গল্প

জনগণ মন



নন্দিনী নাগ


অনেকক্ষণ ধরেই মাঝবয়সি ভদ্রলোক বসেছিলেন ডাক্তার ভড়ের চেম্বারের বাইরে, রোগীদের অপেক্ষা করার জন্য যে ঘর আছে তার এক কোণায়। অ্যাটেন্ডেন্ট মহিলাটি দু'বার ডেকে গেছেন ইতিমধ্যে, তবে উনি যান নি। বলেছেন, "আমার তাড়া নেই। সব পেশেন্ট দেখা হয়ে গেলে আমি যাব।"

এমন পেশেন্সযুক্ত পেশেন্ট আগে কখনো দেখেননি যোগমায়া। চিরদিন বরং উলটোটাই দেখেছেন, লোকজন সবসময় ছলচাতুরী করে, মিথ্যে বলে লিস্টের অন্যদের টপকে যতটা সম্ভব আগে ডাক্তার দেখানোর চেষ্টা করে। তবে এখন এত কিছু ভাবার সময় নেই যোগমায়ার। ডাক্তারবাবুর রোগী দেখা শেষ হলে তবে তার ছুটি, অতএব সেই ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা যায়, ততই সুবিধা।

একসময় ওই একজন ছাড়া সবার দেখানো শেষ হলো। যোগমায়া এবার ভদ্রলোককে ডেকে বললেন, "এবার আপনি যাবেন তো?"

ভদ্রলোক যেমন মাথা হেঁট করে বসেছিলেন তেমনভাবেই গিয়ে ঢুকলেন ডাক্তার ভড়ের ঘরে। ডাক্তারবাবু সবসময় যেমন করেন, রোগীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বললেন, "কি সমস্যা? কোথায় কষ্ট?"

একটু ইতস্তত করে ভদ্রলোক বললেন, "আসলে কিছুদিন হলো আমি আর জনগণমন গাইতে পারছি না-"

ডাক্তার ভড় ততক্ষণে প্রেসক্রিপশনের ওপরের কেজো লেখাগুলো লিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন। লোকটার কথা শুনে হোঁচট খেয়ে থেমে গেলেন তিনি।

"কি বললেন? গান গাইতে পারছেন না? তার জন্য আমার কাছে কেন এসেছেন? কোনো নাক-কান-গলা স্পেশালিস্টের কাছে যেতে হবে আপনাকে।"

"না... মানে... সমস্যাটা গলার নয়, তাই..."

"গলায় নয়? তাহলে কি স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, মানে গানের কথা মনে পড়ছে না? সেক্ষেত্রেও আমার কিছু করার নেই। তবে আমি একটা কথা বলতে পারি, গান যখন গাইতে পারছেন না তখন গাওয়ার দরকারটাই বা কি? আপনি তো আর সঙ্গীত শিল্পী নন!"

নিজের ঠাট্টাটা নিজেরই এত পছন্দ হলো যে ডাক্তার ভড় হো হো করে হেসে উঠলেন। তবে ভদ্রলোকের মুখে বিন্দুমাত্র হাসি ফুটল না, তিনি যেমন 'বেচারা' গোছের মুখ করে বসেছিলেন, তেমনই বসে রইলেন।

আজকের শেষ রোগী, ডাক্তারবাবুর তেমন তাড়াহুড়োও ছিল না, তাই বললেন, "বলুন তো দেখি, আপনার সমস্যার কথাটা, সব কথা একদম খোলসা করে বলবেন। দেখি আপনার চিকিৎসা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয় কি না!"

ভদ্রলোক যেন এবার একটু সাহস পেলেন বলে মনে হলো। একটু হোঁচট খেয়ে হলেও বলে ফেললেন, "আমি এখানকার লোক নই, আমার বাড়ি আসাননগরে। ওখানেই একটা ইস্কুলে পড়াচ্ছি পঁচিশ বচ্ছর ধরে। এই পঁচিশটা বছর প্রতিদিন নিয়ম করে ইস্কুলের প্রার্থনায় যোগ দিয়েছি, তাছাড়া সেই ছোটোবেলা থেকে গর্ব করে জাতীয় সঙ্গীত গাইছি, কখনও কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ইদানীং দেখছি, গানটার দু'তিনটে লাইন গাওয়ার পরেই আমার স্বর ভেঙে যায়, গলা দিয়ে কান্নার দলা উঠে আসতে থাকে, চোখে জল চলে আসে, একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা!"

