২০১৪-তে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের ভিতর থেকে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিঃশব্দে একটি হিন্দুত্ববাদী অভ্যুত্থানের প্রয়াস চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই প্রয়াসের অংশ হিসাবে সংঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা সংগঠনগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও প্রশাসনিকভাবে শিক্ষার গৈরিকীকরণের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে অত্যন্ত নগ্নভাবে। সেইসঙ্গে সিভিল সোসাইটি বা জনসমাজে ও পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাজনৈতিক সমাজে বিভিন্ন মাধ্যমগুলিকে সুসংগঠিত, সুপরিকল্পিত ও হিংস্রভাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। গণতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে দীর্ঘ ইতিহাসচর্চার ও গবেষণার ফসলগুলির ওপর বিভিন্ন অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে: যেমন মোগল শাসনের অপশাসনকে গোপন করে সেই যুগের ছবি উজ্জ্বল করার অভিযোগ, বৈদিক যুগকে অবজ্ঞার অভিযোগ ইত্যাদি। সংঘ পরিবার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের মতো সুলতানি ও মুঘল শাসনকালকেও বিদেশি শাসনকাল বলে প্রচার করে। কিন্তু মুসলিম শাসকরা প্রথম দিকে অন্য দেশ থেকে এলেও দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দিয়ে তারা ভারতীয় হয়ে উঠেছিলেন। তারা ব্রিটিশদের মতো সম্পদ লুণ্ঠন করে ভিনদেশে পাচার করতেন না।

মোগল চিত্রকর গোবর্ধন অঙ্কিত সম্রাট আকবর-এর ছবি (সম্ভবত ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে)।
ভারতে ঔপনিবেশিক ইতিহাস পাঠের সূচনায় ব্রিটিশরা তাদের পছন্দের জেমস মিলের বই পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিমযুগ ও ব্রিটিশযুগে ভাগ করা হয়েছিল। বর্তমানে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন স্কুল বা ঘরানা বিষয়ে বিদ্যালয়স্তরেই ধারণা দেওয়া হয়। পরিবেশ, নারী, ক্রীড়া, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, শিল্পচর্চার ইতিহাস বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। আনাল, সাবঅলটার্ন ইত্যাদি বিভিন্ন ঘরানার ঐতিহাসিকদের নামের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে কোনো ঘরানার ঐতিহাসিকই মিলের উক্ত বিভাজনকে সমর্থন করেন না। এখন ভারতের ইতিহাসকে প্রাচীনযুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিকযুগে ভাগ করে পড়ানো হয়। হিন্দুত্ববাদীরা এখনও মধ্যযুগকে মুসলিম যুগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান ও সেই যুগকে বিদেশি শাসনের যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সেই কারণেই তারা মুঘলযুগকে ইতিহাসের পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দিতে চাইছেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা তাঁর একটি লেখায় ('সাম্প্রদায়িকতার বিপদ ও ইতিহাস চর্চা') দেখিয়েছেন: মধ্যযুগই হিন্দু সংস্কৃতির সর্বাপেক্ষা বিবর্তনের অধ্যায়। প্রকৃতপক্ষে শিল্পের ক্ষেত্রে, স্থাপত্যের ক্ষেত্রে, আঞ্চলিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মধ্যযুগ হলো গৌরবের যুগ।

ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা (১৯১৯-২০১১)।
