প্রাসঙ্গিক অতীত
অভিজ্ঞতাই শিক্ষক; অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করছি। ১৯৮৫ সাল, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার। স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে 'স্কুল সার্ভিস কমিশন' অর্থাৎ 'The WBCSSC' চালু হয়নি। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি (MC) সরকারি নিয়মে যোগ্যতম শিক্ষক বাছাই করত এবং নিয়োগপত্রও দিত। স্কুল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন ন্যূনতম সংখ্যক চাকুরি প্রত্যাশী না পেলে, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিত। এই প্রেক্ষিতে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি পড়বার সময়, তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার ডেবরা থানার গোলগ্রাম উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলের কেমিস্ট্রি শিক্ষক পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করি। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে স্বজন-পোষণ, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল। এইসব জানা সত্ত্বেও আবেদন করেছিলাম। কারণ চাকুরির খুব দরকার ছিল। আবেদন না করলে, প্রতিযোগিতায় আসার প্রশ্নই নেই। তবে মনে মনে স্থির করেছিলাম, মেধার ভিত্তিতে যদি চাকুরি পাই, তো ভালো। না হলে, না হবে। কি আর করা যাবে? আমাদের বাড়ি কাঁথি মহকুমা এলাকায়, সেই এলাকার এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে মহকুমা এলাকার দু'টি স্কুলে নাম যাওয়ায় ইন্টারভিউ পেয়েছিলাম। ইন্টারভিউ দিয়েও ছিলাম। শুনে এসেছিলাম, এমসি কাকে নেবে, আগেই স্থির করে রেখেছে। সত্যি? না মিথ্যে? জানি না। তবে দু'টি স্কুলের কোনোটি থেকেই আমার নিয়োগপত্র আসে নি। তাই বলে তো থেমে থাকা যায় না। সেকারণেই বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেছিলাম।
মাসখানেক বাদে পথ-নির্দেশ সহ ইন্টারভিউ লেটার। স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনলাম, স্কুলের প্রধান শিক্ষকের আপত্তি এবং বাধার কারণে স্বচ্ছতা বজায় রেখে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ হয় এবং এক্ষেত্রেও তাই হবে। যদিও আশপাশের প্রায় সকল স্কুলে দান বা অনুদানের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। এর কিছুকাল পরে স্কুলের নিয়োগপত্র হাতে। যারপরণাই খুশি এবং যোগদান করি। পরে একদিন, একান্তে প্রধান শিক্ষক মশায় প্রশ্ন করেন - "আচ্ছা, বলুন তো, আমাদের সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি ইত্যাদি কেন রয়েছে"? আমি নিরুত্তর। তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় বলেছিলেন - "আমরা চাই বলেই রয়েছে"। শুনে বিস্মিত হলেও কথাটা মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। যা আজ চল্লিশ বছর পরে, শিক্ষকপদ থেকে অবসরগ্রহণের পর লিখতে বসে স্পষ্ট মনে পড়ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আদেশে চাকরিচ্যুত স্কুল শিক্ষকরা সল্টলেকে 'বিকাশ ভবন'-এর বাইরে তাঁদের চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন।
'স্কুলের নিয়োগে আর্থিক লেনদেন, স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির অভিযোগ' প্রতিকারে ১৯৯৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার পাঁচটি জোন সহ 'The WBCSSC' গড়ে শিক্ষক বাছাইয়ের কাজ শুরু করে। প্রতিটি জোনে স্বচ্ছতার মাধ্যমে প্রস্তুত মেধাতালিকা থেকে কাউন্সিলিংয়ের সাহায্যে সেই জোনের স্কুলগুলির শূ্ন্যপদে 'The WBCSSC' নাম সুপারিশ করত স্কুলের MC'র কাছে, MC নিয়োগপত্র দিত। সেই থেকে প্রায় ফি-বছর স্কুলে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী পদে নিয়োগ হয়ে আসছে। নিম্নের সারণিতে তা স্পষ্ট। মেধার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে এবং হবে, এই আশা ভরসা হয়ে বিশ্বাসে পরিণত হয়। সেকারণে স্কুলে নিয়োগ সংক্রান্ত কারণে অবস্থান, অনশন, পুলিশি নির্যাতন, হাইকোর্ট, এসআইটি, সিবিআই অনুসন্ধান, ডিভিশন বেঞ্চ, সুপ্রিম কোর্ট, সরকারের উপদেষ্টা কমিটি, ভুয়া সুপারিশ, কোটি কোটি টাকার লেনদেন, নেতাদের বাড়ি থেকে কোটি কোটি ক্যাশ টাকা উদ্ধার, ... কোনো কিছুই ঘটেনি।
