গল্প

গল্পদাদু ও সেই গাছটা



নবনীতা দেবনাথ


অনেকটা পথ পেরিয়ে মানুষটা প্রায় তখন এসে পৌঁছেছেন অনাথাশ্রমের গেটের কাছে।

প্রতি রোববারের মতোই আজও কাঁধে আড়াআড়িভাবে লম্বা শান্তিনিকেতনের ব্যাগটা গলিয়ে দুই বাহুতে দু'খানা ক্রাচ নিয়ে আশিয়ানার দিকে হাঁটছিলেন বছর পঁয়ষট্টির মানুষটা।

ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা একমাথা উসকো-খুসকো চুল, রোগাটে শরীর, বেশভুষা অতি সাধারণ। বুকপকেটে পেনের কালির স্থায়ী দাগ। সাথে একটা মাথাভাঙা পেন।

ও হ্যাঁ! বলতে ভুলে গেছি! সাথে একমুখ হাসি। বর্ণনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মানুষটার নাম সদাশিব চাটুজ্জ্যে। তবে এখানে আশিয়ানায় 'গল্পদাদু' নামেই বেশি খ্যাত! একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলেন প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ছাতিম গাছটার দিকে। কেন যে আকাশ ছোঁয়া তরতাজা সবুজ গাছটা এভাবে দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছে কে জানে! মনটা খারাপ লাগে। কোনো ম্যাজিকে যদি গাছটাকে আবার বাঁচিয়ে দেওয়া যেত তো বেশ হতো!

'আশিয়ানা - নির্মল হৃদয় আশ্রম।' হলুদ দোতলা বাড়ির দেওয়ালে কালো অক্ষরে লেখা নাম। সকালের রোদ পড়ে পুরোনো স্যাঁতস্যাঁতে আবাসনটাও কেমন উজ্জ্বল লাগছে।

সময়টা নভেম্বরের মাঝামাঝি! শীতটা যদিও সেভাবে জাঁকিয়ে পড়েনি এখনও।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সদাশিব এসে পৌঁছলেন গন্তব্যে।

অনাথাশ্রমের মরচে ধরা বড় কালো গেটটা সশব্দে খুলে বাঁজখাই গলায় ডাক দিলেন,

- কই রে! মুন্নি, বিল্টু, ঝিলিক, রোদ, গুড়িয়া, সানি, ঝিল সব কই?

মুহূর্তে একদল ছোট বড় লাল নীল প্রজাপতি মুখে হাসি আর ঝর্ণাস্রোত চঞ্চলতায় ছুটে এলো উঠোনে।

- গল্পদাদু! আজ এত দেরি করলে যে!

আশ্রমের সবথেকে ছোট সদস্যা ঝিল ছুটে এসে ছোট্ট হাতে মুঠোটা ধরলো ওর প্রিয় গল্পদাদুর।

- দেরি কই রে সোনা মা? এমনই তো আসি!

- না। ঘড়ির বড় কাঁটাটা তিনে চলে গেছে। বড় কাঁটা বারোতে আর ছোট কাঁটা আটে থাকলেই তো তুমি এসে যাও অন্য রবিবার!

- তবে রে মেয়ে! যে ঘড়ি দেখতে শেখালো তাকেই শাসাচ্ছিস?

আসলে আমার কাছে আলাদিনের যে কার্পেটটা আছে না, যেটায় চেপে আমি তোদের কাছে আসি, সেটা আজ পাংচার হয়ে গেছিল! তাই দেরি!

বেশ বিশ্বাসযোগ্য একটা কারণ পেয়ে বাচ্চারা এই যাত্রায় মাফ করলো ওদের খুব প্রিয় মানুষটাকে।

দু'তিন জায়গায় তাপ্পি দেওয়া শতরঞ্জিটা এনে ঝটপট পাতা হলো বড় বারান্দাটায়। সদাশিববাবু ক্রাচটা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রেখে আরাম করে বসে পড়লেন শতরঞ্জিতে। পকেট থেকে একটা ছোটো কৌটো বের করে তা থেকে অল্প ভাজা জোয়ান নিয়ে মুখে পুরলেন। আশেপাশে তখন গোলগোল চোখের কৌতুহলী হাসিমুখগুলো ঘিরে ধরেছে ওদের গল্পদাদুকে।

- গল্পদাদু! আজ তুমি কিসের গল্প শোনাবে?

