো হয়েছেন। বলা যেতেই পারে যে তাঁদের মন যা সেই প্রাক-বিশ্বায়ন যুগে প্রাকৃত থেকে বহু ও মেট্রোপলিটান-নাগরিক থেকে কিছু দূরে অবস্থিত তাঁদের করে তুলেছিল 'বর্ন রেভলিউশনারি'। আর ওয়াকিবহাল মাত্রেই জানেন যে বিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সাবোটাজ। কোনো ঘরের বড়োরা ঘুণাক্ষরেও আঁচ পেলেন না সামগ্রিক পরিকল্পনার বিষয়ে। শোষকদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় থাকল এইভাবে। অতঃপর, সে'বছরের বিশ্বকাপের এক আফ্রিকান ও এক লাতিন আমেরিকান দেশের মধ্যে ঘটতে চলা প্রথম ম্যাচের রেফারির খেলা শুরুর বাঁশি, যা ভারতীয় সময় সন্ধ্যে পাঁচটায় বেজে উঠবে সাদাকালো দূরদর্শনে, তা বাজার ঘণ্টা দুই আগেই, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, মেঘমরা আলো ও শ্যাওলাপিচ্ছিল মেঝে সত্ত্বেও, সবকটা বিল্ডিং-এর ছাতে উঠে পড়লেন বিদ্রোহীগণ, যাঁদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠঃদের বয়স আনুমানিক ১৪-১৫, কনিষ্ঠদের ৫-৬। সমস্ত বিল্ডিং-এর ছাদেই এক বা একাধিক ফুটবল দেখা দিল বিদ্রোহীদের সাথে সাথে। বিদ্রোহীদের কেউ তখন জিকো বা সক্রেটিস, কেউ প্লাতিনি, কেউ বা সর্বগ্রাসী মারাদোনা। এদিকে, সবকটা ছাদই নেড়া।

বাড়ির বড়োরা এই বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আগেই ঘটে গেল দুর্ঘটনাটা। এল-ব্লকের পাঁচ নম্বর ফ্ল্যাটের সপ্তবর্ষীয় তুতান ছিল হারাল্ড শুমাখার, তাঁর দলের ডিফেন্ডার ছিল ১২ বছরের মান্টু, এগারো নম্বর ফ্ল্যাটের। মান্টু স্বীয় বিলাতফেরৎ, হালে বরোদাবাসী জ্যেষ্ঠতাতের কাছে স্বপ্নের মতো গল্প শোনা ববি মুর। জেঠু-জেঠিমা তখন কলকাতায় কিছুদিনের জন্য এসে প্রবল বৃষ্টিতে অজস্র ফ্লাইট ক্যানসেল হয়ে যাওয়ার কারণে আরও কিছুদিন তাঁদের বাড়িতে থেকে সেইদিন সকালেই হলুদ ট্যাক্সি চেপে রওয়ানা দিয়েছিলেন হাওড়া স্টেশনের দিকে। তাঁর এক বন্ধু রেলের উঁচু পদে চাকরি করার কারণে সেই জেঠা-জেঠিমা ট্রেনের টিকিট পেয়ে গেছিলেন পরশু সন্ধ্যেবেলাতেই! অতি-উৎসাহের বসে একটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসা উড়ন্ত বলে হেড দিয়ে উলটো দিকে পাঠানোর বদলে নিজের দলের গোলরক্ষক তুতান তথা শুমাখারের দিকে উড়ে যেতে দেখল মান্টু। দেখেই গলা ছেড়ে হাঁকলো -

"সে-এ-এ-এ-এ-এ-ভ...!"

ডাইভ দিয়ে উড়ে গেল তুতান। ডাইভ দেওয়ার সময়েই খেয়াল করল, বৃষ্টিতে অনেকদিনের জমে থাকা তাজা হয়ে আসা কালো শ্যাওলায় পা হড়কে কন্ট্রোল হারিয়েছে সে।

দিন যেতে লাগলো। ঘটনার পরের কয়েক সপ্তাহ, সঙ্গত কারণে, পাড়ার প্রাপ্তবয়স্কদের আলোচনায় শ্যাওলা, নোনা, অকালবর্ষণ, মূল্যবৃদ্ধি বা শীতের প্রকোপ প্রসঙ্গ হিসেবে খুব বেশী জায়গা করে নিতে পারল না। তারপর, শ্যাওলার মতোই, সেইসব আলোচনা প্রসঙ্গগুলো এসে ঘিরে ফেলল, অতলে ছেয়ে নিল অকালমৃত্যুর সন্তাপ। যে' বিকেলে তুতানকে বালানন্দ ব্রহ্মচারী হাসপাতাল থেকে স্পট ডেড ঘোষণা করা হল, তার তিরিশ-চল্লিশটা বিকেলের মধ্যেই তুতানের বাবা-মা তাঁদের ফ্ল্যাটটা 'ডিসট্রেস-সেল'-এ চড়িয়ে অন্যত্র বাসা খুঁজে চলে গেলেন। একটু একটু করে বয়ঃসন্ধিতে পা রাখতে থাকল মান্টু।

