'শিলং অ্যাড্রেস' হোটেলের ডাইনিং হল থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে প্রতিদিন নিজেদের রুমে ফেরার পথে কাচের একটা প্রকাণ্ড জানলা-দেয়াল পড়ত; রঙবেরঙের ছোটো ছোটো কাচ কখনো তেরছা করে কেটে, কখনো বা আয়তাকারে সাজিয়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর জিওমেট্রিক আর্ট ফর্ম করা!
পাহাড়ের সকাল শুরুর রোদে সবসময়ই একটা আলাদা নর্মিয়াঁ! শরতের সেই মিঠে রোদ, ঐ লাল নীল হলুদ কাচগুলোকে পার করে যেই না হোটেলের দুধসাদা মেঝেটাতে এসে পড়ে, অমনি ক্যালাইডোস্কোপিক আরেক রূপকথার গল্প শুরু হবেই হবে!

নরম রোদ্দুর আর রঙিন কাচের মিলিত রূপকথা।
সেই দেখেই দিব্যি সারাটাবেলা কাটিয়ে ফেলতাম, যদি ট্রিপটা সোলো হ'তো! কিন্তু সারাদিন কাটানোর হাজারো আয়োজন তখনো থরে থরে সাজানো; কন্যের সেসব দেখা বাকি। অগত্যা নতুনের টানে আবার ছুটিলাম...
গত অক্টোবরের এগারো তারিখটা ছিল আমাদের শিলং আসার তৃতীয় দিন। সেদিন দুর্গাপুজোর মহাষ্টমী। রাস্তায় ভিড়। সকাল থেকে তাই একটু বাড়তি তাড়ায় রয়েছি মা-মেয়ে। আইটেনারিতে সেদিন চেরাপুঞ্জি ভ্রমণ। দূরের পথ। সক্কাল সক্কাল-ই রওনা হওয়ার! তাই রোদ্দুর আর রঙিন কাচ মিলে সেই যে মায়াছায় ফাগুনখেলা, তাকে আগের দিনগুলোর তুলনায় আরেকটু বেশি সকাল সকালই দেখে নিতে হল আমাদের; এবং সময়ের টানাটানিতে, দু'চোখের সেই ঘোর লাগা অপার মুগ্ধতাটুকুকে পিছুটান হিসেবে জমা রেখে আসতেও হল ঐ স্ফটিক-মেঝের ঠিক মধ্যিখানটিতে। সেখানে রঙের খেলা ফুরোতে তখনো ঢের দেরি!
মনটা একটু কেমন কেমন!
গাড়িতে উঠে বসলাম।
'পিকচার পার্ফেক্ট' শিলং শহরকে পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি এবার হু হু করে এগিয়ে চলল চেরাপুঞ্জির পথে। শিলং থেকে প্রায় আটান্ন কিলোমিটার দূরের এই অপরূপ রূপসী উপত্যকা 'চেরাপুঞ্জি'-কে স্থানীয় মানুষ 'সোহরা' নামেও ডাকেন। একদা 'গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস'-এ এই অঞ্চলটিকে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিস্নাত অঞ্চলের শিরোপা দেওয়া হয়েছিল এবং অত্যধিক বৃষ্টির কারণে এখানকার বৃষ্টিকে মিলিমিটারে নয়, বরং 'ফিট' এককে পরিমাপ করা হ'তো তখন। কিন্তু পরিবেশবিকারের অভিশাপে সেই চেরাপুঞ্জি-ই আজ সর্বাধিক বৃষ্টিপাত অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজসিক গৌরবটিকে হারিয়েছে। কিন্তু তাতে কি! সৌন্দর্যের নিরিখে এই উপত্যকা যেন আজ-ও মেঘ-কুয়াশার চাদরে ঢাকা চিররহস্যময়, এক না ফুরোনো কবিতা! এর মেঘের আড়ালে আড়ালে বয়ে চলা ফেনিল নদীগুলোর দূরাগত কুহক-জলতান, কিংবা, পেঁজা তুলোর মত ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে এগিয়ে চলা সেই স্বপ্নপথ... তাতে যে না পা রেখেছে, কাছ থেকে না দেখেছে, তাকে শুধুমাত্র কয়েকটি দীন শব্দের আশ্রয়ে কিছুতেই বোঝানো যাবে না, কেন 'চেরাপুঞ্জি'-র সৌন্দর্য্য আজও অপার্থিব... বর্ণনাতীত!




এ' হেন চেরাপুঞ্জির পথে আমাদের প্রথম দ্রষ্টব্য স্থান ছিল 'ডোয়াং সিন্ সিউয়েম ভিউ পয়েন্ট' (Duwan Sing Syiem View Point বা Mawkdok Dympep Valley View Point)।

Duwan sing syiem view point.
এটি খাসি আর জয়ন্তিয়া-এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী, ইংরেজি 'ভি'আকৃতির নয়নাভিরাম এক উপত্যকা, যেটি 'ডোয়াং সিন্ সিউয়েম'- ব্রিজের বাঁদিকে পড়ে।

ডোয়াং সিন্ সিউয়েম হল ইংরেজি 'ভি'আকৃতির নয়নাভিরাম এক উপত্যকা।
এই ব্রিজ শিলং-এর সঙ্গে চেরাপুঞ্জিকে সংযুক্ত করেছে। খানিক মেঘ, কুয়াশা আর রোদের অদ্ভুত এক খামখেয়ালি চলাচলে সেজে থাকা এই 'সবুজে সবুজ' উপত্যকাটিতে কিছুটা সময় কাটিয়ে এগিয়ে চললাম সামনে।




এবারের দ্রষ্টব্য, 'Kynrem falls'। প্রকৃতি সত্যিই যে কতটা অসীম শক্তিধর, কতটাই ভয়ঙ্কর সুন্দর, এই জলপ্রপাতের সামনে এসে না দাঁড়ালে, বিশ্বাস কিছুতেই নিশ্চিত হয় না!

Kynrem waterfalls যাবার পথে...
শরতকালীন তুলনামূলক কম বৃষ্টির দিনেই যে জলপ্রপাত এতটাই বিপুলা, ভরা বর্ষায় তার রূপ যে কি ভয়াল-সুন্দর হয়ে উঠতে পারে, আমি ভেবেই শিউরে উঠেছি!

Kynrem falls অভিমুখে।

Kynrem falls.


পরে বাড়ি ফিরে, ইউটিউব ভিডিও মারফত আমার এই কৌতূহলটুকুও পরোক্ষভাবে নিবৃত্ত করেছি। জলপ্রপাতটির সে রূপের নাম আমার বিচারে একমাত্র 'প্রলয়'-ই হতে পারে।

ভরা বর্ষায় Kynrem falls, যে রূপের একমাত্র ডাকনাম 'প্রলয়'-ই হতে পারে। (ইউটিউব থেকে সংগৃহীত ছবি।)
এগিয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যে। 'নোহ্ কা লিকাই জলপ্রপাত' (NohKaLikai Falls) ।

'নোহ্ কা লিকাই জলপ্রপাত'-এর অভিমুখে।
প্রথমেই বলি, এই জলপ্রপাত অভিমুখে যাওয়ার সেই ঢেউখেলানো পথটি যেন প্রকৃতিদেবীর নিজের হাতেই আঁকা নিখুঁত এক পটচিত্র, যার দু'পাশে ধোঁয়া ধোঁয়া খন্ড মেঘের অবাধ চলাচল। এ' পথে যতই এগোনো যায়, অস্তিত্ব ততই যেন মেঘের আদরে সাজে!

'নোহ্ কা লিকাই' যাবার পথে একটি গ্রাম্য পথ।

'নোহ্ কা লিকাই' যাবার পথে কাশফুল।
যতই চলি, ততই ধীরে ধীরে সকালের সেই রোদ্দুর আর রঙিন কাচের রঙখেলার সবটুকু না দেখতে পাওয়ার দুঃখ ভুলি। মুগ্ধ মন নিরুচ্চারে একটাই প্রার্থনা করে চলে, এই পথ না ফুরাক... এই গন্তব্য শত আলোকবর্ষ দূরের হোক!
নোহ্ কা লিকাই প্রপাতে যখন সত্যিই এসে পৌঁছলাম, আমাদের চারিধার তখন সম্পূর্ণভাবে মেঘের আবরণে ছেয়ে গেছে। একেবারে আক্ষরিক অর্থেই রহস্যময় সে পরিবেশ! দু' হাত দূরের কোনো কিছুও যেন ঠিকমতো ঠাওর হচ্ছে না তখন!

ঘন মেঘে ঢাকা রাস্তা।
সাদা ঘোলা ঘোলা ধোঁয়ার স্তরে ঢাকা চারপাশে সন্তর্পণে পা ফেলে ফেলে, রেলিং দেওয়া খাদের একদম ধারে এসে অবশেষে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়েই রইলাম বেশ কিছুক্ষণ! খুব মিহি বৃষ্টিরেণু মুখে, গায়ে স্পর্শ বোলাচ্ছে; কিন্তু ভিজিয়ে দিচ্ছে না। রেলিঙের ওপাশে চাপ চাপ কুয়াশা, গা ছমছমে গভীর খাদ, খাদের বুক জুড়ে সবুজে ঠাসা বন আর স্তরে স্তরে মেঘরাজি। আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না।

নোহ্ কা লিকাই'-এ রেলিঙের ধারে। মেঘে ঢাকা আমি।
শুধু জলধারার একটা টানা, চাপা অথচ গভীর শব্দ কানে ভেসে আসছে। বেশ বুঝতে পারছি, মেঘের আস্তরণটুকু একবার সরে গেলেই জলপ্রপাতের রপোলি জলরেখাকে তক্ষুণি দেখতে পাবো, যার ঝরে পড়ার অবিশ্রান্ত আওয়াজ এতক্ষণ ধরে শুনে চলেছি!
'নোহ্ কা লিকাই'-কে দেখতে আমাদের মতো আরো অনেক পর্যটক দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন সেদিন। ইস্ট খাসি হিলের রংযাইরতেহ গ্রামের এই জলপ্রপাতের অপরূপ দৃশ্যের টানে প্রতি বছরই ভিড় জমান বহু পর্যটক৷ একক ধারার এই জলপ্রপাতটি উচ্চতার নিরিখে ভারতের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত (উচ্চতায় প্রায় ১,১২০ ফুট) এবং পৃথিবীর মধ্যে এটি চতুর্থতম। সেইসঙ্গে এটি প্রাকৃতিকভাবে উৎসারিত মেঘালয়ের একটি অতি প্রাচীন অত্যাশ্চর্য প্রপাত-ও বটে!

নোহ্ কা লিকাই' জলপ্রপাত। (নেট থেকে সংগৃহীত ছবি।)
তাই একে দেখার জন্যে প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করলাম, যদি আবহাওয়া একটু সদয় হয়। কিন্তু, নাহ্! 'নোহ্ কা লিকাই' মেঘের ওড়নায় নিজের মুখ সেই ঢেকেই রইলো। কি জানি তার কিসের এতো অভিমান!
শেষমেশ, মেঘময়, শব্দে প্রখর, 'নোহ্ কা লিকাই'-কে বিদায় জানিয়ে আবার গাড়িতে উঠলাম। দুঃখিত হই নি। কারণ, প্রাকৃতিক বিষয়গুলোকে এমনই খামখেয়ালিপনার হাতে ছেড়ে রেখেই সুখ। দার্জিলিং পৌঁছলেই যেমন 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' দেখতে পাওয়া যাবেই, এমন হলপ করে বলা যায় না, মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির দ্রষ্টব্য স্থানগুলোও অনেকটা তেমনই। তাই অতি হিসেবীমনেদের এই নিরালা মেঘবাড়ির দেশটায় তেমন একটা কাজ নেই। বরং, এই যে মেঘের এতো প্রাবল্য, মেঘতুলোদের হাতের মুঠোয় ধরতে চাওয়ার অপচেষ্টা, কিংবা মেঘের কারণে সম্পূর্ণ অপসৃত হয়ে পড়ার অভূতপূর্ব এক মজা, এমন অভিজ্ঞতাও তো জীবনে এই প্রথমবার! সেও তো এক প্রাপ্তি!

রেলিং-এর ওধারে ঘন মেঘে ঢাকা 'নোহ্ কা লিকাই' জলপ্রপাত।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Thangkharang Park। সে পথে যেতে যেতে, অরুণজ্যোতির মুখে 'নোহ্ কা লিকাই' প্রপাতের নামকরণের বৃত্তান্তটিও শুনে নিলাম। স্থানীয় খাসি ভাষায় 'নোহ্ কা লিকাই' নামের অর্থ 'লিকাইয়ের লাফ'। এই নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে আরো একটি দুঃখজনক জনশ্রুতি। খাসি জনগোষ্ঠী মূলতঃ মাতৃতান্ত্রিক। এই সমাজব্যবস্থার নিয়মকানুন ঠিক আমাদের উল্টো। এখানে বিয়ের পর সাধারণত স্বামীই ঘরকন্না করতে চলে আসেন স্ত্রীর বাড়ি৷ স্বামীই ঘরের যাবতীয় কাজ সামলান। আর, অর্থ উপার্জনের দিকটি মূলতঃ সামলান বাড়ির মহিলারা৷ খাসি সমাজের এই নিয়ম মেনে শুরুতে বেশ সুখেই কাটছিল রংযাইরতেহ গ্রামের নবোঢ়া যুবতী লিকাইয়ের দিন ৷ তবে সে সুখ সইলো না বেশিদিন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে লিকাই স্বামীহারা হল৷ একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে শুরু হল তার বৈধব্যজীবন৷ অর্থ উপার্জনের জন্য জঙ্গলে কাঠ বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে যোগ দেয় এবার লিকাই৷ এরই মধ্যে এক স্থানীয় যুবক লিকাই-কে দ্বিতীয়বার বিয়ের প্রস্তাব দেয়৷ কিন্তু শিশুকন্যার ভবিষ্যতের কথা ভেবে, যথারীতি দ্বিতীয়বার আর ঘর বাঁধতে রাজি হয়নি লিকাই৷ কিন্তু সেই যুবক নাছোড়বান্দা। লিকাই-কে পাওয়ার জন্য পারে না, হেন কাজ তার জীবনে নেই। লিকাই-কে নতুন সংসারের স্বপ্নে বিভোর করে তুলতে তাই আপ্রাণ চেষ্টা চালায় সেই প্রেমিক যুবক৷
প্রেম ভীষণ বস্তু!
শেষমেশ রাজি হয়ে গেল লিকাই৷ আবার বিয়ে হল৷ সামাজিক রীতি অনুযায়ী লিকাইয়ের বাড়িতে এসে সংসার করতে শুরু করল সেই যুবক৷ দিনে লিকাই কাজ করে৷ তখন মেয়েকে সামলায় ওই যুবক৷ রাতে বাড়ি ফিরে মেয়েকে নিয়ে সময় কাটতে থাকে লিকাইয়ের৷
প্রথম কয়েকদিন ভালই কাটল ওদের৷ কিন্তু ক্রমশঃ তাদের দাম্পত্যসুখে ঐ শিশুকন্যাটিই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ালো। কেননা, লিকাই নতুন স্বামীর চেয়ে শিশুকন্যার প্রতিই বেশি মনোযোগী। স্ত্রীকে একা চেয়েও পাশে পায় না তার দ্বিতীয় স্বামী৷ শুরু হয় তিক্ততা। শিশুটি রীতিমতো চক্ষুশূল হয়ে ওঠে তার সৎ পিতার। কঠিন আক্রোশ তৈরি হয় সেই যুবকের৷ লিকাই কাজে বের হলেই ঐটুকু দুধের শিশুর ওপর শুরু হল অযত্ন, অকথ্য অত্যাচার... বেধড়ক মারধর। লিকাই ফিরে এলে সেই অত্যাচারী যুবক তুখোড় অভিনয় জুড়তো। ফলে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা লিকাই তার কষ্টকল্পনাতেও আন্দাজ করতে পারে না।
তবুও চলছিল একপ্রকার।
একদিন কাজ থেকে ফিরে লিকাই তার সন্তানকে আর খুঁজে পেল না। সারাদিন হন্যে হয়ে খুঁজেও না। উদ্বিগ্ন, পরিশ্রান্ত, কেঁদে আকুল মা-কে তার সেই দ্বিতীয় স্বামীই পরম মমতায় খাইয়ে দেয় নিজের হাতে রান্না করা মাংস, ভাত। খাওয়া শেষে পান সাজতে বসেই ঘটে বিপত্তি। পানের বাটায় উদ্ধার হয়, একরত্তি শিশুকন্যার একটি কাটা আঙুল। পুরো বিষয়টি এবার জলের মতোই পরিষ্কার হয়ে যায় লিকাইয়ের কাছে। সংজ্ঞা হারায় লিকাই।
বেগতিক দেখে ইতিমধ্যেই বাড়ি ছেড়ে পালায় লিকাইয়ের দ্বিতীয় স্বামী৷ পাহাড়ের কোল থেকে তাকে খুঁজে বের করে গ্রামবাসীরা৷ নিজের মুখে এবার লিকাইয়ের স্বামী স্বীকার করে, কেবলমাত্র আক্রোশের বশেই মেয়েকে খুন করেছে সে। আর মৃত বাচ্চার হাড় ফেলে দিয়েছে ওই ঝরনায়৷ রাগের বশেই মেয়ের মাংসই মাকে রান্না করেও খাইয়েছে সে৷ তবে অসাবধানে বাচ্চার আঙুলটা ফেলতে ভুলে যায়। তাই লিকাই সবটা ধরে ফেলেছে৷ একথা শুনে শোকে পাথর হয়ে যায় সন্তানহারা মা৷ দৌড়ে ছুটে যায় সে ঐ ঝর্ণার কাছে। সেখান থেকেই ঝাঁপ দেয় লিকাই৷ আর কোনোদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি পরে৷ সেই থেকে লিকাইয়ের স্মরণে ওই ঝরনার নাম হয়েছে নোহ্ কা লিকাই৷ স্থানীয়রা মনে করে, ঐ ঝর্ণার জলেই আজও মিশে আছে লিকাই।
এই জনশ্রুতির ঐতিহাসিক সত্যতা জানা নেই। তবুও মনটা ভারিই হল। 'নোহ্ কা লিকাই' - কেন এতো অভিমানী, হয়তো অনুভব করলাম কল্পনায়।
চেরাপুঞ্জির নাম না জানা গ্রাম্য পথ ধরে কিছুদূর চলে, অরুণজ্যোতি এবার পৌঁছে দিলো 'থ্যাঙ্কারাং পার্ক'।

Thangkharang Park.
এটি প্রপার চেরাপুঞ্জি থেকে ১২ কিলোমিটার মতো দূরে 'কোহ্ রামহা' পাহাড়ের ওপর গড়ে উঠেছে। পার্কটি প্রায় একশো একর জমির ওপর খুবই যত্নের সঙ্গে সজ্জিত এবং রক্ষিত।
এই পার্কে রকমারি গাছ। খুব শান্ত, স্বর্গীয় পরিবেশ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে, এখানকার অর্কিড আর প্রজাপতির সংগ্রহ! আর পুরো পার্ক জুড়ে শিশিরভেজা এক কর্পূর কর্পূর গন্ধ! পুরোটাই অকৃত্রিম... বড় পবিত্র!




এদিনের শেষ দ্রষ্টব্য স্থানটি ছিল 'মৌসমাই গুহা'।এটি সোহরার মৌসমাই গ্রামের এক অতি সুপ্রাচীন প্রাকৃতিক গুহাঞ্চল, যার পুরোটাই চুনাপাথর দিয়ে তৈরি।

মৌসমাই গুহা।

এই গুহাটি অবশ্যই দর্শনীয়, কারণ এর আভ্যন্তরীণ দেওয়ালে জীবাশ্মের দেখা মেলে। গুহাটির পরিবেশ যথেষ্ট নিরাপদ। সেই কারণে স্থানীয় গাইড ছাড়াও এই গুহাটিকে স্বচ্ছন্দ্যে-ই ঘুরে দেখা যায়। তবে গুহার সম্পূর্ণ এলাকার মাত্র দেড়শো মিটার-ই পর্যটকদের জন্যে উন্মুক্ত।

মৌসমাই গুহার প্রবেশমুখ।


মৌসমাই গুহার ভিতরে।
এই গুহা পরিদর্শন শেষে, চেরাপুঞ্জির সারি সারি চুনাপাথরের টিলা আর ছোট ছোট পাহাড়কে পাশ কাটিয়ে যখন শিলং ফিরছি, তখন আকাশে আরেক দিনের সূর্যাস্ত!

চেরাপুঞ্জি থেকে ফেরার পথে সূর্যাস্ত।
দিনান্তের সোনারঙ চুনাপাথরের গায়ে প্রতিফলিত হয়ে তপ্ত সোনার মতোই কেমন চকচক করছে! মৌসমাই কেভের বাইরে দুজন স্থানীয় যুবক গীটার হাতে সাউন্ড অ্যারেঞ্জমেন্ট সহকারে গান শোনাচ্ছিল পর্যটকদের। ফিরতি পথে সেই আঞ্চলিক সুরটুকু কানে বেজেই চলেছে তখন। সে গানের ভাষা বুঝি না। কিন্তু সুরে আমাদেরই এক সুপরিচিত গানের ছায়া...
"ডুবাইতে মন ভাইসা যায় রে,
ভাসাইলে মন ডুবে –
পশ্চিমে হারাইলাম যারে,
পাইলাম তারে পূবে..."
সুর কি করে যেন মাটির বিভেদকে গুলিয়ে দেয়!
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল ও লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: শিক্ষিকা ও লেখক।