পাল দা। সে এক মনে রাখার মতো নাম স্বপ্নার জীবনে। স্বপ্নার সঙ্গে আমার আলাপ কলেজে। আমাদের একটা গ্রুপ ছিল বটে কলেজে, গল্প, হাসি, মজা, খাওয়াদাওয়া সব কিছু মিলে জমজমাট গ্রুপ; তবে স্বপ্নার সাথে আমার আলাদা একটা বন্ধন তৈরি হয়েছিল। আমরা একে অপরের বাড়ি প্রায়ই যেতাম, অনেক গল্প করতাম। ওদের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন পাল দা। পাল দা চাকরি করতেন, কিন্তু কোথায় চাকরি করতেন, জানতাম না। বউদি অতটা মিশুকে ছিলেন না। পাল দা বেশ জমিয়ে গল্প করতে ভালোবাসতেন। আমাদের খুব আপন করে নিয়েছিলেন। পড়াশুনোর ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। সবসময় আমাদের বলতেন, "কী রে, পড়াশুনায় ফাঁকি দিচ্ছিস না তো? শুধু গল্প করে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া যায় না। মনে রাখিস।" সুযোগ পেয়েই বউদি তক্ষুনি একটা খোঁচা দিতে ছাড়তেন না, " উঁ..., কে কাকে বলে? অমন গুরুদেব দাদার পাল্লায় পড়লে পড়াশুনো হবে, না ছাই হবে।" কথাগুলো নিছক মজা করে বলতেন না, দাদাকে বিঁধিয়েই বলতেন, দাদার সহাস্য মুখ নিমেষে ম্লান হতে হতে সামলে নিত নিজেকে কোনোরকমে, কৃত্রিম হাসি এসে ঢেকে দিত লজ্জা। বলা বাহুল্য, খুব খারাপ লাগত আমাদের। বুঝতে পারতাম না, পাল বউদির সমস্যাটা কোথায়। যাই হোক, এমনি বেশ কাটত আমাদের দিন।
একদিন কথায় কথায় জানা গেল, পাল দা-র অফিস থেকে আমাদের বাড়ি বেশি দূরে নয়। ঠিকানাটা বলতেই বুঝে গেলাম, আমার বাবার অফিস চত্বরেই ওঁর অফিস। আমরা বাবার অফিস কোয়ার্টারে থাকতাম, হাঁটা দূরত্বে বাবার অফিস। শুনে খুউউব আনন্দ হলো, "কী দারুউউউন ব্যাপার!" বলে উঠলাম দুজনেই।
"দাদা, আমাদের বাড়ি যাবে তো, যাবে তো? মায়ের সাথে, বাবার সাথে আলাপ করিয়ে দেব, পরশু সোমবার, অফিসের পরে যেও প্লীইইজ...!" বলে উঠলাম এক নিঃশ্বাসে।
স্বপ্না ইশারা করল, চিমটি কাটল, বউদির মুখটা ভার হয়ে যাচ্ছে দেখে। আমি ওমনি কুলোভর্তি রোদ্দুর লুকিয়ে ফেললাম।
"এ বাবা, কত দেরি হয়ে গেল, স্বপ্না, আমি উঠি, পরশু দেখা হচ্ছে কলেজে। ও হ্যাঁ, কবিতাটা পুরো পড়া হলো না, একটু নিয়ে যাস প্লীজ কলেজে, পুরোটা না পড়া অব্দি ঘুম হবে না আমার।", এই বলে আমি উঠে পড়লাম।
স্বপ্নার আর আমার দুজনেরই লেখালেখির অভ্যেস বরাবর, তাই নতুন কিছু লিখলেই পরস্পরকে না দেখিয়ে শান্তি ছিল না আমাদের। আমাদের মধ্যে এত বন্ধুত্বের মূল কারণ ছিল এই লেখালেখি। যাই হোক, এই পাল দা অফিসের পর আমাদের বাড়ি গিয়ে উঠতে পারেননি কোনদিনই। সন্ধ্যে হয়ে যেত ছুটি হতে, তারপর বাড়ি চলে যেতেন সোজা। তবে একটা মস্ত উপকার হলো আমাদের। পরীক্ষার আগে যখন টানা ছুটি থাকত কলেজে, আমার স্বপ্নাকে কিছু পাঠাবার হলে, পাল দা-র অফিসে গিয়ে দিয়ে আসতাম, সেইদিনই যাতে স্বপ্না ওটা পেয়ে যায়। আবার স্বপ্নাও পাল দা-র হাতে প্রয়োজনীয় নোটস পাঠাত কখনও আমাকে। আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল, প্রতি বুধবার আমি পাল দা-র অফিসে যাব স্বপ্নার পাঠানো লেখা বা নোটস নিতে, আর আমারও কিছু দেবার থাকলে ঐদিন দেব। পাল দা এত নিঃস্বার্থভাবে আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম, এই দাদার সাথে আমাদের রক্তের কোনও সম্পর্ক নেই। এ হেন দাদাকে বউদির হাতে রীতিমতো নিগৃহীত হতে হতো, ভাবা যায়! কে এসে বউদিকে বলল, পাল দা-কে আজ দেখলাম। ঐ দিক দিয়ে আসছিলেন। ব্যাস, রান্না খাওয়া বন্ধ, রাতভর জেরা দাদাকে বউদির, কোথায় গিয়েছিলে বলো, বলতেই হবে বলো, কোথায় গিয়েছিলে? দাদা শুধু বউদিকে চুপ করতে বলতেন, আর মুখে একটা আওয়াজও করতেন না। পরের দিন দাদা না খেয়ে অফিস চলে যেতেন, বউদি বিছানা থেকে উঠতেন না। স্বপ্না সব শুনতে পেত ঘর থেকে, দেওয়ালের ওপারেই তো ওদের ঘর। খুব আশ্চর্য হত স্বপ্না, যখন দেখত, দাদা না খেয়ে অফিস চলে যাবার পরই বউদি উঠতেন, এবং পছন্দসই খাবার বানিয়ে দিব্যি খেতেন। দাদার অফিসে ক্যান্টিন ছিল না, কাজের চাপে বেরোতে পারতেন না, সারাদিন অভুক্ত থেকেই বাড়ি ফিরতেন। দাদাকে কী কারণে বউদি এমন নির্যাতন করতেন, আমরা সত্যিই বুঝতে পারিনি কোনোদিন।
একদিন, সেদিন বুধবার ছিল না, আমার যাবার কথা নয়, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে আমি দাদার অফিসে পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি, দাদা টেবিলের ওপর একমনে কী যেন দেখছেন। কোনোদিকে খেয়াল নেই। আমি লাঞ্চ ব্রেকেই যেতাম, তাই সে সময় কাজ করতেন না দাদা। আমি একটু ঝুঁকে খেয়াল করলাম, দাদা গভীর মনোযোগে একটা ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন, আর একটু আড়চোখে দাদার দিকে তাকাতেই দেখি, চোখে জল। সেদিন আমি দাদাকে বিরক্ত না করে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। তারপর যাই স্বপ্নার বাড়ি, বলি ওকে সবটা। এরপর স্বপ্না অনেকভাবে জানার চেষ্টা করেছে, দাদাকে অন্যরকমভাবে নাড়া দিয়ে যদি কিছু জানতে পারা যায় আর কী। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। আমাদের তখন সামনেই পরীক্ষা। দুজনেই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লাম লেখাপড়া নিয়ে। পরীক্ষা শেষ হবার পর শুনলাম, পাল দা-রা আসাম চলে যাবেন। বদলি হয়ে গেছেন।
এদিকে রেজাল্ট বেরোলে আমি আর স্বপ্নাও শহরের বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলাম, উচ্চশিক্ষার জন্য। দুজনেরই ঘন্টা বাজল, ও গেল হায়দ্রাবাদ, আর আমি চেন্নাই। এরপর বহু বহু বাঁক পেরিয়ে আমাদের নদী আপন পথে এগিয়েছে, প্রথমে চিঠিতে যোগাযোগ, ধীরে ধীরে অস্তমিত সব টান। অবচেতনে সুতোটা বেঁচেই থাকে, ব্যস্ততার পাথর মাঝখানে ঘাঁটি গেড়ে টান বুজিয়ে দেয় আসলে। কিন্তু সেই পাথরের তলায়ও তো শ্যাওলা জমে। পিছলে গিয়ে সরতে থাকে একটু একটু করে। সুতোয় একটু একটু টান আবার। খোঁজাখুঁজি ফেসবুকে। আবার যোগাযোগ স্থাপিত। স্বপ্না আমার শহরেই থাকে, পুণেতে, চাকরি করে। ওর একটা মেয়ে। বয়স দশ।
বললাম, "তুই বিয়ে করলি কবে? মেয়ে দশ বছরের? আমার তো এখনো...",
থামিয়ে দিয়ে স্বপ্না বলে, "আমি বিয়ে করিনি। সিঙ্গল মাদার। তুন্নাকে আমি এডপ্ট করেছি।"
এডপ্ট করেছে, দশ বছরের মেয়ে, মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না আমার।
"খুলে বলবি?" বলতে বলল, "আরে বাবা, অবাক হচ্ছিস কেন? যার দরকার, তাকে মানুষ করব, বয়স দিয়ে কী আসে যায়? তুই তো জানিস, বরাবরই আমার এরকম একটা ইচ্ছে ছিল। তো কলকাতার একটা হোমে যোগাযোগ করে দেখলাম, সবাই একদম বেবি অবস্থায় এডপ্ট করে। তো এই বয়সের বাচ্চাগুলোর কী হবে? তা ছাড়া তুন্নাকে দেখে আমার খুব মায়া হচ্ছিল, কেমন মনে হলো, ও যেন আমার চেনা। যদিও এগুলো সবই আমার মনের ভুল, তবু..., ওকেই এডপ্ট করার ব্যবস্থা করলাম। আগেকার দিন হলে তো বিয়ে না করে এই কাজ করার প্রশ্নই ছিল না। এখন আইনকানুন বদলেছে, তাই ভাবলাম, বেশ হয়, যদি ওর মা হতে পারি।"
হেসে বললাম, "তা বেশ বেশ, তো কবে আসবি আমার বাড়ি, বল"।
"তুই আগে আয়, জমিয়ে আড্ডা মারি, তুন্নার সাথে গল্প করবি, ছবি টবি দেখাব অনেক, ছবি তুলব, বেশ মজা হবে।"
তাই হলো। স্বপ্নার বাড়িতে গেলাম, সারাদিন খুউউব মজা করলাম। মেয়েটা কী যে মিষ্টি, আর ভীষণ মিশুকে।
স্বপ্না বলল, জানিস, তুন্নাকে নাকি আর একজন ভদ্রলোক ছোট্টবেলায়, নিতে চেয়েছিল, কথাও হয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ আসেনি নিতে।"
আমি বললাম, "ওর ছোটবেলার ছবি দিয়েছে কিছু?"
"হ্যাঁ, আছে তো। দাঁড়া, দেখাচ্ছি..." স্বপ্না বলে।
ছবি দেখে তো আমি তাজ্জব! এ তো সেইই, সেই ছবি।
"স্বপ্না, তোর পাল দা-কে মনে আছে তো?"
"হ্যাঁ, মনে থাকবে না? পাল দা-কে ভোলা যায়?"
"এ তো সেই, সেই ছবি, যার ওপর এক দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন তিনি, আর চোখ জলে ভরে গিয়েছিল। ভালো করে নজর করে দেখ স্বপ্না, তুন্নার মুখের সাথে পাল দা-র..."
স্বপ্নার চোখ জলে ভরে উঠল, আমারও, একে অপরের দিকে তাকিয়ে, আবার তুন্নার মুখের দিকে তাকিয়ে.., আমরা ফিরে গেলাম আমাদের বলতে চাওয়া অনেক কথা নিয়ে পুরোনো কবিতার খাতায়...!