সেদিন ছিল অন্যরকম সকাল। বৃষ্টি থামার পরে সদ্যস্নাত দেবদারুটা নিজের গা-টা ঝেড়ে নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই আশপাশ জুড়ে গজিয়ে ওঠা ছাতার তলা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাঙগুলো সবে দেবদারু গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে একটু নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা সেরে নেবে ভাবছিল। দেবদারুটা ওদের পুরো ভিজিয়ে ছাড়ল। ব্যাঙেদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো কোলাব্যাঙটা ভীষণ রেগে দেবদারু গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "ভারি বেআক্কেলে তো তুমি! কী ভাবলে, আমরা তোমার চরণে আশ্রয় নিতে এসেছি? জায়গাটা ফাঁকা বলে সবাই একসঙ্গে হাজির হয়েছিলাম নিজেদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে। তাছাড়াও একটা জরুরি আলোচনা সেরে ফেলব বলে। তোমার দেখছি সহ্য হল না! মানুষের মাঝে থাকতে থাকতে গাছেদের স্বভাব ভুলে ওদের স্বভাবখানা বেশ রপ্ত করে নিয়েছ দেখছি। নিজেরটুকু ছাড়া অন্যের কথা ভাবতেই ভুলে গেছ"!
কোলাব্যাঙের কথাগুলো শুনে বেশ অবাক হল দেবদারুটা। সে জেনেবুঝে কিছুই করেনি। পাতাদের গায়ে যে জলটুকু জমেছিল সেটুকুই কেবল ঝরিয়ে দেবার জন্য শরীরটা নাড়িয়েছিল, পাছে তাদের গায়ে জল বসে যেন পচন না ধরে। সেটা করতে গিয়েই ব্যাঙেদের ভিজিয়ে ফেলল।
গাছটা কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে কোলাব্যাঙটা আরও রেগে গেল। সে চিৎকার করে বলল, "আমাদের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য কবেই বা কার মাথাব্যথা ছিল? তা যদি থাকত তাহলে একের পর এক জলা বুজিয়ে আমাদের থাকার জায়গাগুলো কেড়ে নিত না। তুমিও এত নিশ্চিন্তে থেকো না, যে জায়গা আঁকড়ে বসে আছো সেটা আর বেশিদিন তোমার থাকবে না। একবার তোমার বাড়বাড়ন্ত শরীরের ওপর নজর আটকালেই হল, কোনো না কোনো অজুহাত খাড়া করে কুঠারের আঘাতে ফালা ফালা করে কেটে ফেলবে।
এবার দেবদারুটা বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, "অভিশাপ দিচ্ছ কেন? না বুঝে এভাবে বলাটা বুঝি খুব ভালো স্বভাবের মধ্যে পড়ে? আমি তোমাদের দেখতে পেলে কখনোই এমনটা ঘটত না। তোমাদের ভিজিয়ে ফেলার জন্য দুঃখিত। এখন বরং তোমরা নিজেদের মতো করে কথাবার্তা সেরে নাও"।
কোলাব্যাঙ এবার স্বরটা নরম করে বলল, "কী আর বলব বল – এখন আমরা উদ্ বাস্তু হয়ে পড়েছি। আজ এই জায়গাতে আছি তো কয়েক মাসের মধ্যেই সে জায়গা যেন উবে যাচ্ছে! সব জানার পরেও আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। নিজেদের বলে আমাদের তো কোনো জায়গা নেই, আর আমাদের নিয়ে ভাবার অত সময়ও কারো হাতে নেই। উলটে যাদের জায়গা তারাই প্রতিবাদ করতে গেলে চড়-থাপ্পড় খাচ্ছে, আমরা তো অতি তুচ্ছ প্রাণী"।
দেবদারু বলল, "ঠিকই বলেছ এখন পরিস্থিতি খুব খারাপ। যে কোনো সময় যে কারুর ওপর আক্রমণ হতে পারে। এই তো কয়েক মাস আগেই ঘোষপাড়ার বিশাল বটগাছটাকে নির্বিচারে হত্যা করল হাই-রাইজ বিল্ডিং বানাবে বলে। ওর মৃত্যুর খবর পেয়ে বেশ কিছুদিন মুষড়ে পড়েছিলাম। এখন প্রাণ নেওয়াটা অতি তুচ্ছ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আর আমাদের মতো নির্বাক প্রাণের তো কোনো মূল্যই নেই। কিছু মানুষের এখনও আমাদের জন্য কষ্ট হয়। কিন্তু তারা সংখ্যায় এতটাই কম যে প্রতিবাদ করেও রুখতে পারেনা। তোমরা তো তা'ও চলাচল করতে পারো, আমার তো সে ক্ষমতাও নেই।”