বিভিন্ন ঘরানার ঐতিহাসিকদের মধ্যে ইতিহাস গবেষণার পদ্ধতি বিষয়ে কিন্তু কোনো মতদ্বৈধতা নেই। ইতিহাস গবেষণার প্রথম শর্ত হলো: আগাম অনুমান বা পূর্বধারণাকে চিন্তাপদ্ধতি থেকে অপসারণ করা এবং ইতিহাসস্বীকৃত উপাদান ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। দ্বিতীয় শর্ত হলো: কোনো ঐতিহাসিক সূত্রকেই বিনাপ্রশ্নে স্বীকার না করা। অর্থাৎ সূত্রগুলিকে অত্যন্ত সমালোচনামূলকভাবে বিচার করা। এই দুই শর্তকে সব ঘরানার ঐতিহাসিকই মেনে চলেন। হিন্দুত্ববাদীরা এই দুই শর্তকে না মেনে, গণতান্ত্রিক ও যুক্তিনিষ্ঠ পদ্ধতিতে ইতিহাসচর্চার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পুরাণ ও বিশ্বাসকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তাই সংঘ পরিবারের কোনো বড়ো ঐতিহাসিক নেই। ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্তরে ইতিহাসের যে ৯৯ পৃষ্ঠার পাঠ্যক্রম প্রকাশ করেছে তার মধ্যে হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে ইতিহাসচর্চা চান তার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। (Learning Outcomes based Curriculum Framework (LOCF), For B.A., History, Undergraduate Programme, 2021, University Grants Commission, Bahadur Shah Zafar Marg, New Delhi, https://www.ugc.gov.in/pdfnews/2500520_UGC-document-on-LOCF-History.pdf)
এই পাঠ্যক্রমের তৃতীয় পত্রে (From Earliest Times to 550 C.E./Common Era) হরপ্পা ও মহেঞ্জোদরোতে আবিষ্কৃত সভ্যতা, যা আবিশ্বে 'সিন্ধু সভ্যতা' বলে পরিচিত, যা এখনও পর্যন্ত সরকারি প্রত্নতত্ত্বে হরপ্পা সংস্কৃতি নামে পরিচিত, তা হয়ে গেছে 'The Indus-Saraswati Civilization'। হিন্দুত্ববাদীদের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য: সিন্ধু সভ্যতা আর্যদের নির্মাণ ও তা বৈদিক – একথা প্রতিষ্ঠা করা। ইরফান হাবিব তাঁর একটি প্রবন্ধে ('স্নাতকস্তরে ইউজিসি-প্রস্তাবিত ইতিহাসের পাঠ্যসূচি: ভারতীয় ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক বিকৃতি') দেখিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্যেই শিবালিক পর্বত থেকে উদ্ভূত সরস্বতী – যা একটি গৌণ ও মরশুমি জলধারা – তার নাম সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কারণ ঋগ্বেদে সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে। 'উই, অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড' বইতে গোলওয়ালকর বলেছেন: কোনো বিদেশি জাতি দ্বারা এই ভূমি আক্রান্ত হবার আগে ৮ বা ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দুরাই এই ভূখণ্ডের অবিসংবাদিত এবং নিরবচ্ছিন্ন অধিকারী ছিল। ৮-১০ হাজার বছর বা তারও আগে থেকে গোলওয়ালকর হিন্দু জাতির অস্তিত্ব কল্পনা করে নিচ্ছেন। ভারতের প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ইতিহাস যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক অবস্থান থেকে যাঁরা চর্চা করেছেন তাঁরা কেউ এই অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক অবস্থানকে সমর্থন করেন না।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া হরপ্পা ও মহেঞ্জোদরোর ধ্বংসস্তূপ।

(বাঁদিক থেকে) সাদা পাথরের তৈরি পুরোহিত রাজার আবক্ষ মূর্তি, ব্রোঞ্জের তৈরি নৃত্যরতা নারীমূর্তি, টেরাকোটার তৈরি পুরুষ মূর্তি।

খননকার্যে প্রাপ্ত শিলালিপি।