মান্টুর পলিটেকনিক-পাশ বাবা ছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত মোটরগাড়ি কারখানা ভারত মোটর্স-এর বেশ কিছু ওভারসিয়রদের মধ্যে একজন। মাঝে মাঝে নাইট ডিউটি পড়ত। শীতকালে পড়লে একটা রামের নিপ ব্যাগে রেখে ভোরের আলোয় বাড়ি ফেরার পথে খালি বোতল পথে কোথাও ফেলে দেওয়াই ছিল তাঁর দস্তুর। এমনই এক শীতকালে কোনো মেশিন থেকে সহস্র-ভোল্টের বিদ্যুৎ ছুঁয়ে দিল তাকে। কনসোলেশন গ্রাউণ্ডে গাড়ি কোম্পানির অফিসে চাকরি পেলেন মান্টুর মা।

মান্টু তখন বড় হচ্ছে। দিনরাতগুলো একটু একটু করে এগিয়ে চলছে। পৃথিবী একটু একটু করে ঘুরে চলছে। ক্রীড়াজগতে তখন ফর্মুলা ওয়ান রেস-কার চালক মাইকেল শুমাখার ও সময়ের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র এসে ঢেকে দিচ্ছে অতীতের ফুটবল ডিফেন্ডার হারল্ড শুমাখারের স্মৃতি। মান্টুর মাধ্যমিকের আগে অবধি ছিল মর্নিং-স্কুল, আর ইলেভেন টুয়েলভ মর্নিং স্কুল। মা-র চাকরি হয়ে যেতে সে লক্ষ করল, বিকেলবেলাগুলো তাকে একা একাই বাড়িতে কাটাতে হচ্ছে।

সেই বিকেলগুলোতে মান্টু ছাদে আনাগোনা আরম্ভ করল। একা একাই যেত। তুতানের ঘটনার পরে বহুদিন ছাদে তালাচাবি দেওয়া ছিল। মরচে ধরে তালা কিছুকাল আগে নিজে থেকেই খুলে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজায় পৌঁছতে গেলে টপকাতে হয় এল-ব্লক-এর বিভিন্ন ফ্ল্যাট থেকে পরিত্যক্ত বিভিন্ন ধরনের কঠিন, অপচ্য বর্জ্য। ছাদে যাওয়া ততদিনে অপস্মৃতি ভোলার জন্য মানুষের এই সামগ্রিক প্রচেষ্টার নিদর্শনের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এমনকি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যন্ত। এতদিনে তারা হাউসিং-এর ততদিনে সমতল হয়ে যাওয়া খেলার মাঠে জড়ো হয়েই শ্যামাশ্রী আবাসনের সবাই দেখে নিয়েছেন। মান্টুও দেখেছিল বাবার হাত ধরে।

কিন্তু মান্টু অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলতে সেই ফুটবল মাঠে যায়নি। পাড়ায় কারুর সাথেই তাকে খেলাধুলো করতে দেখা যায়নি সেই তুতানের ঘটনার পর থেকেই; এ' বিষয়ে পড়শীময় সেই মানবসমষ্টিতে ফিসফাসও যে একদম হয়নি তা নয়। কিন্তু মান্টু সেই বিকেলগুলোতে নানান বর্জ্য ডিঙিয়ে সকলের অগোচরে ছাদে আনাগোনা আরম্ভ করল। প্রথম প্রথম নিয়ে যেত গল্পের বই, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। তারপর, কি মনে হল, ইস্কুল যাতায়াতের অটোভাড়া থেকে অল্প অল্প করে পয়সা বাঁচিয়ে সে সকলের অলক্ষে কিনে ফেলল একটা ফুটবল। সেই ফুটবল হাতেই সন্তর্পণে পৌঁছে যেতে লাগল ছাদে, শনি রবি বাদ দিয়ে সপ্তাহের অন্যান্য সব বিকেলবেলাগুলোতে।