দেবদারুর দুঃখের কথাগুলো শুনে অন্য ব্যাঙেদের চোখেও জল চলে এল। ওরা কিছু সময়ের জন্য নিজেদের কথা ভুলে গাছটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
দেবদারু বলল, “কী গো তোমরা চুপচাপ হয়ে গেলে কেন? এখন সময়টাই এইরকম, মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে বল? তারচেয়ে বরং যে ক'টা দিন প্রাণটা আছে সে ক'দিন একে অপরের পাশে থেকে যে যেভাবে যতটুকু পারি সুন্দর পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করে বাঁচি।”
কোলাব্যাঙ বলল, “তোমার পক্ষে সেটা সম্ভব। তোমার খাবার মাটির তলা থেকে আসে। সূর্যের আলো নিয়ে খাবার তৈরি করাতেও কোনো বাধা নেই। আমাদের কী সে উপায় আছে? এক জায়গা থেকে বাস গুটিয়ে যখন অন্য খানা-ডোবায় যাই, সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে তাদের বাসস্থান, খাবারের ওপর ভাগ বসাতে হয়। তারফলে সেভাবে কারুর ঠিকঠাক পেট ভরেনা। অথচ আমরাও এই স্বাধীন দেশের বাসিন্দা। আমাদেরও সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। যে অধিকার আমরা কমজোরি বলে আদায় করতে পারছি না।”
দেবদারু বলল, “সে তো ঠিকই। অধিকার শব্দের ব্যবহার করতে একমাত্র মানুষেরা জানে বলেই এভাবে প্রতিনিয়ত তার অপব্যবহার করে চলেছে। এতে করে তো পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে। এইভাবে জলাশয় বোজাতে থাকলে একসময় জলের অভাবে নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। ওরা নাকি বুদ্ধিমান, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব!”
সোনাব্যাঙেরা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। এবার তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, “বুদ্ধিমান তো বটেই। তবে সেই বুদ্ধিটাকে কোথায় কাজে লাগালে সবার মঙ্গল হয় সেটা নিয়ে অত ভাবার সময় ওদের নেই। শুনেছি জন্ম একবারই হয়, তাই জীবনটাকে নিয়ে যত পারো শুধু ভোগ করে যাও। কী হবে অন্যের মঙ্গলের কথা ভেবে? আজ আর কেউ উপকারীর উপকার করার কথা স্বীকারও করেনা। বরং কেউ উপকার করলে কীভাবে তার ক্ষতি করবে সেটা ভেবেই দিনরাত এক করে ফেলে।”
দেবদারু তার কথাগুলো শুনে বলল, “বেশ বললে তো! বটগাছটাই তো তার প্রমাণ। বেঁচে থাকা অবস্থাতে কেবল নিজেকে উজাড় করে দিয়ে গেছে। তবে সবাই সেটা অস্বীকার করে তা কিন্তু নয়।”
সোনাব্যাঙ বলল, "জানি তো, কানার মধ্যে ঝাপসা দেখা লোকেরা সেই দলের মধ্যে পড়ে। তাদের না আছে সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা, না আছে আর্থিক বৈভব।”
কোলাব্যাঙ বলল, “এবার আমাদের যে কথা বলতে এখানে আসা সেটা বলে ফেলি। সামনের মাসেই স্বাধীনতা দিবসের উৎসব পালন করার জন্য মোড়ের মাথার শহিদ বেদিটার সামনে প্রচুর লোক উপস্থিত হবে। ওদের স্বাধীনতায় এবার আমরাও অংশগ্রহণ করব। এটা আমাদেরও অধিকার। আশেপাশের যেখানে যত ব্যাঙ আছে সবাইকে হাজির করাতে হবে। দেখি এবার স্বাধীন দেশে নির্বিঘ্নে কীভাবে পতাকা উত্তোলন করা হয়। প্রতিবছর মিথ্যে অঙ্গীকারের ভাষণে অনেক ভুলেছি আমরা। এবার বুঝিয়ে দিতে হবে আমাদেরও স্বাধীনতা চাই। যে ক'জন মানুষ ওখানে