হোলোসিন যুগ হলো পৃথিবীর ইতিহাসের শেষ ১১,৭০০ বছরের যুগ। শেষ প্রধান হিমবাহ যুগের বা তুষার যুগের শেষে তার সূচনা। তারপর থেকে, জলবায়ুতে ছোটো আকারের কিছু পরিবর্তন হয়েছে - বিশেষ করে প্রায় ১২০০ ও ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে 'ছোটো বরফ যুগ' – তবে সাধারণভাবে, হলোসিন অপেক্ষাকৃত উষ্ণ সময়। আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে ১৪ মার্চ, ২০২৩ একটি সংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন: ভারত সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর শুধুমাত্র ভারত থেকে আসা উচিত। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে ইতিহাস গবেষণার যে স্বীকৃত পদ্ধতি তা এই ফতোয়া মানবে না। ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস-চর্চায় সাম্প্রতিককালে প্রচলিত উপাদানগুলির সঙ্গে আধুনিকতম জেনেটিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সত্যগুলিকে যুক্ত করেও সিদ্ধান্তে পৌছানো হচ্ছে। তারফলে বিভিন্ন ঘটনাবলির সঠিক সময় আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই ('প্রাগিতিহাস – ভারতবর্ষে পরিযান ও জাতিগোষ্ঠী গঠন', প্রকাশক গাঙচিল) থেকে জানতে পারি, হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের পপুলেশন জেনেটিক্স বিশেষজ্ঞ ডেভিড রাইখের নেতৃত্বে সারা বিশ্বের জিনবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা যৌথভাবে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার জনগোষ্ঠীর উৎস সন্ধানে একটি বিরাট প্রকল্প নিয়েছিলেন। তাঁরা এই অঞ্চলের ৫২৩টি ফসিলের ডিএনএ বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিম দিক ভারতে থেকে আসা তিনটি পৃথক জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছেন। ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যও ছিল স্বতন্ত্র। পরিযানের ফলে তাদের মিশ্রণ হয়। এই তিনটি জনগোষ্ঠী হল: (১) 'আন্দামানী শিকারি-সংগ্রাহক' জনগোষ্ঠী: যারা আনুমানিক ৬৫,০০০ আগে সরাসরি আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছিল। (২) 'প্রাচীন ইরান-সম্পর্কিত শিকারি-সংগ্রাহক' জনগোষ্ঠী: যারা মূলত ইরানের শিকারি-সংগ্রাহকদের একটি শাখা, যারা ১২,০০০ বছর আগে ভারতে এসেছিল। (৩) তারও পরে সেন্ট্রাল স্তেপভূমির 'ইন্দো-ইয়োরোপীয়' জনগোষ্ঠী: যারা ছিল অর্ধ-যাযাবর পশুপালক, স্তেপভূমি থেকে তারা ঘোড়ায় টানা রথে ভারতে এসেছিল। এদের ভাষা ছিল ইন্দো-ইয়োরোপিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর ইন্দো-আর্য শাখার বৈদিক সংস্কৃতি। আন্দামানী শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রাচীন ইরান-সম্পর্কিত শিকারী-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ ঘটেছিল। প্রায় চার হাজার ছয়শো বছর আগে তারাই হরপ্পীয় সভ্যতা শুরু করেছিল। হরপ্পীয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নগর রাখিগর্হি ও অন্যান্য কাছাকাছি প্রত্নস্থলের দেহাবশেষের ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় হরপ্পীয় মানুষরা ছিলেন মূলত প্রাচীন ইরান-সম্পর্কিত শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের সঙ্গে অল্প মিশ্রণ হয়েছিল আন্দামানী শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর, যারা ৬৫,০০০ বছর আগেই ভারতে এসেছিল। ইন্দো-ইয়োরোপিয়ানরা পশুপালকরা দলে দলে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছে আরও অনেক পরে, প্রায় ৪,০০০ থেকে ৩,৫০০ বছর আগে। রাখিগর্হি সিন্ধু সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর। সেখানকার একটি সমাধি থেকে ৪,৫০০ বছর আগের একটি নারীর ফসিলের ডিএনএ সিকোয়েন্স থেকে ওই নারীর জেনেটিক প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। তাতে ইন্দো-ইয়োরোপিয়ান জিন পাওয়া যায়নি। তাহলে তো একথা প্রমাণ করা যায়না যে, সিন্ধু সভ্যতা আর্যদের সৃষ্টি। রাখিগর্হির নারীর সময়কালের নমুনার এক হাজার বছর পরে পাকিস্তানের সিয়াট উপত্যকার ৭টি প্রত্নস্থল থেকে বিভিন্ন দেহাবশষের জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ইন্দো-ইয়োরোপিয়ান হ্যাপ্লোগ্রুপের সন্ধান পাওয়া যায়। (হ্যাপ্লোক্রোম হলো পিতৃক্রম বা মাতৃক্রম থেকে আগত এক-একটি ডিএনএ শৃঙ্খল।) অথচ হিন্দুত্ববাদীরা বেশ কিছুদিন ধরে দেখানোর চেষ্টা করছেন, হরপ্পা সভ্যতা আর্যদের দ্বারা নির্মিত। এই উদ্দেশ্যে তারা ভারতে ইন্দো-ইয়োরোপিয়ানদের আগমনের সময়কাল ক্রমাগত পিছিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। সংঘ পরিবারের লোকজনেরা হরপ্পার সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো দ্রাবিড়ীয় যোগসূত্র অস্বীকার করার লক্ষ্যে এই কাজগুলি করেন। যদিও ঘন ঘন মাছের চিহ্ন ব্যবহার ও সিন্ধু সিলমোহরে তিরচিহ্নের উপস্থিতি এই যোগসূত্রকে স্পষ্ট করে তোলে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও জেনেটিক প্রমাণ দেখায়: সিন্ধু সভ্যতা কোনোভাবেই ইন্দো-ইয়োরোপিয়ান বা আর্যদের নির্মাণ নয়। অথচ এই লক্ষ্যেই সিন্ধু সভ্যতাকে 'The Indus-Saraswati Civilization' বানিয়ে তোলা হচ্ছে। অধ্যাপক হাবিব তাঁর অন্য একটি প্রবন্ধে ('সরস্বতী নদী: কল্পনায় ও বাস্তবে') সরস্বতীকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লেখক ইতিহাসের যে সব ভ্রান্ত ব্যাখ্যা করে চলেছেন তা উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন: পুরাতাত্ত্বিক ভি. এস. ওয়াকাঙ্কার বলেছিলেন, মানুষের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল হরিয়ানার আম্বালা ও কর্নল জেলায়। কিন্তু শিবালিক অঞ্চলে পাওয়া Ramapichekus হচ্ছে পাকিস্তানে পাওয়া Sivapithekus-এর স্ত্রীলিঙ্গ। এবং এই দুটি ফসিল বিবর্তন বৃক্ষের যে শাখায় অবস্থান করে তারা এপ্ ওরাংওটাং-এ বিবর্তিত হয়েছিল, মানুষে নয়। আবার আমেরিকান ডেভিড ফ্রাওলি (পণ্ডিত বামদেব শাস্ত্রী নামে খ্যাত) বলেছেন: ইন্দো-ইয়োরোপীয় ও অন্যান্য আর্য মানুষরা ভারত থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল ও তারা সরস্বতী নদীর তীরবর্তী অঞ্চল থেকেই গিয়েছিল। আবার আমেরিকার নাসা-র বিজ্ঞানী নবরত্ন শ্রীনিবাস রাজারাম বলেছেন: সরস্বতী নদী ও সরস্বতী সভ্যতা আবিচ্ছেদ্য এবং এতদিন হরপ্পা সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা নামে যা অভিহিত হয়ে এসেছে, তার বদলে সরস্বতী সভ্যতা নামই শুদ্ধ এবং প্রাচীন সরস্বতী নদীর গতিপথ ও প্রবাহ হরপ্পা সভ্যতার ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। হাবিব এইসব ভ্রান্ত কল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন: হরপ্পা, মহেঞ্জোদরো, ধোলাভিরা ও লোথাল সরস্বতী নদীর ধারে অবস্থিত ছিলনা। থানেশ্বরের পাশ্ববর্তী অঞ্চলে প্রবাহিত ক্ষীণ মরসুমী স্রোতধারাকে উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করে দিয়ে সরস্বতী নামটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সত্য সরস্বতী নদীর প্রবক্তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করেন, নাম দিতে পারলেই অর্ধেক যুদ্ধ জেতা যায়। তাই সিন্ধু সভ্যতাকে নতুন নাম 'সরস্বতী সভ্যতা' নামে অভিহিত করতে পারলেই যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে ধ্বংস করে নামকরণটিই প্রধান হয়ে ওঠে। সিলেবাসে তাই সিন্ধু সভ্যতা 'The Indus-Saraswati Civilization' হয়ে যায়।

ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব।