এই ঘটনার মধ্যে লক্ষণীয় কিছু পেল না সেই বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকের স্যাটেলাইট উপনগরীর নিউক্লিয়ার পড়শীসমাজ। ইতিমধ্যে সেই জলাভূমি বহু প্রমোটারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে বুজতে বুজতে মজে যাওয়া ডোবা হয়ে গেছে। সেই ডোবায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাগড়া কচুরীপানার বংশানুক্রম। ঘটনাক্রমে, সেই মান্টুদের এল-ব্লকের ঠিক পাশেই সেই মজে যাওয়া ডোবা। আগেকার বাঁশঝাড়, নারকেলসারি, তালগাছেরা আর নেই। তাদের ছায়ায় লালিত ভোঁদড়, বেজী, এক দেড়খানা শেয়াল-পরিবার, ডাহুক, কুবোপাখি, পানকৌড়ি, বক, খানকতক দলছুট সারসেরাও সরে পড়েছে সেই জলাময় গাছগাছালির অপসৃত ছায়াদের সাথে সাথেই। চারিদিকে অজস্র বাড়িঘর উঠে গেছে। সেই জলাভূমির মতোই, শ্যামাশ্রী আবাসনেরও আর আগেকার রাজকীয় ভাবটা নেই। এমনকি বিনোদিনী সিনেমা হলেও কিছু বছর টিমটিমিয়ে অঞ্জন চৌধুরীর সিনেমা চলার পরে বেশ কিছু বছর ধুঁকতে ধুঁকতে শুধু ম্যাটিনী আর নাইট শো-তে সফট পর্ন গোত্রের সিনেমা দেখিয়ে অবশেষে ঝুঁকতে হল ভোজপুরী সিনেমার দিকে। সেই একটা দুটো শো নিয়েই সে কোনওক্রমে তার অস্তিত্ব বজায় রেখে চলল বিশ্বায়নের (শপিং) মলময় বাজারে।

এত কিছুর মধ্যে ফি-বিকেলে আর মান্টুর ফুটবল নিয়ে ছাদে যাওয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করার ফুরসৎ পেল না নাগরিক সমাজ। কোনো এক কারণে মান্টু সাবধান থাকত যাতে তাঁর মা ঘুণাক্ষরেও স্বীয় সন্তানের এই বৈকালিক ছাদ-এক্সপিডিশন সম্বন্ধে আঁচ না পায়। মা'র অফিস না থাকলে সেই সময়গুলো মান্টু ঘরে শুয়েবসেই কাটিয়ে দিত। এমনকি ম্যাগাজিন বা গল্পের বই পড়ার উৎসাহও তার মধ্যে সেইসব দিনগুলোতে দেখা যেত না। চিন্তিত মান্টুর মা ভাবতে লাগলেন কি উপায়ে ছেলের বিভিন্ন উঁচু ক্লাসের সাবজক্টের জন্য শাঁসালো ও দাপুটে প্রাইভেট টিউশান-শিক্ষকদের কাছে স্বীয় পুত্রকে টিউশনি গ্রহণ করানোর জন্য পয়সা বাঁচানো যায় প্রতি মাসে, সেই বিষয়ে। বিকেল-সন্ধ্যে-রাত শুদ্ধ দিনগুলো কাটতে লাগল। অন্যান্য বিকেলগুলোয় মান্টুর ছাদে যাওয়া অব্যাহত রইল।

ছাদ তখনও নেড়া। কিন্তু, প্রশস্ত ছাদের একদিকে, সেই ছাদের কিনারাগুলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে, একটা চারটে তলার ১৬টা ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সর্বক্ষণ জল সরবরাহ করার জন্য একটু প্রমাণ সাইজ, আড়াই মানুষ উঁচু ও ইট-সিমেন্ট-চুন-সুড়কিতে নির্মিত জলের ট্যাঙ্ক ছিল। সেখানেও অজস্র শ্যাওলা, আরও বহু বছর জমতে জমতে তা জমাটকালো, আপাত-নিরাপদ রঙে ছেয়েছে। ছাদে মান্টুর কাজ ছিল তার সেই গোপন ফুটবলটাকে হেড দিয়ে ট্যাঙ্কের দেওয়ালের কিছুটা উঁচু জায়গার দিকে এমনভাবে পাঠানো যে তা রিবাউণ্ড করে তার কপাল বা মাথার কাছাকাছি আবার এসে পড়ে, যাতে সে তাতে আবার হেড দিতে পারে একই রকম নিয়ন্ত্রনের সাথে। এই পৌনঃপুনিকতা, কসরৎ ও সাধনার সময় মান্টু যেন কিছুটা ঘোরের মধ্যে চলে যেত একটানা অনেকক্ষণ হেড দিতে দিতে।

তবে ছাদে সবসময়ই যে সে ফুটবলে হেড দিয়ে চলেছে তা-ও নয়। কখনও সে ফুটবলটাকে ছাদের বিভিন্ন দিক থেকে থেকে ডেঁয়ো পিঁপড়েতে ভরা আদ্যিকালের আধলা ইঁটের টুকরো যা কোনো এককালে হয়ত গোটা ইঁট ছিল কিন্তু বহু ঋতুচক্র ও কালচক্র ঘাড়ে নিয়ে তারা এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে আদিম আরাবল্লি বা গোণ্ডওয়ানা উপত্যকার পাহাড়দের মতোই তাদের একদা বিশালতা হারিয়ে পিঁপড়েদের আশ্রয়দাতা শ্যাওলাঢাকা আধলায় পরিণত হয়েছিল অথবা ছাদের ঠিক বাইরের ল্যান্ডিং-এর অপচ্য বর্জ্যসমষ্টি থেকে সংগৃহীত কাঠের টুকরো মূলতঃ এই দুই বস্তুই, যথাক্রমে পিঁপড়ের কামড় ও চৌঁছের খোঁচা এড়িয়ে ফুটবলটাকে আটকে রাখত ঢালু ছাদ দিয়ে যাতে তা গড়গড়িয়ে ছাদের নেড়া কিনারা দিয়ে নীচে সেই ডোবার দিকে পড়ে না যায়। শ্যামাশ্রী সমবায় আবাসনের 'এল-ব্লক' চিহ্নিত বিল্ডিং-টার একদিকে যেহেতু সেই একদা বৃহৎ জলাশয়ের একটা মোক্ষম অংশ ছিল, যা এতদিনে মজা ডোবায় পরিণত হয়েছে, সেহেতু জলাভূমি ভরাট করে তৈরী সেই আবাসনের সেই বিল্ডিং কিছুটা হেলে পড়েছিল সেই ডোবার দিকে। তাই ফুটবলের জন্য এই কাঠের বেড়া।

আর বেড়ার নিরাপত্তায় যখন ফুটবলটা ঘুমোতো, তখন সেই নেড়া ছাদের একটা বিশেষ ধারে এসে সে পা ঝুলিয়ে বসত। সামনে চারতলা উচ্চতার নীচেই সেই ডোবা, যদিও একেবারে সরাসরি নীচে নয়। ডোবা আর বিল্ডিং-এর মধ্যে রয়েছে নোনায় ক্ষয়ে যাওয়া একটা পাঁচিল যা অনেক দিন আগে আবাসন সমিতির তরফ থেকে কখনও একবার লাল-সাদা রঙের চুনকাম করা হয়েছিল, এখন জায়গায় জায়গায় চাঙড় ভেঙে ইটের পোক্ত কঙ্কাল বের করে খ্যাক-খ্যাক করে হাসতে থাকে। পাঁচিলের এ'পারে একচিলতে পথ যা দিয়ে এই এল-ব্লকের বিল্ডিং ও তার পড়শী এম-ব্লকের বিল্ডিং-এর লোকজন পদব্রজে অথবা দু'চাকায় বাইরের দুনিয়ায় সশরীরে পৌঁছতে পারে। যে সময়ে এই আবাসনের নির্মান হয়েছিল, সে সময়ে শহরতলীর সমবায় আবাসনগুলোর এল-আই-জি এম-আই-জি ফ্ল্যাটগুলোর আবাসিক মধ্যবিত্ত সমাজের চার চাকার গাড়ি হয়নি।

একরকম বলা যেতে পারে যে সেই সরু সিমেন্ট-বাঁধাই রাস্তা এবং বিল্ডিং-এর সেই দিকের তিনতলা এবং দোতলার বাসিন্দাদের যথাক্রমে কচিকলাপাতা ও মরচে ধরা লাল রঙের গ্রিলদুটোই সেই সময়গুলোতে থাকতো মান্টুর ঈশৎ দুলতে থাকা পদযুগলের ঠিক নীচে। প্রসঙ্গক্রমে, ছাদের সেইদিকেই, অনেক বছর আগে, ববি মুর তথা মান্টু-র হেড থেকে সমভাব্য সেমসাইড ঠেকাতে উড়ে গিয়েছিল রোগাপটকা তুতান তথা হারল্ড শুমাখার। তবে সেইসব কথা সেই পালটানো সময়ের হাই-স্কুল ছাত্র মান্টুর মাথায় থাকত না। থাকত না আত্মহত্যার কোনো উটকো খেয়াল, ইচ্ছা বা পরিকল্পনা।