- দাঁড়া দাঁড়া। গল্প টল্প তো হবেই। আগে বল তোরা সব আছিস কেমন? গুড়িয়ার জ্বর এখন কমেছে?

- হ্যাঁ দাদু। গুড়িয়ার জ্বর তো কমেছে। কিন্তু মুন্নির আজ মনখারাপ!

- সে কেন? আমার শাপলাফুলের মন কেন খারাপ?

- আজ তো সকালে জলখাবারে রুটির সাথে কুমড়োর তরকারি হয়েছিল! ওর কুমড়ো ভাল্লাগে না। ও রাগ দেখিয়েছে আর তারপর বকাও খেয়েছে। তাই...

- অ! এই ব্যাপার? তোদের তাহলে আজ কুমড়োরই একটা গল্প বলি শোন। গল্প ঠিক না। সত্যি ঘটনা।

গল্পদাদু এবার বলতে শুরু করলেন।

তোরা কুট্টিমামাকে চিনিস তো? সেই যে কুট্টিমামা! গজগোবিন্দ হালদার। যাকে ইংরেজ সাহেব আদর করে ডাকতো গাঁজা গাবিন্ডে। সেই কুট্টিমামা। আমায় বড় ভালোবাসতো রে! মানে যাকে বলে চোখে হারাতো।

দলের সবথেকে মুখরা ক্লাস সিক্সের রোদ বলে উঠলো, "ও দাদু! ও তো টেনিদার কুট্টিমামা! তোমায় চিনলো কি করে?"

- এই তোকে নিয়ে এক জ্বালা রে রোদ। তুইও দেখছি ক্যাবলার স্বভাব পেয়েছিস। কুরুবকের মতো মেলা বকবক করিস না দেখি! এই সময় একটা গল্প আসছে, সেটা বলে নিতে দে। টেনিদার মামা আমার কেউ না? টেনিদা কি আমার পর রে? আমার গুরুদেব মানি ওকে।

গল্পদাদু কপালে দু'হাত ঠেকিয়ে একখানা প্রণাম করলেন গুরুদেবকে। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

তো হয়েছে কি, সেই কুট্টিমামার বন্ধু ছিল আমার মামাতো বোনের খুড়তুতো শ্বশুর। একতারা দাদু। দুজনেই তখন চাকরি করছে জঙ্গলঝোরায় অ্যালবার্ট সাহেবের টি এস্টেটে।

সেই কুট্টিমামা আর আমার একতারা দাদু একদিন এক চায়ের দোকানে খাওয়া দাওয়া নিয়ে আলোচনা করছিল আরকি! বুঝলি না, আবেগের বশে পিসিমার হাতের রান্নার একটু বেশিই ইয়ে করে ফেলেছে! ব্যাস আর যায় কোথায়? অ্যালবার্ট সাহেব যাচ্ছিলেন ওই পথে ঘোড়ায় চড়ে। শুনে তো এক্কেবারে যেচে নেমন্তন্ন নিয়ে ফেললেন কুট্টিমামার কোয়ার্টারে! আর এদিকে এ সব শুনে কুট্টিমামার বিধবা পিসিমা তো ভয়েই অস্থির। কি ভাবে আপ্যায়ন করবে এই সাদা হাতিকে সেই ভেবেই প্রেশার বেড়ে এক'শা।

যেদিন সাহেব এলো বুঝলি না! পিসিমা তো ভাইপোর মান বাঁচাতে যার পর নাই আয়োজন করেছে বেচারি! কচি পাঁঠা, কাঁকড়া, চিতল মাছের মুইঠ্যা, নোনা ইলিশ! সে এলাহী কারবার।

তবু খেতে বসে সাহেবের কিছুই যেন মুখে রুচছে না! একেকটা পদ চেখে দেখছে আর নাক সিঁটিয়ে বাটি সরিয়ে রাখছে!

"এ খেমন রন্ধন হে গাঁজা গাবিন্ডে? আমার ভালো লাগিতেছে না। নূতন কিছু আনো!"

এইবার বুঝি কুট্টিমামার চাকরি গেল! আর ওদিকে রান্নাঘরে পিসিমার ভিরমি খাবার জোগাড়।

তখন আলটিমেটলি কুট্টিমামা আর কিছু না ভেবে বিপদে মধুসূদন আমার তানপুরা দাদুকে ডেকে পাঠালো।

- তানপুরা আবার কে গো গল্পদাদু? সে তো একতারা!

