প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

রক্তকরবী – ফিরে দেখা



অঙ্গনা দাস ঘোষ


'রক্তকরবী' শুধু একটা নাটক নয়, 'রক্তকরবী' একটি দার্শনিক, রাজনৈতিক ও মানবিক প্রতিবাদ নাট্য। তাই ১০০ বছর আগে লেখা এই নাটকটি আজ দু’হাজার পঁচিশেও সমান প্রাসঙ্গিক। 'রক্তকরবী' লেখার আগে নাট্যকার দেখেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, পুঁজিবাদের উত্থানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও পুঁজিবাদী সমাজের বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আজ এই মুহূর্তেও পৃথিবী জুড়ে চলছে সমাজতন্ত্রের সংকট, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন। 'রক্তকরবী' নাটক ও তার কবিকৃত ইংরেজি অনুবাদ 'Red Oleanders' প্রকাশিত হয় একই সঙ্গে 'প্রবাসী'র আশ্বিন ১৩৩১ সংখ্যা এবং 'Visva Bharati' Quarterly ১৯২৪-এ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায়।


'রক্তকরবী'র প্রচ্ছদ।

'রক্তকরবী' নাটকে চিত্রিত হয়েছে এক কাল্পনিক রাজ্যের কথা। সেই রাজ্য যেন মাটির নিচে, তাই যক্ষপুরী হিসেবে পরিচিত। যক্ষপুরীর মাটির নিচে আছে সোনার খনি, রাজ্যবাসীর কাজ সেই রাজ্যের সেই গর্ত থেকে সোনা তুলে এনে সঞ্চয় করা – জীবনের বিনিময়ে, প্রাণের বিনিময়ে। তাতেই রাজার কার্যসিদ্ধি ও তৃপ্তি। এই সঞ্চয় কুবেরের সঞ্চয়, লক্ষ্মীর সঞ্চয় নয়। তাই সোনাকে এখানে বলা হয়েছে 'মরা ধন'। মুনাফা সর্বস্ব যান্ত্রিকতা প্রাণের মৃত্যু ঘটায়, মানুষকে যন্ত্র অথবা পশুতে পরিণত করে। এই নাটকে যেন নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ একথাই বলতে চেয়েছেন। এই বক্তব্যের বার্তা নিয়ে যক্ষপুরীতে এসেছে রঞ্জন ও নন্দিনী। দুজনেই দুঃসাহসী, যক্ষপুরীর আইন শাসনের পরোয়া না করে তারা খোদাইকরের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তোলে। শাসকের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহী করে তোলে। নারী নন্দিনী এখানে এসেছে বিপ্লবের বার্তাবাহিকা হয়ে। নন্দিনীর সঙ্গ পেয়ে নাটকের শেষে রাজা নিজেই নিজের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে শোষণ, অত্যাচার ও লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে। নারীর বিচিত্র শক্তি অসাধ্য সাধন করতে পারে এই 'রক্তকরবী' নাটক যেন একদিকে সেই বার্তা দেয় অন্যদিকে ব্যক্তির সাথে আদর্শের সম্পর্ক পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে। রাজতন্ত্র দ্বারা প্রাপ্ত এই সমস্ত সম্পদ প্রাচুর্যের অধিকারী যিনি, তিনি থাকেন এক জালের আড়ালে অদ্ভুত রহস্যময় তাঁর আচরণ। খনিগর্ভের সমস্ত খোদাইকররা তাদের ইচ্ছে- অনিচ্ছের বিরুদ্ধে সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত। তারা যেন এক যান্ত্রিক জীবনের দাস। শান্তিপূর্ণ এই কর্মব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে, তাদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। এই নাটক পুঁজিবাদী শোষণের এক ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ করে পাঠকের সামনে। কাজ ছাড়া যা এই যন্ত্ররূপী মানুষদের ভুলিয়ে রাখে তাহলে ধর্ম ও নেশা – যা প্রায় সমান সর্বনাশা।

হঠাৎ সেই যান্ত্রিক রাজ্যে আসে নন্দিনী। নন্দিনী তার প্রাণের সোনার কাঠি দিয়ে জাগিয়ে তুলেছে মরাধনের শব সাধনা করা সমস্ত মানুষদের। সে সবার মাঝে নিয়ে আসে অবকাশ, আনন্দ ও স্বাধীনতার ইচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জীবন ও মৃত্যুর দ্বন্দ্বে প্রেমের জয় হয়। ঘোর জীবনবোধের প্রতীক নন্দিনী, সে অত্যাচারী শোষক রাজার হৃদয় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যান্ত্রিক জীবনকে অবশেষে অতিক্রম করে জাল ছিঁড়ে সে বেরিয়ে এসেছে সবুজের জয়গান করতে।

'রক্তকরবী' যে ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরে তা যেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শৈল্পিক বিস্ফোরণ। যারা শিক্ষার সংকোচন করতে চায়, চিন্তা-কণ্ঠ রোধ করতে চায়, শ্রমিকের উপর অত্যাচার করে, অমানবিক অত্যাচারে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে তারা যেন নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে। 'রক্তকরবী' নাটকটি একটি রাজতন্ত্রর ভেঙে পড়ার নাটক, তবে এই ভাঙ্গন ইতিবাচক। ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অথবা ব্যক্তিবিরুদ্ধ ব্যবস্থা অবশ্যই একদিন ভেঙে পড়ে, নাটক হিসেবে 'রক্তকরবী' মানুষের জন্য এই এক স্থায়ী শিক্ষা বহন করে চলে। 'রক্তকরবী' নাটক রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য নাটকের থেকে আলাদা তাই, রক্তকরবী লেখার আগে তৈরি হয়েছে দশটি খসড়া, বারে বারে সংযোজন, সংশোধন ও পরিমার্জন করে অবশেষে সচেতন নাটক নির্মাণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

আধুনিক সভ্যতার প্রধান দুটি অঙ্গ – যন্ত্র ও ধনতন্ত্র। যন্ত্র যেমন মানুষের মানবিক গুণগুলিকে নিঃশেষিত করে, তেমনি ধনতন্ত্র নিঃশেষ করছে শ্রমকে। 'রক্তকরবী'র রাজা মকররাজ শেষ পর্যন্ত নাটকের শেষে তাঁর নিজের যন্ত্রকে ভেঙে ফেলে আক্ষেপ করেছে, "আমি যৌবনকে মেরেছি, মরা যৌবনের অভিশাপ আমাকে লেগেছে"। 'রক্তকরবী' নাটকে রাষ্ট্রসভ্যতা ও পুঁজিবাদের বিষয়গুলোকে প্রতীকের দ্বারা প্রকাশ করা হলেও নাটকটিকে রাজনৈতিক নাটক বলা যায় না; 'রক্তকরবী' মূলত পুঁজিবারদের বিরুদ্ধে শ্রেণী সংগ্রাম।


রক্তকরবী (১৯৫৭)। শিল্পী: গণেশ পাইন।

শেষ পর্যন্ত জীবন-যৌবন-সবুজ জীবনে এসে ধরা দিয়েছে যক্ষপুরীতে। সবার মুখে শোনা গেছে ফসল কাটার গান 'পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে'। অন্ধকার কেটে ফুটে উঠেছে আলো। 'রক্তকরবী' একটি কালজয়ী নাটক, তাই শোষণের বিরুদ্ধে বন্ধনমুক্তির জন্য প্রাণের প্রতিবাদের কথা – জীবনের কথা ভাবতে গেলে এই নাটকের কথা পাঠকের সবচেয়ে আগে মনে পড়ে।

আজও সভ্যতার নামে যে আগ্রাসন সারা পৃথিবীতে চলছে তা কতটা বিধ্বংসী ও ভয়ংকর তা আজ আরও একবার এই নাটক আমাদের স্মরণ করায়। আগ্রাসনের আসক্তি ভয়ংকর রূপ নিয়ে জাতি-গর্ব ও শক্তিমত্তার বেড়াজালে মানবিকতাকে ঢেকে রাখে। আজ আবার এক সেই নন্দিনীর খোঁজ করতে হবে আমাদের, যে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আবার প্রেমের বার্তা নিয়ে আসবে – শাসকের জন্য, মানুষের জন্য।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক।