গল্প

এক বোকা মানুষের গল্প



স্বপন মজুমদার


কেউ কি ডেকেছিল আমাকে? কেউ একজন অথবা আরও কয়েকজন? অদ্ভুত, তা না-হলে আমি দরজায় কেন। দরজায়, মানে গ্রিলের গেট ধরে। কাঠের দরজা খুলে তারপর গ্রিলের গেট। মানে ডাবল প্রোটেকশন। গ্রিলের গেটেও তালা আছে। সেটা যেমন লাগানো হয়েছিল তেমনই ঝুলছে। দরজাটা খোলা ছিল। কে খুলল? আমি খুলিনি। দরজাতেও তালা আছে। অদ্ভুত তো! শুতে যাবার আগে সে-সব বন্ধ করা হয়। আমি শুয়ে পড়েছিলাম। এখন রাত্রি ঠিক একটা। ঘাড় ঘুরিয়ে বারান্দার ঘড়ি দেখলাম আমি। হ্যাঁ, ঠিক একটা। তাহলে? নিশ্চয়ই আমি রোজের মতো দরজায় তালা দিয়ে শুতে গিয়েছিলাম। আবার এ-ও হতে পারে আমি বারান্দায় ছাদে ওঠার সিঁড়িতে বসে ছিলাম। কেউ বা কারা এসেছে, ডেকেছে আমাকে আর আমি উঠে এলাম। কিন্তু চাবি কোথায়? একছড়া চাবি। সেটা কি বালিশের নিচে? তা হলে তো প্রমাণ হয় আমি শুয়ে পড়েছিলাম। আচ্ছা, মনে পড়ছে আমার, আমি ঘুমন্ত অলোকার ঠোঁটে, একটু-বা প্রস্ফুটিত ঠোঁটে আলতো করে আমার ঠোঁট ছুঁইয়েছিলাম। হ্যাঁ, আলতো করে। কারণ অলোকা জেগে উঠলে রাগ করত। সে-রকম সম্পর্ক আর নেই। কত বছর কি জানি! সময় জানে। এক রকম স্রোতে ভেসে চলি আমি। সময়ের স্রোতে অস্তিত্বহীন, বোধহীন। আমার কিছু করার থাকে না। কে যেন আমাকে চালায়। নিয়তি হতে পারে। 'নিয়তি' শব্দটা বেশ। জন্মান্তরীণ শুভাশুভ কর্মের পরিণাম। তা হলে অপরিহার্য ঘটনা? অদৃষ্ট! এত কিছু ভাবার কারণ আছে। কিন্তু আমাকে কেউ বা কারা ডেকেছে। না হলে আর আমি এখানে এলাম কী করে। আমি তো শুয়ে পড়েছিলাম। ঐ যে, মনে আছে আমার, অলোকার প্রস্ফুটিত ঠোঁটে –। কেউ কিছু বলছে। হ্যাঁ, কে? কী বলছেন?

"রাত্রি কত হল?"

"তা হল। তাতে আপনার কী?"

"তোমাকে এই কথাই মনে করিয়ে দিতে চাই। মনে আছে, সময়?"

"আচ্ছা, কাল আমার অফিস আছে তো না-কি?"

"আর! রাখ তোমার অফিস। তোমার মাথা খারাপ। তাই তোমার চাকরি আর নেই। কী করে ভুলে যাও এত বড় ব্যাপারটা।"

"ও, আচ্ছা, আমার চাকরিটা আর নেই।"