সে তখন এক মনে বিভিন্ন বাংলা সমসাময়িক পত্রিকা, মায়ের সংগ্রহের সীমিত কিছু বাংলা বই (বঙ্কিম-রবীন্দ্র-শরৎ এই ট্রায়ো-কে সন্তর্পণে এড়িয়ে) এবং বাবার ততোধিক সীমিত, রেখে যাওয়া, উইয়ে কাটা ভাঁড়ারের কিছু ইংরেজি, মূলতঃ ডিটেকটিভ ঘরানার পাল্প-ফিকশন গোত্রের বই, অথবা ভ্রমণমূলক দিশি পত্রিকা বা সচিত্র সহজপাঠ্য ইতিহাস-পুরাণের কিছু বইয়ের পাতা নিবিষ্ট মনে উল্টোতো। এ'হেন সাহিত্য সরস্বতীর সাধনা সে বাড়ির ভিতর বা ইস্কুলের সিলেবাস, সিলেবাস-বহির্ভূত, পাঠ্য-অপাঠ্য কোনো পুস্তক-পুস্তিকার ক্ষেত্রেই তাকে করতে দেখা যায়নি।

একইরকমভাবে, সে যে'রকম ঘোরের মধ্যে দিয়ে ফুটবলে বারম্বার হেড-পুনঃহেড দেওয়ার সুনিপুণ কৌশল আয়ত্ব করেছিল সেইভাবে ক্রীড়াদেব হার্মেস-এর সাধনা তাকে কোনো খেলার মাঠে করতে দেখা যায়নি। এই খেলা মাঠের খেলা নয়। জয়ের দেবী নাইকির সাধনা নেই এই খেলায়। ট্যাঙ্কের দেওয়ালকে হারানোর প্রশ্ন আসে না। নিজের শরীরের এবং মনের ছায়াদেরও। তাই, যখন সে হেড-পুনঃহেড প্র্যাক্টিস করে চলত, তখনও সে অন্য কোনোকিছুর দিকে, এমনকি বিকেলের মজে আসা রঙে, ছাদের শ্যাওলাকালো ক্যানভাসে নিজের পিছলিয়ে সরতে থাকা ছায়াগুলোও পারত না তার একাগ্রতা কেড়ে নিতে। তবে যখন সে ছাদের কিনারে পা দুলিয়ে পড়তো, তখন সেই মজে যাওয়া ডোবার কচুরিপানা-জঙ্গলের উপর দিয়ে এক-আধটা স্ট্রে কুকুরের দৌঁড়ে যাওয়া তার চোখে পড়ত। আর মানসচক্ষুতে সে ভাবত তার সেই সরে যাওয়া অতীতের কথা যখন সে তার ঘরের জানলা দিয়ে দেখত সেই একদা-জলাশয়ে জলঢোঁড়া সাপ এঁকেবেঁকে চলেছে, তাদের থেকে গা বাঁচিয়ে কুচকুচে কালো পানকৌড়ি ডুব মেরে থাকছে বেশ কিছু রুদ্ধশ্বাস সেকেণ্ড। কিন্তু সে তখনও সেই ববি মুর, শুমাখার, জিকো, সক্রেটিস, মারাদোনাদের দ্রোহকল্লোলিত জীবনের এক কিশলয়কালের বিকেলবেলার কথা ভাবছে না। জোর করে যে ভাবছে না তাও নয়। জাস্ট মাথায় আসছে না।

এক বিকেলে এ'হেন মান্টু ভীষণ চমকাল। এমন নয় যে সে সেই ট্যাঙ্কি-দেওয়ালের সাথে তার নিখুঁত হেড প্র্যাক্টিস করতে তার সরতে থাকে ছায়াদের দেখতে পেয়েছিল। অথবা মনের মধ্যে সে তখন সেই ববি মুর বাল্যবেলার বিকেলে চলে গিয়েছে। ওই তো পাওলো রসির গোড়ালিতে ছিটকে আসা বল বেকাদায় ফেলে দিচ্ছে ববি মুরকে। তার রক্ষণ ভ্রষ্ট হলেই বেচারা শুমাখারের উপরে নির্ভর করবে ম্যাচের প্রথম গোলটা কোন দল খেল। ঠিক করে হেড দিতেই হবে। তাছাড়া আর কোনোই রাস্তা খোলা নেই একদা চুরির দায়ে অভিযুক্ত (এই কথাও মান্টু তার সেই জেঠুর মুখেই শুনেছিল) ববি মুরের সামনে। তাই ববি মুর লাফালো, মাথাটাকে বলের সাথে এক অ্যালাইনমেন্টে এনে নিখুঁত সেই লাফ।

লাফানোর সময়ে কি তার হাওয়াই চটি সেই গ্লোবালাইসড বিকেলের ভিজে শ্যাওলার প্রকোপে কিঞ্চিৎ হড়কে গেল? নাকি সে প্রবল ধাক্কা খেল একটা? ধাক্কাটা কি সামনের দিক থেকে এল না পিছনের দিক থেকে? নাকি সাইডের কোনো দিক থেকে এল। দূর থেকে কি সে নিজের বাল্যকালের সেই ভেঙে না যাওয়া তীক্ষ্ণ কন্ঠস্বর কয়েক ঝলকের জন্য শুনতে পাচ্ছে -

"সে-এ-এ-এ-এ-এ-ভ...!"

নাকি এগুলো সবই তার মনের ভুল?

কারণ আচম্বিতে যখন মান্টুর সম্বিৎ ফিরল তখন সে সেই ছাদের ধারে ঠ্যাংজোড়া দুলিয়ে বসে আছে যেমন সে আশ্চর্য এই বিকেলটাতে তার ফুটবলে হেড-সাধনা আরম্ভ করার আগে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিল। তার গায়ে পড়ে বা ছড়ে-ছেঁচড়ে যাওয়ার কোনো ব্যাথা নেই। সেই সময়েও সেই একদা জলাভূমির মাটির কোমলতার কারণে সমবায় আবাসনের চারিদিকে চারতলা অথবা তার চেয়েও উঁচু কোনো প্রাইভেট হর্মনিকেতন তৈরী হয়নি, এক দোতলা প্রাইভেট বসতবাটিই ছিল। আর তাছাড়া, ছাদের সেই কিনারের সামনে ডোবা, ডোবার ওপারের এক-দুই-তিনতলা বাড়িদের ফাঁকে ফোঁকড়ে এখনও কিছু গাছগাছালি তাদের জিন-এ পূর্বসুরীদের স্মৃতি ও তাদের কাণ্ডগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রস্থ-অনুপ্রস্থ জুড়ে সূর্যগ্রহণের স্মৃতি ধরে সেই বিকেলের ঝিরঝিরে বৃষ্টি ও হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছিল। তবু, সেই হাওয়ার শীতল ছোঁয়া সত্ত্বেও, মান্টু কুলকুল করে ঘামছে।

বৃষ্টির কারণে সে ছাদে সেইদিন কোনো বই আনেনি, শুধু ফুটবলটা এনেছিল। যেহেতু মান্টু সুইসাইডাল অথবা জীবনের হাল ছেড়ে দেওয়া অবসাদগ্রস্ত কিশোর নয়, সেহেতু সে মুষলধারে বৃষ্টি হলে মা বাড়িতে না থাকলেও লুকিয়ে ছাদে না গিয়ে ঘরেই শুয়েবসে কাটিয়ে দিত। কিন্তু সেইদিন বিকেলে হালকা ইলশেগুঁড়ি উড়ছিল, কখনও বৃষ্টিফোঁটাগুলোর আয়তন ও পরিধি একটু বেড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে পরিণত হচ্ছিল। সেহেতু, শুধু ফুটবল নিয়ে ছাদে ওঠে সেই বিকেলে শ্যামাশ্রী আবাসনের আজন্ম বাসিন্দা নওলকিশোর মান্টু। তবে খেলা শুরু করার আগে বলটা কিছুক্ষণ ছাদের সেই নিদারুণ কিনারে বসে পা দুলিয়ে সাতপাঁচ ভাবে। মূলতঃ শৈশবের নানান কথা রোমন্থন করে। কিন্তু সেই ববিমুল-শুমাখারতুতো বিকেলের কথা তখনও তার মাথায় আসেনি। নাকি এসেছিল?

