রাত্রি সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। এখনও খাবার কোনও তোড়জোড় নেই। আজ মাস ছ'য়েক হল মা নেই। এখন তিন জনের সংসার। আগে অনেক সময় মায়ের সঙ্গে খেয়ে নিতাম। মেয়ে আর বউ পরে খেত। একা একা খেতে ভালো লাগে না। আর পারলাম না। টেবিলে খাবার রাখা আছে। খাবার শেষে একটু মিষ্টি চাই। দেখি ফ্রিজে কী আছে। ফ্রিজ খুলে তাজ্জব! সেই ঈদের সময়কার লাচ্চা সিমুইয়ের পায়েস! এখনও এতটা পড়ে! জানি এরপর ফেলে দেবে। শুধু অপচয়। মাথা গরম হয়ে যায়।
রাত্রি বারোটার পর খাওয়া শেষে হঠাৎ যে কী হল? শুরু হল দরদর করে ঘাম। মনে হল ডুবে যাচ্ছি এক চোরা বালির সমুদ্রে। আমার আশেপাশে কারা যেন সব ফিশফিশ করছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, "এই দেখোনা আমার শরীরটা কেন খারাপ লাগছে"! মেয়ে আর বউ ছু্টে এল পাশের ঘর থেকে। আমাকে ও ঘরের বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হল। ওখানে তখন টিভি চলছিল, এসি চলছিল। টিভি বন্ধ করা হল। এসির তাপমাত্রা অনেক কমানো হল। ঘামের স্রোত বাড়তেই থাকল। মেয়ে এন্টাসিড, হজমের ওষুধ আর অ্যাস্পিরিন জলে গুলে খাইয়ে দিল। জিভের নীচে দেওয়া হল সরবিট্রেট। আমার অল্পে নার্ভাস হওয়া বউ কোথা থেকে এত মনোবল পেল কে জানে। পাড়ার উপকারী ছেলে উত্তমের সহায়তায় খুব তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে গেল এক সরকারি হাসপাতালে। ওখানে দায়িত্বে থাকা মহিলা চিকিৎসক আমার ইসিজি করছিলেন গম্ভীর মুখে। আমি ওনার মুখের অভিব্যক্তি দেখে আমার হৃদ-স্পন্দনের ছন্দপতনের ছবি বোঝার চেষ্টা করছিলাম। উনি বললেন, "গোলমাল আছে। ইমিডিয়েটলি কার্ডিয়োলজি ডিপার্টমেন্টে চলে যান"। তখন মাথা দুলছে। কার্ডিয়োলজি বিভাগের ডাক্তারবাবু বললেন, "এক্ষুনি ভর্তি হতে হবে। দেখুন বেড পান কিনা"। ইতিমধ্যে আমার দুই ভাগ্নাও এসে গেল। আর কিছু না ভেবেই ওরা আমাকে নিয়ে ছুটল আলিপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। আমার ভয় হচ্ছিল। আমি বাঁচব তো ? আমার চোখের কোল বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে কানের মধ্যে চলে গেল। আর তখনই কে যেন মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "ভয় পাসনা সোনা"। আমার মায়ের গলা মনে হল! মা কী করে হবে? মা তো আজ নেই ছ'মাস হল।
হাসপাতালে তড়িঘড়ি আমার কিছু পরীক্ষা করা হল। আর সঙ্গে সঙ্গে আট-দশ জন লোক আমাকে নিয়ে দৌড়ল ইন্টেনসিভ করনারি কেয়ার ইউনিটে। বেডে শুয়ে বুঝতে পারলাম, কেউ আমার বাড়ির পোশাক সব খুলে নিচ্ছে। তারপর, পরিয়ে দিচ্ছে অন্য কোনও পোশাক। বোধহয় মৃত্যুর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্যেই।
* * * *
