
অনেক দিনের মনের মানুষ
শৈশবের অবচেতনে, যখন দৃশ্য, শ্রুতি, গন্ধ, স্পর্শ সব ক্লদ মোনে (Claude Monet)-র ছবির মতো মূর্ত-বিমূর্তের মাঝে দোল খায়, জীবনের 'সেই অবাক ভোরবেলা'য় তুমি আমার মন ছুঁয়েছিলে। "তখন কে তুমি তা কে জানত"! শুধু জানতাম তোমার গলার স্বরে আছে এক আকাশ ছুটির ডাক, শরতের অমল ধবল মেঘের অনাবিল আনন্দ, ঝলমল আলোয় নানা রঙের খেলা।
ছুটির দিনে টেবিলের উপর বসত চৌকো রেকর্ড প্লেয়ার। ঢাকনা খুললেই দেখা যেত চোঙের সামনে চুপটি করে বসে থাকা কুকুরটিকে। বের হতো বড় কালো রেকর্ড, যার ঠিক মাঝখানটিতে বসে বাঁশি বাজায় রাখালবালক। তারপরেই ঘুরতে থাকা রেকর্ড থেকে উঠে আসত তোমার অমোঘ কণ্ঠস্বর। যার অভিঘাতে আশ্চর্য বিস্ময় ছেয়ে ফেলে আকাশভরা সূর্য তারাকে, বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে প্রাণের হিল্লোল। সেই অমৃতপাথারের গভীরে তখন নিমগ্ন আমরা তিন প্রজন্ম। জীবনের নানান বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে বোধের নানান স্তরে ছুঁয়ে যেত তোমার কণ্ঠের সম্মোহন। রক্তধারায় দোল দিয়ে যেত।
তোমার পরশ আসে কখন কে জানে
স্পষ্ট মনে পড়ে ছবি... ভেসে আসছে তোমার গলায় "যেতে যেতে একলা পথে নিভেছে মোর বাতি"। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার দিম্মা। শুভ্র বসনা, আলুলায়িত কেশ, শূন্য দৃষ্টি দূর আকাশে নিবদ্ধ, দু'চোখে নিঃশব্দে নামছে জলের ধারা। তাঁর ভোরবেলার সাথীর ঠিকানা যার জানা, সেই যে আজ তাঁর নিদ্রা রাতের সাথী। শুনেছি আমার দাদু খুব ভালোবাসতেন তোমার গলায় "আজি যত তারা তব আকাশে"। তারার মাঝে তাঁকেই বুঝি খোঁজায় তোমার গান!
আমার মায়ের কাছে তোমার গাওয়া সব গান একান্তভাবে তোমারই। তাঁর মতে, সে গান আর কারো না গাওয়াই শ্রেয়। মা বলে, তোমার গান শুধু গান নয় এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নাট্যাভিনয়। তোমার উদাত্ত কণ্ঠের সঙ্গে গলা মিলিয়ে মা অনর্গল গান গেয়ে যেত - "হে মোর দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ কী অমৃত তুমি চাহো করিবারে পান", "এরে ভিখারী সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে" কিংবা "রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি"। গীতবিতান বা স্বরবিতান দেখতে হ'ত না কখনও। এমনকি আমার ধনঞ্জয়-ভক্ত বাবাও তোমার গান শুনে শুনে টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করে ফেলল "প্রভু আমারো, প্রিয় আমারো, পরম ধন হে"। এমনি অপ্রতিরোধ্য তোমার গানের আকর্ষণ।
কী গোপন আপন আনন্দে
তখনও তো রবি ঠাকুরের গানের মানে বোঝার বয়স হয়নি আমার। তবু কেন এমনি হ'ত? তোমার গলায় "ফুল গেল শুকায়ে মালা পরানো হ'ল না তব গলে" শুনে কেন একটা অব্যক্ত ব্যথা গাঢ় হয়ে উঠত মনের গহনে? পর মুহূর্তেই যারে যায় না পাওয়া সেই সোনার হরিণের খোঁজে মন ছুটত আপন মনে মাঠে বনে। কখনও বিপুল আনন্দে ঝরো ঝরো ঝরে রঙের ঝর্ণা, কখনও প্রকৃতির অশ্রু ঝরো ঝরো ঝরে শ্রাবণ ধারায়। তোমার গান একটা আকুল করা ভালো লাগার ঘোরে আচ্ছন্ন করে রাখত ছেলেবেলার দিনগুলিকে। তোমার কণ্ঠস্বর জীবনের ঊষালগ্নে কান্না-হাসির জাল বুনে যেত অবিরত।
তবু অনন্ত জাগে
১৯৮০ সালের জুলাই মাসে ঘটল দুই আকস্মিক ইন্দ্রপতন। ২৪শে বাংলা হারাল তার মহানায়ককে। তার অব্যবহিত পরেই ৩১শে ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ হারাল তার সর্বশ্রেষ্ঠ হিরণ্ময় কণ্ঠ। তখনও জানা ছিলনা আসছে চরমতম আঘাত। ১৮ই আগস্ট। সেদিন বাড়িতে ছিল অরন্ধন, স্বজন হারানোর বেদনা। জল স্থল অন্তরীক্ষ ছেয়ে রণিত হ'ল তোমার জলদ গম্ভীর স্বর "মেঘ বলেছে 'যাব যাব', রাত বলেছে 'যাই', সাগর বলে 'কূল মিলেছে - আমি তো আর নাই' "।
বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে কে
আর একটু বড় হয়েছি। মনে পড়ে একটা লং প্লেয়িং রেকর্ডের এদিক ওদিক মিলিয়ে ছিল তোমার গাওয়া ছয়টি ঋতুর গান। তোমার আশ্চর্য কণ্ঠে তুমি মনের মধ্যে এনে দিতে প্রতিটি ঋতুর স্বতন্ত্র আমেজ। বসার ঘরের পরিসরে কখনও প্রকৃতি হানছে দারুণ অগ্নিবাণ, পরমুহূর্তে নেমে এসেছে শ্যামল সুন্দর তার সঙ্গসুধা নিয়ে। ক্ষণে শীতের হাওয়া নাচন লাগায়, তারপরেই রূপের ভাণ্ডারী চৈত্রপবনে চিত্তবনে দোল দিয়ে যায়। এই শুকতারা ভোরের কিনারায় ডেকে ফেরে শিউলি ফুলকে, আবার মুহূর্তে নামে হিমের রাত তার কুহেলী ঘেরা আলোকমালা নিয়ে। কী অবলীলায় ঘুরতে থাকত ঋতুচক্র তোমার গানের আলম্বে। একই কণ্ঠ, অথচ বদলে যেত আবহ, বদলে যেত ভাবের খেলা। মনে মনে ভাবতাম - এ কোন জাদুকর!
শ্রাবণমেঘের খেয়াতরীর মাঝি
তবে রবি ঠাকুরের গান আর তোমার কণ্ঠলাবণ্যের মণিকাঞ্চন যোগ এক আলাদা মাত্রা এনে দেয় বর্ষার গানে। বহু যুগের ওপার থেকে বিরহ যক্ষের বিচ্ছেদ বেদনা মূর্ত হয়ে ওঠে। পুব হাওয়াতে দোল দিয়ে যায় হৃদয় নদীর কূলে কূলে। কোথা থেকে ছাড়া পেয়ে জয়ধ্বজা উড়িয়ে আসে আষাঢ়। বয়ে নিয়ে আসে বৃষ্টির সুবাস। ভিজে মাটির গন্ধে মনে আনে কোন সুদূরের স্মৃতি। তোমার মতো এমন করে 'আষাঢ়ে'র গভীরতা বা 'বিন্দু বিন্দু' জলের ঝরে পড়ার পরিশীলন আর কারো উচ্চারণে ব্যক্ত হতে শুনিনি। ঝরো ঝরো শ্রাবণ ধারায় গৃহহারা পথবাসীর জন্য প্রাণ কাঁদে। কখনও বা সে গোপন চরণ ফেলে চলে অভিসারে। আবার কখন পাগলা হাওয়ায় চেনাশোনার কোন বাইরে হারিয়ে যায় মন। বর্ষাশেষে আকুল আর্তি ফুটে ওঠে যখন তুমি গাও - "তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না, আমার বাদলের গান হয়নি সারা"। আমাদের শ্রুতিও যে চায় তোমার বাদলের গান শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, অবিশ্রাম।

এ কী গভীর বাণী
তোমার কণ্ঠে সুগভীর নিমগ্নতায় যখন উচ্চারিত হ'ত সংস্কৃত বেদমন্ত্র "ত্বমীশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং", চারপাশের ইট-কাঠের শহর তখন নিমেষে বিলুপ্ত হ'ত। যেন সুদূর কোনো নদীর ধারে, নিবিড় বনচ্ছায়ায়, কোনো বেদবিতের পুণ্য আশ্রমে গীত হচ্ছে সাম গান। আবার সেই কণ্ঠই গেয়ে উঠছে নিখুঁত পাশ্চাত্য দক্ষতায় "This weariness forgive me, Oh! My Lord!"। তোমার সেই স্বরক্ষেপ হার মানাবে খোদ ইংরেজকেও। শুধু ভাষার বিশুদ্ধতায় এ ম্যাজিক সম্ভব নয়, তাকে অতিক্রম করে ভাবের নিগূঢ়তায় তোমার গানের বিন্যাস। তাই তা স্পর্শ করে মনের গভীরতম নিভৃতি।