| সাল | ১৯৯৮ | ১৯৯৯ | ২০০১ | ২০০২ | ২০০৪ | ২০০৫ | ২০০৭ | ২০০৮ | ২০০৯ | ২০১০ | ২০১১ |
|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|---|
| নিয়োজিত | ৮,০৭২ | ১০,৯৮৭ | ১২,৬৪১ | ৯,৯৮০ | ৮,৬৮৫ | ১৪,২৬৭ | ২০,৮৮৭ | ১০,৯৯৫ | ১২,৯৩১ | ১৩,৬৭৭ | ১১,৭২৩ |
[সারণিটি পাশাপাশি সরিয়ে দেখুন।]
বহুচর্চিত পরিবর্তন
বর্তমান সময়কালে 'The WBCSSC'-র জোন অফিস তুলে দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপত্র দেওয়ার দায়িত্বে স্কুল শিক্ষা দফতর এবং মধ্যশিক্ষা পর্ষদ যৌথভাবে। অর্থাৎ বকলমে সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে। সেকারণেই দুর্নীতির অভিযোগে উপদেষ্টা কমিটি সহ শিক্ষা দফতর-সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর তলব সিবিআই-এর দফতরে! তলব এড়াতে কোর্টের শরণাপন্ন। তথাপি শিক্ষামন্ত্রী সহ স্কুলের নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকগণ ('The WBCSSC'-র চেয়ারম্যান ও সচিব; উপদেষ্টা কমিটির প্রধান, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি) এবং শাসকদলের নেতাগণ, বিধায়কগণ জেলবন্দি। কেউ কেউ জামিন পেলেও শিক্ষামন্ত্রী এখনও জেলবন্দি। বামফ্রন্ট সরকারের মেয়াদের শেষ সময়কালে ১০০ নম্বরের বাছাইয়ের মাধ্যমে মেধাতালিকা প্রস্তুতিতে ১০০ শতাংশ স্বচ্ছতা ছিল। ১০০ নম্বরের বাছাই পর্বের বিভাজনে লিখিত পরীক্ষায় ৬০; শিক্ষাগত যোগ্যতায় ৩৫ এবং ইন্টারভিউয়ে ৫ নম্বর ছিল। স্বজনপোষণ নিরসনে ইন্টারভিউতে রাখা হয়েছিল মাত্র ৫ নম্বর।
প্রাসঙ্গিক বর্তমান
২০১১ সালে বহুচর্চিত পরিবর্তনের পর, তথাকথিত 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের সময়কালে স্কুলে নিয়োগে নিয়মের পরিবর্তন সহ প্রথম বিজ্ঞপ্তি ২০১৬ সালে! ১০০ নম্বরের বাছাই পর্বের বিভাজনে - ওএমআর শিটে পরীক্ষায় ৫৫; শিক্ষাগত যোগ্যতায় ৩৫ এবং পারসোনালিটি টেস্টে ১০ নম্বর। মূল পরিবর্তনগুলো হলো - (১) ফি-বছর নিয়োগ বন্ধ (এক্ষেত্রে শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য - 'SSC মাধ্যমে নিয়োগ কী বার্ষিক দুর্গাপূজা নাকি?'); (২) স্বচ্ছতা ১০০ শতাংশ দূরীভূত (ওএমআর শিট সহ ফলাফল প্রকাশ্যে নয়, এমনকী পরীক্ষার্থীও জানতে পারবে না!); (৩) বিকেন্দ্রীভূত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে চূড়ান্তরূপে কেন্দ্রীভূত করা; (৪) ওএমআর শিটের হার্ডকপি সংরক্ষণকাল মাত্র এক বছর! তারসঙ্গে পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে চাকুরি বিক্রির জন্য এলাকায় এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করা। সিবিআই-এর প্রাক্তন অতিরিক্ত অধিকর্তা তথা 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. উপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস মহোদয়ের 'সৎ রঞ্জন' শীর্ষক ভিডিয়ো-বার্তা, তারই প্রমাণ। দুর্নীতির তদন্তে চন্দন কুমার মণ্ডল ওরফে 'সৎ রঞ্জন'-এর গ্রেফতার তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাছাড়া 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের সময়কালে 'The WBCSSC'-র প্রথম চেয়ারম্যান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. চিত্তরঞ্জন মণ্ডলের বক্তব্যেও তা স্পষ্ট। ড. মণ্ডলের বক্তব্যের নির্যাস - মুখ্যমন্ত্রীর জ্ঞাতসারে শিক্ষামন্ত্রীর পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। তারসঙ্গে বর্তমানে জেলবন্দি প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বান্ধবীর একাধিক ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড়, সোনার গহনা, মূল্যবান সামগ্রী, কোটি কোটি টাকার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টস, বহু কোটি টাকার সম্পত্তির দলিল উদ্ধার; পুনঃ প্রমাণ করে - স্কুলের চাকুরি বিক্রি সহ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে রাজ্যের শাসকদল, পুলিশ প্রশাসন, তদন্তকারী সংস্থা এবং ভিজিল্যান্স কমিশন সমূহের প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় সহযোগিতায়।

সল্টলেকে পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর 'বিকাশ ভবন'-এর বাইরে অবস্থান বিক্ষোভের সময় স্কুল শিক্ষক এবং পুলিশ কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ।
কোটি কোটি টাকা উপার্জনে চাকুরি বিক্রি এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার প্রয়াসে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফলে ২০১৯ সাল থেকে (১) বঞ্চিত এবং প্রতারিত চাকুরি প্রার্থীদের অবস্থান - বিক্ষোভ - অনশন রাস্তায় আছড়ে পড়ে; (২) প্রশাসনের উদাসীনতা, অবহেলা সহ চরম অসহযোগিতা সমস্ত রীতিনীতি অতিক্রম করে; (৩) মূলস্রোতের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এই সকল খবর থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে এবং (৪) আরটিআই-এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করার পর বঞ্চিত এবং প্রতারিত চাকুরিপ্রার্থীদের শত শত পিটিশন হাইকোর্টে আছড়ে পড়ে। পাশাপাশি 'The WBCSSC', মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, শিক্ষা দফতর, শিক্ষামন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী সহ বিচারব্যবস্থা 'বঞ্চিত এবং প্রতারিত চাকুরি প্রার্থীদের' নানান কায়দায় বিভ্রান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তথাপি প্রশাসনের চোখ-রাঙানি, লাঞ্ছনা, অসহযোগিতা সত্ত্বেও লাগাতার অবস্থান - বিক্ষোভ - ধরনা কর্মসূচি চলতে থাকে। রাস্তার আন্দোলন বছরের পর বছর চলতে থাকে। হুগলী নদী দিয়ে লক্ষ কোটি গ্যালন জল গড়িয়ে যায়। তারমধ্যে 'অজানা করোনা ভাইরাসজনিত বিশ্বব্যাপী অতিমারি' শাসকদল, প্রশাসন, দীর্ঘসূত্রী বিচারব্যবস্থা এবং দুর্নীতির কারবারিদের বাড়তি অক্সিজেন জোগান দেয়। কিন্তু রাস্তার লড়াই দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ায় জাস্টিস রঞ্জিত কুমার বাগের নেতৃত্বে তদন্ত রিপোর্ট এবং সিবিআই-এর তদন্ত রিপোর্ট হাইকোর্টে জমা পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি অনাবৃত হয়ে প্রকাশ্যে চলে আসে। সরকারের সুপার নিউমেরিক পোস্টের মাধ্যমে দুর্নীতিকে সরকারিকরণের প্রচেষ্টা প্রকাশ্যে চলে আসে, কিন্তু রাস্তার আন্দোলনের চাপে বানচাল হয়। দীর্ঘসূত্রী বিচার প্রক্রিয়ায় হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ, ডিভিশন বেঞ্চ, সুপ্রিম কোর্ট, ফের হাইকোর্টের স্পেশাল ডিভিশন বেঞ্চ, প্রায় ছাব্বিশ হাজার পুরো নিয়োগ বাতিল, ফের সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন, স্থগিতাদেশ; কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভি, বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যদের সওয়াল; প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশবন্ত চন্দ্রচূড়ের অবসরগ্রহণ, জাস্টিস সঞ্জীব কুমার খান্নার প্রধান বিচারপতি পদে অভিষেক, রাজ্যের শাসকদলের জাঁদরেল আইনজীবীদের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘসূত্রী করার প্রয়াস প্রাসঙ্গিকতালাভ করে।

সল্টলেকের শিক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর 'বিকাশ ভবন'-এর বাইরে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষক অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