অর্থাৎ সে কি তাহলে আদৌ সেই বিকেলে তার হেড-প্রাক্টিস আরম্ভ করেইনি? পুরো ঘটনাটাই তার মনে মধ্যে ঘটে গেল? স্মৃতির গোপন আবডাল সরিয়ে, বিস্মৃতির শ্যাওলা ঠেলে, আবার সেই অনেক বছর আগের বিকেল তার মনে জেগে উঠল? এইসব ভেবে সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। ঘামছে। এই বিষয়ে হয়ত সে কাউকে বলতে পারেনি এতদিন, এরপরেও আর কোনোদিন বলতে পারবে না। নীচে ওই যে পাঁচিলটা, সেইটায় তখনও আবাসন সমিতির তত্ত্বাবধানে করা লাল-সাদা রঙের চুনকালি মলিন হয়নি পুরোপুরি, যদিও শ্যাওলা সেখানেও যথেষ্ট কামড় বসিয়ে দিয়েছিল ততদিনে। আর মান্টুর পায়ের ঠিক নীচে, তিনতলার বারান্দার কচিকলাপাতা রঙের আর দোতলার বারান্দার মরচে ধরা লাল রঙের গ্রিলগুলো ছাড়িয়ে আরও নীচে যে সিমেন্ট-বাঁধানো রাস্তাটা, ওটাও তখন বিভিন্ন জায়গায় চাঙড় খুলে ফোকলা হয়ে যায়নি। ওই রাস্তাতেই, একদা লাল-সাদা দেওয়ালের এপাড়েই পড়ে ছিল তুতান। ওই রেলিংদুটোর সাথে বা সেই আবাসন আর জলাশয়ের মাঝে মর্মান্তিক ঠাট্টার মতো দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ালটার সাথে তুতানের মাথা ঠুকে গিয়েছিল কি না, তা শত চেষ্টাতেও মান্টু মনে করতে পারল না। এমনকি এই গ্রিল-দুটো সেই সময়েও এই একই রূপে একই রঙে বর্তমান ছিল কি না, অথবা মান্টুর মাথা দিয়ে গলগল করে চাপ চাপ রক্ত বেরিয়েছিল কি না যেমন সে বিভিন্ন সময়ে ইস্কুল যেতে আসতে বেরোতে আবাসনের ভিতরে লোকমুখে শুনেছে দূরে দাঁড়িয়ে কারণ তাকে কাছে আসতে দেখলেই পড়শিরা তাঁদের আলোচনায় তুতানের মৃত্যুপ্রসঙ্গে কখনও সুনিপুণভাবে এবং কখনও অস্বস্তিকর 'অকওয়ার্ড সাইলেন্স'-এর মাধ্যমে তৎকালীন যবনিকা ফেলে দিতেন - সেইরকম কোনো স্মৃতিই ভেসে এল না তার মানসপটে। শুধু ববি মুর চেঁচিয়ে উঠছে -

"সে-এ-এ-এ-এ-এভ...!"

আর রোগাপাতলা হারল্ড শুমাখার উড়ে যাচ্ছে।

নাকি ববি মুর-ই বাজপাখির মতো উড়ে যাচ্ছে যাতে শুমাখারকে উড়তে না হয়? সাথে সাথে কি সে-ই চেঁচিয়ে যাচ্ছে -

"সে-এ-এ-এ-এ-এ-এভ...!"

নাকি শুমাখার আর সে দু'জনে মিলে উড়ে যাচ্ছে উড়ে আসা ফুটবলটাকে আটকাতে। কাপের প্রথম গোল তাদের খেলে চলবে না। কিন্তু তখনও বুঝি শুধু ববি মুর-ই বাল্যকালীন মান্টুর তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচিয়ে উঠছে -

"সে-এ-এ-এ-এ-এ-এ-এ-এভ...!"

কিন্তু কেন? সে যদি নিজেও ওড়ে তাহলে তো তার চেঁচানোর কথা নয়! এই ঘটনাগুলো কি সবই একসাথে বা আলাদা আলাদা করে বাস্তবে ঘটছে নাকি এগুলো চলছে তার মনের মধ্যে?

মান্টু সেই বিকেলে যথেষ্ট হাওয়া ও ঝিরিঝিরি ইলশেগুঁড়ি সত্ত্বেও কুলকুল করে ঘামতে লাগল। তার পাদুটো দুলতে লাগল। পায়ের কিছু নীচে একটা কচিকলাপাতা রঙের বারান্দার গ্রিল। তার নীচে একটা মরচে ধরে যাওয়া লাল রঙের গ্রিল। তারও নীচে সেই সেই মধ্যবিত্ত আবাসনের ফোকলা সিমেন্ট-রাস্তা। সেখানেই তুতান পড়ে ছিল।

সেই রাতে শ্যামাশ্রী আবাসন সমিতির প্রাক্তন সভাপতি শ্রী শ্যামল দত্ত মহাশয়ের ঠিক করে ঘুম এল না। বয়স হয়েছে। বাত, বদহজম, কাশীর দমক - নানান কারণে এমনিতেই তাঁর বিশেষ ঘুম হয় না। তিনি আবাসনের জে-ব্লকের ফ্ল্যাটটার যে ঘরটায় শোন, সেই ঘরে তাঁর মাথার কাছে একটা জানলা আছে। জানলার বাইরে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছে বর্ষাকালে অল্পবিস্তর লালরঙের ফুল ফোটে। বিস্তর নয়, অল্পই, কারণ সেই বিল্ডিং ও তার পড়শি বিল্ডিং-এর বাসিন্দাদের লোক লাগিয়ে সেই কৃষ্ণচুড়া গাছের ডালপালা ছাঁটিয়ে রাখতে হয় বছরে দু'বছরে, নইলে বেয়ারা গাছ ফ্ল্যাটের বিভিন্ন জানলার বিভিন্ন কার্নিশের দিকে হাত বাড়ায়। সে কি হতে দেওয়া যায়?