উপস্থিত হবে, তার থেকেও বেশি ব্যাঙেদের হাজির হতে হবে। যাতে প্রতিটা মানুষের পায়ের আশেপাশে গিজগিজ করে ব্যাঙ। ক'টাকে পায়ের তলায় পিষে মারবে? গেছোব্যাঙেদেরও খবর দিও, ওদের লাফালাফিতেও অনেক কাজ হবে। কত মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে আমাদের এই দেশ। আর আজ সেই স্বাধীন দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য হরণ করে তাকে নিরাভরণ কঙ্কালসার রূপ দেওয়ার চেষ্টা যারা করছে, তাদের হাত দিয়ে কিছুতেই পতাকা উত্তোলন করতে দেওয়া যাবেনা।”
এতগুলো ব্যাঙকে একসঙ্গে দেখে লোভ সামলাতে না পেরে একটা দাঁড়া সাপ দেবদারু গাছটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এত সহজে শিকার মিলে যাবে ভাবতে পারেনি। হিসহিস শব্দে জিভটাকে বারবার মুখের বাইরে এনে আবার ঢুকিয়ে নিচ্ছে। তারপরেও সে একটা ব্যাঙকেও মারল না। বোধহয় তাদের আলোচনার কিছু অংশ তার কান অবধি পৌঁছেছে। কিছুক্ষণ শরীরটা গুটিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে ব্যাঙেদের উদ্দেশে বলল, এখনই গিয়ে সে অন্য সাপেদের খবর দেবে। তারাও উপস্থিত থাকবে ওদের সঙ্গে। গাছ কেটে, জলাভূমি বুজিয়ে দেওয়ার জন্য তাদেরও কষ্টের শেষ নেই। একে অপরের মুখ থেকে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। সাপ, ব্যাঙ, কুকুর, বিড়াল, পাখি সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতার অপব্যবহার রুখে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকল।
দেবদারুটা কেবল সাক্ষী রইল ব্যাঙেদের প্রতিবাদী সভার। শত চেষ্টা করলেও সে একফোঁটাও নড়তে পারবে না। কেবল মনে মনে এটুকুই চাইল স্বাধীনতা দিবসটা যেন সেদিন ধুমধাম করে পালন করা হয়, যেদিন স্বাধীন দেশের একজন বাসিন্দাকেও পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে জীবন কাটাতে হবেনা। হয়তো ব্যাঙেরা কিছুই করতে পারবে না, তারপরেও ভীরু-কাপুরুষদের চোখের পর্দা সরানোর এও এক নতুন পথ রচনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
সকাল সকাল শহিদ বেদিটার সামনে একে একে ধোপদুরস্ত পোশাকে রঞ্জিত হয়ে উপস্থিত হতে থাকল। বেদিটাকে সাজানোর পর্ব সমাপ্ত হতেই হঠাৎই গেছো ব্যাঙের দল সেটাকে ঘিরে লাফালাফি জুড়ে দিল। কেউ কেউ আবার গায়ে চড়ে শরীরে কতটা মানুষের গন্ধ আছে, পরখ করে নিতে ভুলল না। তাদের লাফালাফি জারি থাকা অবস্থাতেই সেই জায়গাটা ঘিরে নিল অজস্র সোনাব্যাঙ, কোলাব্যাঙের দল। তাদের কণ্ঠে দ্রোহের আগুন, লাগাতার চিৎকারে সবার কান ঝালাপালা হয়ে উঠল। এই অবধি তবুও ঠিক ছিল। বিষাক্ত সাপেদের আগমন ঘটতেই যে যেদিকে পারল প্রাণ হাতে দৌড়ানো শুরু করে দিল। বেড়াল, কুকুরেরাও পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিল। উড়ে আসা পাখিদের ডানার শব্দে প্রলয়ের হুঙ্কার। ওরা ছুটছে মুখোশে ঢাকা মুখগুলো নিয়ে। অত্যাচারী, ক্ষমতালোভী, কামুকের দল। আর শত্রু-মিত্র একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে।
স্বাধীন দেশের দড়ি বাঁধা পতাকার মুখে এক অদ্ভুত হাসির ঝলক। যেন এই দিনটা দেখার অপেক্ষাতেই সে নিজেকে যতটা পেরেছে গুটিয়ে রেখেছিল। এবার সে নিজেই নিজেকে মেলে ধরতে চায় গোটা দেশের বুকে। দেখিয়ে দিতে চায় প্রকৃত স্বাধীনতার পতাকার রূপ।

পরিচিতি: কবি ও গল্পকার।