শেষমেষ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ থেকে ৬ বছর পর ৩ এপ্রিল ২০২৫ চূড়ান্ত রায়। 'The WBCSSC'-২০১৬ বিজ্ঞপ্তি মাধ্যমে নিয়োজিত ২৫,৭৫২ শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীর চাকুরি বাতিল। কারণ পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক দু্র্নীতি। ২৫,৭৫২-এর মধ্যে একাংশ 'প্রমাণিত চিহ্নিত অযোগ্য'। বাকি অংশ যে অযোগ্য নয়, 'The WBCSSC' তথ্যপ্রমাণ সহ হলফনামা দিয়ে জানাতে চায়নি। সেকারণেই পুরো প্যানেল বাতিল করে, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর মধ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মেধাতালিকা প্রস্তুত করে পুনর্নিয়োগের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি এও নির্দেশ দেয় - 'প্রমাণিত চিহ্নিত অযোগ্য'দের ১২ শতাংশ সুদ সহ টাকা ফেরত এবং তাঁরা আর পরীক্ষায় বসতে পারবেন না।
এই অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে, 'The WBCSSC' ৩০ মে, ২০২৫ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তি থেকে স্পষ্ট - (১) সরকার 'প্রমাণিত চিহ্নিত অযোগ্য'দের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করবে না; (২) ১০০ নম্বরের বাছাই পর্বের বিভাজনে অনৈতিক পরিবর্তন আনা হয়েছে - ওএমআর শিটে পরীক্ষায় ৬০; শিক্ষাগত যোগ্যতায় মাত্র ১০ (মাধ্যমিক এবং উচ্চ-মাধ্যমিকের রেজাল্ট বাদ দিয়ে কেবলমাত্র স্নাতক/স্নাতকোত্তরের রেজাল্টের ভিত্তিতে); শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় ১০; এবং ইন্টারভিউয়ে কার্যত ২০ নম্বর; (৩) যাঁরা ২০১৬ সালে আবেদন করেছিলেন, তাঁরা সহ সব্বাই আবেদন করতে পারবেন। ফলে আবার চ্যালেঞ্জ করে পিটিশন হাইকোর্টে।
রাজ্য সরকারের বারতা
সরকারের প্রধান এবং মন্ত্রী-সান্ত্রিদের হাবভাব এবং কথাবার্তায় স্পষ্ট - দুর্নীতি করেছি, বেশ করেছি। 'প্রমাণিত চিহ্নিত অযোগ্য'দের তালিকা প্রকাশ করব না। 'প্রমাণিত চিহ্নিত অযোগ্য'দের যে কোনো মূল্যে রক্ষা করব। বারে বারে মামলায় চাকুরি বাতিল হয়েছে, হোক; নিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে, থাক। তার দায় মুখ্যমন্ত্রীর নয়, সরকারেরও নয়। কেবলমাত্র মামলাকারী, আইনজীবী এবং বিরোধীদের। অর্থাৎ কোর্টের নির্দেশ মানব না। তারজন্য যদি আদালত অবমাননার মামলা হয়, হোক। সবকিছু আটকে যাক। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের মূলমন্ত্র। “এলো মেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই”। ফলে কার্যত রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। একটা প্রজন্ম সহ সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা উৎসাহিত হচ্ছে। রাজ্য সরকারের এটাই মূল লক্ষ্য। অপরদিকে শাসকদলের পার্টিফান্ড স্ফিত হচ্ছে।
সালতামামি এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন
(১) ২০১৬, 'The WBCSSC' নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
(২) ২০১৯ সালের শুরু থেকে দুর্নীতির অভিযোগে অনশন আন্দোলন রাস্তায়; কোর্টে শত শত মামলা-পিটিশন।
(৩) ৩ এপ্রিল ২০২৫, দীর্ঘসূত্রী বিচার প্রক্রিয়া শেষে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়। ২৫,৭৫২ জনের পুরো নিয়োগ বাতিল।
(৪) পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় কোর্টের নির্দেশে বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগ তদন্ত কমিটি এবং সিবিআই তদন্তের রিপোর্ট। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আপাতত ১৭ দফা বেনিয়মের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রমাণিত।
(৫) এইখানে প্রশ্ন - ২৫,৭৫২ জনই কি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে নিয়োজিত? কক্ষণও সম্ভব নয়। তাহলে একাংশ যোগ্যতার নিরিখে বৈধভাবে নিয়োজিত। অপর অংশ দুর্নীতির কারণে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে নিয়োজিত।
(৬) এবার প্রশ্ন, কারা বৈধভাবে নিয়োজিত এবং কারা অবৈধভাবে নিয়োজিত? হলফনামা এবং তথ্যপ্রমাণ সহ এই তালিকা কোর্টে জমা দেওয়ার দায়িত্ব কার? 'The WBCSSC'-এর। ১৭ দফা বেনিয়মের মাধ্যমে দুর্নীতির বাইরে আর কোনোরকম বেনিয়ম কি হয় নি? 'The WBCSSC'-এর স্পষ্ট জবাব নেই।
