প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

কৈলাস শঙ্খলাঃ ভারতের ব্যাঘ্র-মানব



অমিত শঙ্খলা


"বাঘকে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষণ করা যায় না এবং যদি তাকে বাঁচতে হয় তবে তার সমগ্র আবাসস্থলটিকেও বিশেষভাবে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ভাগ করে সংরক্ষণ করতে হবে। এটাই আমরা করেছি, এবং এখনও আমাদের ব্যাঘ্র অভয়ারণ্যগুলির ক্ষেত্রে করছি... আমার কার্যকালে ফরেস্ট সার্ভিসে থাকাকালীন আমি কখনই আফসোস করিনি। ফরেস্ট সার্ভিসের শতাব্দী-প্রাচীন ঐতিহ্যের সংরক্ষণ করাকালীন...। আমি 'প্রজেক্ট টাইগার'-এর প্রথম নির্বাহী পরিচালক হিসাবে কাজ করতে পেরে গর্বিত এবং আমি এটা দেখে খুশি যা আমার বর্ণনার অতীত, যে এ'জীবনে বাঘ বাঁচানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার পূর্ণ হয়েছে... আমার সমগ্র জীবন তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ হয়েছে... আমার পুরো জীবনটাই ছিল একটি ব্যাঘ্র প্রকল্প, এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি হল 'প্রজেক্ট টাইগার'-এর জন্ম।"

কৈলাশ শঙ্খলা (জন্ম: ১৯২৫ - মৃত্যু: ১৯৯৪), 'ভারতের টাইগার-ম্যান' নামে যিনি সর্বাধিক পরিচিত, ছিলেন একজন সংরক্ষণবিদ এবং 'প্রজেক্ট টাইগার'-এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক। তিনি ভারতে বন্যপ্রাণীদের মধ্যে বিশেষ করে ব্যাঘ্র সংরক্ষণে গতানুগতিকতার (জোয়ারের) মোড় ঘুরিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৫০ সালে রাজস্থানের যোধপুরের যশবন্ত কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৫৩ সালে দেরাদুনের ইন্ডিয়ান ফরেস্ট কলেজ থেকে বনবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভের পর, কৈলাশ শঙ্খলা, ১৯৫৭ সালে ভারতীয় বন পরিষেবা (Indian Forest Service)-তে যোগদান করেন। তিনি তাঁর কর্মজীবন নির্বাহী বন সংরক্ষক (Executive Conservator of Forest) হিসেবে শুরু করেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি 'দিল্লি জুলজিক্যাল পার্ক'-এর অধিকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ক্রমে ভারতের অন্যতম সেরা 'চিড়িয়াখানাপ্রেমী মানুষ' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

শঙ্খলা নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত 'ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ কনজারভেশন অফ নেচার অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস' (আইইউসিএন)-এর [International Union of Conservation of Nature and Natural Resources - IUCN] দশম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন এবং সেখানেই 'দ্য ভ্যানিশিং টাইগার' শিরোনামের একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছিলেন যা উপস্থিত প্রতিনিধিদের ভিতর বিড়াল জাতীয় প্রাণীদের মধ্যে বাঘের বিলুপ্তির আশংকাজনক সতর্কবার্তা উন্মোচিত করেছিল এবং সংরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে আইইউসিএন-এর 'রেড ডেটা বুক'-এ বাঘকে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর এই প্রস্তাব অপ্রতিরোধ্য করতালি ও সমর্থনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ফলস্বরূপ, 'ইন্ডিয়ান বোর্ড অফ ওয়াইল্ডলাইফ' (Indian Board of Wildlife) দ্বারা ১৯৭০ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ভারতে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১লা এপ্রিল ইন্দিরা গান্ধীর উদ্যোগে ভারত সরকার কর্তৃক 'প্রজেক্ট টাইগার' প্রকল্প চালু করা হয়েছিল, ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন (Wildlife protection act 1972)-এর অধীনে, যার আওতায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নয়টি ব্যাঘ্র অভয়ারণ্য স্থাপন করে সেগুলিকে যুক্ত করা হয়েছিল। উত্তরাখণ্ডের 'জিম করবেট জাতীয় উদ্যান' থেকে 'প্রজেক্ট টাইগার' চালু হয়। কৈলাশ শঙ্খলাকে এর অধিকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি প্রকল্পটিকে দৃঢ় পদক্ষেপে চালনা করে প্রকল্পটিকে সফল করার মাধ্যমে ভারতীয় বাঘের উদ্বর্তন নিশ্চিত করেন।

১৯৭৩ সালে যখন কৈলাস শঙ্খলা 'প্রজেক্ট টাইগার'-এর অধিকর্তা নিয়োজিত হন, তখন ভারতের বনাঞ্চলে ৩০০টিরও কম বাঘ ছিল। "কিছু কোরো না এবং কাউকে কিছু করতেও দিও না।" - প্রজেক্ট টাইগারের প্রথম অধিকর্তা কৈলাস শঙ্খলা বাঘ সংরক্ষণে তাঁর এই 'কিছু কোরো না' ধারণা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাঁর নীতি ছিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় কেউ হস্তক্ষেপ করবে না এবং একান্তই যদি করতে হয় তাহলে তিনি 'ন্যূনতম মানুষের হস্তক্ষেপ' নিশ্চিত করবেন। প্রজেক্ট টাইগারের অধিকর্তা হিসেবে সাফল্যের সাথে তাঁর মেয়াদ শেষ করার পর, শঙ্খলা ১৯৭৮ সালে রাজস্থানে ফিরে আসেন এবং ১৯৮৩ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত রাজস্থানের মুখ্য বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন (Chief Wildlife Warden) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালে, তিনি রাজ্যের অনেক অভয়ারণ্যর সাথে বিখ্যাত রণথম্ভোর, কেওলাদেও ঘানা (ভারতপুর) এবং ডেজার্ট ন্যাশনাল পার্ক প্রতিষ্ঠা করেন।


ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কৈলাস শঙ্খলা।


করবেট জাতীয় উদ্যানে 'প্রজেক্ট টাইগার' প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠান।

১৯৮৪-৮৫ সালে তিনি ভারত সরকারের পরিবেশ বিভাগের হয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের 'সুরক্ষিত এলাকা'র পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন এবং পরবর্তীতে (১৯৮৫-৮৭) রাজস্থানের জয়সলমির-এ 'ডেজার্ট বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ'-এর ম্যানেজমেন্ট ডকুমেন্ট তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। এছাড়াও তিনি 'টাইগার ট্রাস্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি এবং চেয়ারম্যান ছিলেন, এছাড়াও ছিলেন রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের সদস্য। ভারতের 'বিষ্ণোই জীব রক্ষা কমিটি'র প্রদেশ সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

কৈলাশ শঙ্খলা আজীবন একজন গবেষক এবং ভারতের বন্যপ্রাণী বাস্তুশাস্ত্র এবং পরিবেশ সংক্রান্ত বহু প্রবন্ধের লেখক ছিলেন। তাঁর রচিত বই 'টাইগার! দ্য স্টোরি অফ ইন্ডিয়ান টাইগার' (১৯৭৮) ভারতে বাঘের উপর সবচেয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত বইগুলির অন্যতম হিসাবে বিবেচিত, যেটি পরবর্তীতে একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল: 'ওয়াইল্ড বিউটি: এ স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ' (১৯৭৩), 'টাইগারল্যান্ড' (১৯৭৫), 'গার্ডেনস অফ গড: দ্য ওয়াটার বার্ড স্যাঙ্কচুয়ারি অ্যাট ভরতপুর' (১৯৯০) এবং 'রিটার্ন অফ দ্য টাইগার' (১৯৯৩)। তিনি একজন অসামান্য বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ছিলেন এবং তাঁর সময়ের সবচেয়ে উদ্দীপক ও আকর্ষক বেশকিছু বন্যপ্রাণের ছবি তুলেছিলেন।

১৯৯৩ সালে ভারতের কানহা ন্যাশনাল পার্কে রাজকীয় সফরের সময় সুইডেনের রাজা ও রাণীর জন্য সফরসঙ্গী প্রকৃতিবিদ হিসেবে কৈলাশ শঙ্খলা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ভারত সফরকালে প্রিন্স ফিলিপস, এডিনবার্গের ডিউক, ভুটানের রাজা, ভারতের রাষ্ট্রপতি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী সহ অন্যান্য অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সফরসঙ্গী ছিলেন কৈলাশ শঙ্খলা।


প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাত থেকে 'পদ্মশ্রী' সম্মান গ্রহণ করছেন কৈলাস শঙ্খলা।

শঙ্খলা ছিলেন প্রথম অসামরিক কর্মচারী যিনি ১৯৬৯ সালে ব্যাঘ্র অধ্যয়নের জন্য 'জওহরলাল নেহেরু ফেলোশিপ' পেয়েছিলেন। তিনি ভারতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১৯৬৫ সালে রাজস্থান সরকার কর্তৃক প্রদত্ত 'বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য মেরিট' পুরস্কার, পুনরায় ১৯৮২ সালে রাজস্থান সরকারেরই দেওয়া 'অসামান্য এবং মৌলিক কাজের জন্য মেরিট' পুরস্কার, ১৯৯২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত 'পদ্মশ্রী' সম্মান। ২০১৩ সালে রাজস্থান সরকার তাঁকে মরণোত্তর 'রাজস্থান রত্ন' পুরস্কার প্রদান করে।

তাঁর অমূল্য সংগ্রহ সম্পর্কে

একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সংরক্ষণবাদী, বন অধিকর্তা, পণ্ডিত এবং গবেষক, কৈলাশ শঙ্খলার লেখা কাগজের সমৃদ্ধ সংগ্রহ, বিশেষ করে তাঁর অপ্রকাশিত বইয়ের পাণ্ডুলিপি, প্রকাশিত বইয়ের খসড়া পাণ্ডুলিপি, ফিল্ড নোট, ডায়েরি, হাজারখানেক ফটোগ্রাফিক স্লাইড সহ ভারতের বন্যপ্রাণীর সুন্দর প্রতিকৃতি, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র আগ্রহী সমস্ত পণ্ডিত এবং গবেষকদের জন্য একটি অমূল্য ভান্ডার গঠন করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে সংরক্ষণ নীতি এবং বাঘ সংরক্ষণ, বাঘের পরিবেশবিদ্যা, বাঘের প্রাকৃতিক ইতিহাস, রাজস্থানের বন্যপ্রাণী এবং ভারতে প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে প্রভাবিত করে এমন অন্যান্য বিষয় যারা অধ্যয়ন করতে চান তাদের কাছে এ এক হীরকখনি।

[২০২১ সালে এই নিবন্ধটি লিখেছেন কৈলাশ শঙ্খলার সুযোগ্য পুত্র অমিত শঙ্খলা।]

(ছবি সৌজন্যঃ টাইগার ট্রাস্ট)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।

পরিচিতি: বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও ব্যাঘ্র সংরক্ষক।