হিন্দুত্ববাদীদের কাছে আর্য-উৎস বিষয়ক স্পন্দনশীলতা এতটাই জোরালো ও তা গোপন রাখতে তারা এতটাই অক্ষম যে, পাঠ্যসূচিতে 'আর্যদের আদি বাসভূমি'-কে একটি বিশেষ বিষয় হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন ভারতের পাঠ্যসূচিতে এই বিষয়কে নিয়ে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, তা থেকে মনে হয়, সিলেবাস নির্মাতারা নাজিদের রাস্তাতেই হাঁটছেন। এই পাঠ্যক্রমের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম 'Aryan Civilization'। এই অধ্যায়ের দুটি উপশিরোনাম হলো: 'Original home of Aryans, Myths of Aryan Invasion' ও 'Vedic Cultures: early Vedic and post Vedic Literature and Vedic Polity, society and Economy'। এইক্ষেত্রে যে বিষয়টি প্রথমেই উঠে আসে তা হলো, আর্য অনুপ্রবেশ যদি মিথ-ই হয় তাহলে তা নিয়ে আলোচনার দরকার কী? আসলে সিলেবাস নির্মাতারা জানেন, আর্যরা যে বিদেশ থেকে এসেছিলেন - তা অপ্রমাণ করা অসম্ভব। কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে যে, আর্যরাই ভারতের আদি বাসিন্দা। সেই একই কারণে আর্য সভ্যতার উপশিরোনামে বৈদিক সংস্কৃতিকে রাখতে হয়। তাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে: আর্য জাতিভুক্ত হওয়া ভারতীয়দের পক্ষে বিশেষ সম্মানের বিষয়। এর মধ্যে দিয়ে এক ধরনের জাতিগত বৈষম্যের মানসিকতাকে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীদের চৈতন্যে দৃঢ় করে দেওয়া যাবে। অথচ বিশ্বের যেকোনো দেশে জাতিগত বৈষম্যের মানসিকতাকে যে শুধু নিন্দা করা হয় তাই নয়, তাকে একধরনের বিকৃত মানসিকতা বলেও বিবেচনা করা হয়। হিন্দুত্ববাদীরা বহুবছর ধরে পুরাণকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে চলেছেন নানাভাবে। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে 'Aryan Civilization' অধ্যায়ের 'Epic literature and Culture' উপশিরোনামে। রামায়ণ ও মহাভারতের বর্ণিত ঘটনাগুলি যেন সত্যই ঘটেছিল। সেগুলির 'ঐতিহাসিকতা' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিলেবাসটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সিলেবাসে মহাজনপদকে 'প্রজাতন্ত্র' হিসেবে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের মূল সোর্স বা উৎসগুলিতে তার কোনো অনুমোদন নেই। ইরফান হাবিব লিখেছেন: বুদ্ধদেবের সময়কালেই জাতিভেদপ্রথা তার বর্ণ ও জাতি উপাদানগুলি-সহ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল এবং দাসপ্রথার সঙ্গে শূদ্র ও অস্পৃশ্য জাতিগুলির আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি এটি দেখে আশ্চর্য হয়েছেন যে, পাঠ্যসূচিতে জাতিভেদপ্রথার উত্থান ও বিবর্তনের জন্য কোনো স্থান রাখা হয়নি। অস্পৃশ্য ও শূদ্রদের ওপর নিপীড়নের সত্যকে অস্বীকার করলে তো ভারতের ইতিহাসের একটি বিরাট পরিসরকেই চর্চার বাইরে রাখতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই রামশরণ শর্মার 'শূদ্রস ইন অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়া' বইটিকে গ্রন্থপঞ্জিতে রাখা হয়নি। ডি. ডি. কোসাম্বির বইগুলি ও অধ্যাপক শর্মার 'ইন্ডিয়ান ফিউডালিজম'-ও গ্রন্থপঞ্জিতে নেই।
এই পাঠ্যসূচি থেকে শিক্ষার্থীরা জানতেই পারবেন না যে, ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ - ২০০ খ্রিস্টাব্দ মধ্যবর্তী সময়ে প্রধান লিখিত ভাষা ছিল 'প্রাকৃত'। পাশাপাশি এই সময়টিই ছিল সংস্কৃত সাহিত্যের একটি সমৃদ্ধ পর্যায়। শিক্ষার্থীরা জানতেই পারবেন না: পতঞ্জলি ছিলেন এই যুগের এবং মনুস্মৃতি, মহাভারত, রামায়ণ, কামসূত্রের মতো বইগুলি এই সময়েই লেখা হয়েছিল। আবার বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ 'মিলিন্দপঞহো' এই যুগের ফসল।

লাল কেল্লা, দিল্লি।
আকবর আর ছাত্র-ছাত্রীদের পড়তে হবেনা। বাবর আর ঔরঙ্গজেব আছেন, কিন্তু জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান বাদ। সিলেবাসের চতুর্থ এককে (Society and Economy) বলা হয়েছে:
I. Hindu Society: Caste and Occupational groups; Lifestyle, Education, Customs and Traditions.
II. Muslim Society: Divisions and Occupational groups; Lifestyle, Education, Customs and Traditions.
অর্থাৎ 'হিন্দু' ও 'মুসলিম' সমাজকে পৃথকভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। যেন সাভারকরের 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'কে মুঘল যুগ পর্যন্ত পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মহীশূরের টিপু সুলতানের বীরত্বপূর্ণ লড়াইকে উপেক্ষা করা যাবে। নবম পত্রের সময়কালে (History of India 1707-1857) ভারত বাংলার নবজাগরণ দেখেছিল, রামমোহন রায়ের মতো অসামান্য ব্যক্তিত্বের আলোকচ্ছটার উদ্ভাসন দেখেছিল, সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তির লড়াই দেখেছিল – এইসব এখন থেকে আর শিক্ষার্থীদের পড়তে হবেনা।

রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)। [তৈলচিত্রটি লন্ডনে রেমব্রান্ট পিল কর্তৃক ১৮৩৩ সালে অঙ্কিত।]
ইতিহাস হলো অন্যান্য সমস্ত মানবিকীবিদ্যার মিলনস্থল। জ্ঞানচর্চার একটি শাখা হিসেবে ইতিহাস সামাজিক প্রক্রিয়ার সমগ্রকে ধরার চেষ্টা করে। অর্থনীতিবিদরা যেমন কোনো একটি বিষয়কে ধ্রুবক হিসেবে ধরে নেন, ইতিহাসের ক্ষেত্রে তা করা যায়না। ইতিহাসে রাজনীতি, সমাজনীতি, নৃতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, পরিবেশ, ভাষাতত্ত্ব, জেনেটিক্স, অর্থনীতি ইত্যাদি সব বিষয় নিয়েই আলোচনা করতে হয়। যেকোনো বিষয়ে যখন কোনো মৌলিক চিন্তাবিদ কোনো নতুন কিছু আবিষ্কার করেন, তখন তিনি সেই বিষয়টির ইতিহাসের মধ্যে প্রবেশ করেন, বিশ্লেষণ করেন ও লেখেন এবং কোনো না কোনোভাবে ইতিহাসের দ্বারা প্রভাবিত হন। ঐতিহাসিক আদিত্য মুখার্জি একটি প্রবন্ধে ('ইতিহাসকে রক্ষা করতে হবে') দেখিয়েছেন: ঐতিহাসিকদের সবসময়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। বর্তমান সময়ে ইতিহাসের বিকৃতির অভিজ্ঞতার দিকে তাকিয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন: ইতিহাসের নির্দিষ্ট পদ্ধতিবিদ্যার তোয়াক্কা না করে, এর ভ্রান্ত ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে, হয় কল্পকাহিনি বা নতুন সত্যের জন্ম দেওয়া হচ্ছে, আর নয়তোবা রাজনৈতিক শক্তিগুলির দ্বারা সত্যের পরিবর্তে বিশ্বাস ও পৌরাণিক কাহিনির মেলবন্ধনকে তুলে ধরা হচ্ছে।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী:
১। ভারতের ইতিহাসচর্চায় সাম্প্রদায়িকতার অভিঘাত, সম্পাদক: অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ, ২০২৩।
২। সরস্বতী নদী: কল্পনায় ও বাস্তবে, ইরফান হাবিব, এনবিএ, ২০০৩।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

লেখক পরিচিতি: প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, রাজ্য কমিটির সদস্য - পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, যুগ্ম সম্পাদক - ইন্ডিয়ান স্কুল অফ সোসাল সায়েন্সেস, লেখক, গবেষক।