জলের নীচে সে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুপুরী। আমার শরীরটা ক্রমশ ডুবছে। আমাকে তাড়া করছে এক ঝাঁক শিঙি মাছ। এঁকেবেঁকে ওরা দৌড়ে এসে আমাকে ক্রমাগত কাঁটা বেঁধাতে লাগল। রাগে ওদের চোখগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। একটা বিশাল শিঙি মাছ বলল, "ছোটবেলা থেকে আমাদের ঝোল খেয়ে খেয়ে তো আমাদের বংশ লোপাট করে দিয়েছিস। তাই হাইব্রীড করতে হচ্ছে। এবার দেখ কেমন লাগে"। আমি "মা মা" করে চিৎকার করে উঠলাম। দেখি একটা বিশাল আঁশবঁটি হাতে আমার মা। মায়ের খুব সাহস। ঘরে ইঁদুর কিংবা ছুঁচো ঢুকে পড়লে মা একাই তাদের মেরে ল্যাজ ধরে বাইরে ফেলে দিয়ে আসত। মা চিৎকার করে উঠল, "এই, আমার ছেলে সাঁতার জানেনা। ছাড় বলছি। তোদের আবার কাটব"। মায়ের রণচণ্ডী মূর্তি দেখে ভয়ংকর মাছগুলো শেষমেশ পালিয়ে গেল। কিন্তু তার আগে আমার হাতে, পেটে আর কব্জিতে অসংখ্য কাঁটা বিঁধিয়ে গেল। আমি ছটফট করতে লাগলাম।
"আপনি এত নড়ছেন কেন? আমাদের চ্যানেলগুলো করতে দিন"। বিরক্ত হয়ে কেউ বলল। আর, আমার হাতে, পেটে ফোঁড়াফুঁড়ি চলতেই লাগল।
আবার অন্ধকার। কতগুলো হাঙর আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছিল সমুদ্রে, জলের তলায়। নোনা জল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। পুরুষ কণ্ঠে এবার একজন বললেন, "এ কী? আপনি অক্সিজেন মাস্ক খুলছেন কেন"? আবার অন্ধকার। হাঙরগুলো আমায় টেনে নিয়ে চলেছে জলের আরও গভীরে। আমি হাতজোড় করার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। বললাম, "আমি তো তোমাদের কিছু করিনি ভাই"!
"ভাই?" ক্ষেপে গিয়ে একটা হাঙর বলল, "দাদু বল দাদু! আমাদের বয়স কত জানিস? একশো!"
"হ্যাঁ দাদু, জানি আপনারা অনেকেই একশো বছরের বেশি বাঁচেন"।
"কিন্তু তোদের জ্বালায় বাঁচছি কই"?
"কিন্তু দাদু, আমিতো আপনাদের কোনও ক্ষতি করিনি"।
"সে কী! আমাদের ফ্রাই করে খাসনি"? একটা হাঙর খ্যাঁক করে উঠল।
"সে তো ভেটকির"।
"ভেটকির"! তাচ্ছিল্যর হাসি হাঙরের মুখে।
"বিয়ে বাড়িতে দশ-পনেরো পিস করে আমাদের ফ্রাইতো মেরে দিয়েছিস। তখন মনে ছিল না? আজ তোকে গিলে খাব"।
আমি "মা মা" বলে চিৎকার করে উঠলাম। আর ঠিক তখনি আমার মা ডুবসাঁতারে চলে এল। এলোকেশী। কাপড় আলুথালু। হাতে একটা ভোজালি। ভোজালিটা চিনতে পারলাম। অনেকদিন আগে আমার ভাই এটা নেপাল থেকে এনেছিল। একটা আলমারির মাথায় রাখা থাকত। মা হুঙ্কার দিয়ে বলল, "এই হতচ্ছাড়া, ছাড় বলছি। বুড়ো হয়েছি বলে ভেবেছিস কী, আমার ছেলেকে ধরে খাবি"? হাঙরটা আমায় গিলতে এল। মা সঙ্গে সঙ্গে ভোজালি চালিয়ে দিল হাঙরের মাথায়।
"স্যার। স্যার, শুনছেন"? কোনও সিস্টারের গলা।
"স্যার, আপনার বডি ওয়েট কত"?
সিস্টার আর ডক্টরদের দ্রুত হাঁটাচলা আর ফিসফিসানিতে বুঝলাম আমার প্রেসার ফল করে যাচ্ছে। ওনারা হিসাব কষতে শুরু করলেন, আমার ওজন আনুযায়ী কতটা অ্যাড্রিনালিন ইন্জেকট্ করতে হবে। ওনাদের হুটোপাটির মধ্যে আবার অন্ধকারে ডুবে গেলাম। তলিয়ে গেলাম ছেলেবেলায়।
দাশনগর। যখন ওখানে সবে একটা খাসির মাংসর দোকান হল, কী আনন্দ আমাদের। রবিবার মায়ের হাতের রান্না খাসির মাংসর স্বাদই আলাদা। মা নিজে মাংস খেতনা। রান্না করতে করতে বাটিতে একটু মাংস নিয়ে আমাদের বলত, "দেখনা বাবা মাংসটা সেদ্ধ হয়েছে কিনা"। আমরা গম্ভীর মুখে বলতাম, "আর একটু হবে মনে হয়"। তারপর আবার চাখা। কিন্তু, এখন কী হল? এক দঙ্গল ছাগল আমাকে গলায় দড়ি বেঁধে হিড়-হিড় করে টেনে নিয়ে চলেছে একটা জঙ্গলে! সকলে মিলে আমাকে গোঁতাতে শুরু করল। একটা ছাগল আমার মাথার চুলের ঝুঁটিটা কামড়ে টেনে ধরল। সর্দার ছাগল তার সামনের বাঁ ঠাংটা দিয়ে আমার থুতনিটা তুলে ধরল।
"আব তেরা কেয়া হোগা...? বয়েসতো অনেক হল। বছরে ত্রিশ-চল্লিশ কিলো করে আমাদের মাংস খেলে কত হয়"? সর্দার হিসেব কোষতে বসল।
"তার ওপর তোদের ওই সুলেমান ব্যাটার বিরিয়ানি! আমাদের মাংসে! একবার পাই ওটাকে। আজ তোকে আমরা খাব। জানিসতো আমরা সব খাই"।
"তবে রে"! আমার মায়ের হুঙ্কার। মায়ের হাতে একটা বড় লাঠি।
"তোরা দাশনগরে আমাদের বাগানের শাকসবজি খেয়ে পালাতিস; লজ্জা করেনা"?
ছাগলগুলো এবার শিং বাগিয়ে মায়ের দিকে তেড়ে গেল। মা একেবারে লেঠেলদের মতো লাঠি চালাতে লাগল। শেষে সব ছাগল পালিয়ে গেল।
ভোর হচ্ছে। চারিদিকে কী ঠাণ্ডা। সর্দার ছাগলটা কীভাবে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। আমার নাকের কাছে তার মুখটা নিয়ে পরীক্ষা করে পাশের ছাগলটাকে বলল, "লোকটা বোধহয় মরে গেছে"। ছাগলের দাড়িটা আমার কপালে লাগছিল।
"স্যার, শুনছেন? উঠুন। আপনাকে চান করাতে হবে"। সিস্টারের গলা। ওনার হাতে ধরা তোয়ালের একটা কোনা লাগছিল আমার কপালে।
"আমি কি বেঁচে আছি"?
"সে কী! আপনি খুব ভালো আছেন"।
"ক'টা বাজে"?
"পাঁচটা। আমার ডিউটি শেষ হয়ে যাবে, তাই"। হাসপাতালের যে কী নিয়ম। শেষে নিউমোনিয়া না হয়ে যায়।
সকালে বড় ডাক্তার এলেন। ডঃ সেন। লম্বা, ফরসা, রোগা। হাসপাতালে ভর্তির অভিজ্ঞতা এই প্রথম।
"স্যার, আমাকে কবে ছাড়বেন"? ওঁনাকে প্রশ্ন করতেই উনি চোখ কপালে তুলে ফেললেন।
"ছাড়ব মানে? আর একটু হলেই আপনি তো ওপরে চলে যাচ্ছিলেন। নেহাত গোল্ডেন আওয়ারে টিনিসেপটালেজ ইঞ্জেকশনটা দেওয়া হয়েছিল। আঞ্জিওগ্রাফি হোক আগে"।
সারাদিন খাওয়া নেই। অক্সিজেন চলছে, ডিপ চলছে। বিকেলে অনেকেই দেখতে এলেন। এক সহকর্মী বলল, "আমরা কেউ খেলাম না; কাল মিটিঙে তুমি ওই ভাজাগুলো খেলে কেন"? সেটা শুনে অন্যরা "ছি ছি" করতে লাগল।
পরদিন আমাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হল। অপারেশনের টেবিলে শুয়ে আবার ডুবে গেলাম অন্ধকারে। ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার মুরগি। আমাকে ঠোকরাচ্ছে। কেউ বলছে, "আমার ডিম খেয়েছিস"। কেউ বলছে, "ঠ্যাং খেয়েছিস"।
"মা কোথায়, মা"? আমার ডাকে "যাই" বলে মা দৌড়ে এল। হাতে ঝুল ঝাড়ার লম্বা লাঠি। মায়ের ঠ্যাঙানির চোটে মুরগিগুলো পালক উড়িয়ে পালাল। এবার এল বিশ্রী দেখতে কয়েকটা বিশাল মুরগি।
"এগুলো কেরে বাবা"? মা চমকে গেল।
"টার্কি"।
"তুই এগুলোও খেয়েছিস নাকি"?