রোদ তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললো।

- ওই একই হলো! বাজানোরই তো জিনিস। নামে আর কি আসে যায়? সাহেবের মেজাজ এদিকে সপ্তমে উঠছে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তোর! তুই নাম দেখছিস? ম্যালা ফ্যাঁচফ্যাঁচ না করে ঘটনাটা শোন।

একতারা দাদু তো এক তলবে হাজির।

কুট্টিমামা জোড়হস্তে হাঁটু গেড়ে বসে বললো, "ও একতারা, এবার বাজাও! আই মিন বাঁচাও!"

- তারপর?

- তারপর আর কি!

শেষমেশ একতারা দাদু ওর টিফিন কৌটো থেকে বউয়ের রান্না করা কুমড়োর ছক্কা নিয়ে গিয়ে সাহেবের পাতে দিল।

ব্যাস! সেই কুমড়োই সে যাত্রায় সম্মান আর চাকরি দুটোই বাঁচালো কুট্টিমামার। সাহেবের কুমড়োর ছক্কা এতো ভালো লাগলো যে খুশিতে ডগমগ হয়ে একতারা দাদুকে এস্টেটের ম্যানেজার করে দিল।

আর চায়ের বদলে সেখানে তারপর থেকে কুমড়োর বাগান করা হলো। নাম রাখা হলো 'দ্য পাম্পকিন প্যারাডাইস'।

এবার বুঝলি এই কুমড়োর কি মহিমা? মুন্নি তোকে বলছি, এখন থেকে কুমীরকে ইচ্ছে করলে আন্ডার এস্টিমেট কর, তবু কুমড়োকে নৈব নৈব চ!

গল্প শেষে ভালোলাগায় আচ্ছন্নপ্রায় কচিকাঁচারা তাদের অভিব্যক্তিতে তখন বিমুগ্ধতা প্রকাশে ব্যস্ত।

ট্যাঁকঘড়িটা বের করে সময় দেখে নিলেন সদাশিব। তারপর অন্যদিনের মতোই ব্যাগ থেকে পুরোনো ছোট্ট ডায়েরিটা বের করে কিছু লিখলেন।

অন্যদিনের মতোই সমস্বরে প্রশ্ন এলো, "ওতে কি লিখে রাখো গল্পদাদু?"

অভ্যেসেই উত্তরও এলো, "আরেকদিন বলবো!"

- নাহ্! এবার আসি রে! তোরা যে যখন সময় পাবি গেটের কাছে ওই শুকিয়ে যাওয়া ছাতিম গাছটার গায়ে একটু হাত বুলিয়ে আসিস তো! গাছটার অসুখ করেছে। তোদের ভালোবাসায় যদি সুস্থ হয়ে ওঠে!

সেদিনের মতো উঠলেন সদাশিব।

ফেরার সময় একটু বাজার হয়ে যাবে আজ। শরীরের কষ্টটা যেন বাড়ছে ক'দিন। শরীর জুড়ে রক্তকোষে বাসা বাঁধা এই হতচ্ছাড়া কর্কট রোগটার সঙ্গে যেন কিছুতেই পেরে উঠছে না সদাশিব। এই রোগটা যে ওর কল্পনাশ্রিত আষাঢ়ে গল্প, হাসি, তামাশায় বশ হয় না! আর সদাশিবের কাছে সম্পত্তি বলতে তো দিনের শেষে ওটুকুই!

বারোটা কেমো আর বেশ ক'খানা রেডিওথেরাপির ধকলটাও ছিল মারাত্মক। তবু ডাক্তার জবাব দিয়েই দিলেন। আর হয়তো বড়জোর দু'এক মাস!

কিন্তু বিশ্বাসই হয় না সদাশিবের। জীবন যে বড় সুন্দর! এখনও যে ওর অনেক কাজ বাকি! বাচ্চাদের সান্নিধ্যে থেকে, ওদের সাথে সময় কাটিয়ে ওদের থেকে প্রাপ্ত উষ্ণতা ভালোবাসা সঞ্চয় করে ঐশ্বর্যবান হওয়া বাকি! এত সুন্দর জীবনকে ফাঁকি দিয়ে এত তাড়াতাড়ি ও মরতে চায় না কিছুতেই!

মাঝখানে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। শীতটাও জাঁকিয়ে পড়েছে এইবার। আশিয়ানার গেটের পাশের ছাতিম গাছটাও যেন শীতঘুমে আচ্ছন্ন। বিষাদের চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সর্বশ্রান্ত অস্তিত্বটাকে টিকিয়ে রেখে।

সেদিনও এক রোববার।

লাল নীল সবুজ টুপি সোয়টারে ভরে গেছে শতরঞ্জিটা। আলখাল্লা আদলের একটা পুরোনো সোয়টারে সদাশিব। চেহারাখানা ক'দিনেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে অনেকটাই, তবে মুখের হাসিটা এখনও অমলিন, অক্ষত।

- আজ কি গল্প শোনাবে গল্পদাদু?

- ধর আমি আর গল্প শোনাতে পারলাম না তোদের, তখন?

- কেন? কেন তুমি পারবে না? এমন কিন্তু কথা ছিল না! কক্ষনও না!

- আসলে আমি অন্য কোথাও ডাক পেয়েছি! মস্ত বড় সুযোগ। হাতছাড়া করা যাবে না!

- কিসের ডাক? কে ডাকলো তোমায়?

- সময় ডাকলো। সময়ই তো আসল রাজা রে! রাজামশাই। তার কথা ফেলি কি ক'রে বলতো? যাই ঘুরেই আসি!

- কিন্তু কোথায়? আর কেনই বা?

- অনেক দুরে এক, সব পেয়েছির দেশ! আরও অনেক বাচ্চা আছে সেখানে। তবে তোদের মতো বাধ্য নয়। দুরন্তপনা। ওদেরকে গল্প শুনিয়ে ভুলিয়ে রাখতে হবে। ওখানেই হয়তো আমার ছেলেটাও আছে রে! সোহাগ! যদি দেখা পাই!

থামলেন সদাশিব। ঘাড় ঘুরিয়ে ছাতিম গাছটার দিকে তাকালেন একবার। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

- ওদের গল্প শোনালে ওরা আমায় ম্যাজিক শেখাবে জানিস তো?

আমি তোদেরও সেই ম্যাজিক শিখিয়ে দেবো স্বপ্নে এসে চুপিচুপি!

সেদিনের গল্প আর সেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দে এগোলো না। থমকে রইলো কিছু ম্লানমুখে, আড়ষ্ট আঙুলে আর একরাশ অজানা মনখারাপে।

উঠবার আগে আবার গল্পদাদু পকেট থেকে ম্লান ডায়েরিটা বের করে কিছু লিখে রাখলেন।

অভ্যেসেই প্রশ্ন এলো, "ওতে কি লিখে রাখো গো গল্পদাদু?"

তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আজ অনভিপ্রেত উত্তর এলো, "তোদের মতো দেবশিশুদের সাথে আমার সাক্ষাতের দিনসংখ্যা। আজ সাতশো পাঁচ দিন পূর্ণ হল আমার আশিয়ানায় আসার।

ভালো থাকিস তোরা সবাই। এবছর সান্টাক্লজ না এলে মনখারাপ করিস না। বরং তোরাই এক এক ক'রে অন্যের জীবনে সান্টাক্লজ হওয়া শিখে যা।

আর হ্যাঁ! ছাতিম গাছটার গায়ে আদর মাখিয়ে দিস রোজ। কানে কানে বলে আসিস তোদের সবুজ ইচ্ছেদের কথা। দেখবি, ম্যাজিক হবে! আমি তো নিজেই ততদিনে ম্যাজিক শিখে নেবো!"

গল্পদাদু আসে না আর। এক জোড়া ক্রাচ আর দাঁড়িয়ে থাকেনা প্লাস্টার খসা দেওয়ালের গা ঘেঁসে! মুন্নি খাওয়া নিয়ে বায়না করে না আর। রোদেরও ছটফটানি কমে গেছে অনেক।

আর... গেটের পাশে ছাতিমগাছটা সবুজ পাতায় সেজে উঠেছে, সাথে সারা গাছে পেস্তা রঙের ফুল ছেয়ে গেছে। একটা হালকা এলাচ-এলাচ গন্ধ মাতোয়ারা করে রেখেছে আশিয়ানার চারপাশ।

এভাবেই এক নিকষকালো বাস্তবতার আকাশে কিছু অলীক ম্যাজিকেরা জায়গা করে নেয় উজল তারাদের মতো, জাগতিক সব প্রশ্নচিহ্নদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে!

পরিচিতি: শিক্ষিকা, লেখক।