অন্ধকার রাতে শহরের নির্জনতম একটা স্থান খুঁজতে খুঁজতে অমিতেশ এসে দাঁড়িয়েছে এক পোড়ো মন্দিরের সামনে। তার আস্তানা থেকে জায়গাটা বেশ কিছু দূরে। প্রায় প্রতিদিন এই সন্ধের সময় তার এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে ভালো লাগে। আসলে অমিতেশ এই সময় জগৎ সংসার থেকে নিজেকে নিয়ে পালাতে চায়। সেই কোনকাল থেকে তার এই পালানোর পর্ব চলেছে আজও তার শেষ হয়নি। সে জানে এ জীবনে তার পলায়ন পর্ব সমাপ্ত হবে না। অমিতেশ একজন বড় আমলা। সরকারের প্রশাসনিক কাজে তার দক্ষতা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এই একটা বিষয়ে অমিতেশ কিছুতেই নিজের কাছে কোনো যুক্তি খাড়া করতে পারে না। কেন সন্ধ্যের এই সময়টা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। অনেক ভেবেছে অমিতেশ। মনে হয়েছে বহু বছর আগে তার জীবনের এক সন্ধের স্মৃতি বোধহয় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় তাকে। সারাদিন নানা প্রশাসনিক ঝামেলা পোহাতে পোহাতে সন্ধে নামলেই কেমন যেন ছটফট করে অমিতেশ। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে এক জায়গাতে কোথাও থিতু হয়ে থাকে নি বেশিদিন। এক জেলা থেকে অন্য জেলা ক্রমাগত বদলি হয়েছে। সব জায়গাতেই তার সরকারি আবাসন তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে এই একটা সময়। কিছুতেই ঘরে থাকতে পারে না বেরিয়ে পড়ে আর ঘুরতে ঘুরতে ঠিক এমন কোনো জায়গা খুঁজে নেয় যেখানে অন্ধকার চরাচরে অমিতেশ সামনাসামনি হয় নিজের একান্ত গোপন সত্তার। সব খোলস থেকে বেরিয়ে আসে। নিমেষে তার চারদিকে ঝরে পড়ে তার আজন্ম লালিত আভিজাত্য, গাম্ভীর্য। তখন তার নিজেকে বড় অচেনা বলে মনে হয়। মনে হয় এ জগৎ সংসার সব মিথ্যা সব শূন্য। সন্ধ্যে কেটে যায় রাত গভীর হয় একসময় ফিরে আসে ঘরে। আজ যে ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত মন্দিরটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এখানে তার প্রথম আসা। আসলে উত্তরবঙ্গের এই জেলায় সে বদলি হয়ে এসেছে মাত্র এক সপ্তাহ কাল হয়েছে। সেই সুবাদে এই স্থানে তার প্রথম আসা। আর এখানে এসেই তার ভীষণ ভালো লেগে গেল এই পোড়ো মন্দির আর তার চারপাশের নিস্তব্ধতা। অনেক দিন পর আজ এই আধো অন্ধকারে অমিতেশ যেন খুঁজে পেল নিজেকে। এখনও রাতের গভীর অন্ধকার গ্রাস করে নি চারদিক। মন্দিরের ভাঙাচোরা সিঁড়িতে বেশ আয়েশ করে বসে সে একটা সিগারেট ধরায়। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে গিয়ে মনে পড়ে এই সিগারেট নিয়ে কী ভীষণ অবসেশড ছিল মিতুল। কতদিন তাকে অবাক করে তারই হাত নিয়ে নাক ঠেকিয়ে ঘ্রাণ নিয়েছে।
- জানো তোমার গায়ের থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ পাই আমি।
- কী করে গন্ধ পাও! তুমি তো আমাকে তোমার কাছে যেতেই দাও না।
- এই তো পাশেই বসে আছ তুমি। পাশাপাশি বসলে বুঝি গন্ধ পাওয়া যায় না!