"হাঁ, বিদেশে"। মা টার্কিগুলোকেও ঠেঙিয়ে ভাগাল।
মা যেইনা একটু আড়াল হয়েছে, এল এক বিশাল মহিষ। তার গরম নিঃশ্বাসে ধুলোর ঝড় শুরু হল। মহিষের মাথায় বসানো একটা বিশাল কুমড়ো। মনে হল বেশ মিষ্টি হবে।
"কী রে পেটুক, কুমড়োর ছক্কা দিয়ে ভয়সা-ঘিয়ের ত্রিশ-চল্লিশটা লুচিতো এক একবারে মেরে দিয়েছিস"। মহিষটা গর্জন করে উঠল।
"সে তো ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর আগে। এখন আর সেই রকম ছক্কা পাই কোথায়"?
"তুই আমাদের শিশুদের বঞ্চিত করে সারা জীবনে কত ঘি, দুধ, ছানা, মিষ্টি খেয়েছিস? বল? আজ তার শোধ তুলব"। আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। মহিষটা আমার মাথায় কুমড়োটা ছুঁড়ে মারল। মা একটা বেলনচাকি ছুঁড়ে ওটা আটকানোর চেষ্টা করল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। আমার মাথায় লেগে কুমড়োটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। কুমড়োর বীজগুলো মাটিতে পড়তেই তা থেকে কয়েকশো কুমড়ো চারা বেরিয়ে পড়ল। মহিষ সেই সতেজ চারাগুলো খেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল। আমার মা-ও দেখা দিল আরও রুদ্রমূর্তিতে। চল্লিশ বছর আগেকার মা। ফরসা টকটকে রঙ। লালপেড়ে শাড়ী। মাথা ভর্তি সিন্দুর। হাতে ধরা ত্রিশুল। দাশনগর মেলা থেকে কেনা। তারপর সে কী লড়াই! মায়ের ত্রিশুলটা মহিষটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করতেই তা থেকে বেরিয়ে এল, অসুর! না! এল, ছুরি কাঁচি হাতে যন্ত্র-মানব। মা যেন কাকে বলছে, "দেখুন, আমি ডাক্তারের মেয়ে। আমার ছেলের কিছুই হয়নি। চিকিৎসা-বিভ্রাট যেন না হয়"।
"আচ্ছা, আপনি এত নড়ছেন কেন'? কে যেন ঝাঁঝিয়ে উঠল।
"লাগছে যে"। আমি বলতে বাধ্য হলাম। হাতের ধমনির মধ্যে দিয়ে সরু নল চালানো হয়েছে। আঞ্জিওপ্লাস্টি চলছে।
"দেখুন, আপনার এক জায়গায় থার্টি থেকে ফর্টি পারসেন্ট ব্লক আছে। স্টেন্ট বসালেও হয়, না বসালেও হয়"। ডঃ সেন এক সময় বললেন। আমি কী বলব? আমার মাথা তখনও টনটন করছে। শেষমেশ ওটা বসিয়েই দেওয়া হল।
দু'দিন বাদে হাসপাতাল থেকে আমায় ছাড়া হল। আমাকে বলে দেওয়া হল, "আপনার ভালমন্দ খাবার কোটা শেষ"। মা নেই। বাড়িতে এবার মেয়ে আর বউ যে কী টাইট দেবে তাই ভাবছি।
বাড়ি ফিরছি। পথে এক জায়গায় সব গাড়ী আটকে রাস্তা পার হচ্ছিল একপাল ছাগল। আমি মনে মনে বললাম, "তোরা আমায় অনেক জ্বালিয়েছিস। আমি ওষুধও খাব, তোদেরও খাব"।
বাড়ি ফিরে মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ালাম। পাশে বাবার ছবিও টাঙানো। মায়ের মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। তা দেখে বাবা একটু মুচকি হেসে ফেলল। তাতে মা আরও রেগে গেল। মা চাপা গলায় বলল, "তোর গালে এবার একটা চড় কষিয়ে দিতে হয়। আমি কি আর পারি? এখন থেকে একটু সামলে চলিস বাবা"। আমি মায়ের ছবি থেকে মালাটা খুলে নিলাম। মা কি কখনও ছবি হয়ে যেতে পারে?

পরিচিতি: লেখক প্রাবন্ধিক।