(৭) অবৈধভাবে নিয়োজিতদের নামের তালিকা কোর্টে 'The WBCSSC' জমা দিয়েছেন? না।
(৮) ৩০ মে ২০২৫, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনর্বাছাই এবং পুনর্নিয়োগের জন্য 'The WBCSSC' যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তাতেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
(৯) সরকারি স্কুলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে, তা প্রমাণিত। ২০১৬ সালে যাঁরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলেন; যাঁরা আবেদন করেছিলেন তাঁরা সহ তাঁদের পরিবার পরিজন; যাঁরা নিয়োজিত হয়েছিলেন তাঁরা সহ তাঁদের পরিবার পরিজন; যাঁরা তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিলেন; যাঁরা মামলাকারী; যাঁরা আইনজীবী হিসেবে সওয়াল করেছেন; যাঁরা বিভিন্ন কোর্টে বিচারপতি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন; যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কুশীলব সহ রাজ্যবাসী এবং দেশবাসী একবাক্যে স্বীকার করেছেন এবং করবেন, হ্যাঁ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি হয়েছে।
(১০) এইখানে প্রশ্ন, তাহলে এই 'প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি'র জন্য অপরাধী কে বা কারা? বিচার প্রক্রিয়ায় তা চিহ্নিত হওয়া দরকার ছিল। কোর্ট তা করেছে? না। দ্বিতীয়ত: অপরাধীদের চিহ্নিত করে, যথাযথ শাস্তি দেওয়া হোক, কোর্ট ঘরে 'সওয়াল-জবাব' প্রক্রিয়ায় কোনো আইনজীবী দাবি করেছেন? শুনি নি।
(১১) কোনো আইনজীবী এবং কোনো বিচারপতি অপরাধী চিহ্নিতকরণে কোনো সদর্থক ভূমিকা পালন না করলে, কেন করেন নি? দ্বিতীয়ত: রাজ্যবাসী স্পষ্টভাবে জানেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিতে প্রথম এবং প্রধান অপরাধী 'The WBCSSC'। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি, শিক্ষা দফতর এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রীসভা।
(১২) যাঁরা সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে বেসরকারি ব্যবস্থাকে সুবিধে পাইয়ে দিতে, পরিকল্পনামাফিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে অযোগ্যদের অবৈধভাবে নিয়োগ করলেন, তাঁদের কোনও শাস্তি হল না! কিন্তু যাঁরা যোগ্যতার নিরিখে বৈধভাবে নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যাঁরা বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েছেন, তারা মৃত্যুসম শাস্তি পেলেন!
(১৩) তাহলে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় থেকে ন্যায়বিচার মিলল না কেন? কারণ একটাই, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বিচারব্যবস্থা থেকে স্বাধীন ভারতের বিচারব্যবস্থা সবসময় অর্থশালী এবং প্রভাবশালীদের পক্ষে কাজ করে চলেছে।
(১৪) দুর্নীতি প্রতিরোধে বামফ্রন্ট সরকার সফলভাবে 'The WBCSSC'-কে ব্যবহার করতে পারলেও, স্বঘোষিত 'সততার প্রতীক' নেতৃত্বাধীন 'মা-মাটি-মানুষ' সরকার পরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে 'The WBCSSC'-কে 'The West Bengal Central Super Scam Commission'-এ পরিণত করেছে।
(১৫) প্রকৃতি বিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট - স্বঘোষিত 'সততার প্রতীক' নেতৃত্বাধীন 'মা-মাটি-মানুষ' সরকারের দ্বারা 'The WBCSSC' মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ নিয়োগ সম্ভব নয়। এমনকী সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের নজরদারিতেও।
(১৬) তাহলে? উদয়ন পণ্ডিতের নেতৃত্বে ভালো মানুষের জোট দরকার এবং ভূতের রাজার বলে বলিয়ান 'গুপি-বাঘা' জুটির ভূত তাড়ানোর মন্ত্র ('দড়ি ধরে মারো টান, রানি হবে খান খান')-এর সফল প্রয়োগ দরকার। এটাই ঐতিহাসিক বারতা।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, লেখক, সমাজকর্মী।