গল্প

গভীর গাঢ় নিঃশ্বাস



লক্ষ্মী নারায়ণ হাজরা


গভীর রাত। খাটে এপাশ ওপাশ করছিলাম। হঠাৎ যেন মেঝে থেকে উঠে এল আওয়াজটা। অনেকক্ষণ ভালো করে শুনলাম। না, মনের কোনও ভ্রম নয়। গভীর নিদ্রামগ্ন কোনও মানুষ মেঝেয় শুয়ে গাঢ় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে চলেছে... অবিরাম।

তখন আমার বয়স ২৪/২৫ বছর। একটা বেশ পুরোনো বাড়ির বাইরের সদর ঘরটা সদ্য ভাড়া নিয়ে গেছি। ঘরটা মূল বাড়ির থেকে বিচ্ছিন্ন, সামনে খানিকটা উঠোন। পুরোনো যুগের বাড়ি তো, একা থাকার পক্ষে ঘরটা খুবই বড়ো। ঘরের একপ্রান্তে ভেতরে ঢোকার একটা দরজা, উলটো দিকে দেওয়াল ঘেঁসে আমার একলা শোওয়ার খাট, ঘরে আর কোনও বিশেষ আসবাবপত্র নেই। স্বভাবতই মেঝেটা বিশাল।

ওদিকে সেই নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়া অবিরত চলছে। কী ব্যাপার? আমি তো একলা শুয়েছি, তাহলে মেঝেতে শুয়ে কে ঘুমোচ্ছে? আমি একলা শুলেও খাটটা দুজন শোওয়ার মতো প্রমাণ সাইজের, কাজেই আমি একা শুলেও অনেকখানি জায়গা খালি থাকে। আমি দেওয়ালের দিকে ঘেঁসেই শুয়েছিলাম।

আমি বরাবরই নির্ভীক প্রকৃতির এবং অনুসন্ধিৎসু, কোনও ঘটনার যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা না পেলে আমি তৃপ্তি পাইনা। কোনও জিনিস হারিয়ে গেলে বা খুঁজে না পেলে অনেকে সম্ভাব্য অসম্ভাব্য নানা জায়গায় হাতড়ায়, গোটা ঘর তোলপাড় করে ফেলে। আমি কিন্তু তা করিনা, ওইরকম উতলা না হয়ে আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাবতে থাকি, শেষ কখন আমি সেটা ব্যবহার করেছি বা কোথায় রাখতে পারি। একটু ভেবেই আমি কিন্তু জিনিসটা বার করে ফেলি। অবশ্য ব্যর্থতাও থাকে, কিন্তু সেটা খুব কম।

যাই হোক, বিছানায় শুয়ে শুয়েই কোনও রকম আওয়াজ না করেই আমি একটু একটু করে পিঠ ঘষে ঘষে তক্তপোষের প্রান্তের দিয়ে এগিয়ে চলেছি। তখনও সেই আওয়াজের কোনও বিরাম নেই। আমার গোঁ আরও বেড়ে গেল। কিসের আওয়াজ? কি ঘুমোচ্ছে? একটা ব্যাখ্যা তো চাই। আরও এগিয়ে খাটের প্রান্তে চলে এলাম। তারপরে শরীরের আধখানা বিছানায় রেখে বাকি আধখানা যতখানি সম্ভব মেঝের দিকে ঝুলিয়ে দিলাম। দূরত্ব কমে কানটা প্রায় মেঝের কাছাকাছি চলে গেল। চিরপ্রশান্তির ঘুমের কোনও বিরতি নেই, গভীর নিঃশ্বাস উঠছে আর পড়ছে, উঠছে আর পড়ছে।

কী করা যায়? ঘরে খিল দিয়ে শুয়েছি তো একলা, আমার ঘরে কে কোথা থেকে আসবে? অথচ এর তো একটা ব্যাখ্যা পাওয়া চাই। আলো জ্বালাও সহজ নয়, দরজার পাশে সুইচ বোর্ড অর্থাৎ গোটা মেঝে পেরিয়ে অন্ধকারে হাতড়ে সুইচ টিপতে হবে। তখন আমি একটু হলেও ভয় পেয়ে গিয়েছি। শুধু মনে হচ্ছে মেঝেতে যে শুয়ে আছে তার সঙ্গে ঠোক্কর খেয়ে যদি আমি পড়ে যাই অথবা সে যদি আমার পা দুটো ধরে ফেলে! ওই পরিস্থিতিতেও আমি আবার ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে শুরু করলাম। আগেই বলেছি ঘরটা খুব বড়ো সড়ো। কাজেই একটা লোক যদি মেঝেতে শোয়-ও, তাহলেও একদম দেওয়ালের দিকে খানিকটা ফাঁক থাকবেই। ঠিক করলাম আমি ওই দেওয়াল ঘেঁসে ছুটে দরজার কাছে গিয়ে আলোটা জ্বেলে ফেলব।

কত জোরে ছুটেছিলাম সেটা নিশ্চয়ই অনুমান করা যায় এবং সৌভাগ্যবশত আমি আন্দাজ করে সহজেই সুইচটা পেয়ে গিয়েছিলাম। সুইচ টিপতেই পুরো ঘর আলোয় ভরে গেল, আশ্চর্য, কোথাও কিচ্ছু নেই।

ঘটনাটা ঘটেছিল (যদি এটাকে আদৌ ঘটনা বলা যায়) আমি ওই ঘরে ঢোকার তিন-চার দিনের মধ্যেই। তারপর আমি ওই ঘরে সাত-আট বছর কাটিয়েছিলাম, কিন্তু আর কোনও দিন ওই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি। আমি নিশ্চয়ই বোঝাতে পেরেছি আমার অভিজ্ঞতাটা কাল্পনিক নয় বা মনের কোনও হ্যালুসিনেশন নয়। ২৪/২৫ বছর বয়সের যুবকের লেট-এজ সাইকোসিস বা তজ্জনিত হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশন - কোনওটাই হওয়ার কথা নয়। আজ আমি যথেষ্ট বৃদ্ধ, ওই ঘটনাটা ঘটেছিল অন্তত বছর ষাটেক আগে। কিন্তু আজও আমি ঘটনাটা নিয়ে ভাবি এবং যথারীতি আজও কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না।