প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

পহেলগাম: যে প্রশ্ন রয়ে গেল



স্বর্ণেন্দু দত্ত


পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার দুই মাস পূর্ণ হলো। পর্যটকদের জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পরে প্রত্যাশা মতোই সামরিক অভিযান করেছে ভারত। 'অপারেশন সিঁদুর' নামের মধ্যে চমক থাকলেও উরি, পুলওয়ামার পরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মতো অভিযান হওয়ারই ছিল। আগের দুটির থেকে তফাত, এবারে পাক অধিকৃত কাশ্মীরই নয়, পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে অভিযান চালানো হয়েছে। পাকিস্তানের দিক থেকেও এবার প্রত্যাঘাত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পরে সংঘর্ষ বিরতি হয়েছে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীই এই সংঘর্ষে নিজেদের জয় দেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, ঘরে ঢুকে মেরেছি। আবার মারব ইত্যাদি। সেই অনুযায়ী বিজেপি দেশজুড়ে তিরঙ্গা যাত্রা বের করেছে। মোদি সহ বিজেপি'র নেতা-মন্ত্রীরা নির্বাচনী মুনাফা আসে এমন ভাষায় ভাষণ দিচ্ছেন। অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও দেশবাসীকে বিজয় উৎসব করতে বলেছেন। ভারতের বিরুদ্ধে 'অভূতপূর্ব সাফল্যের' জন্য সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল করে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এসবের বাইরে পহেলগাম হামলা এবং তার পরবর্তী ঘটনাক্রম কতগুলি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে।

বিষাদ নয়, সুযোগের লোভ

পহেলগামে সন্ত্রাসবাদীরা একজন ঘোড়া চালক ও ২৫ জন পর্যটককে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, এ খবর তখনও তেমনভাবে জানতে পারেননি দেশবাসী। তার আগেই নির্দিষ্ট কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, 'জাতি নেহি, ধরম পুছা'। অর্থাৎ জাত জিজ্ঞেস করেনি, ধর্ম জেনে হত্যা করেছে। এমনকী স্বামীর নিষ্প্রাণ দেহের পাশে স্ত্রীর নিথর বসে থাকার 'আইকনিক' ছবির জিবলি ইমেজ বানানো হয়েছে অতি তৎপরতায়। সেখানেও এক স্লোগান। লোকসভা ভোটের পর থেকে শাসকদলের পক্ষ থেকে 'বাঁটেঙ্গে তো কাটেঙ্গে', 'এক হ্যায় তো সেফ হ্যায়' ইত্যাদি স্লোগান তোলা হয়। আদিবাসী-দলিত-ওবিসি ইত্যাদির নামে বিভক্ত হওয়া নয়, সব হিন্দু এক হও। নানা নামের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এটাই এখন মূল লক্ষ্য, কর্মসূচি। সেই সময়ে পহেলগামের হত্যাকাণ্ডকে এরা একটা সুযোগ হিসেবে লুফে নেয়। তাই এত বড়ো ঘটনার অভিঘাত যখন সামলে উঠতে পর্যন্ত পারেনি দেশবাসী, তখন এরা তার লাভ তুলতে নেমে পড়ে। শোক নয়, মুনাফাই লক্ষ্য।


পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত স্বামীর নিষ্প্রাণ দেহের পাশে বাকরুদ্ধ স্ত্রী (বাঁদিকে)।
সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ঘোড়া চালক সৈয়দ আদিল হুসেন শাহ্‌-র মরদেহের কপালে তার পুত্রের বিদায় চুম্বন (ডানদিকে)।

সর্বগ্রাসী ঘৃণা

বৈসরন উপত্যকায় গাড়ি যায় না। পাহাড়-জঙ্গলের পথে পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চেপে পর্যটকদের যেতে হয়। সন্ত্রাসবাদীদের হামলার পরে স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করেছেন। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, রক্ত দিয়েছেন। অন্যদের আশ্রয়, খাবার দিয়েছেন। এমনকী বিমানবন্দর বা অন্য গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন গাড়ি ভাড়া না নিয়েই। পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরে পরেই শ্রীনগর থেকে কাশ্মীরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ রাস্তায় নেমেছেন প্রতিবাদে। বিরাট বিরাট মিছিল হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মসজিদ থেকে ঘোষণা হয়েছে। পরের দিন অভূতপূর্ব হরতালের সাক্ষী থেকেছে কাশ্মীর উপত্যকা। সাড়ে তিন দশকের উগ্রপন্থায় উপত্যকা কখনও এমন সরব, শক্তিশালী সর্বাত্মক প্রতিবাদ দেখেনি সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এই সবটা চাপা দিয়ে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের বড়ো অংশ, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সিয়ার, ভ্লগাররা জড়ো হয়ে যায় কাশ্মীরে। কাশ্মীরিরা এই সন্ত্রাসবাদী হামলায় যুক্ত – এইটা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা স্থানীয়দের প্ররোচিত, উত্যক্ত করতে থাকে ক্যামেরার সামনে। স্থানীয় মুসলিমরা পাকিস্তানের জন্য এই কাজ করেছে কি না, এই হচ্ছে প্রশ্ন! স্থানীয়রা এই জঘন্য ঘটনা সম্পর্কে যা বলছেন, তাকে কেটেছেঁটে, বিকৃত করে দেখানো হয়েছে। যা আরও একবার ভীতি এবং অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করেছে। এমনকী ঘোড়াওয়ালা স্থানীয় যুবক আদিল শাহ, যিনি পর্যটকদের বাঁচাতে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে খালি হাতে লড়তে গিয়ে জীবন দিলেন, তাঁর কথাও সেইভাবে বললো না এই মিডিয়া। যা আদিলের পরিজনদের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়েছে। পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় হতাহতদের পরিজনরা প্রত্যেকে কাশ্মীরিদের সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলেছে। কিন্তু ঘৃণার বাহিনী সে কথা শুনতে নারাজ।


কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে মোমবাতি নিয়ে পহেলগাম হামলার নিন্দায় প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

পর্যটনের নানা অংশের সঙ্গে যুক্তদের মত, সংবাদ মাধ্যম এবং সমাজ মাধ্যম যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণার পরিস্থিতি তৈরি করে তার ফলেই পর্যটকরা আতঙ্কিত হয়ে কাশ্মীর ছাড়তে থাকেন, আগের বুকিং বাতিল হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ডাক দেওয়া হয় কাশ্মীরিদের বয়কট করার জন্য, যাতে তাঁরা না খেয়ে মরে! মূল ধারার সংবাদ মাধ্যম, আইটি সেল পরস্পরের মধ্যে বিষয়বস্তু আদানপ্রদান করতে থাকে। এই প্রবণতা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কাশ্মীরিদের বয়কট থেকে মুসলিম গণহত্যার ডাক দেওয়া হয়। এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, দেশের নানা অংশে কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রী, শাল বিক্রেতা, আখরোট-বাদাম বিক্রেতাদের উপরে হামলা, আক্রমণ শুরু হয়। ঘৃণার গণহিস্টিরিয়া এমন জায়গায় পৌঁছোয় যে, বহুকাল ধরে যে শাল বিক্রেতারা প্রায় ঘরের লোক হয়ে উঠেছেন, তাঁদের উপর আক্রমণ নেমে এলেও পরিচিতরা নীরব দর্শক হয়েই থাকেন। ধর্মাশ্রিত ঘৃণার এই সর্বব্যাপী স্রোতে বহু তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, বামপন্থীদের ভেতরের চেহারাটাও সামনে চলে আসে।

কাশ্মীরি এবং মুসলিমদের পরে যাঁরাই এই ঘৃণা প্রচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, সরকারকে প্রশ্ন করেছেন, তাঁরাই আক্রান্ত হয়েছেন। পহেলগামে নিহত নৌসেনা লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়ালের স্ত্রী হিমাংশী নারওয়াল হোন বা লোকগায়িকা নেহা সিং, অধ্যাপক আলি মাহমুদবাদের মতো অনেকেই প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের দাবি তুলে সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছেন বামপন্থীরা।

মিথ্যা প্রচারের এই স্রোত রুখতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পরে অ্যাডভাইসরি জারি করেছিল সরকার। এবার তেমন কিছু হয়নি। অথচ বৃহৎ শিল্পপতিদের দ্বারা পরিচালিত এই টিভি চ্যানেলগুলি সরকার ঘনিষ্ঠ। তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি জানায়, সোশ্যাল মিডিয়া সহ ইনফ্লুয়েন্সিয়াররা যেভাবে প্ররোচনা ছড়াচ্ছে তা রুখতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যদিও তেমন কিছু হয়নি। ফলে কাশ্মীরি পরিধি ছেড়ে হামলা প্রসারিত হয় দেশের নানাপ্রান্তের মুসলিমদের উপরে। উত্তরপ্রদেশ এবং কর্ণাটকে দুই জনকে খুন করে ফেলা হয় প্রকাশ্যে। বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত যেখানে বিজেপি'র সরকার, মুসলিমরা আক্রান্ত হতে থাকেন। যারা এইধরনের প্ররোচনা এবং ঘৃণা ছড়াচ্ছিল তারা কোন মতাদর্শের অনুসারি সেটা তো কারও অজানা নয়, তারপরেও প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একবারের জন্যেও সংকটের মুহূর্তে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাননি। ঘৃণা-বিদ্বেষ-বিভাজন রুখতে পদক্ষেপ করেননি।

মিথের মৃত্যু

পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং 'অপারেশন সিঁদুর' বহু যত্নলালিত কতগুলি মিথকে একেবারে দুরমুশ করে দিয়েছে। প্রথমটি হলো, 'স্বাভাবিক কাশ্মীর'। আরএসএস-বিজেপি সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির বহুদিনের রাজনৈতিক প্রকল্প ৩৭০ ধারা। মোদি সরকার আসার আগের ৬৫ বছরেই কেন্দ্রের বিভিন্ন রঙের সরকার সংবিধানের যে ধারাকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রকল্পের কারণেই দ্বিতীয়বার সরকারে এসে মোদি-শাহরা ৩৭০ ধারা বাতিল করলেন। এরপরে দেশজুড়ে প্রচার করা হয়, ৩৭০ ধারা বাতিলের সঙ্গে সঙ্গেই কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের অবসান হয়েছে। অমিত শাহের বক্তৃতার জনপ্রিয় লাইনটি হলো — ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে কাশ্মীরে পাথর ছোঁড়া তো দূর, একটি নুড়ি ছোড়ার কথাও এখন কেউ ভাববে না। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে জম্মু-কাশ্মীরে 'সন্ত্রাসবাদ অবসানের' এই যে প্রচার, কাশ্মীর 'স্বাভাবিক' হয়ে যাওয়ার যে অতিকথন, তাকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে দিয়েছে পহেলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলা। পাহাড়-জঙ্গল ঘেরা এক উপত্যকায় যেখানে হাজারো পর্যটক রয়েছে, সেখানে কয়েকজন সন্ত্রাসবাদী অবাধে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে বিনা বাধায় চলে গেল। আসলে আমরা নজর করিনি গত কয়েক বছরে কীভাবে জম্মু-কাশ্মীরে নতুন ধারায় প্রসারিত হয়েছে সন্ত্রাসবাদ। নতুন নামের সংগঠন, নতুন কায়দায় হত্যা করে চলেছে নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সাধারণ মানুষকে। কাশ্মীর ছেড়ে জম্মুর নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসবাদী নাশকতা। যা নয়ের দশকে সন্ত্রাসবাদের উত্তুঙ্গ সময়েও হয়নি। পহেলগামে একবারে এত পর্যটকের মৃত্যু আমাদের ধাক্কা দিয়েছে, কিন্তু প্রায় প্রতিদিন ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদী নাশকতা আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে। আমরা বিভোর থেকেছি 'স্বাভাবিক কাশ্মীর' প্রচারের সাফল্যগাথায়।


শ্রীনগরের লালচকে ক্লক টাওয়ারের সামনে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।

দ্বিতীয় মিথটি ভেঙেছে পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সামরিক অভিযানের পরে। ৬ মে রাতে 'অপারেশন সিঁদুর' নামের এই অভিযানে ৯টি জায়গায় সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোয় আঘাত হানার কথা জানায় ভারত। বিমান হানার ১৫ মিনিটের মধ্যেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে জানানো হয়, ভারত সুনির্দিষ্ট, পরিমিত এবং উসকানিবিহীন অভিযান চালিয়েছে। সেই অবস্থানেই অনড় থেকেছে ভারত সরকার। কিন্তু দেখা গেল, আন্তর্জাতিক মহল তা খারিজ করল। এই অভিযান মোদি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে সম্পূর্ণ উন্মোচিত করে দিয়েছে। স্পষ্ট হয়ে গেল, বিশ্ব মঞ্চে ভারত সম্পূর্ণ একা। একটিও দেশ এই সামরিক অভিযানের পক্ষে ভারতকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসেনি।

আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষার আঙ্গিকেই অভিযান হয়েছে — এটাই ছিল নয়াদিল্লির ঘোষিত অবস্থান। তবে অন্য কোনও দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা বহুমাত্রিক জোটকে এই ভাষ্য বোঝাতে ব্যর্থ মোদি সরকার। পহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সরাসরি মদত রয়েছে, তা বিশ্বের অন্য কোনও দেশ স্বীকার করতে রাজি হয়নি। এমনকী তথাকথিত বন্ধু দেশগুলিও পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ভারতের 'পরিমিত' অভিযানকে 'উত্তেজনা বর্ধক' বলে চিহ্নিত করে, সংঘর্ষ বিরতির পক্ষে সওয়াল করেছে। এরপরেও অমিত শাহ গলার রগ ফুলিয়ে দাবি করছেন, "দুনিয়া পিএম মোদির দৃঢ় নেতৃত্বের প্রশংসা করছে!"


সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়েছেন মোদি। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ভুটান দিয়ে শুরু করে ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্রাজিল পর্যন্ত অজস্র দেশে গেছেন মোদি। এরপর কোভিড মহামারীর জেরে ২০২০ সালে কোথাও যেতে পারেননি। ২০২১ সালের মার্চে বাংলাদেশ দিয়ে শুরু করে চলতি বছরে পহেলগাম হামলার সময়ে সৌদি আরব পর্যন্ত আরও ৩১ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। এই তথ্য 'পিএম ইন্ডিয়া' ওয়েবসাইটের। সেখানে কোভিডের আগে পর্যন্ত সফরের খরচের হিসাবও দেওয়া আছে। আড়াই কোটি খরচে ভুটান যাত্রা থেকে ২৩ কোটি খরচে আমেরিকা যাত্রার হিসাব আছে। গত ২০ মার্চ রাজ্যসভায় বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা লিখিত প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোদির ৩৮টি বিদেশ সফরের জন্য ২৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আবার ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী ভি. কে. সিং রাজ্যসভায় জানান, ২০১৪-২০১৮ পর্যন্ত মোদীর মোট ৮৪টি বিদেশ ভ্রমণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। বিদেশ ভ্রমণ মূলত নানা বিষয়ে সমঝোতাপত্র, চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করার জন্যেই হয়ে থাকে। প্রয়োজনের সময়ে দেখা গেল সে ভাঁড়ার শূন্য। এমন কোনও রাষ্ট্রনেতা পাওয়া যাবে না যাঁর সঙ্গে মোদির আলিঙ্গনের ছবি নেই, বিশেষ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে। কারো কারো কাঁধে হাত দিয়ে চলার ছবিরও বহুল প্রচার করা হয়েছে। এই সব প্রচারের লক্ষ্য একটাই — বিশ্ব মঞ্চে মোদি এবং তাঁর সময়ে ভারতের গুরুত্ব এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অতীতে কখনও হয়নি এইটা দেখানো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে 'মোদিজী নে ওয়ার রুকওয়া দি পাপা' বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মোদিকে 'বিশ্বগুরু' সাজানোর সবথেকে হাস্যকর প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। 'অপারশেন সিঁদুর' এই প্রচারকে একেবারে ধসিয়ে দিয়েছে। মোদির আমলে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তাও স্পষ্ট হয়ে গেছে সিঁদুর অভিযান-পরবর্তী ঘটনাক্রমে। 'বিশ্বগুরু' হওয়ার আকাশকুসুম গল্প দিয়ে মোদি সরকার যে আদতে মিথ্যার ফানুসে কেবল হাওয়া দিয়ে গেছে, তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

দ্বিপাক্ষিক থেকে আন্তর্জাতিক

মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০ মে ঘোষণা করেন, তিনি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ বিরতি করিয়েছেন। তারপর থেকে গত দেড় মাসে তিনি অন্তত ১৪ বার একই কথা বলেছেন। এমনকী একথাও ঘোষণা করেছেন যে, বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েই তিনি এই কাজ করেছেন। তিনি কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে চান বলেও ঘোষণা করেন। এই সব নিয়ে মোদি সরকারের নীরবতা চোখে পড়ার মতো। ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মীর সহ পাকিস্তানের সঙ্গে যে কোনো বিষয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা করবে। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্হতার কোনও প্রয়োজন নেই। মোদি সরকার কি ভারতকে সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে নিল, উঠছে প্রশ্ন। পাশাপাশি কোনোরকম পরিকাঠামো না গড়েই সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তার ফলে পাকিস্তানও সিমলা চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। সেটা হলে, কাশ্মীর দ্বিপাক্ষিক থেকে আন্তর্জাতিক মহলের আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকছে। বিশেষ করে বিদেশ নীতির প্রশ্নে ভারতের গৌরবজনক স্বাধীন-স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে যেভাবে মোদি সরকার দেশকে আমেরিকা-ইজরায়েলের মতো অক্ষে নিয়ে গেছে, তাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকছেই। ভারত-পাক সংঘর্ষ পরিস্থিতিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি সমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে এক পঙ্ক্তিতে নিয়ে সম্বোধন করেছেন। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ভোজ দিয়েছেন এবং তারপরে মোদি এবং মুনিরকে শক্তিশালী নেতা বলেছেন! ভারতের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পাক সেনাপ্রধান একাসনে! এই দুঃসাহস ট্রাম্প দেখাতে পারছেন মোদি সরকারের আত্মসমর্পণের নীতি গ্রহণের কারণেই। বিদেশ নীতি মুখ থুবড়ে পরার পরে বিরোধী দলগুলি সহ সাংসদদের প্রতিনিধি দল গোটা দুনিয়ায় পাঠানো হলো। তাতেও কী কিছু লাভ হলো? উলটে অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে প্রতিনিধি দলকে।

অমীমাংসিত প্রশ্ন

পহেলগামে হামলার দু' মাস পরেও মূল প্রশ্নটি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, জনপ্রিয় একটি পর্যটনস্থলে নিরাপত্তার এমন ত্রুটির দায় কার? হামলাকারীরা এখনও অধরা। সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া কিছু কথা ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড কারা ঘটালো, কীভাবে অবাধে এত বড়ো ঘটনাকে পরিণতি দেওয়া হলো, হামলার পরে তারা কোথায় গেল, এখন তারা কোথায়, কোনো তথ্যই জানা নেই। দুই মাস পূর্তির দিনই আবার এনআইএ সূত্র উদ্ধৃত করে জানানো হলো, আগে যাদের হামলাকারী বলে ছবি এঁকে প্রকাশ করা হয়েছিল, তারা নাকি হামলাকারী নয়! প্রকৃত হামলাকারীদের যারা আশ্রয় দিয়েছিল, তাদের ধরা হয়েছে এবং এখন জানা যাচ্ছে চার জন হামলাকারী যারা সকলেই পাকিস্তানের, তারা লস্কর-ই-তৈবার। এই যদি তদন্তের হাল হয় তবে ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলি কী এতই অযোগ্য? প্রশ্ন জাগে।

যেমন প্রশ্ন তৈরি হয় কাশ্মীরের মতো এলাকায় যেখানে পায়ে পায়ে নিরাপত্তা বাহিনী, জায়গায় জায়গায় তল্লাশি, অহরহ পরিচয়পত্র দেখানো, সেখানে কীভাবে পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা একটি জনপ্রিয় পর্যটনস্থল এমন নিরাপত্তাবিহীন? কেন জানুয়ারি মাসে সেখানকার সিআরপিএফ চৌকি তুলে নেওয়া হলো? কেন বৈসরন যাওয়ার পথে এবং উপত্যকায় যেখানে হাজারো পর্যটক, সেখানে দুই জন লাঠিধারী পুলিশও মোতায়েন রাখা হলো না? 'স্বাভাবিক' কাশ্মীরের প্রচার করতে করতে আত্মমুগ্ধ প্রধানমন্ত্রীও সেটাকেই সত্য মেনে নিয়েছিলেন? নাকি এর নেপথ্যে অন্য কিছু?


ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে প্রবাসী ভারতীয়দের সাথে ওখানকার অধিবাসীরাও প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন।

জম্মু-কাশ্মীরের নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্র সরকারের। তারপরেও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন সেখানের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একবারও সে কথা উচ্চারণ করেননি। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার দায় নিয়ে ইস্তফা দিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল। সে সম্ভাবনা তো দূর, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা তো চাইতেই পারতেন। নিদেনপক্ষে আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ। পহেলগামে হামলায় নিহতদের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করেননি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু দেশজুড়ে ভাষণ দিচ্ছেন। এমনকী পাকিস্তানের হানায় সীমান্ত অঞ্চলে যাঁদের প্রাণ গেল, বাড়িঘর ধ্বংস হলো যাননি তাদের কাছেও, কিন্তু পাঞ্জাবের বায়ুসেনা ঘাঁটিতে গিয়ে ছবি তুলেছেন।

যাঁরা প্রিয়জনদের হারালেন, তাঁদের অপূরণীয় ক্ষতির কোনও সমাধান নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে এইধরনের ঘটনা আর ঘটবে না, তা নিশ্চিত হলো কি? উরি, পুলওয়ামার পরের ঘটনাক্রম দেখায় নিশ্চিত নয়। ওই হামলাগুলির পরেও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হয়েছে। তা নিয়ে বিস্তর ঢক্কানিনাদ হয়েছে। এবারের চেয়ে বেশিই হয়েছে। কিন্তু মূল নিরাপত্তার প্রশ্নটি অপরিবর্তিতই রয়ে গেল। কিছুদিন পর পর ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী হামলা হবে আর আমরা পাকিস্তানে গিয়ে দাদাগিরি করেই দায় সারব? দেশের মাটিতেই যাতে সন্ত্রাসবাদ জল-সার পাওয়ার মতো সুযোগ না পায়, সেই পরিস্থিতি নিয়ে কবে ভাবব?

পহেলগাম হামলার ঠিক এক মাস পূর্তির দিনে ২২ মে রাজস্থানের বাড়মেরে সমাবেশে মোদি বললেন, "পাকিস্তান একটা কথা ভুলে গেছে। এখন মা ভারতীর সেবক মোদি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোদির মাথা ঠান্ডা থাকে, কিন্তু রক্ত গরম। আর এখন তো মোদির শিরায় রক্ত নয়, গরম সিঁদুর বইছে!" ২২ এপ্রিল পহেলগামের হামলার দিন থেকে বিগত এক বছর ফিরে দেখলেই দেখা যাবে 'বুক চিতিয়ে মোদি' দাবি সম্পূর্ণ ফাঁপা। এই সময়ে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৫ জন জওয়ান। আহত হয়েছেন ৫৩ জন। একইভাবে সন্ত্রাসবাদী হামলায় নিহত হয়েছেন ৬২ জন সাধারণ নাগরিক। আহত হয়েছেন প্রায় একশো জন। সরকারের এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। অথচ জবাব সরকারকেই দিতে হবে। প্রশ্ন সরকারের কাছেই করা প্রয়োজন। জবাবদিহি সরকারের করার কথা। সংবাদ মাধ্যম, সমাজ মাধ্যম প্রশ্ন করছে কাশ্মীরিদের, কাঠগড়ায় তুলছে মুসলিমদের। কিন্তু সরকারকে কেউ প্রশ্ন করছে না!

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: লেখক সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।