তো, এহেন শ্যামলবাবুর মাথার কাছের জানলাটা সচরাচর খোলাই থাকে, কিন্তু সেই রাতে হালকা বর্ষনের কারণে ও ভারি বর্ষনের আশঙ্কায় জানলা বন্ধ ছিল। ঘুমের মধ্যে কখন তিনি সেই জানলা খুলে দিয়েছেন, তাঁর খেয়ালও ছিল না। অথবা, আদৌ খুলেছিলেন কি? কখন বুঝি বৃষ্টিভরা মেঘ ফুঁড়ে এক টুকরো পুর্ণিমার আলো এসে পড়েছিল সেই কৃষ্ণচুড়া গাছ ছেয়ে তাঁর বিছানার বালিশে, যেইখানে তিনি মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন। চোখে চাঁদের আলো পড়তে তিনি স্বপ্ন দেখলেন যে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের সব ফুল শ্যাওলায় সবুজ হয়ে গিয়েছে। সূর্যের আলো ছাড়াই, এবং স্বপ্নের মধ্যেও, তিনি স্পষ্ট দেখলেন যে ফুলের লাল পাপড়িগুলো সব সবুজ হয়ে গেছে। সবুজ শ্যাওলারা নিজেদের মধ্যে দড়ি বা সাপ বা বেনজিন-রিং-এর মতো পাকিয়ে পাকিয়ে গাছের ডালপালা দিয়ে গাছের কাণ্ড দিয়ে নিম্নমুখে, বাড়ির কার্নিশ, সানশেড, গ্রিল হয়ে, সমস্ত আবাসনের বাউণ্ডারি- পাঁচিলের নোনাছোপ দেওয়াল হয়ে, সর্বত্র ছেয়ে যাচ্ছে। আবাসন ও তার সকল আবাসিক বুঝি এইবার ডুবে যাবেন শ্যাওলায়। শ্যামলবাবুও বাদ যাবেন না। তাই গাছের ডাল বেয়ে বেয়ে অজস্র দড়ি বা অন্ধকার জমাট জল অথবা সময়ের মতো পাকিয়ে পাকিয়ে পূর্ণিমার আলো ছাপিয়ে শ্যামলবাবুদের জানলা দিয়ে ঢুকে, বিছানা বালিশময় আঁকড়ে ধরছে তাঁকে। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে তাঁর। তিনি ডুবে যাচ্ছেন...।

স্বপ্ন-বাস্তবে যখন একাকার দশা, তখন ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন শ্যামল দত্ত। বিছানার বালিশে চাঁদের আলোয় গাছের ডালপালা, ফুল, পাতা, জানলার আড়াআড়ি সবুজ গ্রিল সব সাদাকালো ছায়া ফেলে আলপনা কেটেছে। মাথার কাছে টেবিলে রাখা জলভর্তি ঢাকা দেওয়া গ্লাসটা তিনি সেই চাঁদের আলোতেই দেখতে পেলেন। বিছানা থেকে উঠে দেওয়ালের সুইচবোর্ড অবধি গিয়ে নীল নাইট-ল্যাম্প বা বিছানাতে বসেই বেডসুইচ-টিপে সাদা টিউবলাইট জ্বালাতে হল তাঁকে সেই পুর্ণিমার বদান্যতায়। একটু একটু করে অনেকটা জল খেয়ে গ্লাসটা আবার ঢাকা দিয়ে যথাস্থানে রেখে দিলেন শ্রী শ্যামল দত্ত। তারপর, মাথার কাছের জানলাটা বন্ধ করতে করতে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন, আগামীদিনে কোনো একটা সময়ে আবাসনের মেইন গেট থেকে বাঁ দিকে অর্থাৎ বাজারের দিকে কিছুটা হেঁটে গেলে যে ওষুধের দোকানটা পড়বে, সেইখানে নিমাইয়ের থেকে ব্লাড প্রেশারটা একবার নিখরচায় চেক করিয়ে নেবেন তিনি।