তখন আমার মনে পড়ছে, একটা রাস্তা, সেই রাস্তা থেকে ডান দিকে আবার একটা রাস্তা চলে গেছে। এবার ডানদিকে যে কোণটা প্রথমে তৈরি হল, সেখানে একটু সরে একটা গাবগাছ। একটু উঁচুতে বড় বড় শির তোলা পাতা, উপরে সবুজ, পিছনে তামাটে। অদ্ভুত এই, ঘন পাতার আড়ালে শুধুই অন্ধকার। এমনিতে গাবগাছে আমার ভীষণ ভয়, আর কী না আমাকে গাবগাছের সঙ্গে কে বা কারা বেঁধে রেখেছে। আমার ডাইনে-বাঁয়ে রাস্তা। হেঁটে যাচ্ছে-আসছে কত লোক। সাইকেলের ঘন্টা বাজিয়ে, বাইক চালিয়ে যাচ্ছে-আসছে কত লোক। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলছে না। আমাকে কোনওরকম সাহায্য করছে না । মূর্খ, অপদার্থের দল ভাবতে চাইছে না আমি পাগল না। আমি কোনও পাপ করিনি। বরং যারা মানসিক রুগি লাঠি দিয়ে আমাকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে। আমার কষ্ট ওদের মজার কারণ। আবার আরও এক নীচ লোক ক্যামেরা এনে ভিডিও করে নিল সব। সব আমাকে না-জানিয়ে লুকিয়ে। কেউ মোবাইলেও তুলে রাখল আমার কণ্ঠস্বর। তখন আমি গান গাইছিলাম, কর্ণ-কুন্তি সংবাদ পাঠ করছিলাম। গাছটার সঙ্গে বেঁধে রেখে কেউ আমাকে সেরকম নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল। আসলে সে-সব শুধুমাত্র নির্দেশ ছিল না, আতঙ্কের কারণ ছিল। আমি জানতে পারিনি ক্যামেরা চলছে। আমি তাদের ঘৃণ্য আচরণের প্রতিবাদ করেছিলাম। এরপর মুহূর্তে সব ভাইরাল। আমার আবেগ, আমার ভালবাসা – সব মিথ্যে হয়ে গেল!

পথ দিয়ে মানুষ চলে যায়। কেউ কথা বলে না। মানুষের ভিড়ে আমি একা। মোবাইলের রিংটোন শুনে অস্থির হয়ে ধরি, শুধু কোম্পানি, শুধু বিজ্ঞাপন। মূর্খরা বোঝে না একটা ছবির কতখানি সত্যি। ছবির পিছনে ছবি থাকে। উদ্দেশ্য-বিধেয় থাকে। ভাবেনা কেউ।

কিন্তু এ-ও সত্যি আমার খুব হাসি পায়। মন্দ লাগছে না আমার। এক দিকে অসহায় একাকিত্ব, অন্য দিকে নিবিড় নিঃসঙ্গতা । আমি উপভোগ করি সে-সব। বেশ একটা ঋষিসুলভ ভাব আসে। অনেকটা সময় পড়াশুনোয় ব্যয় করতে পারছি। বরং মূর্খদের ডানা ঝাপটানো দেখতে দেখতে ক্লান্ত লাগে। আবার নিজেকে খুঁজে পাবার এরকম মুহূর্তগুলি হারাতে ইচ্ছে করে না।

মূর্খ মানুষ নিজেকে তৃপ্ত করতে করতে অপরকে পাগল দেখতে বেশ পছন্দ করে। না, আমি পাগল না। জনে জনে এ-কথা প্রচারের কোনও কারণ দেখি না আমি। আমার ভালবাসার, আবেগের মূল্য কোথায়! এই জায়গাটাতে হোঁচট লাগে আমার। তাই কখনো কখনো আত্মহত্যার কথাও ভাবি আমি।

আসলে, হয়েছে কি বাড়িতে এক মহিলা এসেছিলেন। তিনি বেশ সুন্দরী। আমার স্ত্রী, মানে অলোকা, অলোকা বলাই ভাল। সেও সুন্দরী। তবে ঐ মহিলা বেশ একটু তাজা। মানে আলো ছড়ান তিনি। সঙ্গে আলোর প্রভা নিয়ে বেড়ান। যাই হোক, তিনি, মানে প্রভা, প্রভা আমার দেয়া নাম, আমি তাঁর নাম জানি না, এই প্রথম বোধহয় এলেন আমাদের বাড়িতে। এসেছেন তিনি ঠিক সন্ধ্যের আগে। সবার জন্য আমি তাই চা করতে উঠলাম। লকডাউনের পর থেকে আমিই চা করে থাকি। আসলে চাকরি নেই তো। অলকাই বা ছাড়বে কেন? ব্যাপারটা তো এই রকম, প্রত্যেক সংসারেই একটা নিয়ম আছে, হয় টাকা আনো নয় ঝুল ঝাড়ো, বাসন মাজো, ঘর মোছ ইত্যাদি আর কী। ভদ্রমহিলা চা মুখে দিয়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, "আহ, কী ভালো চা করেছেন আপনি! এরকম একটা বর পেলে–!"