- আচ্ছা বেশ সে না হয় পেলে কিন্তু গন্ধটা কিসের? সিগারেটের?
- না ঠিক তা নয়। বোধহয় তোমার মাখা পারফিউমের সঙ্গে সিগারেটের গন্ধ মিলে মিশে অন্য রকম একটা গন্ধ।
- কী যে বল না তুমি! আমি কোনো পারফিউম ব্যবহার করিনি কোনোদিন। বেকার মানুষ পারফিউম কিনব কোথা থেকে?
- সে তুমি যাই বল আমি কিন্তু গন্ধ পাই।
কত বছর আগে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বেরনোর পর কোনো এক বিকেলে নন্দনের সামনে গাছের তলায় বসে কথাগুলো বলেছিল মিতুল। মিতুল তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই তাদের প্রথম আলাপ। তার ব্যক্তিত্ব আর সুন্দর দুটো চোখ অমিতেশকে প্রথম দেখাতেই তীব্র আকর্ষণ করে। কাজে অকাজে অমিতেশ তার আশেপাশে যেতে চেষ্টা করত। এখন মনে পড়লে কেমন যেন হাস্যকর বলে মনে হয় নিজেকে। বহুদিন পর্যন্ত অমিতেশ জানতই না ওর নাম নাজমা মিতুল আক্তার। অবশ্য সে জানা না জানাতে অমিতেশের কোনো হেলদোল ছিল না। আগে যেমন সে মিতুল ছিল তাই থাকে। কথাটা মিতুলই তাকে একদিন জানিয়েছিল। ভিনধর্মী একটা মেয়েকে ভালোবাসার ঝক্কি কিন্তু কম নয়। সে নিশ্চিত ছিল যে তার পরিবার কোনো দিন এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। তবুও অমিতেশকে ফিরিয়ে দিতে পারে নি নাজমা মিতুল আক্তার।
মিতুলই তাকে বারবার বলত তোমার কিন্তু অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সেক্টরের জন্য পরীক্ষা দেওয়া উচিত। একরকম জোর করেই তাকে পরীক্ষায় বসিয়েছিল মিতুল। আর অমিতেশ তখন একটা ভদ্রস্থ চাকরির জন্য প্রাণপণ লড়াই চালাচ্ছিল। সেজন্য তার প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি ছিল না। ফলও পায় অমিতেশ। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সে কোয়ালিফাই করে। যেদিন ফল প্রকাশ হয় সেদিন তারা ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা সেরে ফেলতে দেখা করেছিল এমন এক নির্জন ভগ্নপ্রায় মন্দিরের চাতালে। কথায় কথায় বেশ অনেকটা সময় পার হয়ে সন্ধ্যে নেমে আসে। সন্ধ্যের অন্ধকারে সেদিন প্রথম অমিতেশ মিতুলকে অন্যভাবে চিনেছিল। এতদিন যে মিতুল স্পর্শ বাঁচিয়ে চলতেই অভ্যস্ত ছিল সেদিন যেন তার বাঁধ ভেঙে যায়। নিজে থেকে অমিতেশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধ'রে নিজের অধরে অমিতেশের ঠোঁট শুষে নিতে চেয়েছিল। অমিতেশ তখন জ্ঞান শূন্য ভেসে যেতে চাইছিল প্রথম পাওয়া প্রিয় নারীর স্পর্শ সুখে। কতক্ষণ যে তারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে দাঁড়িয়েছিল তার হিসাব কেউ রাখেনি। সচেতন হল তখনই যে মুহূর্তে তারা বুঝতে পারে তাদের ঘিরে ধরেছে বেশ কয়েকজন। অমিতেশ শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে মিতুলকে রক্ষা করতে। কিন্তু অতজনের সঙ্গে একা লড়াই করা সহজ ছিল না। অচিরেই হার মানতে হয়। ওরা মিতুলকে ছিনিয়ে নেয় ওর কাছ থেকে তারপর প্রচণ্ড মারধর চলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। একসময় কানে আসে মিতুলের আর্তনাদ ঠিক তখনই মাথায় কোনো ভারি বস্তুর তীব্র আঘাতে জ্ঞান হারায় অমিতেশ। দু'দিন পর যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সে দেখে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে, তার নাকে হাতে সব নল লাগানো। তার নাকি প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে রক্তও নাকি দিতে হয়েছে। প্রথমেই তার মনে হয় মিতুলের কী হল। তাকে পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাড়িতে খবর দেওয়া হয়। পরে তার সঙ্গে কথা বলতে পুলিশ হাসপাতালেও এসেছিল কিন্তু তারা মিতুলের কোনো কথা বলতে পারেনি। অমিতেশ বারবার বলা সত্ত্বেও মিতুলের নামে কোনো মিসিং ডায়েরি পর্যন্ত নেয়নি। এটা বড় আশ্চর্যজনক যে মেয়েটা যেন হঠাৎই উধাও হয়ে গেল। কতরকম ভাবে খোঁজ পাওয়ার চেষ্টা করেছে অমিতেশ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর। কিন্তু কোনো ভাবেই সে খোঁজ পায়নি মিতুলের। পুলিশের কাছে জানতে চেয়েছে তার সঙ্গে থাকা মেয়েটির কী হল। এ বিষয়ে পুলিশ বরাবর চুপ থেকেছে আর অমিতেশ ভেবেছে মিতুলের ভয়ঙ্কর কিছু হয়েছে যা হয়তো পুলিশ তাকে জানাতে চায় না। মিতুলের সহপাঠী তিনটে মেয়েকে একরকম জোর করে অমিতেশ মিতুলের বাড়িতে পর্যন্ত পাঠিয়েছে। তারা ঘুরে এসে কেমন যেন রহস্যজনক আচরণ করেছে। বারবার জিজ্ঞাসা করে জেনেছে মিতুলের কোনো সন্ধান তারা পায়নি। কেউ খুলে বলেনি যে মিতুল বেঁচে আছে কিনা বা থাকলেও কেমন আছে। সেই সময় থেকে অমিতেশ নিজের সঙ্গে নিজে লুকোচুরি খেলে চলেছে। যতদিন সে তার কাজে যোগ দেয় নি ততদিন প্রতি বিকেলে সেই মন্দিরের চাতালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আর অপেক্ষা করেছে যদি কোনওভাবে মিতুল ফিরে আসে। কখনো ভেবেছে যারা সেদিন তাদের আক্রমণ করেছিল তারাও যদি আবার ফিরে আসে। ফিরে আসলে তারা কি খবর দিত মিতুলের কি হয়েছে ! সেই প্রথম স্পর্শ আজও অমিতেশ ভুলতে পারে নি। আচ্ছা তার এই সব কিছু থেকে দূরে নির্জনতায় ফিরে ফিরে যাওয়ার এটাই কী কারণ। নিজেকে ঠিক বুঝতে পারে না তবে সমস্ত ঘটনার জন্য অমিতেশ নিজেকে অপরাধী ভাবে। আর অপরাধী যেভাবে পালিয়ে বেড়ায় সেও একইভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কোনওদিন হয়তো মিতুল তার সামনে এসে প্রশ্ন করবে অমিতেশ কেন তাকে তার কাছে ধরে রাখতে পারল না। অমিতেশ কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। কেবলই মনে হয় সেদিন নির্জনতার খোঁজে ওই রকম একটা জায়গায় না গেলে হয়তো মিতুলকে হারাতে হতো না।
রাত বাড়ে। অমিতেশ অবসন্ন শরীরটা নিয়ে ঘরে ফেরে। তারপর আবার প্রতীক্ষা করে কখন রাত কেটে একটা কর্মময় দিন আসবে। বহুকাল ধরেই ডাক্তারের পরামর্শ মেনে ঘুমের ওষুধ খায় সে। এক এক রাতে ভাবে সব ওষুধগুলো একসাথে খেয়ে ফেলে। কিন্তু কোথায় যেন একটা ক্ষীণ আশা মনে মনে পোষণ করে অমিতেশ - কোনও না কোনও দিন ঠিক মিতুল এসে দাঁড়াবে তার সামনে। এরকম একটা অসম্ভব আশা নিয়ে রাতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে নিজেও জানতে পারে না। আবার পরদিন দপ্তরের কাজে দিনটা কাটিয়ে দেয়। মিতুলের শূন্যস্থান পূরণের কোনো ইচ্ছা কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি। সেদিন ওই মন্দির চত্বর থেকে ফেরার পর অমিতেশের কেবলই মনে হচ্ছে যে এবার হয়তো তার সাথে মিতুলের দেখা হবে। কিন্তু কোথায় কখন কিভাবে দেখা হতে পারে সে ভাবনা এখন তাকে পেয়ে বসেছে। দপ্তরে বসেও কোনো মহিলা ঘরে ঢুকলেই তার মনে হয় এই বোধহয় মিতুল এসে দাঁড়াল। মুখ তুলে মহিলার দিকে তাকিয়ে হতাশ হয় অমিতেশ। আর যদি সে আসেও তবে চিনতে পারবে! মাঝে যে কেটে গেছে কুড়িটা বছর। এখন কেমন দেখতে হয়েছে তাকে কে জানে।
সেদিন একটা প্রশাসনিক মিটিং-এ যাওয়ার জন্য নিজের অফিসঘর থেকে বের হতে গিয়ে অমিতেশ দেখে একজন বোরখা পরা মহিলা তার দরজার সামনে লাগানো নেমপ্লটটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাড়াহুড়ো থাকায় তাকে তখন ভালো করে দেখার অবকাশ পায়নি সে। মিটিং চলাকালীন হঠাৎই অমিতেশের মনে হয় ওই মহিলা তার নেমপ্লেটের দিকে অমনভাবে দেখছিল কেন! ওই মহিলা মিতুল ছিল না তো! ইশ্ কেন যে একবার ভালো করে দেখল না। নিজের উপর খুব রাগ হল অমিতেশের। অবশ্য পরক্ষণেই ভাবল তা কী করে হবে মুক্তমনা মিতুল তো নিশ্চয়ই বোরখা পরবে না। এই ভেবে নিজেকে খানিকটা আশ্বস্ত করে কিন্তু ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলতে পারে না একেবারে। এখন তার মন ওই বোরখা পরা মহিলাকে খুঁজে চলেছে সবসময়। গাড়িতে চলতে চলতে সে রাস্তার দু'পাশে বারবার দেখে ওই রকম কোনো মহিলাকে দেখা যায় কিনা। একটা সপ্তাহ কেটে গেল কিন্তু অফিসের আশেপাশে বোরখা পরা কোনো মহিলা তার চোখে পড়ল না। প্রায় প্রতিদিন অমিতেশ নিয়ম ক'রে ওই পরিত্যক্ত মন্দিরের চাতালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে আর নিজের বোকামির জন্য নিজেকে দোষারোপ করেছে। এতদিনে তার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে ওই বোরখা পরিহিত মহিলাই নাজমা মিতুল আক্তার। হাজারো যুক্তি সাজিয়েছে অমিতেশ। সে জানে তার এ ধারণা অমূলক কিন্তু মন মানতে চায়নি।
এক রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে সবেমাত্র চা আর খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে। বাংলোর বারান্দা থেকে তার একমাত্র বাবুর্চি কাম খানসামা কৃষ্ণপদর বিরক্তি সূচক কথা কানে এল।
- তুমি আজ আবার এসেছ! বলেছি না সাহেব বাড়িতে কারো সাথে দেখা করেন না।
আগন্তুক কি বলল তা শুনতে পেল না অমিতেশ। কৃষ্ণপদর গলায় আবার শুনতে পায়।
- কী যা তা বলছ বল দেখি। তোমার আবার সাহেবের সাথে কী ব্যক্তিগত দরকার থাকবে শুনি। যাও তো এখন আমাকে বাজারে যেতে হবে।
এই পর্যন্ত শুনে আর ঘরে থাকতে পারে না অমিতেশ। বারান্দায় পা দিয়ে হতবাক হয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে সেই বোরখা পরা মহিলা। কৃষ্ণপদকে বাজার যেতে ব'লে মহিলাকে ভিতরে আহ্বান করে অমিতেশ। সোফায় সামনাসামনি বসে মুখের পর্দা সরায় মহিলা। অমিতেশ সব কথা হারিয়ে ফেলে।
- আমাকে ক্ষমা করো অমিত।
কত বছর পর ডাকটা শুনল। এ নামে কেবল মিতুলেরই অধিকার। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে অমিতেশের। তখন তার সামনে হাতজোড় করে বসে মিতুল।
- তুমি কেন ক্ষমা চাইছ! ক্ষমা তো আমার চাওয়ার কথা মিতুল। আমি সেদিন তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। এ অপরাধ আমার।
কোনওক্রমে কথাগুলো বলে অমিতেশ। তার মাথাটা যেন নিজের থেকে ঝুঁকে পড়ে। শব্দ করেই কেঁদে ওঠে সামনে বসা মিতুল। ধাতস্থ হয়ে ধীরে ধীরে সেই সেদিনের সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া মুহূর্ত থেকে এ পর্যন্ত সব বলে যায় মিতুল। আর দলা পাকানো কান্না বুকে চেপে নির্বাক শুনে যায় অমিতেশ। কী ভীষণ কষ্ট পেয়েছে মেয়েটা।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল একভাবে বসে আছে অমিতেশ। কৃষ্ণপদ কয়েকবার ডেকে গেছে খাওয়ার জন্য। উঠতে ইচ্ছে করেনি। মিতুলের বলা কথাগুলো যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে মন চায়না। কী ভয়ঙ্কর সত্যের মুখোমুখি হল আজকে অমিতেশ। ভাবতেও পারে না যে, কোনো বাবা তার মেয়ের সাথে এরকম করতে পারে! মিতুলের বাবাই লোক পাঠিয়ে তাদের আক্রমণ করিয়ে তাদের মেরে ফেলতে চেয়েছে! কোনো বাবা নিজের মেয়েকে শুধু ভিনধর্মী একটা ছেলেকে ভালোবাসার জন্য এরকম একটা জঘন্য কাজ করতে পারে! মিতুল শুধু তার দাদার জন্য সে যাত্রা বেঁচে যায়। আর অমিতেশ মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছিল। দাদার কল্যাণে মিতুল বাবার সাথে একটা আপসরফা করে নেয়। মিতুলের শর্ত মেনেই তার বাবা আর অমিতেশকে কোনো সমস্যায় ফেলেনি। দু' বছর মিতুল তার বাবার শাসনে ছিল। তারপর বিজ্ঞাপন দেখে এখানকার একটা বেসরকারি স্কুলে চাকরি নিয়ে আসে। অমিতেশ বেঁচে আছে এটা জেনেছিল তারই পাঠানো ওই মেয়েদের কাছে। অমিতেশের সব খবরই সে রাখে। শুধু অমিতের যাতে কোনো বিপদ না হয় তাই সে একা। এতক্ষণে বাস্তবে ফেরে অমিতেশ মিতুল চলে গেছে অনেকক্ষণ। তার পলায়ন পর্বের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

পরিচিতি: বিশিষ্ট লেখক ও গল্পকার।