ভ্রমণ

মেঘ পাহাড়ের দেশে ক'টা দিন (তৃতীয় পর্ব)



বর্ণা কুণ্ডু


ওয়ার্ড'স্ লেকে পৌঁছলাম, তখন দুপুর একটা দশ মতো। অক্টোবরের দুপুর। পাহাড়ের দুপুর। তাই রোদ্দুরে জ্বালাভাবটা কম। কিংবা এও হ'তে পারে, বেড়ানোর আনন্দ বাদবাকি যাকিছু জাগতিক তাপ-উত্তাপকে কখন যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে, টের-ই পাইনি!

'ওয়ার্ড'স লেক' যেন মর্ত্যের রূপকথারাজ্য। দারুণ সুসজ্জিত শতাব্দী-প্রাচীন এই কৃত্রিম হ্রদটি শিলং শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে সমানেই যেন হেসে চলেছে! এর ঠিক পাশ দিয়ে খাড়াই মেজাজে এগিয়ে চলেছে 'পুলিশবাজ়ার মেন রোড' – নামের মাখনমসৃণ একখান চড়াই পথ, যে পথ ধরে সামান্য এগোলেই 'শিলং রাজভবন' (গভর্নরের বাসভবন)।


অশ্বক্ষুরাকৃতির ওয়ার্ড'স্ লেক।

এই ওয়ার্ড'স্ লেক দেখতে ঠিক যেন ঘোড়ার একটা আস্ত ক্ষুর! লেকটি মানবসৃষ্ট বলে আকৃতিগত দিক থেকে ঠিক এতোটাই নিখুঁত! ১৮৯৪ সালে অসমের তদানীন্তন মুখ্য কমিশনার স্যার উইলিয়াম ওয়ার্ড-এর পরিকল্পনায় এবং কর্নেল হপকিন্স-এর তত্ত্বাবধানে এই লেক তৈরি হয়। নাম তাই 'ওয়ার্ড'স্ লেক'। তবে স্থানীয় মানুষ এই লেক-টিকে 'পোলক লেক' বা 'ন্যান পোলক' নামে ডাকতেই বেশি স্বচ্ছন্দ; কারণ, প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে ফিৎজুইলিয়ম থমাস পোলক নামের এক প্রখ্যাত এঞ্জিনিয়ার এই লেকটির ডিজাইন করেন।

এই লেক্-এর নির্মাণ নিয়ে লোকমুখে আরো একটি গল্প সুবিদিত। খাসি জনগোষ্ঠীর এক কয়েদি নিজের প্রাত্যহিক কারাশ্রমে মানসিকভাবে ক্লান্তিবোধ ক'রে ক'রে কারা-প্রধানকে আর্জি জানিয়েছিল, তাকে যেন কোনো সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত করা হয়। সেই কাজই তাকে প্রকৃত সংশোধনের দিশা দেখাবে। কারাবাসকালীন এই কয়েদিটির শিষ্ট সদাচারে সন্তুষ্ট হয়ে, তার এই একান্ত ইচ্ছেটুকু শেষমেশ একদিন মঞ্জুরও হয়ে যায় কারা-কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। আর মানুষটির সেই ঐকান্তিক ইচ্ছা-সঞ্জাত সৃজনধর্মী শ্রমের ফসল-ই নাকি আজকের এই ওয়ার্ডস্ লেক!

লেকটির নামকরণের নেপথ্যের ইতিহাস যাই হোক না কেন, বাস্তবিক-ই রূপকথা গল্পের সেই ফুল-পাখির দেশ-ই যেন এই লেক্ এবং লেক্ সংলগ্ন ভীষণ সাজানো বাগানটি। লেকের ভেতরে লেকের সাথে সাথেই চলেছে কাঠের ছোট্ট সাদারঙের বেড়া ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এক হাঁটাপথ।


ওয়ার্ড'স লেক এমনই ছোট্ট সাদা বেড়া দিয়ে ঘেরা।

আর লেকের মাঝ বরাবর এর দুই পাড়কে সংযুক্ত ক'রে দাঁড়িয়ে আছে একটি কাঠের ব্রিজ। সেও সাদা রঙের। তবে ব্রিজটির মেরামত চলছিল বলে তাতে চড়তে তখন নিষেধ। এছাড়া ওয়ার্ড'স লেকে আছে চমৎকার একটি ক্যাফে।


ওয়ার্ড'স লেকের সেই সাদা রঙের কাঠের ব্রিজ।

লেক-বাগানের রঙবেরঙের ফুল, লেকের যত্নলালিত স্বচ্ছ জলে এক ঝাঁক সাদা সুদর্শন রাজহাঁস, রকমারি মাছ, তৎসঙ্গে নাম না জানা কতশত পাখির কিচিরমিচির, নানা রঙের প্রজাপতি আর লেকের মধ্যে মা-মেয়েতে মিলে বালিকাসুলভ চাপল্যের সেই বোটিং এক্সপিরিয়েন্স... সব মিলিয়ে ওয়ার্ড'স্ লেকে আমাদের দু' আড়াই ঘণ্টার দুপুর কখন যে এক দৌড়ে বিকেল তিনটের কাঁটায় এসে ঠেকলো, জাস্ট ঠাহর-ই করতে পারলাম না!

এবার পা বাড়াতেই হল দ্রুত। এই হ্রদ-মায়াটান যে করেই হোক কাটিয়ে বের হ'তে হবে আমাদের! হবে মানে হবেই!

ড্রাইভার অরুণজ্যোতি আগেই বলে রেখেছিল, হাতে কমপক্ষে ঘন্টাখানেক সময় না রাখলে শিলং-প্রসিদ্ধ 'ডন বসকো মিউজিয়াম'-টা আর দেখা হবে না। মিউজিয়াম সাড়ে চারটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, আর পরের দুটো দিনে আমাদের ট্যুর প্ল্যান মোতাবেক যথাক্রমে চেরাপুঞ্জি আর ডাউকি যাওয়ার কথা। সে দূরের পথ। তায় পুজোর সময়। সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়তে না পারলে, ফিরতি পথে অনিবার্যভাবে প্রবল যানজটের দুর্ভোগ নাচছে কপালে। কাজেই পরের দু' দিনের ঠাসা প্রোগ্রামে ডন বসকো'র জন্যে আলাদা করে আর সময় সঙ্কুলান হবার নয়।

অগত্যা, মন কেমন করা এক শিশু-বিকেলের আলোয় ওয়ার্ড'স্ লেককে পিছু ফিরে বিদায় জানিয়ে লেক থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

পৌঁছলাম লেক-সংলগ্ন 'শিলং বোটানিক্যাল গার্ডেন'। এটি ইস্ট খাসি হিলসের বনবিভাগের আওতায় থাকা একটি ছোট্ট অরণ্যাংশ। পুরো জায়গাটাই ভীষণ ভীষণ প্রাকৃতিক। কৃত্রিমতার এতোটুকু নামগন্ধ নেই গোটা জায়গাটায়। বরং একটু বেশিই যেন রোমাঞ্চকর। আলো-কম পরিবেশ এখানে। চারদিকে বিবিধ বিরল প্রজাতির অর্কিড আর রকমারি দেশি-বিদেশি গাছগাছালি। এই গার্ডেনের হাঁটারাস্তার প্রায় পুরোটাই মসবর্গীয় উদ্ভিদের সবুজ গালচে বিছানো যেন... তাতে অদ্ভুত একটা বুনো সুবাস। সুবাস-ই! এমন গন্ধের আঘ্রাণ আমাদের শহুরে সীমাবদ্ধ জীবনের এক অমূল্য সঞ্চয়-ই বটে! তবে ওয়ার্ড'স্ লেক্-এর পারিপাট্য দর্শন ক'রে ট'রে, এই গার্ডেনে এসে দাঁড়ালে, জায়গাটার আত্মায় কোথায় যেন একটা অবহেলা অযত্নের নীরব অভিমান স্পষ্ট বোঝা যায়।


শিলং বোটানিক্যাল গার্ডেন।

এবার 'ডন বসকো মিউজিয়াম'। ঘড়িতে তিনটে পঁয়ত্রিশ। তার আগে ছোট্ট করে ঢুঁ মেরে নিলাম শিলং-এর 'দ্য বাটারফ্লাই মিউজিয়াম'। এটি মিস. ওয়াঙ্খার রিয়াৎসোমথিয়া নামের এক স্থানীয় মহিলার উদ্যোগে মথ আর প্রজাপতিদের নিয়ে গড়ে ওঠা ভারতের একমাত্র ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা। পুলিশ বাজ়ার এলাকা থেকে মোটামুটি ২ কিলোমিটার মতো দূরত্বে এই মিউজিয়াম। এখানে খুব বিরল প্রজাতির আর ডানায় খুবই সূক্ষ্ম নকশাবিশিষ্ট প্রজাপতিদের, আর সাথে রকমারি মথেদের কাঁচের বাক্সে বিবরণসহ সাজিয়ে রাখা আছে, দেখলাম। শুরুতে এই মিউজিয়ামটি একটি বিশিষ্ট প্রজাপতি প্রজনন কেন্দ্র হিসেবেই বাণিজ্যিক কারণে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বর্তমানে এটি আক্ষরিক অর্থেই প্রজাপতি আর মথেদের একটি সযত্নলালিত সংগ্রহশালামাত্র। এই মিউজিয়ামে এসে, এই ভীষণই স্পর্শকাতর রঙিন প্রাণগুলোর জীবনচক্র আর বাসযোগ্য পরিবেশ সম্পর্কেও একটা প্রাঞ্জল ধারণা তৈরি হল।


দ্য বাটারফ্লাই মিউজিয়াম, শিলং।

পরিশেষে পৌঁছলাম 'ডন বসকো মিউজিয়াম'। ঘড়ির কাঁটা ছুটছে। তাই আর কালবিলম্ব না করে টিকিট কেটে চটপট ঢুকে পড়লাম শিলং শহরের খুব শান্ত নিরিবিলি এক সফেদ মুগ্ধতার অন্দরে।

মিউজিয়ামটি আসলে একই ছাদের তলায় গড়ে ওঠা এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক সমন্বয় কেন্দ্র, যেখানে সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারতের মোট সাতটি ভগিনী রাজ্য অর্থাৎ সেভেন সিস্টার্স স্টেটস্ (অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়, মিজ়োরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা)-এর ঐতিহ্যময় কালচারাল হেরিটেজকে দারুণ আকর্ষণীয় উপায়ে সাজিয়ে গুছিয়ে মনোজ্ঞভাবে বোঝানোর প্রয়াস রাখা রয়েছে। আকৃতিগত দিক থেকে পুরো মিউজিয়ামটি একটি নিখুঁত ষড়ভুজ, যার এক একটি তলা এই সাতটি রাজ্যের এক একটির প্রতিনিধিত্ব করছে। মিউজিয়ামটিতে ১৭টি গ্যালারি। দশ হাজারেরও বেশি দুষ্প্রাপ্য বই এই মিউজিয়ামের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। সত্যি বলতে বিল্ডিং-টি একটি থ্রি ইন ওয়ান ইনস্টিটিউশন, যার মধ্যে এই বিপুল আধুনিক সংগ্রহশালাটির পাশাপাশি একটি উচ্চমানের পুস্তক প্রকাশনা কেন্দ্র এবং উত্তর পূর্ব ভারতের ঐতিহ্য পরম্পরা এবং সাহিত্য-ইতিহাস-বিজ্ঞান বিষয়ক চর্চার আর গবেষণার কেন্দ্র-ও সমান ঔজ্জ্বল্যে দীপ্যমান।

পর্যটকদের এক্তিয়ারভুক্ত এলাকাটি হল শুধুমাত্র ঐ সাতটি তলায় সেজে ওঠা সংগ্রহশালা, যেখানে এক একটি রাজ্যের পোশাক আশাক, গয়না, অস্ত্রশস্ত্র, বাদ্যযন্ত্র, কৃষি সামগ্রী, ঘরকন্নার জিনিসপাতি, এক একটি জনগোষ্ঠীর নারী এবং পুরুষের রেপ্লিকা, তাদের প্রাচীন ঘরবাড়ি তথা জীবনচিত্র খুব সহজবোধ্য উপায়ে সাজিয়ে রাখা আছে।


ডন বসকো মিউজিয়াম-এ খাসি জনগোষ্ঠীর রেপ্লিকা।

একটু একটু ক'রে সবটা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতেই সময় যেন ঘোড়সওয়ারের গতিতে উধাও হল।

একে একে ওপর নীচ মিলিয়ে মোট সাতটি তলা ঘুরে দেখার পর পৌঁছলাম বিল্ডিং-টির ছাদে। সেখানে বোর্ডে তীর চিহ্ন দিয়ে লেখা 'Sky Walk'। মিউজিয়াম ভ্রমণেই বিভোর ছিলাম। ঐ স্কাই ওয়াক্ বিষয়টাতে আদৌ ততটাও গুরুত্ব দিই নি প্রথমে।

কিন্তু ঐ ছাদে উঠে বুঝলাম, এমন একটি ছাদ-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এ' জীবনে আর কখনো হয়নি এর আগে। ভবিষ্যতেও আদৌ হবে কিনা, জোর গলায় বলতেও পারি না। ছাদটি আসলে গীর্জার চূড়ার অংশ, যেটি এক অতিজটিল গাণিতিক হিসেবের নিরাপত্তায় জায়গায় জায়গায় উত্তল, তো জায়গায় জায়গায় অবতল। ছাদের প্রান্তভাগে মজবুত স্টিলমেড রেলিং। পুরো ওয়াকওয়ে-টি মাথার দিকেও ফাঁক বজায় রাখা রেলিঙে অনেকটা খাঁচার আদলে ঢেকে রাখা। পাশের রেলিং ধ'রে ধ'রে খুব সন্তপর্ণে এগিয়ে চললাম অনেকটা উঁচু থেকে পুরো শিলং শহরটাকে দেখতে দেখতে। সে' দৃশ্য চির অম্লান থাকবে, যতদিন বোধে বাঁচি!


স্কাই-ওয়াকে...

এই সফরের শেষ গন্তব্য হল আকাশের সেই পশ্চিম কোণটা, যেখানে রেলিংগুলো ডান এবং বাম দিক থেকে এসে ত্রিভুজের এক কৌণিক বিন্দুতে যেন মহাসুখে নির্ভয়ে মিলিত হয়েছে।


"দিনান্তের এই এক কোণাতে
সন্ধ্যামেঘের শেষ সোনাতে...
"

এবার সামনে শুধু পশ্চিম আকাশ আর তার অস্তরাগ। আর কিচ্ছু না। সোনা আর মেটে সিঁদুরে মাখামাখি সেই আকাশটার দিকে চেয়ে চিত্রার্পিত দাঁড়িয়েই রইলাম ঠায়! মনে হল, ঠিক এই মুহূর্তটুকু দেখতে দেখতেই যদি জীবনের শেষতম শ্বাসটুকু রাখি!

এই কুসুমী-লাল আকাশ, শিলং পাহাড় থেকে আসা ঠাণ্ডা হাওয়ার দাপট আর দু' চোখে কুলায় না এমন অপার্থিব এক দৃষ্টিসুখ... তুলনারহিত এই সন্ধিক্ষণটিতেই তো মৃত্যুকে সেই প্রিয়তম-সদৃশ ব'লে মনে হওয়ার, যে মধুরের আজ অবধি কোনো শেষ আমি পাই নি...

(ক্রমশ)

আলোকচিত্রঃ লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: শিক্ষিকা ও লেখক।