ডাক্তার ভড় যদিও মনোরোগ বিশারদ নন, তবু এই ভদ্রলোককে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল তাঁর। এমন অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে কেউ আগে কখনো আসেনি তাঁর কাছে, তাই লোকটাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখবেন বলে নিজে নড়েচড়ে বসলেন।
"তা মশাই, আপনার কি কেবল জনগণমন গাইতে গেলেই এমন হচ্ছে?"

"এটা দিয়েই রোগের সূত্রপাত হয়েছিল। এখন রোগ আরো ছড়িয়ে গেছে। এই তো সেদিন, ক্লাসে বাংলা পড়াতে ঢুকেছি। সবেমাত্র 'হও ধরমেতে ধীর হও করমেতে বীর' কবিতাটার সারমর্ম বোঝাতে শুরু করেছি, তখনই আবার রোগটা চাড়া দিল। 'ন্যায় বিরাজিত যাদের করে, বিঘ্ন পরাজিত তাদের স্বরে' লাইনদুটো থেকেই গলার কাছে অস্বস্তি শুরু হলো, তারপর যেই না 'সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে' লাইনটা এসেছে তখন আর ওদের বোঝাব কি, আমার নিজেরই কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেরাও খেয়াল করেছে আমার দশা, তারা থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল, একি স্যার! আপনি কাঁদছেন কেন? বাচ্চা ছেলেরা সব, হাঁ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, ওদের আমি কী করে বলি যে, তোদের এসব ভুল শিক্ষা দিতে হবে কোনোদিন ভাবিনি রে! মিথ্যে বুলিগুলো তোতাপাখির মতো আওড়াতে গিয়ে তাই এক অসহায় শিক্ষকের চোখে জল চলে আসছে।"

"হুঁ। গভীর সমস্যা মাস্টারমশাই। এমন ইমোশনাল ব্রেক ডাউন হলে আপনি পড়াবেন কী করে! আপনি একটা কাজ করতে পারেন, বাংলার ক্লাসটা পারলে অ্যাভয়েড করুন কিছুদিন। আসলে যেসব কবি সাহিত্যিকদের লেখা স্কুলে পড়ানো হয়, তাঁরা একটা স্বপ্ন, একটা আদর্শের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁদের সময়কালে এগুলো লিখেছিলেন। তাঁরা তো আর বুঝতে পারেননি, একটা দিন আসবে যেদিন তাঁদের লেখার অর্থ লোকজনের কাছে বিলকুল উলটো মনে হবে, লেখাগুলো লেখককেই ভেংচি কাটবে! সাম্য নাকি স্বার্থকে ভয় পায় না! আজকের দিনে এই কথা ভাবতে গেলেও হাসি পায়।"

"সে উপায় নেই ডাক্তারবাবু। আমাদের ইস্কুলে বর্তমানে আমরা তিনজন শিক্ষক আছি। দশবচ্ছর হলো নিয়োগ বন্ধ, রিটায়ার করে-টরে আমরা মাত্র পাঁচজন পড়ে ছিলাম, তার মধ্যে আবার দু'জনের চাকরি চলে গেল। কাজেই আমাদের তিনজনকেই সব ক্লাস নিতে হয়।"

"তিনজনে পুরো স্কুল চালাচ্ছেন! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার!"

"চলছে আর কোথায় ডাক্তারবাবু? মাঝপথে দাঁড়িয়ে আছে।"

মাথা নিচু করে, নিচু গলায় বললেন ভদ্রলোক।

ডাক্তার ভড় একটু ভেবে বললেন, "আমার মনে হচ্ছে, আপনার মনে 'দেশ' সম্পর্কে একটা সুন্দর ছবি আঁকা আছে। সেই ধারণা যখন বাস্তবের ধাক্কায় ভেঙেচুরে যাচ্ছে তখন আপনিও ভেঙে পড়ছেন। ধারণা তো আর সহজে বদলানো যাবে না, বাস্তবটাও নয়। আপনি বরং একটা কাজ করতে পারেন, খারাপ জিনিস যেগুলো আপনার মনের ওপর নেগেটিভ প্রভাব ফেলছে, সেগুলো থেকে কিছুদিন দূরে থাকুন। খবর পড়বেন না, টিভি দেখবেন না, চারপাশে যা হচ্ছে সেসব শুনবেন না, বাইরের কোনো ব্যাপারে মন দেবেন না। কেবল মন দিয়ে ছাত্রদের পড়ান আর খান, ঘুমান।"

"সে চেষ্টাও করে দেখেছি ডাক্তারবাবু, তাতেও ছাড়ান নেই। খারাপের দুনিয়ায় একটা ভালো মানুষের দেখা পেলেও আমার ওই একই অবস্থা হয়। এই তো সেদিন আমাদের গ্রামের ভক্তিচরণ সাহা পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভাঙলেন। শহরে নিয়ে এলাম, ডাক্তারবাবু বললেন অপারেশন করাতে হবে। ভক্তির ছোট্ট একটা মুদির দোকান, অপারেশনের টাকা সে কোথায় পাবে? গোরুদুটো বেচে টাকা জোগাড় করল। অপারেশনের দিন আবার আমাকে আসতে হলো ভক্তির সঙ্গে। কাউন্টারে টাকা জমা করার সময় ওর গোরু বিক্রি করার কথাটা আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেছিল। টাকা জমা করে বসে আছি ভক্তির বেডের পাশে, তখনও ভক্তির ডাক আসেনি, এমন সময় ডাক্তারবাবু এলেন সেখানে। ভক্তিকে বললেন, তুমি গোরু বিক্রি করে টাকা এনেছ? ভক্তি স্বীকার করল। আমি তাকিয়ে দেখি ডাক্তারবাবুর চোখে জল। চোখ মুছে উনি বললেন, তুমি আমাকে সেদিন বলোনি কেন? আমি ওদের বলে দিয়েছি, তোমার টাকা ফিরিয়ে দেবে। ডাক্তারবাবু চলে গেলেন, ভক্তিকেও ওটিতে নিয়ে গেল, এদিকে আমার চোখের জল তো আর শুকায় না! ভক্তির ছেলে বাইরে ছিল, সে এসে আমাকে কাঁদতে দেখে ঘাবড়ে গেল, ভাবল তার বাপের বুঝি খারাপ কিছু হয়েছে! কি সমস্যা বলুন তো!"
ডাক্তার ভড় নাক টেনে বললেন, "আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই! মনে হচ্ছে এবারে আমাকেও কাঁদিয়ে ছাড়বেন! আচ্ছা এবার বলুন তো, আপনার এই সমস্যাটা শুরু হয়েছে কবে থেকে?"

"একবছর হলো ডাক্তারবাবু! আমার ছেলেটা ডাক্তারি পড়ছে, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালে। গতবছর কলকাতায় যখন প্রতিবাদ আন্দোলন হচ্ছিল, আমার ছেলেটাও ওখানে গিয়েছিল। বাচ্চা ছেলে, কলকাতায় আমাদের কেউ চেনা পরিচিত নেই, একা একা গিয়ে কোথায় থাকছে, কি খাচ্ছে দেখার জন্য আমিও দুদিন বাদে গেলাম। গিয়ে তো আমার চক্ষুস্থির। একমায়ের কোল খালি হয়েছে বলে হাজার হাজার মা কোল পেতে দিয়েছে আমার ছেলেদের জন্য। যে ছেলেমেয়েগুলো ঘরদোর ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় বসে আছে তাদের জন্য খাবার, জল, ইলেকট্রিক, মাথার ওপর ত্রিপল সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা। কত মানুষ সারারাত জেগে পাহারা দিচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়েগুলোকে, কত বাড়ি থেকে ভোরবেলা চলে আসছে চা বিস্কুট, কত মা আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে, বাতাস করছে হাতপাখা দিয়ে। শুনেছিলাম, মানুষ শহরে থাকতে থাকতে ইঁটপাথরের মতোই হয়ে যায়, গিয়ে দেখলাম তা তো নয়! কোথা থেকে যে এত প্রাণ এলো তাদের মধ্যে, ভাবতে অবাক লাগছিল। সেদিন এত মানুষের নজরদারির মধ্যে ছিল বলেই আমাদের ছেলেমেয়েগুলোর কোনো বিপদ আপদ ঘটেনি। তারপর ওরা মিছিল বার করল, আমিও ওদের সঙ্গে হাঁটলাম। হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক মানুষ, লাঠি হাতে মিছিলে এসেছে। হুইলচেয়ারে জীবন কাটে যে মানুষের তাকেও থামিয়ে রাখা যায়নি। বৃষ্টি, রোদ, ভয় সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে মানুষ পথে নেমেছে মানুষের হাত ধরতে। তারপর ওরা অনশনে বসল। আমি দেখলাম চারপাশে মানুষ বড়ো কাঁদছে। এখনও মানুষ অপরিচিতের জন্য কাঁদে দেখে আমার বড়ো ভালো লাগল ডাক্তারবাবু। সেই কান্না বিচারকের কানে পৌঁছল না বটে তবে আমাকে দুমড়ে মুচড়ে দিল। আহা! আমার চারপাশে এখনও কত মানুষ আছে! আমার মানে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা শিখে শুধু ডাক্তার হয়নি, মানুষও হয়েছে, দেখে বড়ো ভালো লাগল ডাক্তারবাবু, খুব শান্তি পেলাম। সেই থেকেই আমার পাষাণ বুকের আগল খুলে গেল। চোখের জল বড়ো সংক্রামক ব্যাধি ডাক্তারবাবু, এত মানুষের চোখের জলে সংক্রমিত হয়েছি তো, তাই এখন আর চোখের জল বাঁধ মানে না।"

শেষ রোগীকে চেম্বারে ঢুকিয়ে দিয়ে যোগমায়া গেছিল গুছিয়ে নিতে, যাতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে চেম্বারটা বন্ধ করে ফেলা যায়। ওদিকটা সেরে এসেও যখন সে দেখল রোগী তখনও বেরোয়নি, তাই কৌতূহলবশত সে ভেতরে ঢুকেছিল। লোকটার কথাগুলো শুনে তার জীবন সংগ্রামে পাথর হয়ে যাওয়া বুকের ভেতরে তিরতিরে জলের ধারা বইতে শুরু করল, যোগমায়া দাঁড়িয়ে গেল। ভদ্রলোক যখন থামলেন যোগমায়ার মনে হলো, আরেকটা বিয়ে করে সংসার ভাসিয়ে চলে যাওয়া তার স্বামীটিই তো শেষ কথা নয়! এই যে ডাক্তারবাবু আছেন, যিনি ওকে কাজ দিয়েছেন, তাছাড়া মাইনেটাও অন্যদের চাইতে বেশিই দেন। আছেন মেয়ের স্কুলের কাজরী দিদিমণি, যিনি বইখাতা সব কিনে দেন, এমনকী বাড়িতে ডেকে আলাদা করে পড়ানও। সবচেয়ে বড়ো কথা, পাশের ঘরের কল্যাণী কাকিমাও তো আছে! সে না থাকলে ছোটো মেয়েটাকে কার ভরসায় রেখে যোগমায়া কাজে বেরোতো?

এসব ভাবতে ভাবতে যোগমায়ার বুকের ঝোরা ততক্ষণে দু'চোখের নদী। সেদিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু বললেন, "আপনি শেষে যোগমায়াকেও কাঁদিয়ে ছাড়লেন! আপনি কিন্তু খুবই বিপজ্জনক লোক মশাই। তবে আমি যা বুঝলাম, আপনার এ অসুখ সারবার নয়! এমন অসুখ তো আর সকলের হয় না, তাই যাদের হয় তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে।"

ডাক্তারবাবুর জবাব শুনে ভদ্রলোকের মুখের আলো নিভে গেল। হতাশ গলায় তিনি বললেন,
"কিন্তু তাহলে আমার জনগণমন গাওয়ার কী হবে?"

ডাক্তারবাবু চোখ রাখলেন মাস্টারমশাইয়ের চোখে। তারপর নিচু গলায় গোপন শলা করার স্বরে বললেন, 
"গাইবেন না। যতদিন জনগণের মন না বদলায় ততদিন নিজেকে বিরত রাখুন।"

পরিচিতি: কবি, গল্পকার ও শিক্ষিকা।