
আজ এমন এক তেজী ঘোড়ার কথা লিখতে বসেছি, যাঁর জন্ম এই জুন মাসে। নামেও তাঁর তেজ, কর্মেও তাঁর তেজ, অথচ মুখে চোখে শিশুর সারল্য। তিনি সুরের ম্যাজিশিয়ান, তাঁর আঙুলের পবিত্র ছোঁওয়ায় প্লাবিত হতো কত অসংখ্য বাদ্যযন্ত্র। সেজে উঠত কথা আর সুর, গান হবে বলে। এক অন্য মাটিতে জন্মগ্রহণ করেও সিঞ্চন করেছিলেন বাংলা গানের মাঠ, ঘাট, প্রান্তরকে তাঁর অনুপম বিভায়। প্রথম কর্মভূমি তখনকার বম্বে হলেও তিনি মিশে রয়েছেন বাংলার গানজমিনে। তিনি সঙ্গীত আয়োজক, পরিচালক, আবহসঙ্গীত পরিচালক, যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী ভিয়েস্তাপ আদের্শির বালসারা, তাঁর নামের অর্থ তেজী ঘোড়া।
হাতে কখনও পিয়ানো, কখনও একর্ডিয়ন, বা হারমোনিয়ম কিম্বা হার্মোনিকা, ইউনিভক্স এরকম আরও কত অজস্র বাদ্যযন্ত্রে যে পরম মমতায় তিনি আঙুল বোলাতেন, আর যাতেই হাত দিতেন, তাতেই সরগম বেজে উঠত, সুর ঝরত বৃষ্টি হয়ে। প্রাচ্য, পাশ্চাত্যের অভিনব সব বাদ্যে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত সা রে গা মা পা ধা নি আর ডো রে মি ফা সো লা সি। রাগরাগিনীরাও যেন এসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর সামনে নতজানু হয়ে বসত।

যৌবনে ভি. বালসারা।
আমরা তাঁকে দেখেছি সামান্য কিছু রেকর্ডিং-এ, মুখে তাঁর এক শিশুর মতো সরল হাসি, অনায়াসে সুরতরঙ্গ তুলে চলেছেন আঙুলের মায়াবী পরশে। যাঁরা বালসারাজিকে সামনে থেকে দেখেছেন, তাঁদের কাছে শুনেছি, ছন্দের গান বাজানোর সময় তাঁর চোয়ালে নাকি ছন্দেরা খেলা করত, যার আলো ছড়িয়ে পড়ত তাঁর চোখে, মুখে, স্নায়ুতে, সারা শরীরে। পিয়ানো, হারমোনিয়ম, হার্মনিকা, একর্ডিয়ন ইত্যাদি নানা বাদ্যযন্ত্র তো বটেই, গ্লাস, শিশি, ধাতু, পাথর, টাইপরাইটার প্রভৃতি নন-মিউজিক্যাল জিনিষ থেকেও অসামান্য সব সুর সৃষ্টি করতেন এই জাদুকর, যার ফসল 'বটলফোন', 'গ্লাসোফোন', 'স্টিলোফোন', 'বেলোফোন' ইত্যাদি। নিজের আত্মকথায় তিনি লিখছেন, "আমার মাথায় খুব ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন রকমের পোকা কিলবিল করত। হারমোনিয়াম থেকে আরও কত রকম কায়দা বের করা যায়, এসব ভাবতাম।" সে বয়সের শিশু বা কিশোর মন যখন দুষ্টুমির জন্য বকুনি খায়, সেই বয়সে বসে নানারকম সুরেলা ধ্বনি রচনাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এভাবেই ধীরে ধীরে ভিয়েস্তাপ আদের্শির বালসারা হয়ে উঠলেন বাদ্যযন্ত্রের সাম্রাজ্যের অধিপতি। কিন্তু সে এক দীর্ঘ যাত্রাপথ।

লতা ও ঊষা মঙ্গেশকরের সাথে গানের রিহার্সালে।

স্টুডিওতে মহম্মদ রফি ও অন্যান্য যন্ত্রশিল্পীদের সাথে।

বিশিষ্ট গায়ক মুকেশ ও গীতিকার মিল্টু ঘোষ-এর সাথে স্টুডিওতে গানের রেকর্ডিং-এ।

(বাঁদিক থেকে) শচীনদেব বর্মণ, ভি. বালসারা, ভূপিন্দর সিং ও কিশোরকুমার।
সে পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে যাবো বম্বে নগরীতে, যেখানে ১৯২২ সালের ২২শে জুন এক পার্সি পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেন এক বিস্ময়বালক। ছোট থেকেই সঙ্গীতশিল্পী মায়ের কোলে কোলে নানা অনুষ্ঠানে যেতে শুরু করেন ছোট্ট ভিয়েস্তাপ আদের্শির বালসারা। তাঁর বাবার ছিল এক টিউটোরিয়ল হোম, যেখানে ফ্রেঞ্চ, পার্সি, জার্মান ভাষা সহ সায়েন্স শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই চলত সঙ্গীতের শিক্ষা। মাত্র ছয় বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে মঞ্চে বসে প্যাডেল হারমোনিয়ম বাজাতে শুরু করেন তিনি। উপস্থিত রসিক শ্রোতারা আবিষ্ট। তাঁকে দেখে নাকি মনে হতো লাজুক প্রকৃতির, কিন্তু মনে মনে তিনি ছিলেন বেশ সাহসী। ১৫ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন। কাজ নিলেন মিলিটারি ক্যাম্পে, ঘোড়াকে স্নান করানো ছিল তাঁর কাজ। অবধারিতভাবেই সেখানে কাজে ইতি দিয়ে বাড়ি এলেন আবার। পার্সি বিয়েতে জ্যাজ বাজানো শুরু করলেন। সেই সময় থেকেই হাতের কাছে যা পেতেন তা সে কাঠ, শিশি, কাঁচ যাই হোক না কেন, তাই দিয়েই ছন্দ সুরের খেলা চলত তাঁর। টাইপরাইটারে তাল রাখার এক অদ্ভুত খেলা চলত তাঁর আঙুলে। মঞ্চে কোনো গানের সুর বাজলে তিনি তার সঙ্গে লয় মিলিয়ে টাইপ করে ফেলতেন সে সুরের কারুকাজ। ধীরে ধীরে বম্বে ছবির জগতে সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ পেতে শুরু করেন। এরই মধ্যে তাঁর জীবনে আসেন স্ত্রী, দুই পুত্র। "ইয়াদ কিয়া দিল নে কহাঁ হ্যায় তু", " আওয়ারা হুঁ", "অ্যায় মেরে দিল কহীঁ অওর চল" ইত্যাদি গানে তখন মজে গিয়েছেন সারা দেশের মানুষ আর এ সব গানের শরীরে মিশে থাকা একর্ডিয়ন, হারমোনিয়ম, পিয়ানোর মাধ্যমে বালসারাজী প্রবেশ করছেন রসিক শ্রোতার ধমনীতে। বম্বেয় তখন বেশ ভালোই কাজকর্ম করছেন, রোজগারও হচ্ছিল ভালোই। একের পর এক ছায়াছবির সঙ্গে মিশে যাচ্ছেন কখনও সঙ্গীত পরিচালক, কখনও আবহসঙ্গীত নির্মাণ, কখনও বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে। সহকারী সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে প্রায় ৩৫টি হিন্দি ছায়াছবিতে কাজ করেছেন। ১৯৪০ হতে ১৯৫০ অবধি হিন্দি ছবিতে অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় আমরা পেয়েছি 'ও পঞ্ছি', 'রংমহল', 'মদমস্ত', 'তালাশ', 'চার দোস্ত', 'বিদ্যাপতি', 'প্যার', 'মধুশ্রাবণী', 'জয়বাবা বৈদ্যনাথ'-এর মতো ছবি।১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি এইচএমভি-র অর্কেস্ট্রা নির্দেশক হন। মুম্বইতে হিন্দি চলচ্চিত্রে যেসব শিল্পীর গান শুনে বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, তাঁরা অনেকেই ছিলেন কলকাতার। তাই হঠাৎ একদিন তাঁর মন বলল, কলকাতায় যেতে হবে। সেখানে কাজ না করলে জীবন বৃথা। যেমন চাওয়া, তেমন কাজ।
চলে এলেন সংস্কৃতির আর এক পীঠস্থান কলকাতায়। যেখানে পার্সি অস্তিত্বকে বাঙালিয়ানার পোষাকে সাজিয়ে হয়ে উঠলেন বাংলার ঘরের মানুষ। আকাশবাণীর পুরোনো দিনের মানুষদের কাছে গল্প শুনেছি, রেকর্ডিং থাকলে সময়ের আগে এসে ডিউটি রুমের বাইরে বসে থাকতেন তিনি। বাংলা আধুনিক, ছায়াছবির গান, ভজন, গীত তো বটেই, সঙ্গীতাচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের স্বপ্নভূমি রম্যগীতির আসরে তিনি হয়ে উঠলেন অপরিহার্য সুরসৈনিক, যেখানে বৈদিকমন্ত্র অনায়াসে মিশে গেল ইউরোপীয় সিম্ফনিতে। শ্রদ্ধেয় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় লিখছেন, "আজ পর্যন্ত মনে হয় কেউ বলতে পারবেন না যে বাজাতে গিয়ে তাঁর নোট স্লিপ করেছে। অথবা কোন টেক তাঁর ভুলের জন্য আবার নিতে হয়েছে।" আরও লিখেছেন, "সব বাজনার স্টাইলে he is institution of his own style and method". সে সময় বাংলা গানে যন্ত্রসংগীত মানেই ভি বালসারাজী। মূলত তাঁর কাজ ছিল যন্ত্রসংগীত নিয়ে, কিন্তু কন্ঠসংগীতের সুর সৃষ্টিতেও তিনি ছিলেন অনন্য। শ্যামল মিত্র, মুকেশজি, শ্রাবন্তী মজুমদার, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, তালাত মাহমুদ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, রাণু মুখোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্তকে দিয়ে কত গান যে গাইয়েছেন আর সে সব গান আজও আমাদের ভালো থাকার সঞ্জীবনী মন্ত্র।

সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-এর সাথে।

সংগীতশিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়-এর সঙ্গে।

(বাঁদিক থেকে) ধন নওয়াজ, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ভি. বালসারা ও উৎপলা সেন।

(বাঁদিক থেকে) পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, ভি. বালসারা ও আশা ভোঁসলে।
শ্রদ্ধেয়া উৎপলা সেনকে বলতেন 'গুরুমা' আর শিল্পী তাঁকে ডাকতেন 'পার্সিবাবা' বলে। "সাজ অওর আওয়াজ" অনুষ্ঠানে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন উৎপলা সেন, যে অনুষ্ঠানের পর সমস্ত সংবাদপত্রে বালসারাজীর নামে জয়জয়কার। এরপর শুধুই কাজ আর কাজ। গ্ল্যামার বিশ্বে থেকেও কোনরকম নেশায় জড়াননি নিজেকে। নেশা ছিল একটিই, সে নেশা সুরসৃষ্টির নেশা।
১৯৫৬ সালে নির্মল ভট্টাচার্যের সঙ্গে জুটি বেঁধে 'চলাচল', 'মা', 'পঞ্চতপা', 'মমতা' প্রভৃতি ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন। ১৯৫৯ সালে অভিনেতা জহর রায় অভিনীত 'এ জহর সে জহর নয়' ছবিতে প্রথম একক ভাবে বাংলা ছবির সুরকার হিসেবেও তাঁকে পেলেন সঙ্গীতরসিক শ্রোতা। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩২টি ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তাঁর সঙ্গীত পরিচালনায় বেশ কিছু ছবি হল - 'মা', 'চলাচল', 'পঞ্চতপা', 'পথে হলো দেখা', কাঞ্চন কন্যা', 'শুভা' ও 'দেবতার গ্রাস'। সঙ্গীত আয়োজক হিসাবে 'জয়দেব', 'চিরকুমার সভা', হাঁসুলি বাঁকের উপকথা', 'পলাতক', 'হাসপাতাল', 'ধন্যি মেয়ে', 'সন্ন্যাসী রাজা' সহ ১১২টি ছবির কাজ করেছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সংগীত পরিচালনায় বালসারাজী বাজালেন অসাধারণ কিছু ছবিতে যার মধ্যে রয়েছে 'সূর্যতোরণ', 'দুইভাই', 'পলাতক', 'বাদশা', 'অজানা শপথ', 'মন নিয়ে', 'শ্রীমান পৃথ্বীরাজ', 'দীপ জ্বেলে যাই'-এর মতো প্রায় ৭০টি ছবি। আর শুধু ছবিই বা কেন বলি। মঞ্চসফল যাত্রা ও নাটকে তাঁর অনবদ্য সুরসৃষ্টি, দূরদর্শন ধারাবাহিকে থিম মিউজিক নির্মাণ সবখানেই তাঁর সুর মণিমুক্তো ছড়িয়েছে।

'প্রসার ভারতী'-তে কর্মরত অবস্থায়।

বাড়িতে কাজের টেবিলে নিমগ্ন শিল্পী।
একটা বয়সে এসে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন তাঁর ধ্যান জ্ঞান। তাঁর বাজানো ইমন, বিলাবল, মধুবন্তী, ভৈরবী, চারুকেশি, কলাবতী, পিলু, কিরওয়ানিতে বুঁদ হয়েছেন শ্রোতারা আর তিনি তারই সঙ্গে মন সঁপেছেন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভান্ডারে। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় 'পুরানো সেই দিনের কথা', 'সুন্দর বটে তব অঙ্গদখানি', 'এ মণিহার আমায় নাহি সাজে', 'আলো আমার আলো ওগো', 'দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না' শুনতে শুরু করলে চোখ ভিজে যায়।

জীবন সায়াণ্হে ভি. বালসারা।

১৬ নম্বর অক্রুর দত্ত লেনে শিল্পীর বাসগৃহ।

বাড়িতে নিজের প্রিয় পিয়ানোতে আত্মমগ্ন শিল্পী।
কাজের মধ্যে বেঁচেছিলেন দীর্ঘজীবন, একে একে হারিয়েছেন সন্তানকে, স্ত্রীকে। ১৬ নম্বর অক্রুর দত্ত লেনের ঘরটিতে ছবির মধ্যে থেকে গিয়েছেন তাঁরা। সব শোক সামলে কাজের মধ্যেই খুঁজেছেন উত্তরণের পথ, সেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সবসময় বলতেন, "এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু, এই দীনতা ক্ষমা করো প্রভু, পিছন-পানে তাকাই যদি কভু।"
শেষজীবনে মারণব্যাধি থাবা বসিয়েছে বালসারাজীর শরীরে, তবু, সুরকেই হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছেন যতদিন প্রাণ ছিল। ২০০৫ সালের ২৩শে মার্চ থেমে গিয়েছে এই অপ্রতিরোধ্য তেজী ঘোড়া, কিন্তু ভি. বালসারা নামটি থেকে গিয়েছে আপামর সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের মনে, থেকে যাবে ততদিন, যতদিন গান থাকবে আমাদের হৃদয় জুড়ে।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: সঞ্চালিকা (বেতার ও দূরদর্শন)।