খেলাধুলো

মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ



ডঃ তমোঘ্নী মান্না


খেলার জগতে মেয়েরা অনেকদিন ধরেই ছেলেদের সঙ্গে সমানতালে অংশগ্রহণ করছে। বিশ্বজুড়ে নারী ক্রীড়াবিদরা নানা প্রতিযোগিতায় অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তায় তাঁরা পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নন। তবে নারী ও পুরুষ শরীরবৃত্তীয় গঠনের কিছু মৌলিক পার্থক্য থাকায় মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্য আলাদা ও বিশেষ ধরনের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।

মেয়েদের শারীরিক গঠন ও চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ

মহিলা ক্রীড়াবিদদের শরীরে হরমোনের তারতম্য, বিশেষত ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের প্রভাব, তাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। যেমন, মেনস্ট্রুয়াল চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরের শক্তি উৎপাদন, সহনশীলতা এবং মনোযোগের স্তর ভিন্ন হতে পারে। ফলে এ সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণের ধরন ও তীব্রতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রশিক্ষকরা এখন এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে 'মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল বেসড ট্রেনিং' পদ্ধতি অনুসরণ করছেন।

পেশি ও হাড়ের যত্ন

মেয়েদের হাড় অপেক্ষাকৃত বেশি নমনীয় হলেও, তাঁদের হাড়ের ঘনত্ব পুরুষদের তুলনায় কম হতে পারে। তাই, নিয়মিত ভারোত্তোলন বা রেজিস্টেন্স ট্রেনিং তাঁদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে পেশি শক্তিশালী হয় আর হাড়ের ঘনত্বও বাড়ে। মেয়েদের ACL (anterior cruciate ligament) ইনজুরির প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তাই প্রশিক্ষণের সময় এর ঝুঁকি কমাতে কৌশলগতভাবে কাজ করতে হয়।

পুষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস

মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্য সঠিক পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিনের চাহিদা তাঁদের শরীরে তুলনামূলক বেশি। অতিরিক্ত ক্যালরি ঘাটতি বা 'Energy Deficiency' তাদের হরমোনের ভারসাম্য, হাড়ের সহন ক্ষমতা ও কাজকর্মে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একজন স্পোর্টস নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শে নির্দিষ্ট খাদ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মানসিক প্রশিক্ষণ

মহিলা ক্রীড়াবিদদের অনেক সময় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা অতিক্রম করে খেলাধুলার জগতে প্রবেশ করতে হয়। তাই মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মনোবিদের সাহায্যে মনোসংযোগ বাড়ানো, চাপ কমানো এবং জয়ের লক্ষ্যে পৌছনোর জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মেডিটেশন করানো উচিত।

নিরাপত্তা ও আরামদায়ক পরিবেশ

সমাজের অনেক জায়গাতে মেয়েরা আজ লালসার শিকার। খেলার দুনিয়াও এর থেকে মুক্ত নয়। এরজন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক নিরাপত্তার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পায়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারী প্রশিক্ষক, পরামর্শদাতা এবং নারী ক্রীড়াবিদদের সুবিধামতো পরিকাঠামো যেমন আলাদা চেঞ্জ রুম, পরিচ্ছন্ন স্যানিটারি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাতৃত্বকালীন প্রশিক্ষণ

অনেক মহিলা খেলোয়াড়রই গর্ভধারণের পরও ক্রীড়াক্ষেত্রে সক্রিয় থাকতে চান। গর্ভাবস্থায় ও মাতৃত্বকালীন সময়ে তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা দরকার যা মায়ের এবং শিশুর উভয়ের স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে। আধুনিক স্পোর্টস মেডিসিন এখন এমন প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করতে সক্ষম যা মাতৃত্ব এবং শরীরচর্চার সমন্বয় করতে পারে।

মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ শুধু তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যই নয়, তাঁদের সার্বিক সুস্থতা, নিরাপত্তা ও মানসিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। উন্নত প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, পুষ্টি, মনোবিদ্যার সহায়তা এবং একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে মহিলা ক্রীড়াবিদদের জন্য সমান সুযোগ এবং সাফল্যের পথ নিশ্চিত করা সম্ভব। খেলাধূলায় শারীরিক ও অনেক ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক বাধা থাকলেও মেয়েরা আরও উন্নত বিজ্ঞান-প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও অনেক সফল হবে, তা আমরা আশা করতেই পারি।

পরিচিতি: অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ক্রীড়া বিজ্ঞানী।