নিভৃত প্রাণের দেবতা
তোমার আর এক রূপ দেখি ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে। তোমার উপস্থিতি ও "আকাশভরা সূর্য তারা" সমৃদ্ধ করেছে 'কোমল গান্ধার'। 'মেঘে ঢাকা তারা'য় "যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে" কিংবা 'যুক্তি-তক্কো-গপ্পো'র "কেন চেয়ে আছো গো মা" এক একটি হৃদয় নিংড়ে নেওয়া কালোত্তীর্ণ উপস্থাপনা। তা অমর হয়েছে তোমার কণ্ঠের সুরমূর্ছনায়। রবি ঠাকুরের গান যে তোমার যাপনেরই অঙ্গ এবং আরেক 'মা' তা বুঝতে পারি 'ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত' পড়ে। "আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান"-এ যেন তোমার জীবন-দেবতা রবি ঠাকুরের সঙ্গে তোমার নিভৃত আলাপন, তোমার আত্মসমর্পণ। তোমার রচিত ও সুরারোপিত গানটিতে - "ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিল না/ আমি বুঝতাম পারলাম না/ এই কথাডা তো ব্যাবাকের আসে জ়ানা/ জ়াইন্যা হুইন্যাও কেউ কিসু রাও করে না।" - ব্যক্ত হয়েছে তোমার মনের গভীর গোপন ব্যথা।
পথে চলে যেতে যেতে
আমার জীবনসঙ্গীর সাথে কলেজে বন্ধুত্ব। ওর সব থেকে পছন্দের গান "কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন দিয়ে যাও"। সেখানেও তুমি স্বমহিমায় বিদ্যমান। তখন রেকর্ড, ক্যাসেট চলে গিয়ে সিডির যুগ। মনে পড়ে, দেশে-বিদেশে যখনই লং ড্রাইভে গেছি আমরা, লুপে চলতে থাকত তোমার গলায় "আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী"।
এমনি বহে ধারা
নিজের শৈশব ছাড়িয়ে অনেক দূরে, মা হয়ে, আর এক শিশুর মনে ভরে দিতে চাইলাম তোমার সুরের ধারা। নিজের ছেলেবেলার মতো আমার সন্তানের শৈশব ঘিরেও ধ্বনিত হয় তোমার কণ্ঠ। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলে "মা, সব থেকে জ্বলজ্বলে তারাটা নিশ্চয়ই দেবব্রত!" বুঝতে পারি তুমি জয় করে নিয়েছ আরও এক প্রজন্মকে। শিশু উৎসবে সে গায় "আমার মুখের কথা তোমার নাম দিয়ে দাও ধুয়ে"। যৌবনের দ্বারপ্রান্তে যখন কোনো উদাস মুহূর্তে ও গেয়ে ওঠে "মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে", বুঝতে পারি আজ ওর মনের যে কোণটি আমার অধরা, সেখানেও আছো তুমি।
প্রাণের আলাপ কেবলমাত্র গানে গানে
তোমার গানের স্রোতে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গেছে একটি প্রজন্ম, এসেছে আর এক নতুন প্রজন্ম। আজও সেই নতুন তিন প্রজন্ম বুঁদ হয়ে শোনে তোমার গান। রাসবিহারী রোডের ট্রায়াংগুলার পার্ক ঘেঁষে তোমার বাড়িতে গড়ে উঠেছে যে 'মাড ক্যাফে', তার আলো-আঁধারির অসীম রহস্য মাঝে খুঁজে ফেরে তোমায়। "প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ"।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: লেখক, প্রাবন্ধিক ও বিশিষ্ট চিকিৎসক।