"হ্যাঁগো, আলোদি", তাঁকে থামিয়ে বলে ওঠে অলোকা।

আমি লাফিয়ে উঠি। ভাবি, দ্যাখো কান্ড, আমি প্রায় ঠিক নামই দিয়েছিলাম।

"তোমার মেয়ে কি এখন নিউজার্সিতে আছে?"

আলোদি একগাল হেসে বললেন, "হ্যাঁ, বড় ভালো আছে ওরা। আসলে কী বলব, ওসব দেশ একদম আলাদা ভাই।"

"তা যা বলেছেন। আমাদের দেশে কী যে এক রাজত্ব এল!"

আমার বলতে ইচ্ছে করল, হ্যাঁগো, ক'বার গেছ নিউজার্সিতে?

কিন্তু কী আর বলব, ভদ্রমহিলা, না, আলোদি হয়তো আরও কিছু বলতেন। "ভারি মিস্টি আপনার বরটা!" – এরকম কিছু আর কি। সঙ্গে সঙ্গে নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করল আমার। বললাম মনে মনে, শালা হারামি, ভুলে গেছ সব, গাবগাছে জড়িয়ে তুমি। আর ওদিকে এক শুয়োরের বাচ্চা ক্যামেরা চালাচ্ছে!

না-না, একদম ভুলিনি। বাকি জীবনে কোনও মহিলার ধার-কাছে নেই আমি। বললাম আমি নিজেকেই। বরং কাপ-ডিশ নিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি।

অলোকা চেয়ারে বসে খাটের কিনারে পা তুলে বসে। এভাবে টিভি দেখতে আরাম পায় ও। আলোদি খাটের পিছনদিকে পা মুড়ে বসেছেন। যার যা-তে আরাম হয় আর কি।

বাইরের বেসিনে কাপ-ডিশ ধুয়ে ঝাকাতে রেখে আমি বিড়ি খাবার কথা ভাবছিলাম। আমি ঘেরা বারান্দায় যেখানে ঢুকেই বাঁ-দিকে দরজা, ভিতরের ঘরে যাবার। যেখানে ওরা বসে। আমি এও ভাবছিলাম বিড়িটা নিচে খাওয়া ঠিক হবে না। আলোদি গন্ধ পাবেন, সেটা বিচ্ছিরি হবে।

এদিকে অলোকা একটা মোক্ষম ভুল করে ফেলল। দীর্ঘ দিন আমরা এক ছাদের নীচে। মানে একত্রে আছি। পরস্পরকে জানা-বোঝা কম-বেশি তো থাকবেই। অলোকা নির্ঘাৎ ভেবেছিল আমি ছাদে উঠে গেছি। কিন্তু না, আমি তো দরজার পাশে বারান্দায়।

আলোদি বললেন, "পুজোয় বেড়াতে যাচ্ছ?"

বোঝো, অতিমারির দীর্ঘ উপদ্রব গেল, লকডাউন গেল, শালা কাজকম্ম নেই বেড়াতে যাচ্ছি! – মনে মনে বললাম আমি।

অলোকা আলোদির কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বলে উঠল, "শোন আলোদি, একটা কথা বলি, ও নেই, ছাদে গেছে বিড়ি টানতে। ওর সঙ্গে বেশি আবার কথা-টথা বোলো না। ও কিন্তু পাগল। মহিলা দেখলেই জড়িয়ে ধরে, কামড়ে দেয়।"

"অ্যাঁ, সেকি গো, কী বলছ তুমি! সে আসার আগে আমি যাই বাবা।" একরকম লাফিয়ে উঠে বললেন আলোনি। পরে আবার বললেন, "তা ওর সঙ্গে কী করে সংসার করো তুমি?"

"আমাকে কামড়ায় না। যেরকম পোষা কুকুর কি বাড়ির লোককে কামড়ায়?"

"ও, তাই বল। মহিলা বুঝে কামড়ায়। সে যা হোক, যাই গো, আবার কখন নেমে আসবে।"

বেরিয়ে যাবেন আলোদি। তাড়াহুড়োয় দরজার কাছ থেকে সরতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা লাগল আমার। আলোদি বেরোতে গিয়ে আমাকে দেখে দু-পা পিছিয়ে গেলেন।

আমি বাইরের দরজা খুলে ধরলাম। তিনি বড় বড় চোখে নজর করে সম্ভাব্য দূরত্ব বজায় রেখে বেঁকে-চুরে বেরিয়ে গেলেন।

ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, আমি হাসব না কাঁদব।

হাসির চাইতে কান্না দ্রুত স্পর্শ করে মানুষকে। হাসির জন্য যে অনুভূতির প্রয়োজন, কান্না তার সিকি ভাগেই কাজ চালিয়ে নেয়। না হলে আর তখনই আমার চোখে জল এল কেন। কী স্পর্শ করে গেল আমাকে! অস্তিত্বহীনতা? ভাল চা করে খাওয়াবার পরও আমার অস্তিত্বের সংকট তৈরি হয়, থেকে যায়। যা আমাকে কাঁদিয়ে ছাড়ে। তখন আমার আত্মহননের কথা মনে হয়। আত্মহননের এই দার্শনিক সমস্যা থেকে কারো মুক্তি নেই। প্রত্যেকের জীবনে কখনো না কখনো এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। কখনো তো মনে হয় জীবন অসহনীয়। যখন নিজের জীবনের প্রতি করুণা জন্মায়, তখন স্বেচ্ছামৃত্যু ভিন্ন আর পথ খোলা থাকে না।

গভীর রাত্রে গ্রিল ধরে তারা ভর্তি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি এরকম সিদ্ধান্ত নিই, এ-ভাবে পালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। তখন এ কথাও ভাবতে হয় আমাকে, আমার শত্রুরা তাহলে কি হাসবে না? হাতে হাত ঠেকিয়ে লাফিয়ে হেসে বলবে না আমরা জিতে গেলাম?

আমার একাকিত্ব, আমার স্থবির জীবন, লজ্জা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, যা ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে। আমি নিশ্চিতভাবে আত্মহননের প্রস্তুতির কথা ভাবলাম। তখন কেউ একজন বলে উঠল, "কী ঠিক করলে?" বলল আমার পিছন দিক থেকে। ঘুরে তাকালাম আমি। ছাদের সিঁড়ি ধরে নেমে আসছে ওরা সাতজন। বিস্ময়ে হতবাক আমি। ওরা কারা? মাথা থেকে পা পর্যন্ত আলখাল্লার মতো পোশাকে ঢাকা। একটা অবয়ব মাত্র। চোখ-মুখ যেন বা অদৃশ্য।

একটু ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলাম আমি। কিন্তু পিছনে গ্রিলের দরজা। অলোকার সঙ্গ চাইছি আমি। সে সুযোগ না দিয়ে বলে উঠল একজন, "কী ভাবছ, অ্যাঁ? আত্মহত্যা করবে!"

আর কী করার আছে আমার? তোমাদের মনে হয় আমি বেঁচে আছি? কোনও রকমে বলে ফেললাম আমি।

"সময়। সময় একদিন ঠিক সত্য উদ্‌ঘাটন করবে। ধৈর্য ধর।"

এই অবয়ব যেন বা আমার পিতার। বলে উঠি আমি, "কেন আমাকে এনেছ এই পৃথিবীতে?"

"তুমি কেন এনেছ তোমার কন্যাকে?"

বাকিরা যেন পিতার অবয়বের অনুগামী মাত্র। আমি হাঁ-করে তাকিয়ে থাকি। কোনও উত্তর নেই আমার কাছে।

"জানো না আত্মহত্যা মহাপাপ? জীবন অসহনীয় হলেও সহ্য করতে হবে।" বলে উঠল ওদের কেউ। তারপর আমার অগোচরে যেরকম এসেছিল, ফিরে গেল কোথায়।

আমার ভিতরে জেদ তৈরি হল। যে যন্ত্রনা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে তার সামনে আমি অসহায়। কে বলেছে আত্মহত্যা মহাপাপ? বরং বিশ্বাস, ভালবাসা পাপ। অসহায় আমি চেয়ারে বসে পড়লাম। টেবিল থেকে টেনে নিলাম একটা সাদা কাগজ। লিখলাম, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। নীচে সই করতে গেলাম। আমার হাত কেঁপে উঠল।

পরিচিতি: কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক।